যুক্তরাষ্ট্রে আজ বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২০ ইং

|   ঢাকা - 01:39am

|   লন্ডন - 08:39pm

|   নিউইয়র্ক - 03:39pm

  সর্বশেষ :

  করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ২ লাখ মানুষ   বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ৫০ হাজার ছাড়াল   চলতি মাসের শেষে নিয়ন্ত্রণে আসবে করোনা: চীনের বিশেষজ্ঞ   ইসরাইলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনায় আক্রান্ত, প্রধানমন্ত্রী আইসোলেশনে   মক্কা-মদিনায় ২৪ ঘণ্টার কারফিউ   বাংলাদেশে আটকে পড়া ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ডিকসনের ৪ বার্তা   ব্রিটেনে একদিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানি, ২৪ ঘণ্টায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি   বাংলাদেশে সর্দি, কাশি, জ্বর ও গলাব্যাথা নিয়ে ৫৮ জনের মৃত্যু   করোনা সংক্রমণ: যুক্তরাষ্ট্রে সব কারাগার লকডাউন   করোনায় লকডাউন ভাঙলে গুলির নির্দেশ   করোনা লড়াইয়ে ভারতকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল চিনা অ্যাপ টিকটক   করোনার কারণে একজন চীনা কূটনীতিকও ফিরে যাবে না   মুম্বাইয়ে হোম কোয়ারেন্টিনে ১৩ বাংলাদেশি   নিজামুদ্দিনে যোগ দেওয়া আরও দুইজনের করোনায় মৃত্যু   করোনায় লন্ডনের হাসপাতালে প্রাণ গেল সোমালিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর

>>  কলাম এর সকল সংবাদ

এই নিউইয়র্ক আমি চাই না

আসছে গ্রীষ্মে আমার নিউইয়র্কে বাসের এক যুগ পূর্ণ হবে। বেশি দিন ধরে নিউইয়র্কে বাস করছেন এমন কেউ হয়তো বলবেন, এক যুগ তথা ১২ বছর এমনকি সময়? যা নিয়ে ঘটা করে কিছু বলতে বা লিখতে হবে। তা আমারও জানা। তবুও নিউইয়র্ক ঘিরে আমার ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে নিজ অভিব্যক্তি লেখা উচিত বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।
আমেরিকাতে আসা অভিবাসীদের নিয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে। তা হলো—অভিবাসীদের বয়ে নিয়ে আনা বিমানটি যে শহরে অবতরণ করবে, অধিকাংশ প্রবাসীদের জীবনগল্পের শুরু এবং শেষ এই শহরকে নিয়েই। নিজ জীবন নাটকের চিত্রনাট্য লেখা ও মঞ্চস্থ হয় সেই প্রথম আসা শহরে। সে ক্ষেত্রে আমার

বিস্তারিত খবর

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে আপনার/আমার যত করণীয়

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-২৬ ০৬:৪৯:৪৮



প্রাণঘাতী কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) আজ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বের ১৯৮টি দেশে। পুরো বিশ্ব, পুরো গ্রহে আজ ছড়িয়ে পড়েছে মরণব্যাধী এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। এতো দ্রুত গতিতে এতো বিশাল সংখ্যক মানুষকে আর কেউ ঘায়েল করতে পেরেছে কিনা তা খতিয়ে দেখার কাজ ঐতিহাসিকদের। কিন্তু নতুন এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই গ্রহে বসবাসকারী আমরা কেউ বিচ্ছিন্ন প্রাণী নই। আমরা সবাই এক। 

প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটির সংক্রমণ বা প্রাদুর্ভাব কমাতে কিছু করণীয় কাজের কথা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের প্রতিটি দেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার দেওয়া এই ম্যানুয়ালটি মেনে চলার কথা বলছে। 

যেহেতু সর্বনাশা এই ভাইরাসটির এখনো কোন প্রতিষেধক নেই। তাই আমাদের এ সকল করণীয় মেনে চলা শুধু আবশ্যক বা বাঞ্ছনীয় নয়, বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। তাই চলুন আপনি, আমি, আমরা সবাই মিলে এই গ্রহের স্বার্থে; বিশ্বমানবতার স্বার্থে নিচের করণীয় কাজগুলো মেনে চলি। প্রাণঘাতী করোনা থেকে নিজে নিরাপদ থাকি। সেইসাথে অন্যকে নিরাপদ রাখি। নিরাপদ রাখি আমাদের প্রিয় পরিবেশ ও প্রিয় পৃথিবীকে।   

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সবাইকে নিরাপদ রাখতে আপনার যত করণীয়

সামাজিক দূরত্বঃ 
চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করার কথা। জানতে চান সামাজিক দূরত্ব কী? এই সামাজিক দূরত্ব বলতে বোঝায় ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ না করা। সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখা। কারো সাথে দেখা করা বা কথাবার্তা বলার সময় কমপক্ষে ২-৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা। যাতে করে ভাইরাসটি দ্রুত সংক্রমিত বা ছড়িয়ে পড়তে না পারে। সেইসাথে একত্রে অনেকে জড়ো না হওয়া, হৈ চৈ বা আড্ডাবাজি না করাই হল সামাজিক দূরত্ব। 
যা পরিহার করবেন 
কোন একটি গ্রুপে একত্রে জড়ো হওয়া। অতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাস। থিয়েটারে যাওয়া। সকল প্রকার খেলাধুলা ও খেলার মাঠ থেকে বিরত থাকা। প্রেমিকার সাথে বাইরে ডেটিং এ যাওয়া। বাইরে ঘুরতে যাওয়া। অ্যাথলেটিক ইভেন্ট। জনবহুল স্থানে গমন। শপিং মল, বার, রেস্টুরেন্ট বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ভ্রমণ। এমনকি আপনার বাসায় অতিথি আগমনও বন্ধ করতে হবে আপনাকে। 
ভাবছেন, এসব কেন পরিহার করবেন? এসব পরিহার করবেন কারণ প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি যাতে কোনভাবেই একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)’, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটির নিয়ে গবেষণা করেন। 

তাদের করা গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, নতুন এই ভাইরাসটি বাতাসে সর্বোচ্চ ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। কাঠের উপর এই টিকে থাকার সময় হল ২৪ ঘণ্টা। আর প্লাস্টিক বা স্টেইনলেস স্টিলের উপর এই সময় ২-৩ দিন। এবার ভাবুন। 
সুতরাং আপনার করোনা নাই। এসব বিধি আপনার জন্য নয়। যতদ্রুত সম্ভব এই মানসিকতা পরিহার করুন। কেন? কারণ গত বৎসরের ডিসেম্বরে এই ভাইরাসটি শুধু উহানেই ছিল। আপনার, আমার এই বীরত্বপূর্ণ মানসিকতার জন্যই এটা আজ বিশ্বের ১৯৮টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।        
যা করা নিরাপদ 
বাসায় বসে এখন যা করা নিরাপদ। হাঁটা চলা করেন। বাসায় কাজ করেন। নিজ আঙিনায় খেলাধুলা করেন। ভাল বই পড়েন। রান্নাবান্না করেন। গান শুনেন। গ্রুপে ভিডিও চ্যাট করেন। সিনিয়র প্রতিবেশীদের কল বা টেক্সট করেন। বন্ধুকে টেক্সট বা কল করেন। পরিবারকে সময় দেন। আর বারবার সাবান পানি দিয়ে নিজের হাত ধুয়ে পরিষ্কার করে। ভাবছেন বারবার মানে আবার কতবার? কমপক্ষে ১৫-১৬ বার। 
এর বাইরে ভাল থাকার জন্য আপনি করতে পারেন আরও নানা সৃজনশীল কাজ। নিজে নিরাপদ থাকুন। অন্যকে নিরাপদ রাখুন। আর এই দায়িত্ব আপনার, আমার সকলের।   

আর্টিকেলটি লিখতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ও ক্যালিফোর্নিয়া স্বাস্থ্যবিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন লিফলেট ও ম্যানুয়ালের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। 

 

বিস্তারিত খবর

সন্দেহ ক্রমেই দানা বাঁধছে! বিশ্বটাকে হাতে নিয়ে নাচাচ্ছে নাতো চীন?

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-২৪ ০২:১৯:৪৩

বিশ্বটাকে হাতে নিয়ে নাচাচ্ছে নাতো চীন? এখনই উচিত গোটা বিশ্বের এক হওয়া, চীনকে বিশ্ব জুড়ে বয়কট করা..বিশ্বের সমস্ত দেশের আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ উসুল করা | যে সব তৃতীয় বিশ্বের দেশ এই মারাত্মক ভাইরাস এ আক্রান্ত হবে তার সকল দায়ভার চীনের উপর চাপানো..দরকারে বিদেশে থাকা চীনের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণ মেটানো উচিত | বিশ্ব জুড়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য শুধু মাত্র চীন দায়ী.. জবাবদিহি চীনকে করতেই হবে.. শুধু ভয় একটাই বিশ্বের মেরুদন্ডটা যেন ততদিনে ভেঙ্গে না যায় l
 
চীন খুব দ্রুত করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পাচ্ছে | একের পর এক অস্থায়ী হাসপাতাল বন্ধ করছে উহানে নতুন করে মাত্র একজনের সংক্রমণ ঘটেছে..গোটা চিনে মাত্র 13 জন | বেশ অবাক লাগছে না ভাবতে?? মনে হচ্ছে না এটা কি ভাবে সম্ভব?? আর একটু অবাক হবেন এটা জানলে একের পর এক বিদেশী মিডিয়া ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান আরো অনেক দেশের মিডিয়া কে দেশ থেকে বার করে দিচ্ছে যাতে তারা চীনের কোনো খবরই না করতে পারে..

ইতালি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা, ইরান ক্রমশঃ ভয়াবহ স্টেজ এ পৌঁছাচ্ছে..আমেরিকার, ইউরোপের স্টক মার্কেট ও ক্র্যাশ করে গেছে..বিশ্ব জুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি | অথচ একটু চাইনিজ মিডিয়া দেখবেন কি দারুন দৃশ্য | সবাই মাস্ক খুলে ফেলছে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, হিরো দের মতো ওয়েলকাম হচ্ছে সবার.. বেশ অবাক লাগছে না দেখে??

এত বড়ো ক্রাইসিস অথচ এত ফাস্ট রিকভারি?? শেয়ার মার্কেট থেকে কার্রেনসি ড্রপ কোনো কিছুতেই আঘাত লাগলো না..এতোই উন্নত ষোলো খানা হাসপাতাল রাতারাতি তৈরী হয়ে গেলো,আপনি বিশ্বাস করেন এসবের জন্য কোনো প্রিপারেশন ছিলো না তাদের কাছে?? 2,00, 000 করোনা ভাইরাস ইনফেক্টেড থেকে 0 ইনফেক্টেড সব হাসপাতাল রাতারাতি উবে গেলো সবাই আনন্দে মাতোয়ারা প্রেসিডেন্ট কি সুন্দর মৌনব্রত পালন করলো দারুন লাগছে না শুনতে??

যেন সিনেমার মতো সাজানো সন্দেহ জাগে সবটা সত্যি সাজানো নয় তো?? নিজের ঘর কিছুটা পুড়িয়ে বিশ্ব কে জ্বালিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত নয় তো?? বিশ্বকে ভয়ানক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে অধীশ্বর হবার চক্রান্ত নয় তো??

শুনেছিলাম লংকা পড়াতে গিয়ে হনুমান নিজের ল্যাজে আগুন লাগিয়ে ছিলো | উহান হনুমানের ল্যাজের মতো ব্যবহার হলো না তো?? চীনা দের লাইফ স্টাইল বা খাদ্যাভ্যাস দেখা যায় তাহলে বোঝা যায় খুব সহজেই যে তারা কতটা নিষ্ঠুর, কতটা হিংস্র, তারা পারে না এমন কোনো কাজ নেই যদি সত্যিই বিশ্বের অধীশ্বর হবার জন্য এই ভাইরাসকে চীন হাতিয়ার করে থাকে তাহলে অবাক হবার কিছু থাকবে না সত্যিটা হয়তো খুব তাড়াতাড়ি বেরোবে,কিন্তু তখন বিশ্বের মেরুদন্ড থাকবে তো চীনের সামনে দাঁড়ানোর জন্য ?

বিস্তারিত খবর

করোনার ভয় পেলে চলবেনা

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-১৪ ০২:৫৬:৪৯

করোনার মতো কঠিন সময়ে খুব বড় একটা অসুস্থতা কাটিয়ে উঠলাম। যদিও এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ফেব্রুয়ারীর ২৪ তারিখ থেকে প্রচন্ড হাঁচি, নাক মুখ দিয়ে  অনবরত পানি পড়েছে, গায়ে ১০১ এর বেশি তাপমাত্রা বুকে ব্যাথা,  শ্বাস কষ্ট, সমস্ত শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা। ডাষ্ট এলার্জি আছে তাই ওটাতেই আক্রান্ত হয়েছি ভাবলাম। কাজ ফেলে ছুটি নিয়ে বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগেনা।পরদিন অফিসে গেলাম কিন্তু বসে কোনো কাজ করতে পারলামনা। তারপর নানান ওষুধে কদিন গেল। কিন্তু জ্বর বা অন্য কোনো কষ্ট কমলোনা। শ্বাস কষ্ট বেড়ে গেল, কোনো কথা উচ্চারণেও কষ্ট হচ্ছিল। এমন কষ্ট কোনোদিন হয়নি। নিজের বুক ফেড়ে নিজেই পরিস্কার করতে মন চাচ্ছিলো। ফেব্রুয়ারীর ২৯ তারিখে বক্ষ ব্যাধি বিশেষজ্ঞের কাছে গেলাম। আমার এক ভাই জোর করে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। এক্সরে রিপোর্ট দেখিয়ে বললেন বুকের ডানপাশের ফুসফুসে অনেকটা পানি জমেছে। এছাড়াও আরো কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার বললেন তিনমাস ওষুধ খেতে হবে।

 আমার মনের জোর খুব বেশি কিন্তু শ্বাস কষ্টের কাছে হেরে যাচ্ছিলাম বারবার। তবুও ঘড়ির কাটা ধরে ওষুধ খেতে লাগলাম। ১০ দিন ওষুধ খাওয়ার পরে সামান্য কষ্ট কমলো। গতকাল থেকে কিছুটা ভালো আছি। ১৭ দিন প্রায় তেমন কোথাও যাইনি। ঘরে বসে আছি। এর মধ্যে বাসার অন্যান্য সদস্যদেরও জ্বর সর্দি কাশি হলো। নেবুলাইজার মেশিন কিনেছি। ইনজেকশন ওষুধ সব চলেছে এক সাথে। গত দশ বছরে এতোটা অসুস্থ হইনি। আশা করছি আগামী রবিবার থেকে  কাজ করতে পারবো। যদিও আরও আড়াই মাস ওষুধ খেতে হবে। পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে পারার সুখের তুলনা নেই।

বিস্তারিত খবর

বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে হবে

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-১০ ০৪:২৬:০৬

আসলে মার্চ মাসটাই আমাদের কাছে এক অনন্য মাস হিসাবে পরিনত । বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন, ১৭ মার্চ জাতির জনকের জন্মদিন , ২৫ মার্চের কালোরাত ও ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষনা । আবার এই বাংলাদেশে সেই মহামানবটিই  ( বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান )  এই মার্চেই পৃথিবীতে আসেন । এবার তার জন্মের ১০০ তম বার্ষিকী । সহজভাবে তা চিত্রায়নের সুযোগ নাই । আবার অতি রন্জিত করাও ঠিক হবে না । অতি মুজিব প্রেমীদের ও অনু প্রবেশকারীদের কারনে তা বিতকিৃত করার আলামতে খোদ প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন ।

মুজিব বর্ষে অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল । দেশে বিদেশে তা পালন হবে নানান ভাবে র‌্যালিী, আলোচনা সভা, চিত্রাংকন ও নানান প্রকাশনার মাধ্যমে । কিন্তু তার চেয়ে বেশী করার মাধ্যম গুলো করতে পারত দুতাবাস গুলো । বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দেড়শত এর মত দুতাবাস ছিল আছে আরও বাড়ছে , তারা জাতির পিতাকে বহি:বিশ্বে বহুজাতির কাছে মুলধারায় উপস্থাপন করতে পারত । বিভিন্ন ভাষায় জাতির জনকের জীবনি প্রকাশ করে বুক আকারে । পৃথিবীর অনেকেই জানে না জাতির জনক শেখ মুজিব ১৯২০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বেচেছিলেন তাও আবার তাকে মেরে ফেলা হয়েছে । তিনি ৩৫৭৯ দিন জেল জীবন কাটিয়েছেন যা ১০ বছরের সমান ‘ যা বিশ্বে নেলসন মেন্ডেলার সমকক্ষ । মাত্র ৪৫ বছর তিনি আলো বাতাসে ছিলেন। তাকে সপরিবারে মেরে ফেলা হয়েছে । পৃথিবীতে দ্বিতীয় ব্যাক্তি কেউ নেই যার এই বর্নাট্য করুন জীবনি । অথচ আমরা যারা আওয়ামী মনোভাবের বা বাংলাদেশী তারা তার কথা জানি প্রতিবছর বলে ও বেড়াচিছ ।  কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে তার অবদান সামগ্রিক প্রচার কে করবে ।  তিনি বিশ্বের একজন আইডল নেতা হবার সুযোগ ছিল । মহাত্বা গান্ধি কে যদি বিশ্ব জানতে পারে , নেলসন মেন্ডেলাকে যদি বিশ্ব জানতে পারে তাহলে শেখ মুজিব কে কেন জানবে না বিশ্ব । এ্ই কাজটা কে করবে । কেন বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরীতে জাতিন জনকের উপর কোন বই থাকবে না । কেন তার জীবনি ছোট বড় আকারে বিশ্বের নামি দামি প্রকাশনি কেন তৈরী করবে না । আমাদের তো টাকার কোন অভাব্ নেই । আমাদের সরকারের উচিত বিশ্বের নামি দামি লেখকদের দিয়ে তার জীবনি প্রকাশ করা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় । শত শত কোটি টাকা খরচ করে জন্ম শত বার্ষিকী আমরা পালন করব , দেশের সেরা সেরা লেখকরা গল্প কবিতা গান রচনা করছেন । কিন্তু তাতো সবই ঢাকা কেন্দ্রিক তোষামোদর জন্য । ইংরেজীতে কি করতে পারছি , কেন আমরা ফরাসি ভাষায় ,স্পেনিশ ভাষায় , হিন্দি ভাষায় , চায়নিজ ভাষায় , আরবি ভাষায় তার জীবনি নিজেদের খরচে প্রকাশ করছি না । কাজের কাজ তো সেটাই ।  সারা বিশ্বে জন্ম শত বার্ষিকী পালিত হবে কিন্তু বিশ্বের নতুন প্রজন্মকে আমরা কিভাবে তাকে চেনাব । আমরা যদি বাংলাদেশে নেলসন মেন্ডেলাকে চিনি , আমাদের বাচচারা যদি নেলসন মেন্ডেলাকে চিনে , আমাদের বাচচার যদি মার্টিন লুথার কিং ( সাদা কালোর মুভমেন্টের আইকন ) কে চিনে তাহলে আমেরিকান নতুন প্রজন্ম কেন জাতির জনককে চিনবে না । আমাদের আইকনিক নেতা জাতির জনকে তাদের কারও চেয়ে কম নন । তিনি অনেক উর্ধে ,তিনি তার জীবন উ্যসর্গ করেছেন মানুষের মুক্তির জন্য । আমাদের উচিত বিশ্বের সেরা সেরা লাইব্রেরীতে শেখ মুজিবের উপর বই প্রেরন করা । তা কিভাবে সম্ভব তা খুজে বের করতে হবে । বিশ্বের সেরা সেরা প্রকাশনিকে বলতে হবে তারা যেন তা প্রকাশ করে । তাহলে ই তাকে বিশ্বের আইকন হিসাবে পরিগনিত করা যাবে ।

বিশ্বের শত শত দেশে আমাদের দুতাবাস রয়েছে , তাদের উচিত তাদের মাধ্যমে সে দেশের মুলধারায় জাতির জনকের জীবনি বিভিন্ন স্কুল কলেজের লাইব্রেরীতে স্পন্সর শিপের মাধ্যমে তা প্রকাশ করে বিতরন করা ।  বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে  আমাদের অনেক আইকনিক ব্যবসায়ী রা রয়েছেন দুতাবাস তাদের বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে , দুতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সাথে যৌথভাবে ইংরেজী বই প্রকাশ করে বা সে দেশের ভাষায় জাতির জনকের জীবনি ছোট  আকারে বা বড় আকারে প্রকাশের উদ্যেগ নিতে পারে । ব্যাবয়ায়ীদের অনুরোধ করতে পারে জন্ম শতাবার্ষিকী বা তার পরেও যে বহি:বিশ্বে তা ছড়িযে দেয়া । অনেক ভাল কাজ করার সুযোগ রযেছে । আসলে বিদেশী কোন গবেষক যদি সঠিক ভাবে জানতে পারে কে ছিলেন শেখ মুজিব, কি ছিল তার জীবনের লক্ষ্য , কেমন ছিল তার ব্যবহার, তিনি কেমন কাটিয়েছেন তার ৫৫ বছর , কতটা সফল নায়ক ছিলেন তাহলে তারাই লিখতে বা গবেষনা করতে শুরু করবে । তার জীবনি নিয়ে  পিএইচ ডি হবে । আসলে আমরা বাংলাদেশের মধ্যই তাকে আটকে রেখেছি । তার সঠিক বিশ্ব মুল্যায়ন হয়নি , হচেছও না । যে শত  শত  মিলিয়ন ডলার খরছ হবে দেশ বিদেশে এ্ই মার্চ মাস জুড়ে তার আপ  কামিং কোন রেজাল্ট আসবে না । তার জন্য গান রচনা হচেছ, কনসার্ট হবে, শত শত সুভেনির, বই , গল্প , উপন্যাস রচিত হচেছ হবে । কিন্তু তার পরিথি সীমাদ্বই । আমরা তাকে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যই আটকে রেখেছি মাত্র । নিউ ইযর্কে তিনটি বাংলাদেশে শত শত , আমেকিরার বিভিন্ন ষ্টেটে অর্ধশত অনুষ্টান হছেছ,বিশ্বের প্রায় দু শত শহরে বাংলাদেশী প্রবাসীরা তার জন্ম শতবার্ষিকী  পালন করবেন পুরো মার্চ মাস জুড়ে  তাকে তুলে  ধরার জন্য ।  কিন্তু আমাদের বিভিন্ন ভাষার পাবলিকেশন না হলে তাকে আমারা বাংলা ভাষার দুটো দেশের কিছু মানুষের কাছেই রেখেদিলাম । আমাদের বিশ্ব দরবারে তাকে ‍তুলে ধরতে হবে ।

অসাধারন এক অনন্য মানব শেখ মুজিব। অসাধারন ছিল তার চিন্তা । লোভ লালসাহীন, এক প্রানবন্ত হ্যামিলনের বাশিওয়ালা । সাত কোটি  মানুষের স্ব্প্ন পুরুষ ছিলেন । তাকে নিযে গবেষনার বিস্তর মাধ্যম পড়ে আছে । আমরা তাকে নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি করে তাকে ক্ষুদ্রতায় আবদ্ব করেছি । তার অনন্য পোষাকটাও আজ অবমুল্যায়ন হচেছ  । তিনি তার একটি পোষাককে তার নামে সমাদ্রিত করতে পেরেছেন । মুজিব কোট বলতে একটি বিশেষ পোষাক কে বোঝায় । এ নিয়েও গবেষনার সুযোগ আছে । এক শত বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন মাত্র ৫৫ বছরের বর্নাট্য জীবন কজনের আছে । তার উদাসিনতার জন্য তার আত্ব বিশ্বাসের জন্য তার সাথে আরও সতের জন প্রান হারান । পৃথিবীতে কোন গোষ্টিকে এমন ভাবে মেরে ফেলার ইতিহাস নেই । কালের আবর্তে আজ তার মৃত্যু শক্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে ।  সব মানুষকে মৃত্যু বরন করতে হয় , তার এ্ই আত্ব ত্যাগ তাকে আল্লাহ এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসাবেন এই প্রত্যাশা কোটি কোটি মুক্তিকামি বাংলাদেশীদের । আমরা এ্ই ক্ষনজন্মা বিরপুরুষের বিদেহী আত্বার শান্তি কামনা করি । আর সবার কাছে অনুরোধ “যে যেভাবে পারেন তার জীবনি দেশে বিদেশে নানান ভাষায় প্রকাশ করুন“ । বাংলাদেশের ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল গুলোতেও তার জীবনি প্রকাশ জরুরী পার্ঠ্যসুচিতে । আর আমরা যারা লেখক সংগঠক মুজিব আদর্শের  আছি তাকে ভালবাসি তার জীবনি প্রকাশে ও ছড়িযে দিতে সর্বাত্বক নিবেদিত হই নানান ভাষায় । নানান মাধ্যমে তাকে নেলসন মেন্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং এর সম পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে । জাতির জনক তাদের চেয়ে ও উর্ধে । “আমাদের উদাসীনতায় তিনি ক্ষুদ্র একটি গোষ্টির মাঝে ঘুরপাক খাচেছন”।

 
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

বিস্তারিত খবর

করোনা' মানেই 'মৃত্যু' নয়, বাঁচতে হলে জানতে হয়

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-০৭ ০৬:১১:৩২

দেশি-বিদেশি মিডিয়া হাউজগুলোকে গত মাস দেড়েক ধরে খুব সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি। দেশীয় মিডিয়া হাউজের কথা অবশ্য ধর্তব্যের বাইরে, কারণ এদের নিউজগুলোর মাঝে কোন সৃজনশীলতা নেই। নেই নিজস্ব রিসার্চ, ডাটা। এরা যেখানে যা পায় তা-ই অনুবাদ করে ছেড়ে দেয়। তাই, গ্লোবাল সিরিয়াস ইস্যুতে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বিদেশি মিডিয়া হাউজগুলোর ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু, 'করোনা' ইস্যুতে এই বিদেশি মিডিয়া, বিশেষ করে আমেরিকান মিডিয়াগুলোকে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে আমার কাছে। তারা সারাদিন 'করোনা' কে তাদের লিড নিউজ হিশেবে দেখাচ্ছে, খবরের পাতা থেকে জিনিসটা সরাচ্ছেই না একদম। বিশ্বের কোন প্রান্ত থেকে যদি করোনাতে কোন একটা মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়, সাথে সাথে সেটা তুলে দিচ্ছে লিড নিউজে৷

মিডিয়াগুলো করোনায় মৃতের সংখ্যা হাইলাইট করছে বলে আমি বিরোধিতা করছিনা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, করোনায় আক্রান্ত হাজার হাজার লোক প্রতিদিন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছে, এই নিউজটা লিড নিউজ হিশেবে দেখাচ্ছেনা আমেরিকান মিডিয়াগুলো, বিশেষ করে সি এন এন, ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার ২% এর কাছাকাছি। এই ২% এর পাশে আমি ইচ্ছে করলে 'মাত্র' শব্দ যোগ করতে পারতাম, কিন্তু করিনি। আমার কাছে একটা প্রাণের মূল্যও অনেক। কিন্তু ব্যাপার হলো, এই যে হাজার হাজার মানুষ করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছে, এটা কেনো মানুষকে জানানো হচ্ছেনা?

আরেকটা ইন্টারেস্টিং ডাটা শেয়ার করি। করোনা নিয়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হইচই করছে আমেরিকান মিডিয়া হাউজগুলোই। মুহুর্তে মুহুর্মুহু সংবাদ ছাপাচ্ছে তারা করোনা নিয়ে৷ এতে করে সারা পৃথিবীতে একটা প্যানিক ছড়িয়ে পড়েছে ভালোভাবে যে, করোনা ধরলে আর বুঝি রক্ষে নেই৷ অথচ, করোনায় মৃতের সংখ্যার পাশাপাশি আমাদের যদি সুস্থ হয়ে উঠার ডাটাও মিডিয়া জানাতো, তাহলে বোধকরি মানুষ এভাবে প্যানিকড হয়ে পড়তো না। মানুষ এখন ভাবছে, করোনা মানেই মৃত্যু।

কিন্তু, এই বছর খোদ আমেরিকাতেই নর্মাল ফ্লু'তে মারা গেছে বিশ হাজারের মতো মানুষ৷ একেবারে টাটকা খবর কিন্তু। নর্মাল ফ্লু মানে বুঝেছেন তো? এই যে জ্বর, সর্দি-কাশি ইত্যাদিতে। দেখুন, এই নর্মাল ফ্লুয়ের জন্য দুনিয়ায় হাজার রকমের প্রতিষেধক মজুদ আছে। আছে বাহারি রকমের চিকিৎসা৷ এতোকিছু থাকা সত্ত্বেও, আমেরিকার মতোন দেশে এই ফ্লুতেই মারা গেছে বিশ হাজারেরও অধিক মানুষ। পুরো বিশ্বের হিশেব যে কি, তা তো বলার বাইরে। অথচ, যে করোনাকে নিয়ে এতো হইচই মিডিয়া করছে, সেই করোনায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে তিন হাজারের কিছু বেশি মানুষ। এই করোনার কিন্তু কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। কোন প্রতিষেধক না থেকেও এতে মারা গেছে তিন হাজার, আর হাজার রকমের প্রতিষেধক মজুদ থাকার পরেও নর্মাল ফ্লুতে আমেরিকায় নাই হয়ে গেছে বিশ হাজার। তাহলে, কোনটাকে বেশি ডেঞ্জারাস মনে হচ্ছে ডাটানুসারে? কিন্তু দেখুন, আমেরিকার মিডিয়া এটা নিয়ে কোন বাতচিত করছেনা। তারা সারাদিন ওই এক করোনা নিয়েই আছে। এখানে কি তাহলে কোন 'গেম' চলছে? আমি জানিনা।

'করোনা আর মৃত্যু' শব্দ দুটো শুনতে শুনতে আপনি নিশ্চয় ভয়ে কুঁকড়ে আছেন, না? তাহলে আপনাকে কয়েকটা আশার কথা শুনাই৷ হয়তো আপনার ভয়টা চলে যাবে। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।

(১) এখন পর্যন্ত করোনাতে কোন শিশুর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়নি। শিশু মানে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে ০-৯ বছরের কোন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা দুনিয়ার কোথাও ঘটেনি। তাই, আপনার বাচ্চার ব্যাপারে বেশি ভয় পাওয়ার দরকার নেই। তবে, সতর্ক থাকতে হবে অবশ্যই।

(২) ১০-১৯ বছরের একজনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত, তবে অনেকের মতে, সেটাও রহস্যজনক। আদৌ করোনায় কিনা, তা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত না।

(৩) করোনা আক্রান্ত ৭০,০০০ মানুষের ওপরে একটা স্ট্যাডি হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে ৮১% মানুষের সর্দি-কাশি হচ্ছে করোনার ফলে, আবার সেরেও যাচ্ছে। সুতরাং, বিশ্বাস রাখুন, আপনার-আমার যদি করোনা হয়েও থাকে, সাধারণ জ্বর-সর্দির মতো তা আবার সেরেও যাবে, ইন শা আল্লাহ৷ আশা নিয়ে বাঁচুন, ভালো থাকবেন।

(৪) ডাটা অনুসারে, করোনায় যারা মারা গিয়েছে, তাদের ৫০ ভাগের বয়স ৭০ বছরের উর্ধ্বে। আর ৩০% এর বয়স ৬০-৬৯ এর মধ্যে। মানে, ৮০% লোক যারা মারা গেলো বা যাচ্ছে, তাদের গড় বয়স ৬০-৭০ এর উর্ধ্বে। আরো স্পষ্টভাবে, এই করোনায় বুড়োরাই মারা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

না, ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বুড়ো হলেই যে করোনায় ধপাস করে মারা পড়ছে, তা কিন্তু নয়। রিসার্চে দেখা গেছে, বুড়োদের মধ্যে করোনায় যারা মারা যাচ্ছে, তারা প্রায় সবাই আগে থেকেই কোন না কোন রোগে আক্রান্ত, যেমন- ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, অ্যাজমা, লিভার ইত্যাদি।

সব ডাটাকে একত্র করলে যা সারমর্ম দাঁড়ায় তা হলো, সুস্থ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের বেশি, তাদের ক্ষেত্রে করোনায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই, আশাহত হবেন না। মনে জোর রাখুন।

গত দু'দিন ধরে আমার নিজেরও হালকা হালকা গা গরম। মাঝে মাঝে মনে হলো, আমাকে বুঝি করোনাই পেয়ে গেলো। তো, আমি যদি এই ফ্যাক্টরগুলো সম্পর্কে না জানতাম, আমি কি ভাবতাম জানেন? আমি ভাবতাম, আমার যদি সত্যিই সত্যিই করোনা ধরা পড়ে, তাহলে সেদিন আমি আর বাসায় ফিরবো না। আমার মাধ্যমে আমার মা, স্ত্রী, সন্তান আক্রান্ত হবে, আমি এটা ভাবতেই পারিনা। তো, কি করবো তাহলে? কক্সবাজারের দিকে চলে যাবো, কিংবা কোন নির্জন পাহাড়ি অঞ্চলে। বাসায় কোনোভাবে ব্যাংকের কার্ডটা পাঠিয়ে বলবো, 'বেঁচে থাকলে দেখা হবে'।

তো, বাঁচলে তো ফিরবো। যদি না বাঁচি? সম্ভবত আমার লাশটাও খুঁজে পাবেনা আমার পরিবার৷ এই ভাবনাগুলো কোত্থেকে আসতো জানেন? প্যানিক থেকে। প্যানিক এতো ভয়ানক জিনিস। তাই, ভাইয়েরা, প্যানিক হবেন না। স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন, কিন্তু অতি অবশ্যই সতর্কতার সাথে৷

এই যে বিশাল একটা লেখা পড়লেন, এই লেখার সারমর্ম কি? আমি কি করোনা নিয়ে হাসি তামাশা করছি? পাত্তা না দিতে বলছি?

না, মোটেও তা নয়। করোনাকে অবশ্যই পাত্তা দিতে হবে। সতর্ক হতে হবে৷ বাইরে বেরুলে মাস্ক পড়তে হবে, বারেবারে হাত ধুতে হবে, লোকারণ্য এলাকা এড়িয়ে চলতে হবে। সবই করতে হবে, কিন্তু প্যানিক হওয়া যাবেনা। প্যানিক হলে স্বাভাবিক জীবনযাপন বিপর্যস্ত হবে ভীষণভাবে। তখন করোনায় আপনার মৃত্যুর সম্ভাবনা না থাকলেও, প্যানিক থেকে তৈরি ডিপ্রেশানে আপনার মৃত্যুর সম্ভাবনা কিন্তু হুড়মুড় করে বেড়ে যাবে।

চলুন, সকাল-সন্ধ্যার যিকিরগুলো নিয়মিত করি। বেশি বেশি ইস্তিগফার করি। ভয় না পেয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করি।

বিস্তারিত খবর

ভাষা আন্দোলন ও জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার প্রাণ পুরুষ ডাঃ গোলাম মাওলা

 প্রকাশিত: ২০২০-০২-২১ ১০:৪২:০৪

 কোন দেশেই মায়ের ভাষা বা মানুষের মুখের ভাষায় কথা বলার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে এমন তথ্য জানা যায়না, জীবন দিতে হয়েছে এমন প্রমানও পাওয়া যাবেনা। বাঙ্গালী জন্ম থেকেই সংগ্রামী-ত্যাগী জাতি হিসেবে পরিচিত। এ জাতি যখনই যা কিছু অর্জণ করেছে তার পেছনে বিসর্জণ দিতে হয়েছে অজস্র প্রাণ। তেমনি তার মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতেও মুখোমুখি হতে হয়েছিল রক্ত ঝরানো সংগ্রামের। বাঙ্গালীর মায়ের ভাষা, রাষ্ট্র ভাষা “বাংলা”কে প্রতিষ্ঠিত করতে যে সুদীর্ঘ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল সে ইতিহাস সকলের জানা। কিন্তু একটি পরাক্রমশালী দানবচক্রের হাত থেকে আমার জন্মগত অধিকার মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে যারা প্রান দিয়েছেন তারা অবিনশ্বর। আর যারা ধারাবাহিক এ সংগ্রামকে অধিকার আদায়ের শেষ স্তম্ভে পৌছে দিয়েছিলেন তাদের অনেককেই আমরা মনে রাখিনি। ইতিহাস দেয়নি তাদের সঠিক মর্যাদা। আজ আমি এমন একজন ইস্পাত কঠিন দৃঢ় মানসিকতার পরিচায়ক, অকালে ঝরে যাওয়া একজন মহান পুরুষের কথা বলবো যিনি একাধারে ভাষা সংগ্রামী, প্রখ্যাত চিকিৎসক, সফল রাজনীতিক, সমাজসেবক ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলন ও জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার প্রান পুরুষ ডাক্তার গোলাম মাওলা।

মহান ভাষা আন্দোলন ও আমাদের বাঙ্গালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রথম প্রতীক জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রানপুরুষ ভাষা সৈনিক ডাক্তার গোলাম মাওলা ছিলেন শরীয়তপুরের সুর্যসন্তান। রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বাঙ্গালীর চির ঐতিহ্যের ঠিকানা জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ডাঃ গোলাম মাওলার নেতৃত্ব প্রদান, ভূমিকা ও ত্যাগের তথ্য মাতৃভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে কতটুকুন ঠাঁই পেয়েছে তা আমার জানা নেই। নতুন প্রজন্ম এই ক্ষনজন্মা মানুষটির কীর্তির কথা খুব একটা জানে বলেও আমার মনে হয়না। জাতির সামনে প্রয়াত এই মহান পুরুষের গৌরবান্বিত ঐতিহাসিক অর্জনের সুবিস্তার স্থান পায়নি কোথাও । দীর্ঘ দিন ভাষা সংগ্রামের এই প্রান পুরুষটি রাষ্ট্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বলয় সর্বত্রই উপেক্ষিত ছিলেন।

১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন গোলাম মাওলা। তার পিতার নাম আব্দুল গফুর ঢালী এবং মায়ের নাম ছিল জমিলা খাতুন। গোলাম মাওলার পিতা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাজিরা থানার পাঁচুখার কান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেনী পাশ করে গোলাম মাওলা নড়িয়া বিহারী লাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হন।

১৯৩৯ সালে সেখান থেকে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। ৪১ ও ৪৩ সালে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি পাশ করেন। এরপরে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ব বিষয়ে এমএসসি পাশ করার পর ১৯৪৫ সালে কোলকাতা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ডাক্তারী কোর্সে ভর্তি হন। সে বছর মাত্র দুইজন মুসলিম বাংগালী ছাত্র কোলকাতায় এমএসসি পাশ করার পর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয় । একজন গোলাম মাওলা অপর জন মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ (এ সময় গোলাম মাওলা একটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন অসুস্থ্য থাকেন)। কোলকাতায় ছাত্রাবস্থাতেই মাওলার সাথে শখ্যতা হয় বঙ্গবন্ধুর।

গোলাম মাওলা যখন ঢাকা জগন্নাথ কলেজের ছাত্র তখন বৃটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হবার জন্য শৃংখলিত মানুষের আর্তনাদ তাকে ব্যথিত করতো। বিপ্লবী চেতনা থেকেই তিনি বৃটিশ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ভারতে লেখা পড়ার সুযোগে তিনি মুকুল ফৌজের অধিনায়ক হিসেবে বৃটিশ তাড়ানোর আন্দোলনে অগ্রনী ভ’মিকা পালন করেন। ৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কোলকাতা থেকে মাওলা ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসেন। ৪৮ সাল থেকেই মাওলা সহ কয়েকজন ছাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন (ছাত্র সংসদ) প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। ৪৮ সালে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ গঠন করা হলে গোলাম মাওলা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি মনোনীত হন।

১৯৫০ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে হিন্দু- মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্রনেতা রাজপথে শান্তি মিছিল বের করেছিল। এদের মধ্যে গোলাম মাওলা অন্যতম ছিলেন বলে ভাষা সৈনিক গাজিউল হক তার একটি স্মৃতি চারণ মূলক লেখায় ১৯৮৪ সালে উল্লেখ করেছিলেন। একই বছর ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ গঠন হলে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন ডাঃ নাজির আহমেদ ( তিনি সেনা বাহিনীতে চাকুরী নিয়ে পাকিস্তান চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসেননি)। ঢাকা মেডিকেলের ২য় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ৫২’র জানুয়ারীতে ভিপি নির্বাচিত হন গোলাম মাওলা।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা অন্দোলনে যে ক’জন তৎকালিন ছাত্রনেতা অসীম সাহসিকতা, সুচিন্তিত পদক্ষেপ, দক্ষতা আর সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের মাধ্যমে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার ভ’মিকা রেখে ভাষা সৈনিক/ভাষা সংগ্রামীর খেতাব অর্জণ করেছিলেন ডাক্তার গোলাম মাওলা ছিলেন তাদের প্রথম কাতারের অন্যতম দিকপাল, সফল অর্জণের পুরোধা এবং ইতিহাস রচনার পথিকৃত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো যে, ক্ষনজন্মা সেই পুরুষ তার কীর্তির দ্বীপ্তি ছরিয়ে বড় অসময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অকৃজ্ঞ জাতি আমরা, যাকে মনে না রেখে অনেক কাল পর্যন্ত উপেক্ষিত করে রেখেছি। ২১ আসে ২১ যায়, কিন্তু এই নির্লোভ, ত্যাগী, পরোপকারী, নীরবে চলে যাওয়া মাওলাকে আমরা সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে অনেক কুন্ঠাবোধ করেছি। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যু বরনের পূর্বে তিনি অসামান্য কীর্তি ও গৌরবগাথা রেখে গেছেন বাঙ্গালী জাতির জন্য।

সংক্ষেপে ডাঃ মাওলা সম্পর্কে কিছু লিখতে গিয়ে আমাকে ইতিহাসের পেছনে অনেক সাতরাতে হয়েছে। মাত্র সেদিন (২০১০ সালে) জাতীয় সংসদের তৎকালিন ডেপুটি স্পীকার ও শরীয়তপুন-২ আসনের সাবেক সাংসদ কর্নেল (অবঃ) শওকত আলীর অক্লান্ত চেষ্টায় ভাষা সৈনিক মরহুম ডাঃ গোলাম মাওলাকে জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মরনোত্ততর ২১শে পদক প্রদান করেছেন। এছারাও জাতীয় বীর কর্নেল (অবঃ) শওকত আলীর কল্যানে কীর্তিনাশা নদীর উপর নির্মিত সেতু ও নড়িয়ায় একটি সড়কের নামকরন করা হয়েছে গোলাম মাওলার নামে। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে বিশেষ অনুরোধ করে শওকত আলী সাহেব ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল ধানমন্ডির ১ নং সড়কটির নামকরন করিয়ে নেন গোলাম মাওলার নামে।

এ ছাড়াও শওকত আলী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহায়তায় শরীয়তপুর সরকারী পাবলিক লাইব্রেরীকে ২০০৯ সালে “ভাষা সৈনিক ডাঃ গোলাম মাওলা পাবলিক লাইব্রেরী” নামে নাকরন করান।। গোলাম মাওলার নামে কয়েকটি সংঘ, সংসদ বা ক্লাব ধরনের সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা জানা যায়। এর মধ্যে ডাঃ গোলাম মাওলা তরুন স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক আগে। তার কোন কার্যক্রম আছে বলে আমার জানা নেই। তবে ১৯৯৭ সালের ২রা মে শওকত আলী এমপির উদ্দীপনায় ভাষা সৈনিক ডাঃ গোলাম মাওলা স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার কিছু কিছু কার্যক্রম এখনো চলমান।

পরিতাপের বিষয় যে, আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস ও শহীদ দিবসের বর্ষপূর্তিতে গোলাম মাওলার পরিবারের কাউকে কোন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন মনে রাখেনি। দেশের প্রগতিশীল ধারার অনেক ব্যক্তির সম্পাদনায় জনপ্রিয় কয়েকটি জাতীয় দৈনিক সহ সকল দৈনিক পত্রিকায় ২১ কে নিয়ে বিশেষ সাময়ীকি/ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেশের নামজাদা সব লিখিয়েরা পাতায় পাতায় লিখে থাকেন। কিন্তু বিশেষভাবে গোলাম মাওলার ইতিহাস তুলে ধরে কেউ দুটি লাইন রচনা করেননি কোনদিন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট দেশ বিভাগের কিছুদিন পর আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলর ডঃ রিয়াজ উদ্দিন সর্ব প্রথম উচ্চারন করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দূ। সাথে সাথে এর প্রতিবাদ করেন ডঃ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন ও ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঘোষনা করেন উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সেদিন সর্ব প্রথম ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্ররা এর প্রতিবাদ করে। এর তিন দিন পর ২৫ মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ তার বক্তব্যের পূনরাবৃত্তি করলে ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পরে। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এর পুরোভাগে এবং যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গোলাম মাওলা।

ছাত্রদের বিক্ষোভের ফলে জিন্নাহ মন্তব্য করেন রাষ্ট্রভাষার বিরোধীতা করার পেছনে পঞ্চম শক্তির হাত রযেছে। জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা পূনরাবৃত্তি করেন। ৫১ সালে লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে খাজা নাজিম উদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন।

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারী নাজিম উদ্দিন ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে আবার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষনা করেন। এখানেও ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পরেন। সে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডাঃ মুঞ্জুরের কক্ষে মেডিকেল কলেজের ভিপি হিসেবে একটি বিশেষ জরুরী সভা আহবান করে গোলাম মাওলা সিদ্ধান্ত দেন যে, “নাজিম উদ্দিনের ঘোষনার কড়া জবাব দিতে হবে”। ২৮ জানুয়ারী গোলাম মাওলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ঢামেকসু) এর সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভিপি হিসেবে এর প্রতিবাদ লিপি পেশ করেন তিনি।

৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরী মিলনায়তনে এক সম্মেলন হয়। এতে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এখানে ডাঃ গোলাম মাওলা ঢাকা মেডিকেলের ভিপি হিসেবে অন্যতম সদস্যপদ লাভ করেন। ৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রতিনিধিত্ব করে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে বক্তব্য রাখেন গোলাম মাওলা।

১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী রাত ৮টায় পুনরায় ঢাকা বার এসোসিয়েশন লাইব্রেরীতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জরুরী সভা হয়। গোলাম মাওলা অসুস্থ্য থাকায় তিনি ছাত্র সংসদের জিএস শরফুদ্দিন আহমেকে পাঠান। সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয় ২০ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় ধর্মঘট, মিছিল, সভা-সমাবেশ ও পিকেটিং করা হবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে। রাতে ছাত্রাবাসে ফিরে শরফুদ্দিন মাওলাকে সকল সিদ্ধান্তের কথা খুলে বলেন। মাওলা তৎক্ষনাৎ বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জিং এবং দুঃসাহসিক ভেবে শরফুদ্দিনকে একটি বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেন। শরফুদ্দিন ছিলেন পুরান ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ঢাকার আদিবাসীদের (ঢাকাইয়া কুট্টি) বেশীর ভাগেরই আনুগত্য ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং উর্দু ভাষার প্রতি। তখন ঢাকা শহর ২২টি পঞ্চায়েতের স্থানীয় সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। এই ২২ পঞ্চায়েতের সর্দার ছিলেন পুরান ঢাকার লায়ন সিনেমা হলের মালিক কাদের সর্দার। ১৯ ফেব্রুয়ারী মাওলার পরামর্শে শরফুদ্দিন আহমেদ, ডাঃ আদুল আলীম চৌধুরী (পরবর্তীতে ৭১ এর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবি) ও ডাঃ মুঞ্জুরকে নিয়ে কাদের সর্দারের বাড়িতে গিয়ে তাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ভ’মিকা নিতে অনুরোধ জানান।

কাদের সর্দার প্রথমে ছাত্রদের কথা ততটা পাত্তা না দিলেও পরে যুক্তি প্রদানের এক পর্যায়ে তিনি রাজি হয়ে যান। এবং ঐ মুহুর্তেই সর্দার তার সচিবের মাধ্যমে চিঠি লিখিয়ে ২২ পঞ্চায়েতকে পাঠিয়ে জানিয়ে দেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে সহায়তা করতে হবে (ডাক্তার মাওলা সেদিন এই কৌশল অবলম্বন না করলে ২০ তারিখের ধর্মঘট এবং ২১ ফেব্রুয়ারীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গে স্থানীয় ঢাকাবাসীর সমর্থন পাওয়া যেতনা)। ১৯ তারিখ রাত পার হয়েছে অনেক দুঃচিন্তা ও উত্তেজনায়। ২০ ফেব্রুয়ারী গোলাম মাওলা ছাত্রদের আবেগ বুঝতে পেরে এবং কয়েকজন মেডিকেল ছাত্রের প্রস্তাবে মাইক ভাড়া করে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত দেন।

মাওলা সাহেব ২ জন ছাত্রকে ডেকে হোষ্টেল ঘুরে ২৫০ টাকা উঠিয়ে আনতে বললে ছাত্ররা মাত্র কিছুক্ষনের মধ্যে ৪৫০ টাকা উঠিয়ে মাওলার হাতে তুলে দেন। তিনজন ছাত্র তিন দিকে চলে গেলেন মাইক ভাড়া করতে। মাওলা সাহেব একজনকে নির্দেশ দিলেন ওয়াইজ ঘাটের ফেক্টর দোকানের ১০০ ওয়াটের সে-ই মাইকটি অবশ্যই আনতে হবে, যে মাইকে জিন্নাহ ঘোষনা দিয়েছিল “উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”। যথারীতি তিন সেট মাইকই পাওয়া গেল। ফেক্টর দোকানের সেই ১০০ ওয়াটের মাইকও আসলো। ডাঃ আব্দুল আলীম চৌধুরীর কক্ষকে কন্ট্রোল রুম বানিয়ে সেখান থেকে গোলাম মাওলা সহ মেডিক্যাল কলেজের ও সংগ্রাম পরিষদের নেতারা অবিরাম বত্তব্য দিতে শুরু করলেন। ছাত্রদের আন্দোলন তুমুল আকার ধারন করলো।

মুসলিমলীগ সরকার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের তীব্রতা আঁচ করতে পেরে ২০ ফেব্রুয়ারী বিকেলে সমগ্র ঢাকা শহরে একমাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে দেয়। এ সংবাদ প্রচারের সাথে সাথে জ্বলন্ত বারুদের মত ক্ষেপে উঠে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্ররা (ঐ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ুয়া ছাত্রদের ভেতর একটা ভীতি কাজ করতো পাক সরকারের আচরনের উপর। পাশাপাশি কিছু এ্যাম্বিশন কাজ করতো সরকারের অনুকুলে থেকে শিক্ষা জীবন শেষে সিএসপি অফিসার/আমলা হওয়ার সুযোগ গ্রহনের জন্য। কিন্তু মেডিকেলের ছাত্ররা ঐ লোভের তোয়াক্কা করতো না, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা ছিল নির্লোভ ও সাহসী।

তাদের ধারনা ছিল এমবিবিএস পাশ করে প্রাইভেট প্রাকটিস করেও সম্মানের সাথে বাঁচা যাবে। সেকারনে ভাষা সংগ্রামের চুড়ান্ত পর্বে ঢামেকসুর ভিপি গোলাম মাওলার তাত্বিক যুক্তি ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্বে সবচেয়ে বেশী ভ’মিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল তারা)। ১৪৪ ধারা ভাংতে হবে এই জিঘাংসা তখন বিদ্যুৎ গতিতে কাজ করতে থাকে ছাত্রদের মধ্যে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১৫ জন পলিট ব্যুরোর নেতাদের মধ্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে দ্বিধা দ্বন্দ চলতে থাকে। ৪৪ ধারা ওভারলুক করার পক্ষে থাকেন মাত্র চারজন। বাকি ১১ জন সায় দেননি। গোলাম মাওলা, আব্দুল মতিন,অলি আহাদ ও সামসুল আলম শক্ত অবস্থানে থাকেন পুলিশি ব্যারিগেট ভাঙ্গার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।

২১ ফেব্রুয়ারি ভোর থেকেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শত শত ছাত্র ছাত্রী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে থাকেন আ- জনতা। নেতাদের দ্বান্দিক চিন্তা থেকে বেড়িয়ে ছাত্ররা সত্যাগ্রহি পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রতি ১০ জনের একেকটি দলে তারা রাস্তায় বেড়–তে থাকে। প্রথম দিকে বেড়নো ৩/৪ টি দলকেই পুলিশ গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। মেয়েদের একটি দলের উপরও পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে তাদের লাঞ্ছিত করলো। পুলিশের সাথে আন্দোলন কারীদের তুমুল ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি ও ধাওয়া পল্টা ধাওয়া চলতে থাকে দীর্ঘক্ষন।

পুলিশ এক পর্যায়ে বৃষ্টির মতো টিয়ার সেল নিক্ষেপ ও গুলি করতে শুরু করলে প্রথমেই শহীদ রফিকের মাথায় গুলি লাগে। মাথার খুলি গুলি লেগে ১২/১৩ ফিট দুরে গিয়ে পরে (বর্তমান শহীদ মিনারে কাছে)। পাশাপাশি আরো ২টি লাশ পরে যায় মাটিতে। এরপর ছত্র ভঙ্গ হতে থাকে ছাত্ররা। তারা অভয়াশ্রম হিসেবে জড়ো হতে থাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায়। মেডিকেলের সংগ্রামরত ছাত্ররা শত শত আহত আন্দোলনকারীকে চিকিৎসা দিতে থাকে। সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের বিশৃংখল অবস্থায় কান্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হন গোলাম মাওলা।

২১ শের হত্যাকান্ডের পর পরই বিকেলে নেতারা জরুরী বৈঠকে মিলিত হন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সেখানে আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এখানে উপস্থিত থাকেন তমুদ্দন মজলিশের রাজনৈতিক ফ্রন্টের আহবায়ক আবুল হাশিম, সাপ্তাহিক সৈনিক সম্পাদক আব্দুল গফুর, কমরুদ্দিন আহমেদ, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, মোঃ তোয়াহা, কবীর উদ্দিন আহমেদ, শহিদুল্লাহ কায়সার, কেজি মোস্তফা, মাহবুব জামাল জাহেদী ও গোলাম মাওলা।

এই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১শের রাতে অলি আহাদ ও আব্দুল মতিনের উপস্থিতিতে মাওলা সাহেবের কক্ষে আবার সভা বসে। সেখানে গোলাম মাওলাকে নতুন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক করে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। ২১শের উত্তাল আন্দোলনে রক্ত ঝরার পর ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পরে। ২২ ফেব্রুয়ারী কর্ম পরিষদের বিলুপ্তি ঘোষনা করেন পরিষদের আহবায়ক আব্দুল মতিন নিজেই। কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং ঢাবি কর্ম পরিষদ ব্যর্থ হয়ে গেলে গোলাম মাওলার নেতৃত্বে নতুন সংগ্রাম কমিটি আন্দোলনে প্রান ফিরে পায়।

২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদদের লাশ রাখা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে। কাউকে লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। পুলিশ সারাক্ষন পাহারায় রাখে। ২২ ফেব্রুয়ারী সকালে শহীদদের গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয় অসংখ্য জনতার উপস্থিতিতে। এরপরে ছাত্ররা রাজপথে আবার মিছিল বের করে। পুলিশ সেখানে গুলি চালালে এদিনও হতাহত হয় আরো কয়েকজন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হয়ে উঠে আন্দোলনের প্রান কেন্দ্র। সকল মতাদর্শের উর্ধে উঠে গোলাম মাওলা হয়ে উঠেন একতার প্রতীক। ২৩ ফেব্রুয়ারী সকালে ঢাকা মেডিকেলের ৩ নম্বর সেডের বারান্দায় দাড়িয়ে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মানের কথা হচ্ছিল। ছাত্ররা তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নেয় ঐ দিনই স্তম্ভ নির্মান করতে হবে। তখন প্রশ্ন উঠলো নকশা তৈরী এবং উপকরন সংগ্রহের। এমন সময় গোলাম মাওলা বললেন, মেডিকেলের ৩য় বর্ষের (সম্ভবত) ছাত্র বদরুল আলমকে ডেকে পাঠাতে। বদরুলের আঁকা ঝাকিতে হাত ভালো। বদরুল এলে মাওলা তাকে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ তৈরীর জন্য একটি নকশা প্রস্তুতের নির্দেশ দিলেন। মাওলার নির্দেশে বদরুল আলম ডাঃ মির্জা মাজহারুল ইসলামকে সহ ডাঃ সাইদ হায়দারের সাহায্য নিয়ে তিন জনের মমনশীল চিন্তা থেকে একটি নকশা প্রস্তুত করা হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিকেলের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন মেডিকেল কলেজের যে স্থানে প্রথম গুলি চালানো হয়েছিল সেখানেই শহীদ মিনার স্থাপন করা হবে। সিদ্ধান্ত মতে নির্মানাধীন নার্সেস কোয়ার্টারের ইট-বালু-সুরকি আর হোসেনী দালান সড়কের পুরান ঢাকাইয়া পিয়ারু সরদারের গুদাম থেকে সিমেন্ট এনে সারা রাত জেগে ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট প্রস্থের ঐতিহাসিক প্রথম শহীদ মিনার নির্মান করা হয়। ছাত্রদের সাথে রাতভর নিজের কাধে করে ইট সিমেন্ট বহন করেন মাওলা।

২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে মাওলাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে নির্মান কাজ শেষ হলে মিনারের চার দিকে রশি বেধে দেয়া হয়। মিনারের নিচের অংশে লাল শালু কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে তার ওপরের অংশে হাতে লেখা দুটি পোষ্টার সাটানো হয়। এর একটি পোষ্টারে লেখা ছিল “ শহীদ স্মৃতি অমর হোক” অপরটিতে “ রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই”। শহীদ শফিউর রহমানের পিতা মৌলভী মাহাবুবুর রহমান ২৪ তারিখে প্রথমবার উদ্বোধন করেন শহীদ মিনারের। ২য় বার ২৬ ফেব্রুয়ারী উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম সামসুদ্দিন।

শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে মিনার নির্মান করা হয়েছে এ খবর পৌছে যায় বিভিন্ন এলাকায়। দলে দলে নারী- পুরুষ- আবাল- বৃদ্ধ- বনিতা এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে থাকেন শহীদ বেদীতে। টাকা পয়সা দান করতে থাকেন পূন্যার্থীরা। জানা গেছে অনেক গৃহবধু তাদের স্বর্নালংকারও খুলে দিয়েছেন মিনারের পাদদেশে। এই পরিস্থিতিেিত নতুন করে উত্তেজিত হয় পাক সরকার । ২৬ ফেব্রুয়ারী সেনা ও পুলিশ সদস্যরা ভেঙ্গে ধুলিসাৎ করে দেয় শহীদ মিনারটি। সেদিনের “ শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ” নামক স্থাপনাটি আজ শুধু ২১ শের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত একটি স্থাপত্যই নয়, এটি বাঙ্গালী জাতির গর্বের ইতিহাস, সকল গনতান্ত্রিক আন্দোলনের তীর্থস্থান। বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ও চেতনার উৎস স্থল।

শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি গুড়িয়ে দেয়ার পর এতবড় একটা আন্দোলন নতুন করে যখন নেতৃত্ব শুন্য অবস্থায় তখন অত্যন্ত সাহসী কান্ডারীর ভ’মিকা পালন করেন গোলাম মাওলা। জাতির চরম দূর্দিনে তার আবির্ভাব ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনের প্রেক্ষাপট। তিনি হয়ে উঠেন আন্দোলনের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। গোলাম মাওলার বিরামহীন নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারী বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে।

এমবিবিএস পাশ করার পর গোলাম মাওলা পাকিস্তান মেডিকেল এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা রেড ক্রোসের সম্পাদক হিসেবে ব্যাপক সুখ্যাতি অর্জণ করেন। তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ভাইজির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নড়িয়া থেকে শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। কিছুকাল পরে তিনি মারা গেলে ৫৬ সালে ঐ আসনে উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট থেকে মাওলাকে মনোনয়ন দেয়া হয়।

হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনী এলাকার ভোজেশ্বরের একটি জনসভায় এসেছিলেন। গোলাম মাওলার পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে সরওয়ার্দী বলেছিলেন, “ গোলাম মাওলা আমার চেয়েও বেশী শিক্ষিত, তিনি বিএসসি, এমএসসি ও এমবিবিএস, তাকে আপনারা ভোট দিন”। বঙ্গবন্ধু গোলাম মাওলাকে তাঁর একান্ত বন্ধু পরিচয়ে গোলাম মাওলার জন্য ভোট চেয়েছিলেন। এসময় সরওয়ার্দ্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান প্রায় তিন সপ্তাহ নড়িয়ার পোড়াগাছায় অবস্থান করে গোলাম মাওলার নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মাদারীপুরের একটি আসন থেকে গোলাম মাওলা আ’লীগের টিকিটে এমএনএ নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে বিরোধী দলের হুইপ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন পাকিস্তান সরকার গোলাম মাওলাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য আহবান করলে তিনি তা ঘৃনাভরে প্রত্যাক্ষান করেছিলেন।

তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর বিশেষকরে মাদারীপুর মহকুমায় আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করার জন্য গোলাম মাওলা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। বর্ষিয়ান আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ডাক্তার মাওলা মাদারীপুর মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৫৬ থেকে ৫৭ সাল পর্যন্ত মাওলা ফরিদপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তার সাথে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ভাঙ্গা থানার কাজী রোকোনুজ্জামান এমপি। ডাঃ গোলাম মাওলা জাতীয় রাজনীতি ছেড়ে মাদারীপুর এসে একজন আদর্শ চিকিৎসক হিসেবে প্রাকটিস শুরু করলেন। ডাক্তার মাওলার চেম্বারটিই ছিল তথন আওয়ামীলীগের একমাত্র ঠিকানা। তিনি গরীব রোগীদের থেকে কখনো পয়সা নিতেন না ।

উপরোন্ত গরীবদের বীনা পয়সায় ঔষধও সরবরাহ করতেন। কোলকাতা মেডিকেলে এমবিবিএস পড়া অবস্থায় মাওলার শরীরে একটি সংক্রামক ব্যাধির উপস্থিতি ধরা পরেছিল। চিকিৎসার পর তা নিয়ন্ত্রনে এসছিল কিন্তু পূর্নাঙ্গ নিরাময় হয়নি। মানুষের চিকিৎসা করতে করতে তিনি নিজেই অসুস্থ্য হয়ে পরেন। ৫২’র ২১ শে ফেব্রুয়ারীর শহীদদের রক্তে ঢাকার পিচ ঢালা কালো রাজ পথে যে আল্পনা আঁকা হয়েছিল তাতে ডাঃ মাওলা বাঙ্গালী জাতির মুক্তির ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি অনাগত মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতাকে ইঙ্গিত করে তার সহকর্মী ও বন্ধুদের বলতেন “ বাঙ্গালীর সুদিন আসবে, হয়তো আমি সেদিন থাকবোনা বা দেখবোনা, তোমরা তা অবশ্যই ভোগ করবে”। মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করে মুক্তিকামী সে গোলাম মাওলা স্বাধীনতা লাভের ৫ বছর পূর্বে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালের ২৯ মে মৃত্যুবরন করেন।

মৃত্যকালে আমরন এই মহান সংগ্রামী নেতা তার তিন কন্যা ও ১ জন পূত্র সন্তানের জন্য কোন সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। শুধু তিনটি জীবন বীমা কোম্পানীতে তার নামে তিনটি পলিসি খোলা ছিল ( সম্ভবত হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স ও আলফা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি)। তার তিনিটি বীমার মৃত্যুদাবীর অর্থ থেকেই পরিবারের সহায়তা হয়েছিল বেশীরভাগ। মাওলা সাহেবের সহধর্মিনী ও তার তিন কন্যাই মৃত্যু বরন করেছেন। ডাঃ গোলাম মাওলার একমাত্র জীবীত পূত্র সন্তান ডাঃ গোলাম ফারুখ নড়িয়া উপজেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গিয়েছেন কয়েক বছর আগে। তিনিও শারীরিকভাবে অনেক অসুস্থ্য। ডাক্তার ফারুখ রাষ্ট্রের কাছে দাবী জানিয়েছেন, সকল মহান ভাষা সংগ্রামীদের যথাযথভাবে সম্মানীত করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

ভাষা সৈনিক ডাঃ গোলাম মাওলার গৌরবময় ইতিহাসের কথা এ দেশের নতুন প্রজন্মকে জানানোর ব্যবস্থা এর আগে কেউ করেনি। তিনি উপেক্ষিত ছিলেন রাজনৈতিক অঙ্গনের বহু ক্ষেত্রে। মাতৃভাষার সঠিক ইতিহাস রচনায় গোলাম মাওলাকে উহ্য রাখলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও স্বাধীনতার ইতহাস প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দেশের নতুন প্রজন্ম গোলাম মাওলাকে জানতে চায়। এ দায়ীত্ব বাংলা ভাষাপ্রেমী প্রতিজন গবেষক, লেখক, প্রকাশক, রাজনীতিবিদ ও সরকারের। ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসে ডা. গোলাম মাওলার জন্য সঠিক স্থান নির্ধারণ করে দেয়া এখন সময়ের দাবী।

বিস্তারিত খবর

উতোল বাসন্তী হাওয়ায় প্রাণে লাগে সুখের দোলা

 প্রকাশিত: ২০২০-০২-১৬ ০৯:৩৬:৩২

মনের উঠোনে আজ বসন্তের উতল হাওয়া। প্রাণে প্রাণে লাগবে সুখের দোলা, মুখ রেখে দখিনা বাতাসে চুপি চুপি বলার দিন ‘সখী, ভালোবাসি তারে।’ আজ বৃহস্পতিবার ভালোবাসা দিবস। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে। রোমান বিশ্বাসে-বসন্তের আবিরে স্নানশুচি হয়ে বৃহস্পতিবার কিউপিড ‘প্রেমশর’ বাগিয়ে ঘুরে ফিরবে হৃদয় থেকে হৃদয়ে। অনুরাগ তাড়িত পরান এফোঁড়-ওফোঁড় হবে দেবতার বাঁকা ইশারায়। বৃহস্পতিবার হৃদয় গহনে তারাপুঞ্জের মত ফুটবে চন্ডীদাসের সেই অনাদিকালের সুর: ‘দুঁহু তরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/ অর্ধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া/সখি কেমনে বাঁধিব হিয়া…। আকুতি ঝরবে— ‘তুমি কি দেবে না সাড়া প্রিয়া বলে যদি ডাকি, হেসে কি কবে না কথা, হাত যদি হাতে রাখি।’
পৃথিবীর সব সাহিত্য ডুবে অছে ভালোবাসা নিয়ে কাব্য-মহাকাব্য, গল্প, কবিতা, গান, উপন্যাসের অতলান্তে। অতলান্তকে তল পাওয়া গেছে, তারপরও ’ভালোবাসা কী?’ এই প্রশ্নে খেই হারিয়েছেন। কবিগুরুর ভাষায়, ’তোমরা যে বলো দিবস রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’ সখী ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়। সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুঃখের শ্বাস? জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায় : ‘আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়, মনে পড়ে মোরে প্রিয়, চাঁদ হয়ে রব আকাশের গায়, বাতায়ন খুলে দিও।’ আধুনিক কবির কণ্ঠে প্রেয়সীকে বলা: ‘পৃথিবীর কাছে তুমি হয়তো কিছুই নও, কিন্তু কারও কাছে তুমিই তার পৃথিবী।’ অথবা ‘সুখী হবার জন্য তোমার চারপাশে অসংখ্য মানুষের দরকার নেই, শুধু সেই সত্যিকারের কয়েকজনই যথেষ্ট যারা, তুমি যা তার জন্যই তোমাকে ভালোবাসবে।’ একালের কবির অনুভব ‘তোমার সাথে প্রতিটি কথাই কবিতা, প্রতিটি মুহূর্তেই উৎসব—তুমি যখন চলে যাও, সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সব আলো নিবে যায়…।’
ভালোবাসার কথা প্রকাশের জন্য সুদৃশ্য মলাটে মোড়া বইয়ের আটপৌরে দিন ফুরিয়েছে। আঙুল কেটে রক্তে রক্ত মিলিয়ে দেয়া, চিঠির ভাঁজে গোলাপের পাপড়ি গুঁজে দেয়া, দিস্তায় দিস্তায় কাগজ নষ্ট করে কাব্য চর্চা এখন ম্রিয়মাণ।

বাঙালির বসন্ত বরণের দিন। একদিকে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন অপরদিকে আজ বৃহস্পতিবার এসেছে ভালোবাসা দিবসের ছোঁয়া। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের গবেষকদের অনেকে বলে থাকেন, ফেব্রুয়ারির এই সময়ে পাখিরা তাদের জুটি খুঁজে বাসা বাঁধে। নিরাভরণ বৃক্ষে কচি কিশলয় জেগে ওঠে। তীব্র সৌরভ ছড়িয়ে ফুল সৌন্দর্যবিভায় লাজুক আর ঢলঢলে হতে থাকে। অনেক দিবসের ভিড়ে ভালোবাসা দিবস আলাদা মাত্রায় উত্কীর্ণ। এর সাথে প্রেম এবং অনুরাগের অমনিবাস। এই দিবসটির সূচনা সেই প্রাচীন দুটি রোমান প্রথা থেকেই। এক পাদ্রি ও চিকিত্সক ফাদার সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে দিনটির নামকরণ হয়েছে ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’।

খ্রিস্টীয় এই দিবসের রেশ ধরে আমাদের দেশে ও বিদেশে এদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি কেবল প্রেমবিনিময় নয়, তরুণ-তরুণীদের মাঝে গোপনে বিয়ের বাতিক দেখা যায়। রাজধানীর উদ্যানমালা, বইমেলা, ক্যাম্পাস, কফিশপ, ফাস্টফুড শপ, লং ড্রাইভ, নিভৃতে কাটান প্রণয়কাতর তরুণ-তরুণীরা। ফুল দোকানে থরে থরে সাজানো মল্লিকা, জুঁই, গাঁদা উঠে আসবে ললনাদের খোঁপায়।

(লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক)

বিস্তারিত খবর

হাজারো আবেগ, মহিমা, আক্ষেপের অবসান, আমারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন

 প্রকাশিত: ২০২০-০২-১১ ০৩:৫৫:১৫

দিনটি ৯ ফেব্রুয়ারি, রবিবার। বাঙালি জাতির জন্য এই মাসটি এমনিতেই আবেগের। সেই আবেগের মাসে অন্যরকম এক ইতিহাস গড়ার মন্ত্র নিয়ে বিশ্বকাপের মত বড় কোন আসরের এই ফাইনালের প্রথমবার আকবর বাহিনী। দেশ এবং প্রবাসে ক্রিকেটপ্রেমী কোটি মানুষের উৎকণ্ঠা মাঠে এবং টিভি সেটের সামনে। পারবে কি বাংলাদেশ? কারণ একটাই অনেকবার এই ক্রিকেট মাঠে ভারতের সাথে ফাইনালে ইতিহাস রচিত হয়নি তবে ঝরেছে চোখের জল। তবে এবার এসেছে বিশ্ব জয়ের আনন্দ অশ্রু।

হ্যাঁ শেষ পর্যন্ত নিরাশ করেনি বাংলাদেশ। রুদ্ধশ্বাস, শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে সেই ভারতকে হারিয়ে রূপকথার গল্প বানিয়ে ইতিহাস গড়েছে আকবর-শরীফুলরা। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতেছে, করেছে বিশ্বজয়। অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিল বাংলাদেশের যুবারা। যেকোনো ধরনের ক্রিকেটে এবারই প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো টাইগাররা।

টাইগারের গর্জনে কম্পিত পুরো বিশ্ব। সিনিয়রা যখন একের পর এক ব্যর্থতার গল্প রচিত করছে সেখানে জুনিয়রা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে। এই প্রাপ্তি যে কত আবেগের, কত মহিমার, কত আক্ষেপের অবসান তা শুধু আমারই জানি। আজ আমরাও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে এমন টিম স্পিরিট, টেম্পার, ম্যাচের লাগাম শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা, ক্যাপ্টন নক এর আগে কখনই দেখেনি।

এর জন্য বিসিবি একটি বড় ধন্যবাদও পেতে পারে। কারণ গত দুই বছর ধরে দেশ এবং দেশের বাইরে প্রায় ৩০ টি ম্যাচ খেলিয়েছে জুনিয়রদের। আর এই সব গল্পের পেছনে যারা কাজ করেন তারা হলো কোচিং স্টাফ। তবে এবার একজনের নাম না বললেই নয়।

আকবরদের সাফল্যের পেছনে এই মানুষটির অবদান অনিস্বীকার্য। এমন কোচ, একজন শিক্ষক, একজন বন্ধু থাকলে পরিশ্রম বিফলে যাবে না। বিশ্বকাপ ট্রফি অর্জনের কারিগর এই রিচার্ড স্টোনিয়ার(কন্ডিশনিং কোচ)। এই বিশ্বকাপে যুবারা যতগুলো ম্যাচ খেলেছে তার পেছনে ইতিহাস গড়ার মূল উজ্জীবিত মানুষটি সত্যি অসাধরণ। প্র্যাকটিস, ম্যাচের আগে টিম স্পিরিট, প্রতিপক্ষকে হারানোর সব মন্ত্র এমনকি মাঠে সর্বদা মানসিক চাপ দূরে রাখার সব কাজটি উনি করেছেন।

রিচার্ডকে হতাশ করেনি আকবররা। দিনশেষে এই অর্জনের ভাগিদার আপনিও। রিচার্ড আপনাকে অসংখ্য শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

বিশ্বকাপ জিতে গেছে যুবারা। তবে এই বিশ্বজয়ের উল্টো চিত্রও ঘটছে পাকিস্তানে। যুবারা যা করেছে সেই জায়গায় অনেক ঘাটতি আছে সিনিয়রদের তা আজ স্পষ্ট। হয়তো আকবররা বয়সে তরুণ কিন্তু কাজটি করেছে সিনিয়রদের মেজাজে। যেটি তামিম-মুমিনুলরা করতে ব্যর্থ। জুনিয়ররা দেখিয়ে দিল কিভাবে বিশ্ব জয় করতে হয়। আকবর বুঝিয়ে দিল কিভাবে ক্যাপ্টন নক খেলতে হয়। শরীফুল-রকিবুলরা দেখিয়ে দিল কিভাবে একজন বোলার বোলিং, ফিল্ডিং, ব্যাটিং করতে হয়।

শেখার শেষ নেই, সে ছোট অথবা বড় হোক। যাদের হাত ধরে আজ ইতিহাস রচিত হয়েছে তাদের বিশ্বজয়ের অনুপ্রেরণায় এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

"আবারো অভিনন্দন আকবর-শরীফুল তোমাদের"


লেখক: সাংবাদিক, সম্পাদক

বিস্তারিত খবর

জাতীয় জীবনে গৌরবময় ও ঐতিহ্যপূর্ণ দিন ২১ ফেব্রুয়ারি

 প্রকাশিত: ২০২০-০২-১১ ০১:২১:২২

বাংলা ভাষা বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা। এই মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে বাঙালি জাতি। তাইতো ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির চেতনার দিন, নবজাগরণের দিন। কবিরাও বলেছে, ‘মায়ের ভাষা, সেরা ভাষা খোদার সেরা দান।’ মাতৃভাষা বা ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম। ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বাহন। শিল্পকর্ম ও অগ্রগতির ধারক। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনে এক গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী দিন। বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস হচ্ছে এ দিনটি। বাংলা ভাষাকেই রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার ঐতিহাসিক দিন এটি। "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।’’ এমন গান শুনলেই মনে হয় আমরা ১৯৫২ সালের সেই দিনটিতে ফিরে যাই। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত এমন গান চির অম্লান হয়ে রবে। প্রত্যেক জাতির জীবনে বিরল কিছু স্মরণীয় দিন থাকে, ইংরেজিতে যাকে বলে- 'রেড লেটার ডে'। সুতরাং একুশের ফেব্রুয়ারি দিনটা অনন্য স্বতন্ত্রতায় ইতিহাসের পাতায় পাতায় কালজয়ী সাক্ষী হয়েই থাকবে। এই দেশের সকল চিত্রশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সুরকার এবং গীতিকাররা একুশকে ধারণ করেছিল তাদের লেখায়, সুরে, কণ্ঠে আর শিল্পীর তুলিতে। আর সেসব গান, কবিতা বা শিল্পকর্ম আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। একুশকে সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলতে পথ দেখায়।

১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির সময় একজন ভাষা সৈনিক:- মাহবুব উল আলম চৌধুরী একুশের কবিতা লিখে খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বলা যায় তিনিই অমর একুশের প্রথম কবিতার জনক। এই দিবসের তাৎপর্য উল্লেখ করে বিশিষ্ট ভাষা বিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ বলে ছিল, ''আমি মুগ্ধ আমি প্রীত, আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমার প্রাণের কথা আমার ভাষায় জানাতে পারব বলে আমার হৃদয় স্পন্দন বেড়েছে। সত্যিই গর্বিত আমি।’’ তাই তো ভাষা আন্দোলন জাতি গোষ্ঠীর সর্ব বৃৃৃহৎ চেতনার ইতিহাস। ভাষার অধিকার আদায়ের সেই রাজপথ রঞ্জিত করা ইতিহাস। এখন বাংলাদের বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক ভাবেই স্বীকৃত। একুশ এখন সমগ্র বিশ্বের। কিন্তু কেমন ছিল একুশের প্রথম প্রহর বা একুশের অগ্নিস্ফুলিঙ্গের প্রথম সেই বারুদের সংযোজন। আর তখনকার সেই বিদ্রোহের অনুষঙ্গটাই বা কি ছিল? তা ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনার চেষ্টা করা মাত্র। সেই দিনের প্রথম কিছু বা প্রথম সৃষ্টি কিংবা তার অবদানকে নিয়েই লেখা। আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের স্বপ্ন দেখতে পারে এই লেখাটি বিশ্লেষণ করে। আসলেই এ আলোচনায় অনেক দিকই চলে আসেতে পারে, সব কিছু তো তুলে ধরা সম্ভব হবে না। তবুও মৌলিক কিছু কথা না বললেই নয়।

এই ভাষার সঙ্গেই যেন সংশ্লিষ্ট জীবনবোধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি স্বাতন্ত্র্য, জাতির আধ্মাতিক সত্তা সংরক্ষণের সংগ্রামের মূর্ত রূপ ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাই এমন দিনের গুরুত্বটা অবশ্যই হৃদয়গ্রাহী। প্রথমে এই ভাষার জন্যে এদেশের ছাত্ররাই যেন আন্দোলন চালিয়ে নিলেও পরবর্তীতে গোটা দেশবাসী ছাত্রদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ছিল। ফলে সেই সময়র ছাত্রদের মনোবল অনেক বেড়ে যায় এবং তারা সামনের দিকে দৃঢ় মনোবলে এগোতে শুরু করে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে সেই ছাত্রসমাজ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মিছিলও করে ছিল। পুলিশ মিছিলের উপর গুলী চালায়। এতে অনেকে নিহত হয়েছিল, আজ তাদেরকেই শহীদ বলা হয়। এ হত্যাযজ্ঞের জন্য ছাত্র সমাজসহ সকল শ্রেণীর মানুষেরা ভাষার আন্দোলনকে আরো বেগবান করে। ভাষার জন্যেই যেন আন্দোলনের প্রথম লিফলেট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি গুলি বর্ষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। লিফলেটটির আকার ছিল প্লেট অনুযায়ী ১/১৬। গুলি বর্ষণের অল্প কিছুক্ষণ পর পরই হাসান হাফিজুর রহমান, আমীর আলী সহ অনেকেই যেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টোদিকে ক্যাপিটাল প্রেসে চলে যান। সেখানে গিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটের খসড়া তৈরি করেন। দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই ‘মন্ত্রী মফিজউদ্দীনের আদেশে গুলি’ শীর্ষক লিফলেটটি ছাপার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। হাসান হাফিজুর রহমান লিফলেটটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসেন। প্রায় দুই/তিন হাজার লিফলেট ছাপানো হয়েছিল। উৎসাহী ছাত্ররাই এমন লিফলেটগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে ছিল। বলা যায় যে, চকবাজার, নাজিরা বাজার এবং ঢাকার অন্য সব এলাকাতেও লিফলেটগুলো কর্মীদের মাধ্যমে ঐদিনই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এই স্মৃতি মতো অনেক স্মৃতিই যেন আমাদের ভাষা আন্দোলনকে অমর ও অক্ষয় করে রেখেছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত হত্যাকান্ডের খবর সারা দেশেই পৌঁছে যায়। অতঃপর পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেম্বর ইউনেস্কো এর সাধারণ পরিষদের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে সর্বসম্মতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মাঝে যে চেতনার উন্মেষ হয়, তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে ছিল ঊনসত্তর থেকেই একাত্তরে।বাংলাদেশের সমস্ত আন্দোলনের মূল চেতনা একুশে ফেব্রুয়ারি। তখন থেকেই বাঙালি উপলব্ধি করেছিল তার বাঙালি জাতীয়তাবোধ, তার সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী। এমন এই সংগ্রামী চেতনাই বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন এই দু'ধারাকে একসূত্রে গ্রথিত করে মুক্তি সংগ্রামের মোহনায় এনে দিয়েছে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে একটি গুরুত্ব পূর্ণ দিন। একুশের চেতনাই যেন বাঙালি জাতিকে দিয়েছে অন্যায় ও অবিচার, অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধেই আপোষহীন সংগ্রামের প্রেরণা।একুশের প্রথম নাটক 'কবর', তা মুনীর চৌধুরী রচনা করেছিল। এমন এই ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধেই যেন ’৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন মুনীর চৌধুরী সহ রণেশ দাশগুপ্ত। তাদের পাশাাপাশি অনেক লেখক বা সাংবাদিকরাও জেলে আটক হয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিল। রণেশ দাশ গুপ্ত জেলের এক সেলে আটক, আর অন্য একটি সেলেই মুনীর চৌধুরীকে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি নাটক লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে চিরকুট পাঠান। সে চিরকুটের লেখাটি ছিল- শহীদ দিবসে রাজবন্দিরাই নাটকটি মঞ্চায়ন করবেন, জেলে মঞ্চসজ্জা ও আলোর ব্যবস্থা করা যাবে না। এমন কথাগুলো কৌশলে মুনীর চৌধুরীকে বলা হয়, নাটকটি এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে খুব সহজে কারাগারেই এটি অভিনয় করা যায়। মুনীর চৌধুরী ’৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি লিখে শেষ করেন। ওই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি, রাত- ১০টায় কারাকক্ষগুলোর বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর শুধুমাত্র হ্যারিকেনের আলো-আঁধারিতেই কবর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। অভিনয়ে অংশ নেন বন্দি নলিনী দাস, অজয় রায় প্রমুখ।

ভাষার আন্দোলনটি জাতীয়তাবাদেরই প্রথম উন্মেষ। আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল ছিল বাঙালি জাতির আপন সত্তার উপলব্ধি এবং ঐক্যবদ্ধ হওবার প্রেরণা। এমন আন্দোলন বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার আন্দোলনের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। এমন আন্দোলনে প্রথম ছাপচিত্র অঙ্কন করেছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, বায়ান্নর ভাষাকর্মী- মুর্তজা বশীর। ছাপচিত্রটির শিরোনাম হলো ‘রক্তাক্ত একুশে’। মুর্তজা বশীর ১৯৫২ সালের  একুশে ফেব্রুয়ারির ছাত্রহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলেন। শহীদ বরকতের রক্তে তার সাদা রুমাল রঞ্জিত হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আঁকা তাঁর এমন ছাপচিত্রটিতে তিনি একুশের ঘটনা অঙ্কিত করেছিল। একজন গুলিবিদ্ধ ছাত্রনেতাকে একেঁছেন সেখানেই ফুটে উঠে- মিছিলে গুলি বর্ষণের ফলে পড়ে যান, তার স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ডটি পড়ে যায় এবং তার হাতে থাকা বইটিও মাটিতে পড়ে রক্তাক্ত হয়ে যায়। অমর একুশে আজও বাংলাদেশে শহীদ স্মরণে গ্রন্থমেলার আয়োজন করেই যেন মাতৃভাষার জন্যে বিভিন্ন শহীদ ও বুদ্ধিজীবীদেরকে স্মরণ করা হয়। অমর একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য বিশ্লেষণে শুধু শহীদ দিবস কিংবা গ্রন্থমেলা পালনেই সরকার সীমাবদ্ধ থাকেনি, তাকে এই বাঙালির জাতীয় জীবনের সর্বত্র প্রভাব বিস্তারেও আগ্রহী ভূমিকা পালন করছে। একুশে ফেব্রুয়ারির পূর্ণ ইতিহাস কিন্তু সাধারণ ছাত্র-জনতার ইতিহাস। এমন এ ইতিহাসের নায়ক অথবা মহানায়ক তারাই। কোনো দল অথবা দলীয় নেতার নেতৃত্বে এর জন্ম হয়নি। এই দেশের চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীরা তাদের যুক্তিবাদী সৃজনশীল লেখনীর দ্বারা সমাজজীবনে এর ক্ষেত্র রচনা করেছিল। দেশের স্বাধীনচেতা মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণরা সেই উর্বর ক্ষেত্রেই রক্তবীজ বপন করেছিল। ফলেই আজকের এই সোনালি ফসল। এই তরুণদের সংগ্রামী চেতনা সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং গড়ে তোলে এক অজেয় শক্তি। তাই তো পরবর্তী সময়েই রাজনীতিতে প্রদান করে নতুন দ্যোতনা। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই যেন সৃষ্টি হয় এক নতুন শক্তি। সৃষ্টি হয় নতুন ইতিহাস। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ওই সব শহীদ এবং বীর যোদ্ধাদের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একুশে ফেব্রুয়ারির মতো এই স্মরণীয় দিবসটি লাভ করতে পেরেছি। এমন দিনের সৃষ্টিতে তরুণরা রক্তাক্ত অবদান রাখলেও এখন তা বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে শাসক চক্র বাঙালী জাতিকে দুর্বল করতেই বাংলার মাতৃভাষা বা মায়ের ভাষার উপর চক্রান্ত শুরু করে। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের শুরুতে মায়ের ভাষা রক্ষার আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। আন্দোলন ঠেকানোর জন্য সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ প্রাণের দাবীতে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র যুব সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করে। এ মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ নাম না জানা অনেকেই যেন সেই দিন শহিদ হয়েছিল। আর বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত হওয়া মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে দেশবাসী প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপায় না দেখে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই বাধ্য হয়ে ছিল। একটু ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে পরিস্কার ভাবে জানা যাবে, তা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এর তৎকালীন উপাচার্য- ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। আর পূর্ববঙ্গ থেকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। এইভাবেই যেন ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চক্রান্ত চলতে থাকে। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিল উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর ফলেই তুমুল প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণার পর পরই এদেশের ভাষা আন্দোলন জোরদার হতে থাকে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই বাঙালিদের মাতৃভাষার উপর চরম আঘাত হানে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই যেন রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন শুরু হলেও ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নেই বাঙালি জাতি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়। কেউ কবিতা লিখে, কেউ গান বা নাটক লিখে, কেউ বা চলচ্চিত্র কিংবা চিত্রাঙ্কন করে। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বটা যে, এ সবের মাধ্যমেই এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী শিক্ষা নিয়ে থাকে। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই যেন জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শাসকচক্রের প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়ে ছিল। জানা প্রয়োজন তা হলো, একুশে ফেব্রুয়ারির পরের দিন অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম ক্রোড়পত্র এবং প্রথম অঙ্কিত চিত্র। ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে ছিল তৎকালীন ‘দিলরুবা’ পত্রিকার প্রকাশক এবং এতে স্কেচ আঁকেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আর লেখেন ফয়েজ আহমদ এবং আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন। সেই গুলোকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে কাগজে ছাপা হয়ে যায় এবং পত্রিকার কর্মীরাই রাজপথে কাগজ গুলো বিলি করে ছিল। সেই দিন সন্ধ্যা ৬ টা থেকে কারফিউ ছিল বলে ৬ টার  আগেই হাতে হাতে কাগজ বিলি করা হয়ে যায়। তাইতো ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রেরণা দিয়েছিল একুশ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের রক্ত রাঙ্গা ইতিহাস। বলা যায় যে, সর্ববস্তরে মানুষ ও ছাত্র সমাজের তীক্ষ্ম মেধা দ্বারাই মাতৃভাষার জন্যে সংগ্রাম করেছিল। তাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে গৃহীত হওয়ার ব্যাপারটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এখন আমাদের কর্তব্য বাংলা ভাষা চর্চার মাধ্যমে উন্নত জাতি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানো।

ভাষার জন্য জীবন দান এ বিরল আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সম্পূর্ণ ভাবে ঘোষণা করে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিনটিকে প্রতি বছর পালন করে আসছে। জাতিসংঘে এর আগেও ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতি সংঘের সংস্থা ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিক ভাবেই এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ৩০ তম অধিবেশনে এক পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবটির খসড়াও পেশ করেছিল। বাংলাদেশকে সমর্থন জানায় ২৭টি দেশ। দেশ গুলো হলো:- সৌদি আরব, ওমান, বেনিন, শ্রীলঙ্কা, মিশর, রাশিয়া, বাহামা, ডেমিনিকান প্রজাতন্ত্র, বেলারুশ, ফিলিপাইন, কোতে দি আইভরি, ভারত, হুন্ডুরাস, গাম্বিয়া, মাইক্রোনেশিয় ফেডারেশন, ভানুয়াতু, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, কমোরো দ্বিপপুঞ্জ, পাকিস্তান, ইরান, লিথুনিয়া, ইতালি, সিরিয়া, মালয়েশিয়া, স্লোভাকিয়া ও প্যারাগুয়ে। ইউনেস্কোর এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই যেন বাংলা ভাষা সহ বিশ্বের চার হাজার ভাষাও সম্মানিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালির মাঝে নবচেতনার জন্ম হয়। তা হচ্ছে স্বাধীকারের স্বপ্ন। এর পথ ধরেই যেন আসে বাঙালীর মুক্তি ও স্বাধীন বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মাতৃভাষার উন্নয়ন এবং বিস্তারে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করা যায়। আর মাতৃভাষার প্রতি অবশ্যই এই দেশের শ্রদ্ধাবোধ বাড়াবে। আজও তাই বাংলা ভাষা ও তার সাহিত্য এবং সংস্কৃতি একুশের চেতনায় যেন বিকশিত হচ্ছে। আজও তা অব্যাহত রবে নব নব রূপেই জাতির হৃদয়ে সাড়া দিবে। বাংলা ভাষার জন্যেই সেই সময় একুশের প্রথম গান রচনা করে বাঙালি জাতি হৃদয়কে পুলকিত করেছিল। ভাষাসৈনিক আ.ন.ম. গাজীউল হকের প্রথম গানটির প্রথম লাইন: '‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না"। এমন ভাষা-আন্দোলনের সুচনার গান হিসেবে এটি সে সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং আন্দোলনের মহা অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। গানটির সুর দেয়া হয়েছিল হিন্দি গান ‘দূর হাটো, দূর হাটো, ঐ দুনিয়াওয়ালে, হিন্দুস্তান হামারা হায়’ এর অনুকরণে। একুশের হত্যাকাণ্ডের পরপরই গাজীউল হকের এ গানটি ছিল ভাষাকর্মীদের প্রেরণার মন্ত্র। শুধুমাত্র রাজপথের আন্দোলনে নয়, জেলখানায় রাজবন্দিদের দুঃখ কষ্ট নিবারণে এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে এই গান ছিল প্রধান হাতিয়ার। ১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকীতে আরমানিটোলার ময়দানে আয়োজিত জনসভায় গানটি ১ম গাওয়া হয়। ভাষার জন্য সেসময় কারো অবদান কম ছিলনা। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যেন চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়ছিল।প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির একটি অংশে প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে। খালি পায়ে ফুল দিতে যাওয়ার সেই দৃশ্যে বিখ্যাত গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এমন গানটি সম্পূর্ণ বাজানো হয় আবহসঙ্গীত হিসেবে। পরিশেষে বলতে চাই যে, বিশ্বের কোন দেশে কিন্তুু মাতৃভাষার জন্য এই ভাবে আন্দোলন হয়নি। সেদিক দিয়ে বাংলাভাষার একটি বিশেষ স্থান বিশ্বে আছে। যা‘সবার উর্ধ্বে। তাই আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব কমিয়ে সরকারকে নিজ দেশের চ্যানেলগুলোর প্রতি সবাইকে বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলা সহ প্রত্যেক বছর বই মেলা বৃহৎ আকারে আয়োজন করেই- আমাদের বাংলাভাষা কিংবা মাতৃভাষাকে খুব শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই হয়তো একুশে ফেব্রুয়ারী “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস“ বা দেশীয় একুশের বিভিন্ন উৎসব পালন করাটাও সার্থক হবে। ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার। আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ধারক। সুতরাং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেই একমত পোষণ করে বলাই যায়,-"সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম, মাগো, তোমায় ভালোবেসে"॥

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রভাষক

বিস্তারিত খবর

তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করুন : রাষ্ট্রপতি

 প্রকাশিত: ২০২০-০১-১৫ ১০:৩৪:৩৬


রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেষ্ট থাকার আহবান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন,‘বিশ্বায়নের এ যুগে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য। তাই ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’

রাষ্ট্রপতি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলা- ২০২০’ উপলক্ষে আজ এক বাণীতে এ কথা বলেন।

‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে ১৮ জানুয়ারি-২০২০ পর্যন্ত তিন দিনব্যাপি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলা’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জেনে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন,তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্তার টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মূলত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্ববাসীকে এক কাতারে শামিল করেছে।

আবদুল হামিদ উল্লেখ করেন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল বাংলাদেশের সব অঞ্চলের জনগণের মধ্যে পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে ‘রূপকল্প-২০২১’ ঘোষণা করেছে, যা ইতোমধ্যে অনেকাংশেই বাস্তবায়িত হয়েছে।

তিনি বলেন,সরকার তথ্যপ্রযুক্তি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিনির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। ফলে দেশব্যাপী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে জনগণ ক্রমাগত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সম্পৃক্ত হচ্ছেন এবং জনগণ ঘরে বসেই তাদের মৌলিক নাগরিক সেবাসহ নানাবিধ সেবা পাচ্ছেন।

রাষ্ট্রপতি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলা-২০২০’র সার্বিক সফলতা কামনা করেন।

বিস্তারিত খবর

শীতঋতুতে গ্রামীণ জনজীবনের সুস্বাদু পিঠা

 প্রকাশিত: ২০২০-০১-১৫ ১০:২৪:৪৩

বাঙালীর লোক ঐতিহ্যে বিভিন্ন পিঠার ইতিহাস গ্রামীণ মানুষের ঘরে ঘরে শীত ঋতুতেই যেন বারবার হাজির হয়। শীতে নানা ধরনের পিঠার গুরুত্ব ও ভূমিকা পৃথিবীর ইতিহাসে সে তো এক কালজয়ী সাক্ষী। শীত কালে গ্রামীণ মানুষদের কাছেই পিঠা ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমন পিঠার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আজ গ্রাম কেন্দ্রীক থাকেনি। তা শহরেও প্রবেশ করেছে অনেক আগেই। শহরের সবখানে এখন নানা রকমের পিঠা পাওয়া যায়। এ দেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষ অন্য কোনো ঋতুর চেয়ে এই শীতঋতুতেই যেন বিভিন্ন ধরনের পিঠার উৎসবে করে থাকে। যুগ যুগ ধরে মানুষ সুস্বাদু উপাদেয় পিঠা খাদ্যদ্রব্যের উৎসব পালনও করে আসছে।

হেমন্ত আসতে না আসতেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন। চলে পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে গ্রামেগঞ্জে তৈরিও হচ্ছে নানান স্বাদের পিঠা। শুধুই যে গ্রামে তা নয়, শহরের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে বিভিন্ন পিঠার দোকান। এই দোকানেও পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামের মানুষদের মতো। তবে গ্রামীণ জনপদের মানুষ যেভাবে পিঠা তৈরি করে শহরের মানুষ ততটা ভালো পারে না। গ্রামই তো পিঠা তৈরি করার শিকড় স্থান। শীতকালের আমেজে খেজুর গুড় আর রস ছাড়া তো পিঠা তৈরির পূর্ণতা কখনই উৎকৃষ্ট হয় না। খেজুরের রস দিয়ে ভাপা পিঠা, পুলি, দুধ চিতই পায়েস যাই হোক না কেন শীতঋতু আর খেজুর গাছ ছাড়া অসম্ভব। শীতঋতুতে গ্রামে গঞ্জে খেজুর রস আর শীতের হরেক রকম পিঠা নিয়েই তো হয় উৎসবের আমেজ। বাড়িতে তাদেরই নিজ আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো ও জামাই মেয়েদের বাড়িতে নিয়ে এসে নতুন কাপড় চোপড় উপহার দেওয়ার যেন হাজার বছরের রীতি। উনুনের পাশে বসে গরম গরম ধোঁয়া বা ভাপ উঠা ভাপা পিঠা খেজুর গুড় বা গাঢ় খেজুর রসে চুবিয়ে খাওয়ার ষোলকলা পূর্ণ হয় না শীতঋতু ছাড়া। শুভ সকালে সারারাত্রির বাসি, ঠান্ডা ভাপা পিঠা খেজুর রসে চুবিয়ে খেতে মন্দ লাগে না। মজার বেপার হল শীত কালের এই অমৃত ভাপা পিঠা শুধুই যে গ্রামের মানুষের কাছে প্রিয় তা কিন্তু নয়। শহরের অলিতে গলিতেও দেখা যায় অনেক ভাপা পিঠার দোকান। নারিকেল আর খেজুর গুড়ের সমন্বয়ে চালের আটা মিশ্রণে ভাপা পিঠা তৈরীও হয়। তবে বিভিন্ন বয়সের মানুষ হুমড়ি খেয়েই সেগুলো পিঠা খায়। বলতেই হয় গ্রামই পিঠা তৈরির শ্রেষ্ঠ স্থান।

এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামকরণে চিহ্নিত পিঠা বা আলাদা গঠনে নকশাকৃতির পিঠা লক্ষনীয়। গ্রামীণ জনপদের মানুষ অগ্রহায়ণ মাসে সাধারণত নতুন ধান উঠার পর পরই যেন পিঠা তৈরির আয়োজন শুরু করে। আসলে শীতঋতুতে হরেক রকম পিঠার বাহারি উপস্থাপন এবং আধিক্য হয় বলেই কিশোর-কিশোরীরা মামার বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ততা দেখায়। মামার বাড়ি মধুর হাড়ি এই কথাটি যে যুগে যুগে হয়তো সত্যিই রয়ে যাবে। গ্রামবাংলার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী পিঠার অনেক নাম গ্রামের মানুষের দ্বারে এসে হানা দেয় আজও। বিভিন্ন পিঠা উৎসবের প্রস্তুতি গ্রামাঞ্চলের ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রতিটি ঘরে ঘরেই শুরু হতে দেখা যায়। সুতরাং গাঁ গেরামেই আত্মীয়-পরিজনের আগমন ঘটে। নানার বাড়িতে কিশোর-কিশোরীরা শীতকালীন ছুটি নিয়ে বেড়াতে যাবে বলে তাদের যেন দু'চোখে ঘুম আসে না। মেয়ে-জামাই তাদের সন্তানদের সঙ্গেই শশুর বাড়ি হওয়ার ইচ্ছাটাও পোষন করে। গ্রামে অনেক হতদরিদ্র পরিবারেও যেন বিনোদনের চরম দৃশ্যপট উদয় হয় শীতকালে। আজকাল শীতঋতুর অনেক পিঠা শহরেও মেলা উৎসবের আয়োজন করে গ্রাম গঞ্জের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দিকনির্দেশনার পথ প্রদর্শক হিসেবে দেখা যায় সুশীল সমাজকে, প্রগতিশীল মানুষ এবং শিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীকে। সুতরাং গ্রাম গঞ্জের ধনী পরিবার নানান জাতীয় পিঠার ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে তাদের মেয়ে জামাইকে দাওয়াত দিয়ে খাইয়ে থাকে। শীতঋতুর এই হরেক রকম পিঠা তৈরির আপ্পায়নে গ্রামীণ জনপদের মানুষেরা এখন দিনে দিনে অতীতের বিলুপ্ত হওয়া পিঠাগুলো এখন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং সংস্কৃতির প্রতিও সচেতন হচ্ছে ।

আহা, কি আনন্দ ঘরে ঘরে। ভোজন প্রিয় বাঙালির ঐতিহ্যে পিঠার ইতিহাস খুব পুরনো হলেও বর্তমানে পিঠার স্বাদ আধুনিক ও রন্ধন শিল্পের নানান করণ কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। পিঠার চমৎকার গন্ধে বাড়ির উঠান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খেজুর রসের গন্ধযুক্ত পিঠা সবার কাছে আজ সমাদৃত। হতদরিদ্র গাঁ গেরামের খেটে খাওয়া শ্রমিক মানুষের দু:খ-কষ্টের মধ্যেও পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির মুহূর্ত যেন অনাবিল এক শান্তির পরশ বয়ে আনে। তাদের খুব পরিশ্রম ও দু:খ-কষ্টের জীবন হলেও বিভিন্ন পিঠা উৎসবের আয়োজন করতে একটুও পিছপা হয় না। তারা অবাক করে দেবার মতোই অনেক পদের পিঠার তৈরি বলতে পারে। এ দেশে ১৫০ বা তারও বেশি রকমের পিঠা থাকলেও মোটামুটি প্রায় তিরিশ প্রকারের পিঠার প্রচলন খুবই বেশি লক্ষ্যনীয়। তাছাড়া আরও কতো রকমারি পিঠা অঞ্চল ভেদে রয়েছে সেই গুলোর নাম বলে শেষ করা যাবে না। তবুও সে এক নিঃশ্বাসে বলা শুরু করে। যেমন: নকশি পিঠা, ভাঁপা পিঠা, ছাঁচ পিঠা, রস পিঠা, দোল পিঠা, পাকান পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চিতই পিঠা, মুঠি পিঠা, ছিট পিঠা, পাতা পিঠা, খেজুরের পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা,পানতোয়া পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, জামদানি পিঠা, ভেজিটেবল ঝাল পিঠা, সরভাজা পিঠা, ছিটকা পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, চাঁদ পাকন পিঠা, মালপোয়া পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, কাটা পিঠা, তেজপাতা পিঠা, তেলপোয়া পিঠা, লবঙ্গ লতিকা পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, মালাই পিঠা, চুটকি পিঠা, গোকুল পিঠা, নারকেল পিঠা, আন্দশা পিঠা, পুডিং পিঠা, মুঠি পিঠা, সুন্দরী পাকন পিঠা, রসফুল পিঠা, মেরা পিঠা, তেলের পিঠা, চাপড়ি পিঠা, সেমাই পিঠা, দুধরাজ পিঠা, গোকুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, ঝিনুক পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, ফুল পিঠা, ফুল ঝুরি পিঠা, কলা পিঠা, ক্ষীর কুলি, কুশলি পিঠা, ফিরনি পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি পিঠা, ঝাল মোয়া পিঠা, নারকেলের সেদ্ধ পুলি পিঠা, নারকেল জেলাফি পিঠা, চিড়ার মোয়া পিঠা, নারকেল নাড়ু পিঠা এবং কাউনের মোয়া পিঠা ইত্যাদি নাম অঞ্চল ভেদে পিঠা হিসেবেই বিবেচ্য।

এদেশের হতদরিদ্র গাঁ গেরামের মানুষ পিঠা তৈরি করার জন্য বিভিন্ন প্রকার গুড় কিংবা চিনি ব্যবহার করে। খেজুর গাছের রস থেকে নানান পদের গুড় গ্রামাঞ্চলের মানুষের উল্লেখযোগ্য। পিঠা তৈরিতে মিষ্টি জাতীয় খাবারটাই প্রধান। সেক্ষেত্রে খাঁটি গুড় ব্যবহার করা প্রয়োজন। তাতেই পিঠার স্বাদ পরিপূর্ণ হয়। একটু জানা দরকার যে, খেজুর গাছের খাঁটি গুড় আপনি চিনতে পারবেন কিভাবে? একজন খেজুর গাছ চাষীর বিশ্লেষণ মতে, খেজুর গুড়ের রং অবশ্যই বিভিন্ন রকম হতে পারে। হয়তো কোনো গুড় হালকা খয়েরি, কোনোটা একটু লালচে, কোনোটা আবার কমলা রঙের। খেয়াল করা দরকার কোন রংটা বিশেষ করে খাঁটি গুড়। অবশ্য চাষীদের মতেই জানা যায়, সবচেয়ে গাঢ় খয়েরি রঙের গুড়টাই আসল গুড়। আর গুড়ের রং যত হালকা হবে, বুঝতে হবে ওর মধ্যেই যেন কেমিক্যাল কিছু ভেজাল পন্য মেশানো হয়েছে।আসল গুড় অবশ্যই চমৎকার এক ধরনের ঘ্রান যুক্ত হবে। খেজুর গাছের খাঁটি গুড়ের কিনারায় আঙুল দিয়ে চাপ দিয়েই ভাঙা যাবে। যদি ভাঙা না যায়, শক্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে সেই রকম গুড় গুলোতে ভেজাল আছে। খেজুর গুড় ক্রয় করার সময় গুড়ের ধারটাতে "দুই আঙুল" দিয়েই চেপে দেখবেন। যদি তা নরম হয়, তবে বুঝবেন গুড়টি ভীষণ ভাল। তাছাড়াও গুড় ভেঙে একটু খেয়েও দেখবেন যদি সে গুড়গুলি কচকচ করে অবশ্যই তাতে চিনির মিশ্রণ আছে। জানা দরকার যে খুব খাঁটি গুড় মুখে দিলেই গলে যায়, কচ কচ করবে না। যদি বাসায় নিয়েও যান- ভেজাল গুড় একটু পরীক্ষা করে দেখা যেতেই পারে, তা হলো:- খাঁটি গুড় - দুধ একসাথে জ্বাল দিলে তা কখনো ছানা হয়ে যাবে না। খেজুর গাছের রস থেকে প্রধানত তৈরি হয় পাটালী ও ঝোলা গুড়।

সুতরাং এমন গুড় নামক মিষ্টি খাবার সামগ্রী দিয়েই ভালো পিঠা হয়। চাষীদের শ্রম দ্বারাই যেন তৈরি হয় গুড়ের বিভিন্ন পিঠা। শীত কালের আয়োজনে সত্যিই এমন ধরণের পিঠা গুলোকে ধনী কিংবা গরীবের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় না করে সাধ ও সাধ্যের মধ্যেই যেন রসনা বিলাস করে আসছে। গ্রামীন বাঙালির পিঠা উৎসবের রসনা বিলাসী দিক হয়তো বা পৃথিবীতে আর নেই। গ্রাম বাংলায় ধানের মৌসুম অনুযায়ী নানান পিঠা তৈরি হয়। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন মিলে পিঠা খাওয়ার আনন্দকে কেন্দ্র করে গ্রামের দরিদ্র মজুরদের সঙ্গে নিয়ে ধান মাড়াই করে চালের আটা তৈরি করে মেতে উঠে বিভিন্ন পরিবার। পিঠা তৈরি নানান জাতের চালও শীতঋতুতে গ্রামীণ বাজারেও ক্রয় করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো পরিবার অনেক আগেই পিঠা তৈরির প্রয়োজনীয় বাৎসরিক চাহিদা ঘরে মজুদ করে রাখে। খেজুর গুড় বা নারিকেলের যোগান এখন তারা গ্রামে ফ্রিজ ব্যবহার করে পিঠা তৈরির মজা উপভোগ করছে। আয়েস করে পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির ঢেঁকুর গ্রামঞ্চলে কনকনে শীতের সময় খুব ছড়িয়ে পড়ে। নিশ্চয় এইসব পিঠার চাল মেশিনে ভাঙানো বা পাটায় পিষানো চাউলে হয়ে থাকে। এক সময় ঢেঁকিতে গীত গাইতে গাইতে চাল থেকে আটা তৈরি করতো গ্রামীণ মেয়েরা। ঢেঁকির শব্দ এখনো কানে বাজলেও পিঠা খাওয়ার উৎসব কমে যায়নি বলা চলে। যে সব মেয়েরা বাবা বাড়ি আসতে পারেনা তাদের শ্বশুরবাড়িতে শীত মৌসুমী পিঠা পাঠাতেও ভুল করেনা। গ্রাম বাংলার মানুষের এমনই জীবন সত্যিই নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ ও তাদের উৎসব পূর্ণ বিনোদনের এ জীবন আসলেই ইতিহাসের কালজয়ী সাক্ষী।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

মনের সুখই আসল সুখ

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১৭ ১২:৩১:৫৬

মানুষের এই জগত জীবন অতি সংক্ষিপ্ত জীবন। তাদের আছে দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি, আশা-ভরসা, সফলতা বা বিফলতার জীবন। এরই মধ্যে জীবনের নানা অপূূর্ণতাকে নিয়েই মানুষ অভিযোগ কিংবা ক্ষোভও প্রকাশ করে থাকে। তারা জীবন যাপনের অংশে যেন অনন্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আফসোস করে। তারা কোনোদিন তা পরিপূর্ণ করতে পারে না বা কোনো দিনই পরিতৃপ্ত হতে পারে না। কেউ কেউ খুব কঠোর পরিশ্রম করে সফল হলে বলতেই হয়, তা সৃষ্টিকর্তারই নিয়ামত। আসলে সুখ-শান্তির প্রত্যাশা হলো- মানুষদের সহজাত প্রবণতার একে বারেই ভিন্ন দিক। তাকে জোর জবরদস্তি করে কখনোই আদায় করা যায় না। ইসলাম চেয়েছে দেহ এবং মনের প্রয়োজন সমভাবে পূরণ করতে পারলে মানুষ পেতে পারে সুখের সন্ধান। তার জন্য মানুষের বিজ্ঞতার আলোকেই পরিশ্রম করা প্রয়োজন। সমগ্র পৃথিবীতে এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না যে, তারা সুখী হতে চায় না। আসলে যার যা চিন্তা চেতনাতেই যেেন সুখী হতে চায়। অনেকেভাবে অর্থকড়ি, শিক্ষা-দীক্ষা, বিবাহ, সন্তান-সন্ততি, পরিবার, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি মানুষকে অনেক 'সুখী' করতে পারে। সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরিপ করে দেখা গেছে, এ সকল অর্জন আসলে মানব জাতিকে সুখী করতে পারে না। লাখ লাখ মানুষদের জন্যেই প্রকৃত সুখ যেন হয় যায় সোনার হরিণ।

সারাদুনিয়া খুব সুন্দর এবং তাকে উপভোগ বা সুখ-শাস্তি জন্য মানুষের আছে স্বাধীনতা। এই দুনিয়াকে যেমন পেয়েছে মানুষ। তেমনি সেখানেই অনেক সুখ লাভের প্রকৃৃত পন্থাকে সৃষ্টি করেছে মহান সৃষ্টি কর্তা। এই মানুষদের আনন্দ, ভোগ-বিলাস অথবা সৌন্দর্য উপভোগে যেন আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে আছে প্রতিদান। তার কাছে এ দুনিয়া আখেরাতের সাথেই সম্পৃক্ত, দৈহিক ও শারীরিক আনন্দ উপভোগ করা অন্তরের আনন্দের সাথেই যেন যুক্ত। তাই দুনিয়াতে ভোগের মাধ্যমেই অর্জিত সুখ কিংবা শান্তি মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিতুষ্টি কিংবা প্রশান্তির সাথেই সম্পৃক্ত থাকে। আবার যারা মনে করে যে 'সুখ' হয়তো গাড়ি, বাড়ি, অলঙ্কার, কাপড় চোপড় কিংবা ধন-দৌলতের মধ্যে আছে। কিন্তু এই সব প্রাপ্তি মানুষকে সাময়িক ভাবে কিছুটা সুখ দিতে পারলেও যেন প্রকৃত পক্ষেই স্থায়ী সুখ প্রাপ্তির জন্য এধরণের বহু চাহিদাগুলোও বড় ভূমিকা পালন করে না। এমন কথাগুলো সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাই মনে করে থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুখ বৈষয়িক বা জাগতিক কোনো ব্যাপার নয়। সুখটা হল বহুলাংশে মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাপার। সুখপ্রাপ্তির জন্য আসলেই কোনো 'শর্টকাট পদ্ধতি কিংবা রাস্তা' নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ দিনের চব্বিশ ঘণ্টাতে সুখী হিসেবে থাকে না। তাদের জীবনে যেন- হতাশা, দুঃখ-কষ্ট আছে। পার্থক্য হলো সুখী মানুষরা হতাশা, দুঃখ-কষ্টকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে। অন্যরা তা পারেন না। মানব শরীরটা শুধুই রক্ত-মাংসে গড়া কোনো জড়বস্তু নয়। আছে আত্মা যা কিনা শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবেগ-অনুভূতিই শরীরের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। বস্তু জগতে কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা, মোহ, মাৎসর্য, ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা আমাদের দুঃখ, কষ্ট, অশান্তি, অসুখ এবং ধ্বংসের মূলকারণ। মানুষ তার সততা, সৎ কর্ম বা অটল সৃষ্টিকর্তা প্রীতি দ্বারা উল্লিখিত বদগুণ থেকে নিজকে দূরে রেখে এই পার্থিব জীবনে পরম স্বর্গসুখ লাভ করতে পারে।

একসময়ে মনে হতো সুখের চেয়ে শান্তি ভালো। সেই সময়েই মানুষ, সুখ আর শান্তিকে কখনো এক করে দেখতে চায়নি। কিন্তু এখন মনে হয় শান্তি ছাড়া সুখ ভোগ সম্ভব নয়। আর সুখ ছাড়া জীবনে যেন 'শান্তি' আসতেই পারে না। "সুখ আর শান্তি" দুটোই আলাদা শব্দ। এদের অর্থের মধ্যে যেন বিস্তর পার্থক্য আছে। কিন্তু বাস্তবে ''সুখ বা শান্তি" চলে যেন একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে। সুখ শব্দটি মানুষের দেহনির্ভর। আর শান্তি শব্দটি সে মানুষের মননির্ভর হয়ে থাকে। সুতরাং বাস্তবে শরীরের অস্তিত্বকে বাদ দিয়ে- মনের অস্তিত্বের কথা ভাবা খুবই কঠিন। সারাজীবন মানুুষ বাঁচে নিজ শরীরকে নিয়ে। আবার মৃত্যুতেই শরীরের আর কোনো প্রয়োজন থাকে না, ফুরায় সুখ-দুঃখের অনুভব। মনো বিজ্ঞানীরা বলে, সুখ হলো জেনেটিক বা বংশানুগতিসম্বন্ধীয়। আবার বেশকিছু বিজ্ঞানীরা তাদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূত্র ধরে বলে, তারা মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ নির্ণয় করেছে, আর যেন যেখান থেকেই 'সুখ নিঃসৃত' হয়। জনপ্রিয় স্কাউটের জনক রবার্টস্টিফেনসন স্মিথলর্ড় ব্যাডেন পাওয়েল অব গিলওয়েল বলেছেন-- "সুখ লাভের প্রকৃত পন্থা হলো অপরকে সুখী করা"। এমন সুন্দর পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছো তারচেয়ে একটু শ্রেষ্ঠতর কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টাও করো, তোমাদের মৃত্যুর পালা যখন আসবে তখন সানন্দে এই অনুভুতি নিয়ে 'মৃত্য বরন' করতে পারবে। তুমি অন্তত জীবন নষ্ট করনি কিংবা সাধ্য মতই সদ্ব্যবহার করেছ। তাই এমন ভাবেই সুখে বাঁচতে ও সুখে মরতে প্রস্তুত থাকা প্রতিটি মানুষেরই উচিত। আর হিংস্রতাকে পরিত্যাগ করতে না পারলে মানব জাতি কখনোই পেতে পারে না 'শান্তি'। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতেই দুঃখের বড় কারণ।

হার্ভার্ডের এক মনো বিজ্ঞানী ড্যান গিলবার্ট বলেছে, নিজস্ব সুখ নিজেকেই সংশ্লেষণ করতে হবে। শরীরে মনস্তাত্ত্বিক একটি ইম্মিউন সিস্টেম রয়েছে যা কিনা তোমার পারিপার্শ্বিকতা বা তোমার বিশ্বকেই জানতে ও বুঝতে সাহায্য করার মাধ্যমে তোমাকে সুখী করে তুলবে। নতুন নতুন কাপড়-চোপড় ক্রয় করা কিংবা 'লটারির অগাধ টাকা' অর্জনে তোমার জীবনের সব দুঃখ দূর করে অনাবিল আনন্দ ও সুখ বয়ে আনবে, এই ধরনের কল্পনা মানুষের চিন্তা শক্তিকে ভুল পথে পরিচালিত করে। 'মিশিগানের হোপ' কলেজের এক সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর ডেভিড মায়ারেরই উক্তিমতে, জেনেটিক বা বংশানুগতি সম্বন্ধীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে- যে যাই বলে থাকুক না কেন, মানুষের সুখ অনেকাংশেই 'নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অনুভূতি'।এ 'সুখ' অনেকটা মানুষের কোলেস্টেরল লেভেলের মতো, যা জেনেটিক্যালি প্রভাবান্বিত, আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেন মানুষের আচার-আচরণ বা লাইফ স্টাইল ও খাদ্যাভ্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জানা দরকার,
সুখের বিপরীত শব্দটা হলো অসুখ। যে সুখী নয় সে সুস্থও নয়। অসুখ হতে পারে শারীরিক বা মানসিক। শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও মানুষের জীবনে 'সুখ' থাকে না। তবুও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমেই- শারীরিক অসুস্থতা বহুলাংশেই সারানো যায়। কিন্তু মানুষ যদি মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, তখন জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। কারণ, মানসিক রোগ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রোগ। সুতরাং সুখকে মাঝে মাঝেই এক ধরনের স্বার্থিক উদ্দেশ্য মনে করা হয়। মানুষের কী আছে- তার ওপর সুখ নির্ভর করে না। মানুষ কী ভাবে তার ওপর সম্পূর্ণ ভাবে যেন সুখ নির্ভর করে। এককথায় যদি বলা হয় তাহলে, যার যা আছে এবং যে অবস্থায় আছে, তার জন্যেই মানুষকে শোকরিয়া জানিয়ে যদি দিন শুরু করা হয়- তাতে সুখ আসবে। মানুষ যখন যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করেই- তার ভবিষ্যতের সুখ আসতে পারে। সুতরাং কাজ-কর্ম ও চিন্তা ধারায় পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নিয়ে জীবনটা শুরু করলে সুফল আসবে এবং সুখী হবে। আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, জ্ঞানী-গুণী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান এবং সৎ মানুষ সাধারণত সব সময় সুখী হয়। যারা শুধু নিতে চায়, দিতে জানে না বা চায় না, তারা সুখী হয় না।

মহান সৃষ্টি কর্তার ওপর যার বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, এই বস্তু জগতে তিনিই তত সুখী। 'সুস্থ, সুন্দর এবং সুখী' জীবনযাপনের জন্যেই প্রকৃতিতে হাজারও নিয়ামত রয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গত উন্নয়নের ফলে বা বিশ্বাস প্রক্রিয়ার প্রভাবেই যেন 'প্রাকৃতিক জীবন' থেকে সরে এসে কৃত্রিম, অসুস্থ, ক্ষতিকর বা অসুখী জীবনধারণের প্রতিই ঝুঁকে পড়ছে মানুষ। প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে যেন বিশ্বজুড়েই লাখো-কোটি মানুষের শরীর, মন কিংবা আত্মার ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করার মাধ্যমেই- মানুষরা অতি সহজে সুস্থ, সুন্দর ও সুখী জীবনের অধিকারী হতে পারে। জানা যায় যে পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ধনীর মধ্যে অন্যতম হল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ারেন বাফেট। তাঁর কাজ-কর্ম, টাকা-পয়সা, সুখ-শান্তি বা জীবনদর্শনের অনেক গল্প প্রচলিত থাকলেও কিছুটা জানি কিছুটা জানি না। 'ওয়ারেন বাফেট' কোনো সময়ে ব্যক্তিগত বিমানে চড়েনি। তিনিই বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মালিকানার একটি জেট কোম্পানির মালিক। তিনি পঞ্চাশ বছর আগে কেনা ৩ কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়িতেই বসবাস করে। আর তিনি সেই বাসায় অনলাইন ব্রিজ খেলে অপরিসীম 'আনন্দ লাভ ও সুখ' ভোগ করে থাকেন। অবিশ্বাস্য শোনালেও এমন কথা গুলো সত্যি কিংবা অনুপ্রেরণাদায়ক। সারা বিশ্বের বিশাল ধন সম্পদের মালিক পরম সুখী ওয়ারেন বাফেট মনে করেন, ধন-দৌলত নয়, মনের সুখই আসল সুখ কিংবা অন্যকে সুখী করবার মধ্যেও "প্রকৃত সুখ" রয়েছে।


লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

অন্তরঙ্গ আলোকে: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১৬ ১১:৪৪:০৯

গণের মানুষ, মনের মানুষ, ঘরের মানুষ বাঙালী জাতির হাজার বছরের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।  উনার অন্তরঙ্গ আলোকে আলোকিত হয়েছি আমি মহা ভাগ্যবান অথচ কেহ নহি, মোট চার বার।

প্রথম বার - আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচীব এনায়েত করিম যখন ইন্তেকাল করেন ঢাকার  পি.জি. হাসপাতালে ১৯৭৪ সালের ২৪শে ফেব্রূয়ারি অতি ভোর বেলায়। মৃত্যু সংবাদে উনি চলে এসেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, "লোকটাকে আমিই মেরে ফেললাম। কেন উনাকে অর্ডার দিলাম না, আপনি আমেরিকাতেই থাকেন, এম্বাসেডর থাকেন বা জাতিসংঘে যান।" প্রেক্ষাপট হল, আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসের সর্বউর্ধতন বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে করিম ডিফেকশনের মাধ্যমে নিজ বাসভবনে বাংলাদেশ মিশন খোলেন এবং স্বাধীন  বাংলাদেশের লক্ষ্যে কাজ করা কালীন দুটি হৃদরোগ আক্রমণের শিকার হন। সর্বজন বিদিত যে তৃতীয় হৃদরোগ আক্রমণের হাত থেকে প্রাণ ফিরে পাওয়া দুষ্কর। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা তাঁকে পরোক্ষে দিয়েছিল এরূপ - তুমি এখানে বসে বাংলাদেশের জন্য কাজ করছো, দেশে তোমার বাবা মা ভাই বোনেরা নেই? কঠিন পরিশ্রম, তার উপরে এই মানসিক চাপ তাকে দুটি হার্ট এটাক দেয়। ডিসেম্বর আনুমানিক ১৪ তারিখে আলবদর বাহিনী তার বাবাকে উত্তোলন করতে গিয়েছিল। 

দ্বিতীয়বার - গুলশান এক নম্বর মার্কেটের ঠিক পেছন দিকে এনায়েত করিমের একতলা বাসভবনে যখন তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় একই মৃত্যুদিবসের সকালে। করিমের সুপরিসর ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং রুমের ড্রয়িং অংশের মাঝ বরাবর তাঁর মরদেহ রাখা হয়। যথা সময়ে প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান সেখানে আসেন ও মরদেহের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেন খানিকক্ষন। অনুমান হয় জাতির পিতার মনে তখন হয়তোবা এনায়েত করিমের সাথে তাঁর সুদীর্ঘ দিনের পরিচয়ের স্মৃতিগুলো সিনেমার দৃশ্যের মত একের পর এক খেলে যাচ্ছিল। সেই ১৯৫১-৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় উভয়ের একত্রে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবরণ, আটক অন্যান্য ভাষা সৈনিকদের সাথে। একজন ছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ ইয়াহিয়া যার কবর পাথরে খোদিত, "এখানে শায়িত ভাষাসৈনিক ......."।  করিমের বাসভবনে তখন ছিলেন করিমের পিতা এডভোকেট মোঃ ইয়াসিন। উনি বলছেন বঙ্গবন্ধুকে, "আপনারা দুইজন তখন জেলখানায়, জেলগেটের সামনে আপনার বাবা (শেখ লুৎফুর রহমান) আর আমি টিফিন ক্যারিয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম।"  সামনে করিমের দ্বিতীয় কন্যা শাহলা ও আমি দাঁড়ানো ছিলাম, জাতির পিতা শাহলার মাথায় একটা হাত রাখেন, কিন্তু তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, সেভাবেই বললেন, "কোনো চিন্তা নাই, আমি আছি।"  বঙ্গবন্ধু আনুমানিক তিরিশ মিনিট ছিলেন। মরহুম করিমের পত্নী হোসনে আরা করিম সেখানে ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে এক বৎসর পরিচালক, ওয়াশিংটন ডি.সি.তে পাঁচ বছর ভিসা ও পলিটিক্যাল কাউন্সেলর, অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ বছর অনুরূপ পরন্তু ডেপুটি হাই কমিশনার ও সর্বশেষ, মন্ত্রণালয়ে দুই বৎসর ডাইরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ত্ব পালন করেন। উনার দফতর ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নেপাল ও ভুটান সহ। বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরার মধ্যে এই সময়ে কোন বাক্য বিনিময় হয়নি।

তৃতীয়বার - সেদিনই রাত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আবার আসেন। আমি তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। গৃহের একমাত্র ইয়ং ম্যান হিসেবে আমি প্রধান মন্ত্রীর আসন্ন আগমন সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় বিশেষত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে সজাগ দায়িত্ত্ব পালনে তৎপর হয়েছিলাম। পোর্টিকোর সামনের বারান্দায় সারিবদ্ধ ভাবে দন্ডায়মান ছিলেন হোসনে আরা করিমের ছয় কনিষ্ঠ ভগিনীদের স্বামীগন - এনিম্যাল হাসবেনড্রির ডেপুটি পরিচালক আবুল ফয়েজ, পরিকল্পনার ডেপুটি সেক্রেটারি হায়দার আলী, তথ্য ও বেতারের ডেপুটি ডাইরেক্টর আসিফ আলী, লিভার ব্রাদার্সের ক্রেতাপ্রধান আজিজুর রহমান, ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম, ও সর্বশেষ টেলিফোন ও তার যোগাযোগের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। উনাদের পিছনে গৃহে প্রবেশের প্রধান দরজা, ডাইনে ডাইনিং স্পেসের দরজা বন্ধ, বামে আমার ঘরের দরজা বন্ধ। পাকের ঘরের সামনে বাইরে বাহিরিবার দরজা তালাবন্ধ, সর্বপিছনের বারান্দার দরজা তালাবন্ধ, গৃহের ডানদিকে হলওয়ের দরজা তালাবন্ধ। ইতিমধ্যে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি বন্দুক হাতে কয়েকজন সেনা প্রহরী দালানের চারিদিকে অবস্থান নিয়েছেন। বুঝলাম প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি এখনই ঢুকবে। পোর্টিকোতে দেখলাম বঙ্গবন্ধুর গাড়ি দাঁড়ানো, উনি তখনো সমাসীন, পোর্টিকোর বারান্দায় ছয় ভদ্রলোক পিছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি সেখানে গেলে তিনচারজন বলে উঠলেন, "ওই তো ঝন্টু এসেছে!" যেন প্রধানমন্ত্রীকে গাড়ি থেকে নামানো আমারই দায়িত্ত্ব। ড্রাইভ ওয়েতে ঢুকে গাড়ির মুখ সামনে, বন্ধ মেইন গেটের সামনে ও পিছনে দুজন করে বন্দুক হাতে দাঁড়ানো। বাঁ হাতে গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল ধরে ডান হাত জানালা দিয়ে ঢোকানো মাত্র বঙ্গবন্ধু উনার বিশাল থাবা দিয়ে আমার ডান হাত খপ করে ধরেছেন, "দেখি এখন ক্যামনে নামান!", "এটা কোন ব্যাপার না!" বলে আমি উনার ডান হাত আমার বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে গাড়ির দরজা খুললাম, উনার ডান হাত আবার আমার ডান হাতে নিয়ে বাঁ হাতে গাড়ির দরজা সম্পূর্ণ খুলে ধরলাম। ততক্ষনে উচ্চস্বরে উনার "হা-হা" হাসি শুরু হয়ে গিয়েছে, "শাবাশ!" বলে সেভাবেই হাসতে হাসতে আমর ডান কাঁধে হাত দিয়ে কার যেন খুলে দেওয়া দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। "কি নাম তোমার?", "ঝন্টু", "ঝন্টু!?, এইটা আবার একটা নাম হইলো?" উনার ছাদ ফাটানো সে-কি বিরাট অট্টহাস্য, থামতেই চায় না। এই সময় হোসনে আরা অনুচ্চ স্বরে উনাকে কিছু বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু মাথা সামান্য ঝুকিয়ে সেটা শুনলেন। আমি উনার অটোগ্রাফ কোথায় নেবো তাড়াতাড়িতে আমার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান দেহরক্ষী আমার গমনপথের দিকে সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আমি তাড়াতাড়িতে আমার গীতবিতান নিয়ে উনার সামনে মলাট উল্টিয়ে ধরলাম, উনি লিখে দিলেন, "ঝন্টুকে শুভেচ্ছা সহ"।  
 
বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত দিয়ে ঘরে ঢোকার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখি সেখানে আরো রয়েছেন ফরেন মিনিস্টার ডঃ কামাল হোসেন, ডেপুটি ফরেন সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন আহমেদ, পশ্চিম ইউরোপের ডি.জি. নবাব পরিবারের খড়গনাসা কায়সার মোর্শেদ, পূর্ব ইউরোপ সংক্রান্ত ডি.জি. রেজাউল করিম এবং পশ্চিম আফ্রিকা সংক্রান্ত ডি.জি. শামসুল আলম। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার বিষয়ে হোসনে আরার কথা শেষ হতেই সামনে এগিয়ে এসে ডি.জি. শামসুল আলম আমার দিকে খানিক ইশারা করে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, "স্যার উনি ফরেন অফিস জয়েন করবেন।" প্রধান মন্ত্রী আমাকে বললেন, "খালি জয়েন করলেই হইবো! করিমের মত ন্যাশনালিস্ট হইতে পারবা? এর পরে ডাইনিং স্পেসে ডাইনিং টেবিলে বসে বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরা মাথা নামিয়ে কিছু আলোচনা করলেন। সেখানে আলোচনা হয় হোসনে আরা এক বৎসর পরিচালক হিসেবে কাজ করে ওয়াশিংটন ডি.সি. যাবেন ও আমি দুই-তিন মাস পর ফাইনাল ইয়ার শেষ করে প্রারম্ভিক "সেকশন অফিসার" হিসেবে যোগ দিতে পারবো। বঙ্গবন্ধু সহ বাকি সকলের প্রস্থানের পর ফখরুদ্দিন আহমেদ আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বললেন এনায়েত করিমের কালো ফ্যালকন ৫০০ হোসনে আরা ব্যবহার করতে থাকবেন। পরের দিন সকালে দেখি পোর্টিকোর নিচে গাড়িটা দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধুর ডান হাত বিবেচিত এনায়েত করিমের ৩১ নম্বর রাস্তায় তৎকালীন দোতলা বাড়ি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ভবনের ঠিক পেছনে, কমন বাউন্ডারি দেয়াল। করিমকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "রিটায়ার করার পর আমরা বাউন্ডারি ওয়ালে একটা দরজা বানাবো, একদিন আমার উঠানে আর একদিন আপনার উঠানে বসে আমরা চা খাবো আর দাবা খেলব।" হায় কি হল! ১৯৭৪-এ ইন্তেকাল করলেন এনায়েত করিম, ১৯৭৫-এ বিপথগামী কিছু সেনা অফিসার নৃশংস ভাবে হত্যা করলো জাতির পিতা সহ উনার পুরো পরিবার। দুই বোন বিদেশে থাকার কারণে নিস্তার পেয়ে যান। সদ্য সমাপ্ত করিমের দুইতলার ছাদে আমি খেলতাম, উল্টোদিকের ছাদে দেখতাম আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানা ও ভাই শেখ কামাল ক্রীড়ারত।       

চতুর্থ বার - ১৯৭৪-এর মাঝামাঝি এক সরকারি ছুটির রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেলে হোসনা আরা আমাকে বললেন, "ঝন্টু শিগগির রেডি হও, আমরা প্রধান মন্ত্রীর বাসায় যামু।" করিমের অফিশিয়াল কালো ফ্যালকন উনি কয়েকদিন মাত্র ব্যবহার করে ফেরত দিয়ে দেন ও পারিবারিক প্রায় নতুন সাদা চার দরজা মাজদা ১৬০০ ব্যবহার শুরু করেন। গাড়িটা বেশ ভারী ছিল। উনি চালাচ্ছেন, আমি পাশে বসা। গাড়িটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভিতরে পার্ক করে পেছনে হেঁটে পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকে আলাদা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় আমরা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে উঠলাম। পেছন দিকে ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিল, তার সামনে ট্রিপল সোফায় বঙ্গবন্ধু বসা ছিলেন, উনার পেছনে কাজের ছেলেটা সোফায় ভর দিয়ে তাকিয়ে আছে, মাঝে ছোট সেন্টার টেবিল, উল্টো দিকের ডাবল সোফায় হোসনে আরা বসলেন, আমি সিঙ্গেল সোফাটায় বসলাম। বঙ্গবন্ধুর পরনে সাদা বেশ ঢিলা পাজামা, ততোধিক ঢিলা সাদা পাঞ্জাবির হাতা হাতের কব্জি পেরিয়ে প্রায় আঙুলের মাথা পর্যন্ত। জাতির পিতার ঢুলু ঢুলু চোখ চেহারায় গভীর প্রশান্তির ছাপ, বাংলাদেশকে উনি স্বাধীন করে দিয়েছেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালী জাতিকে উনি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। কাজের ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, "অই মেহমানদের চা দিবি কি দিয়া?", "নানা কেক আছে দিই?" উনি মৃদু মাথা নেড়ে যায় দিলেন। ফ্রট কেক আর চা। হোসনে আরা কিছু নিলেন না, জাতির পিতা চায়ের কাপে দুই-তিন চুমুক দিয়ে সেটা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি ছোট এক পিস্ কেক শেষ করলাম, কাপের চা প্রায় শেষ করলাম, উনি বেশ আমুদে চোখে হালকা অবলোকন করছেন। ছেলেটা টেবিল পরিষ্কার করলো। জাতির পিতা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঝন্টু সাহেব কিছু বলেন।", "কি বলবো?" , "এই যেমন প্রথম দিকে কত কত ব্যাংক ডাকাতি হইলো, দুইটা একটা এখনো হয়, সবাই বলে আমি যথেষ্ট কড়া না।"  আমি একটু চিন্তায় পড়লাম, ভাবছি এত কঠিন একটা প্রশ্ন! উনি সামান্য হেসে বললেন, "তোমার যা বলার নির্ভয়ে বলো।" উনি আমাকে পরীক্ষা করছেন। আমি বললাম, "সংবাদ পত্রের খবরে জানা যায় এই ডাকাতিগুলো হয়েছে অনেকাংশে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা আধুনিক পিস্তল ব্যবহার করে। আমার অনুমান হয় প্রথম দিকে এটা যারা করেছিল বা এখনো মাঝে মধ্যে করে তাদের মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা, এই পরিস্থিতি তো চিরদিন থাকবে না, অচিরেই শেষ হবে বলে আমার বিশ্বাস।" উনি শুনতে শুনতে একটু সোজা হয়ে বসেছেন, "ঝন্টু, একটা বাচ্চা ছেলে হইয়াও তুমি যেটা বুঝলা, আমি মানীগুণী মানুষদেরে সেইটা ক্যামনে বুঝাবো?" উনার চেহারা এখন সজাগ, মৃদুহাসি। আমার কূটনৈতিক উত্তরে উনি সন্তুষ্ট। "আর কোন উপদেশ!", "আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণে তেল অনুসন্ধানে প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে। ভারত বলছে এই তেল-গ্যাসে নাকি তাদের ভাগ রয়েছে, আমরা একতরফা ভাবে তেল উত্তোলন করতে পারবো না। আমার কথা হল তারা তাদের অংশে উত্তোলন করে না কেন, কে বাধা দিচ্ছে! আমার মনে হয় সমুদ্র-সীমা বা "maritime law" আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে জ্বালানি দফতরের দায়িত্ত্ব দিলে ভালো হবে। জাতির পিতার কিছুটা  আশ্চর্যান্বিত সহাস্য চেহারা আমার মনে আছে। "আমি তো ইতিমধ্যে ব্যারিস্টার কামালকে এই দায়িত্ত্ব দিবার ডিসিশন নিয়েছি!" হোসনে আরা এই সমস্ত সময়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করেননি, বলার জন্য নিয়ে গিয়েছেন আমাকে। আমরা চলে আসার সময় সিঁড়ির মাথায় একটু ঝুকে আমার মাথায় উনার সুবিশাল উষ্ণ থাবা বসিয়ে সামনে থেকে পিছনে একটু বুলিয়ে দিলেন, "তুমি আবার আসবা।" আমার আর যাওয়া হয়নি।              

বিস্তারিত খবর

অন্তরঙ্গ আলোকে: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১৬ ১১:৪২:৫৪

গণের মানুষ, মনের মানুষ, ঘরের মানুষ বাঙালী জাতির হাজার বছরের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।  উনার অন্তরঙ্গ আলোকে আলোকিত হয়েছি আমি মহা ভাগ্যবান অথচ কেহ নহি, মোট চার বার।

প্রথম বার - আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচীব এনায়েত করিম যখন ইন্তেকাল করেন ঢাকার  পি.জি. হাসপাতালে ১৯৭৪ সালের ২৪শে ফেব্রূয়ারি অতি ভোর বেলায়। মৃত্যু সংবাদে উনি চলে এসেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, "লোকটাকে আমিই মেরে ফেললাম। কেন উনাকে অর্ডার দিলাম না, আপনি আমেরিকাতেই থাকেন, এম্বাসেডর থাকেন বা জাতিসংঘে যান।" প্রেক্ষাপট হল, আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসের সর্বউর্ধতন বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে করিম ডিফেকশনের মাধ্যমে নিজ বাসভবনে বাংলাদেশ মিশন খোলেন এবং স্বাধীন  বাংলাদেশের লক্ষ্যে কাজ করা কালীন দুটি হৃদরোগ আক্রমণের শিকার হন। সর্বজন বিদিত যে তৃতীয় হৃদরোগ আক্রমণের হাত থেকে প্রাণ ফিরে পাওয়া দুষ্কর। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা তাঁকে পরোক্ষে দিয়েছিল এরূপ - তুমি এখানে বসে বাংলাদেশের জন্য কাজ করছো, দেশে তোমার বাবা মা ভাই বোনেরা নেই? কঠিন পরিশ্রম, তার উপরে এই মানসিক চাপ তাকে দুটি হার্ট এটাক দেয়। ডিসেম্বর আনুমানিক ১৪ তারিখে আলবদর বাহিনী তার বাবাকে উত্তোলন করতে গিয়েছিল। 

দ্বিতীয়বার - গুলশান এক নম্বর মার্কেটের ঠিক পেছন দিকে এনায়েত করিমের একতলা বাসভবনে যখন তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় একই মৃত্যুদিবসের সকালে। করিমের সুপরিসর ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং রুমের ড্রয়িং অংশের মাঝ বরাবর তাঁর মরদেহ রাখা হয়। যথা সময়ে প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান সেখানে আসেন ও মরদেহের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেন খানিকক্ষন। অনুমান হয় জাতির পিতার মনে তখন হয়তোবা এনায়েত করিমের সাথে তাঁর সুদীর্ঘ দিনের পরিচয়ের স্মৃতিগুলো সিনেমার দৃশ্যের মত একের পর এক খেলে যাচ্ছিল। সেই ১৯৫১-৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় উভয়ের একত্রে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবরণ, আটক অন্যান্য ভাষা সৈনিকদের সাথে। একজন ছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ ইয়াহিয়া যার কবর পাথরে খোদিত, "এখানে শায়িত ভাষাসৈনিক ......."।  করিমের বাসভবনে তখন ছিলেন করিমের পিতা এডভোকেট মোঃ ইয়াসিন। উনি বলছেন বঙ্গবন্ধুকে, "আপনারা দুইজন তখন জেলখানায়, জেলগেটের সামনে আপনার বাবা (শেখ লুৎফুর রহমান) আর আমি টিফিন ক্যারিয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম।"  সামনে করিমের দ্বিতীয় কন্যা শাহলা ও আমি দাঁড়ানো ছিলাম, জাতির পিতা শাহলার মাথায় একটা হাত রাখেন, কিন্তু তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, সেভাবেই বললেন, "কোনো চিন্তা নাই, আমি আছি।"  বঙ্গবন্ধু আনুমানিক তিরিশ মিনিট ছিলেন। মরহুম করিমের পত্নী হোসনে আরা করিম সেখানে ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে এক বৎসর পরিচালক, ওয়াশিংটন ডি.সি.তে পাঁচ বছর ভিসা ও পলিটিক্যাল কাউন্সেলর, অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ বছর অনুরূপ পরন্তু ডেপুটি হাই কমিশনার ও সর্বশেষ, মন্ত্রণালয়ে দুই বৎসর ডাইরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ত্ব পালন করেন। উনার দফতর ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নেপাল ও ভুটান সহ। বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরার মধ্যে এই সময়ে কোন বাক্য বিনিময় হয়নি।

তৃতীয়বার - সেদিনই রাত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আবার আসেন। আমি তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। গৃহের একমাত্র ইয়ং ম্যান হিসেবে আমি প্রধান মন্ত্রীর আসন্ন আগমন সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় বিশেষত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে সজাগ দায়িত্ত্ব পালনে তৎপর হয়েছিলাম। পোর্টিকোর সামনের বারান্দায় সারিবদ্ধ ভাবে দন্ডায়মান ছিলেন হোসনে আরা করিমের ছয় কনিষ্ঠ ভগিনীদের স্বামীগন - এনিম্যাল হাসবেনড্রির ডেপুটি পরিচালক আবুল ফয়েজ, পরিকল্পনার ডেপুটি সেক্রেটারি হায়দার আলী, তথ্য ও বেতারের ডেপুটি ডাইরেক্টর আসিফ আলী, লিভার ব্রাদার্সের ক্রেতাপ্রধান আজিজুর রহমান, ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম, ও সর্বশেষ টেলিফোন ও তার যোগাযোগের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। উনাদের পিছনে গৃহে প্রবেশের প্রধান দরজা, ডাইনে ডাইনিং স্পেসের দরজা বন্ধ, বামে আমার ঘরের দরজা বন্ধ। পাকের ঘরের সামনে বাইরে বাহিরিবার দরজা তালাবন্ধ, সর্বপিছনের বারান্দার দরজা তালাবন্ধ, গৃহের ডানদিকে হলওয়ের দরজা তালাবন্ধ। ইতিমধ্যে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি বন্দুক হাতে কয়েকজন সেনা প্রহরী দালানের চারিদিকে অবস্থান নিয়েছেন। বুঝলাম প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি এখনই ঢুকবে। পোর্টিকোতে দেখলাম বঙ্গবন্ধুর গাড়ি দাঁড়ানো, উনি তখনো সমাসীন, পোর্টিকোর বারান্দায় ছয় ভদ্রলোক পিছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি সেখানে গেলে তিনচারজন বলে উঠলেন, "ওই তো ঝন্টু এসেছে!" যেন প্রধানমন্ত্রীকে গাড়ি থেকে নামানো আমারই দায়িত্ত্ব। ড্রাইভ ওয়েতে ঢুকে গাড়ির মুখ সামনে, বন্ধ মেইন গেটের সামনে ও পিছনে দুজন করে বন্দুক হাতে দাঁড়ানো। বাঁ হাতে গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল ধরে ডান হাত জানালা দিয়ে ঢোকানো মাত্র বঙ্গবন্ধু উনার বিশাল থাবা দিয়ে আমার ডান হাত খপ করে ধরেছেন, "দেখি এখন ক্যামনে নামান!", "এটা কোন ব্যাপার না!" বলে আমি উনার ডান হাত আমার বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে গাড়ির দরজা খুললাম, উনার ডান হাত আবার আমার ডান হাতে নিয়ে বাঁ হাতে গাড়ির দরজা সম্পূর্ণ খুলে ধরলাম। ততক্ষনে উচ্চস্বরে উনার "হা-হা" হাসি শুরু হয়ে গিয়েছে, "শাবাশ!" বলে সেভাবেই হাসতে হাসতে আমর ডান কাঁধে হাত দিয়ে কার যেন খুলে দেওয়া দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। "কি নাম তোমার?", "ঝন্টু", "ঝন্টু!?, এইটা আবার একটা নাম হইলো?" উনার ছাদ ফাটানো সে-কি বিরাট অট্টহাস্য, থামতেই চায় না। এই সময় হোসনে আরা অনুচ্চ স্বরে উনাকে কিছু বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু মাথা সামান্য ঝুকিয়ে সেটা শুনলেন। আমি উনার অটোগ্রাফ কোথায় নেবো তাড়াতাড়িতে আমার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান দেহরক্ষী আমার গমনপথের দিকে সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আমি তাড়াতাড়িতে আমার গীতবিতান নিয়ে উনার সামনে মলাট উল্টিয়ে ধরলাম, উনি লিখে দিলেন, "ঝন্টুকে শুভেচ্ছা সহ"।  
 
বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত দিয়ে ঘরে ঢোকার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখি সেখানে আরো রয়েছেন ফরেন মিনিস্টার ডঃ কামাল হোসেন, ডেপুটি ফরেন সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন আহমেদ, পশ্চিম ইউরোপের ডি.জি. নবাব পরিবারের খড়গনাসা কায়সার মোর্শেদ, পূর্ব ইউরোপ সংক্রান্ত ডি.জি. রেজাউল করিম এবং পশ্চিম আফ্রিকা সংক্রান্ত ডি.জি. শামসুল আলম। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার বিষয়ে হোসনে আরার কথা শেষ হতেই সামনে এগিয়ে এসে ডি.জি. শামসুল আলম আমার দিকে খানিক ইশারা করে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, "স্যার উনি ফরেন অফিস জয়েন করবেন।" প্রধান মন্ত্রী আমাকে বললেন, "খালি জয়েন করলেই হইবো! করিমের মত ন্যাশনালিস্ট হইতে পারবা? এর পরে ডাইনিং স্পেসে ডাইনিং টেবিলে বসে বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরা মাথা নামিয়ে কিছু আলোচনা করলেন। সেখানে আলোচনা হয় হোসনে আরা এক বৎসর পরিচালক হিসেবে কাজ করে ওয়াশিংটন ডি.সি. যাবেন ও আমি দুই-তিন মাস পর ফাইনাল ইয়ার শেষ করে প্রারম্ভিক "সেকশন অফিসার" হিসেবে যোগ দিতে পারবো। বঙ্গবন্ধু সহ বাকি সকলের প্রস্থানের পর ফখরুদ্দিন আহমেদ আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বললেন এনায়েত করিমের কালো ফ্যালকন ৫০০ হোসনে আরা ব্যবহার করতে থাকবেন। পরের দিন সকালে দেখি পোর্টিকোর নিচে গাড়িটা দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধুর ডান হাত বিবেচিত এনায়েত করিমের ৩১ নম্বর রাস্তায় তৎকালীন দোতলা বাড়ি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ভবনের ঠিক পেছনে, কমন বাউন্ডারি দেয়াল। করিমকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "রিটায়ার করার পর আমরা বাউন্ডারি ওয়ালে একটা দরজা বানাবো, একদিন আমার উঠানে আর একদিন আপনার উঠানে বসে আমরা চা খাবো আর দাবা খেলব।" হায় কি হল! ১৯৭৪-এ ইন্তেকাল করলেন এনায়েত করিম, ১৯৭৫-এ বিপথগামী কিছু সেনা অফিসার নৃশংস ভাবে হত্যা করলো জাতির পিতা সহ উনার পুরো পরিবার। দুই বোন বিদেশে থাকার কারণে নিস্তার পেয়ে যান। সদ্য সমাপ্ত করিমের দুইতলার ছাদে আমি খেলতাম, উল্টোদিকের ছাদে দেখতাম আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানা ও ভাই শেখ কামাল ক্রীড়ারত।       

চতুর্থ বার - ১৯৭৪-এর মাঝামাঝি এক সরকারি ছুটির রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেলে হোসনা আরা আমাকে বললেন, "ঝন্টু শিগগির রেডি হও, আমরা প্রধান মন্ত্রীর বাসায় যামু।" করিমের অফিশিয়াল কালো ফ্যালকন উনি কয়েকদিন মাত্র ব্যবহার করে ফেরত দিয়ে দেন ও পারিবারিক প্রায় নতুন সাদা চার দরজা মাজদা ১৬০০ ব্যবহার শুরু করেন। গাড়িটা বেশ ভারী ছিল। উনি চালাচ্ছেন, আমি পাশে বসা। গাড়িটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভিতরে পার্ক করে পেছনে হেঁটে পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকে আলাদা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় আমরা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে উঠলাম। পেছন দিকে ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিল, তার সামনে ট্রিপল সোফায় বঙ্গবন্ধু বসা ছিলেন, উনার পেছনে কাজের ছেলেটা সোফায় ভর দিয়ে তাকিয়ে আছে, মাঝে ছোট সেন্টার টেবিল, উল্টো দিকের ডাবল সোফায় হোসনে আরা বসলেন, আমি সিঙ্গেল সোফাটায় বসলাম। বঙ্গবন্ধুর পরনে সাদা বেশ ঢিলা পাজামা, ততোধিক ঢিলা সাদা পাঞ্জাবির হাতা হাতের কব্জি পেরিয়ে প্রায় আঙুলের মাথা পর্যন্ত। জাতির পিতার ঢুলু ঢুলু চোখ চেহারায় গভীর প্রশান্তির ছাপ, বাংলাদেশকে উনি স্বাধীন করে দিয়েছেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালী জাতিকে উনি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। কাজের ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, "অই মেহমানদের চা দিবি কি দিয়া?", "নানা কেক আছে দিই?" উনি মৃদু মাথা নেড়ে যায় দিলেন। ফ্রট কেক আর চা। হোসনে আরা কিছু নিলেন না, জাতির পিতা চায়ের কাপে দুই-তিন চুমুক দিয়ে সেটা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি ছোট এক পিস্ কেক শেষ করলাম, কাপের চা প্রায় শেষ করলাম, উনি বেশ আমুদে চোখে হালকা অবলোকন করছেন। ছেলেটা টেবিল পরিষ্কার করলো। জাতির পিতা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঝন্টু সাহেব কিছু বলেন।", "কি বলবো?" , "এই যেমন প্রথম দিকে কত কত ব্যাংক ডাকাতি হইলো, দুইটা একটা এখনো হয়, সবাই বলে আমি যথেষ্ট কড়া না।"  আমি একটু চিন্তায় পড়লাম, ভাবছি এত কঠিন একটা প্রশ্ন! উনি সামান্য হেসে বললেন, "তোমার যা বলার নির্ভয়ে বলো।" উনি আমাকে পরীক্ষা করছেন। আমি বললাম, "সংবাদ পত্রের খবরে জানা যায় এই ডাকাতিগুলো হয়েছে অনেকাংশে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা আধুনিক পিস্তল ব্যবহার করে। আমার অনুমান হয় প্রথম দিকে এটা যারা করেছিল বা এখনো মাঝে মধ্যে করে তাদের মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা, এই পরিস্থিতি তো চিরদিন থাকবে না, অচিরেই শেষ হবে বলে আমার বিশ্বাস।" উনি শুনতে শুনতে একটু সোজা হয়ে বসেছেন, "ঝন্টু, একটা বাচ্চা ছেলে হইয়াও তুমি যেটা বুঝলা, আমি মানীগুণী মানুষদেরে সেইটা ক্যামনে বুঝাবো?" উনার চেহারা এখন সজাগ, মৃদুহাসি। আমার কূটনৈতিক উত্তরে উনি সন্তুষ্ট। "আর কোন উপদেশ!", "আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণে তেল অনুসন্ধানে প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে। ভারত বলছে এই তেল-গ্যাসে নাকি তাদের ভাগ রয়েছে, আমরা একতরফা ভাবে তেল উত্তোলন করতে পারবো না। আমার কথা হল তারা তাদের অংশে উত্তোলন করে না কেন, কে বাধা দিচ্ছে! আমার মনে হয় সমুদ্র-সীমা বা "maritime law" আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে জ্বালানি দফতরের দায়িত্ত্ব দিলে ভালো হবে। জাতির পিতার কিছুটা  আশ্চর্যান্বিত সহাস্য চেহারা আমার মনে আছে। "আমি তো ইতিমধ্যে ব্যারিস্টার কামালকে এই দায়িত্ত্ব দিবার ডিসিশন নিয়েছি!" হোসনে আরা এই সমস্ত সময়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করেননি, বলার জন্য নিয়ে গিয়েছেন আমাকে। আমরা চলে আসার সময় সিঁড়ির মাথায় একটু ঝুকে আমার মাথায় উনার সুবিশাল উষ্ণ থাবা বসিয়ে সামনে থেকে পিছনে একটু বুলিয়ে দিলেন, "তুমি আবার আসবা।" আমার আর যাওয়া হয়নি।              

বিস্তারিত খবর

কাঁটাতারই বুঝাল বন্ধুত্বের আসল পরিচয়!

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১০ ১২:১২:২৭

পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের মনে হলেও আসল চিত্রটা ভিন্ন। নিজ স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদের বিষয়ে বাংলাদেশকে একবিন্দু ছাড় দিতে সব সময়ই নারাজ ভারত। এ জন্যই নতুন করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে, সম্পর্কটা যতই বন্ধুত্বের হোক সীমান্তের সম্পর্কটা ভিন্ন।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে দেশটি সীমান্তের পুরোটাতেই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কঠোর এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। শুধু তাই নয় এবার সরাসরি ভারত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর বিষয়ে বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করেছে। এটার মাধ্যমেই কি তবে ভারত তাদের সাম্প্রতিক এনআরসি ইস্যুতে পুশ ইন নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে?

গত মঙ্গলবার তিন দিনের সফরে ভারতে যান বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সফরকালে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌র সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল উভয় দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোসহ সীমান্তে চোরাচালান, সীমান্তে পাচার, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, জাল মুদ্রা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে আলাপ আলোচনা।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত বাংলাদেশিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে তা ঠেকাতে সীমান্তে বাংলাদেশকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এছাড়া ভারত সীমান্তের পুরোটাতেই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে চায় বলে জানিয়েছে।

ভারতের আনা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জবাবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশি ভারতে যায় না। যারা যায় তারা ভিসার মাধ্যমে যায়। এছাড়া তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘আমাদের দেশ থেকে তোমাদের দেশে বেড়াতে যায়, চিকিৎসা সেবা নিতে যায় বা শিক্ষা সফরে যায়। নেক্সটডোর নেইবার (প্রতিবেশী) তোমরা, সেজন্যই যায়।’

সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘আইন অনুযায়ী করা হলে তাতে বাংলাদেশের আপত্তি করার কিছু নেই। জয়েন্ট বাউন্ডারি অ্যাক্ট অনুযায়ী যেভাবে আগে তারা করেছে সেভাবেই বাকিটা করলে আমাদের অসুবিধা নেই।’

এদিকে অনুপ্রবেশ ইস্যু যৌথ বিবৃতিতে রাখার বিষয়ে ভারত বাংলাদেশকে এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করেছে বলে সফররত বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন, অনুপ্রবেশ ইস্যু যৌথ বিবৃতিতে রাখার ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে একটা চাপ তৈরি করা হয়েছিল। দিল্লীর বৈঠকে এসব আলোচনা হলেও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। দুই দেশ আলাদা আলাদাভাবে বক্তব্য তুলে ধরেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যদিও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি এবার বাংলাদেশ এবং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের আলোচ্য-সূচিতে ছিল না, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের গুরুত্ব দিয়ে তোলা হয়। তবে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতের বক্তব্য গ্রহণ করেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতকে জানিয়েছেন, ‘অনুপ্রবেশের ব্যাপারে তারা যেটা আমাদেরকে বলছেন, যেটা ওনারা বলতে চাচ্ছেন, যে তোমাদের দেশ থেকে তো বহুলোক আসে। আমি সেখানে বলেছি, আমাদের দেশ থেকে এখন আর অবৈধভাবে যায় না। ভিসা নিয়েই যায়। অবৈধভাবে যাওয়ার কোন প্রশ্ন আসে না কারণ আমাদের দেশে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়ে গেছে।’

ভারতের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ২৩ লক্ষ লোক বৈধভাবে গিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘তারাই স্বীকার করলেন, গত বছর নাকি আমাদের ১৪ লক্ষ লোককে তারা ভিসা দিয়েছেন। আর মাল্টিপল ভিসা দেয়া ছিল। সব মিলিয়ে ২৩ লক্ষ বাংলাদেশের নাগরিক গত বছর ভারত গিয়েছিল।’

এছাড়া ভারতের পক্ষ থেকে পশ্চিমবাংলায় সামনের বিধানসভা নির্বাচনের সময় সীমান্তে নজরদারির জন্য বাংলাদেশকে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘ওনারা (ভারত) বলছিলেন যে, পশ্চিমবাংলায় ইলেকশন হবে, সেই সময় বর্ডারটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমি বলেছি, বর্ডার আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’

এদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করছে, তাদের দেশে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তারা এও দাবি করেছে, ১৯৭১ সালে বহু বাঙালি পূর্ব পাকিস্তানে নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই সময় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ্‌ ভারতে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত ও বহুবার দিয়েছেন। এছাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে ভারতে ভোটের প্রচারে নেমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তার সরকার অবৈধ বাংলাদেশিদের লোটাকম্বল নিয়ে ফেরত পাঠাবে।

মূলত ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর অমানবিক নির্যাতন বেড়েছে। গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের নির্যাতন হত্যার মতো চিত্র বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া মুসলিমদের জোড়পূর্বক ‘জয় শ্রীরাম’ বলার চিত্রও সাম্প্রতিক আলোচনায় আসে। জয় শ্রীরাম বলে মুসলিম হত্যার ঘটনাও ঘটে ভারতে।    


গত সেপ্টেম্বরে অবৈধ অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলে সম্বোধন করে অমিত শাহ্‌ বলেছিলেন, বিজেপি সরকার অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের এক এক করে খুঁজে বের করবে এবং তাদের বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেবে। তবে তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখদের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।  

সম্প্রতি বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত দৈনিক অধিকারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভারতে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন। তারই সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশ থেকে ৩৭ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ গুম হয়েছে বলে দাবি তুলেন।

তার এই দাবি মিথ্যা বলে জানিয়ে রানা দাশগুপ্ত বলেন, প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের কাছে যদি স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের গুম বা নিখোঁজ অর্থে বলে থাকেন তবে তা অসত্য।

তবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর বিষয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের এই নেতা বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের সনাক্তের নির্দেশ দিয়েছে। খুঁজে বের করা শুরু হয়ে গেছে। আসামে ৪০ লক্ষকে খুঁজে পেয়েছে। তার মধ্যে ১৭ লক্ষ মুসলিম এবং ২৩ লক্ষ হিন্দু সম্প্রদায়ের।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৪৭ সালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ছিল ৯৮ দশমিক ৪ ভাগ আজকে সেটা নেমে এসেছে ৪৮ থেকে ৪৯ ভাগে।

বাকিগুলো গেল কই বলে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ভারতে এখন যে জনগণনা হচ্ছে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে, এর মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে অনুপ্রবেশকারী কারা?

সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত বলে বিজেপি সরকার যে ঘোষণা দিয়েছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা অনুপ্রবেশকারীদের ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন টানছেন। আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করছি।

তিনি আরও বলেন, গত নির্বাচনে তারা বলেছেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত যারা গেছে তাদেরকে তারা শরণার্থী মর্যাদা দিয়ে নাগরিকত্ব দেবে। আমরা বলতে চাই যদি তারা এমনটি করে তবে বাংলাদেশে একটি সংখ্যালঘুও থাকবে না।

সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করার বিপক্ষে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান পরিষদের অবস্থান বলেও জানান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক। 


সীমান্ত হত্যায় চুপ ভারত

সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের গুলিতে প্রতিবছর নিরীহ বাংলাদেশি মারা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ থাকলেও কমেনি সীমান্ত হত্যা। মূলত বাণিজ্যিক খাতিরে সীমান্তের এপার ওপারের (ভারত-বাংলাদেশ) বসবাসকারীদের যাতায়াত রয়েছে। তবে সেটা শুধুমাত্রই আসা যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এক্ষেত্রে দুই দেশের মানুষের আসা যাওয়া থাকলেও বাংলাদেশিরাই ভারতের সীমান্তরক্ষীদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে সীমান্তে গরু চোরাকারবারি বলে বাংলাদেশি হত্যা যেন প্রতিনিয়তই দেখা যায়। কিন্তু মাদক চোরাকারবারির ক্ষেত্রে এ চিত্র আবার নেই বললেই চলে।

গত একদশকে সীমান্তে ২৯৪ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। সংসদে দাঁড়িয়ে এ তথ্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল৷

জাতীয় সংসদে পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছিলেন ৬৬ জন। এরপর ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ সালে ২৪, ২০১২ সালে ২৪, ২০১৩ সালে ১৮, ২০১৪ সালে ২৪, ২০১৫ সালে ৩৮, ২০১৬ সালে ২৫, ২০১৭ সালে ১৭ ও ২০১৮ সালে তিনজন নিহত হয়েছেন৷ (সূত্র: বণিক বার্তা, ১২ জুলাই ২০১৯)

গত বছরের চেয়ে এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ আরও বেড়েছে৷ যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসেনি৷ প্রথম পাঁচ মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১৫৷

গত ১৫ জুন ঢাকার পিলখানা সদর দপ্তরে বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে তিনদিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়৷ বিএসএফের মহাপরিচালক রজনীকান্ত মিশ্র জানান, ‘হত্যাকাণ্ড’ শব্দের বদলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’ বলতে চান তিনি৷ তবে স্বীকার করেন, তার ভাষায় ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’র সংখ্যা বেড়েছে৷

ওইদিন রজনীকান্ত আরও জানান, ‘এ কারণে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত রয়েছে৷ বিএসএফকে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে৷ তবে পরিস্থিতি মাঝে মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়৷ কোনো বিকল্প না থাকায় প্রাণে বাঁচতে অল্প কিছু ঘটনায় বিএসএফ মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।’

যদিও ফেলানী হত্যাকাণ্ড আর মেহেরপুরে আম পাড়তে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত কিশোর হত্যার বিচার হয়েছে কিনা- তার উত্তর থাকে না বিএসএফ মহাপরিচালকের কাছে৷ তারা শুধু বন্ধু রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই দেখে৷  


বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা শুধু মাত্রই স্বার্থের। ভারত সব সময়ই তাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আর এটাই মূলত তাদের বন্ধুত্বের অস্ত্র।

তারা আরও মনে করেন, বাংলাদেশের ওপর ভারত সব সময়ই নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। যেটা বাংলাদেশের মানুষ মেনে নিতে পারছে না। আর কোনো স্বাধীন দেশের নাগরিকই নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যের কর্তৃত্ব মেনে নেবে না।             

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুখসানা কিবরিয়া মনে করেন, সীমান্তে মানুষ হত্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে ঢেকে দেয়ার জন্যই ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়কে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এনেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. জমির বলেন, ভারত কখনোই চায় না যে বাংলাদেশ তার কোণায় বসে এমন একটি অস্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছুক যেটি ভারতকেও প্রভাবিত করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে অনেকেই মনে করেন, গত নয় বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের স্বার্থকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছে, বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে ততটা মূল্যায়ন করেনি।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, দুই দেশের সরকারের মধ্যে ভালো সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণ সেটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কোনো স্বাধীন দেশের মানুষই তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য একটি দেশের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। দুটা স্তরে সম্পর্কটা তৈরি হয়। একটা হচ্ছে, সরকার এবং সরকার এবং অপরটি হচ্ছে জনগণের এবং জনগণের মধ্যে। সম্পর্ক যদি টেকসই হতে হয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং বিশ্বাসযোগ্য হতে হয় তাহলে দুই দেশের মানুষকে মনে করতে হবে যে এ সম্পর্কে আমি লাভবান হচ্ছি।’

জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের সভাপতি মাসুদ খান দৈনিক অধিকারকে বলেন, অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা বিজেপি সরকারের সেটা থেকে মূলত তারা কখনোই পিছপা হবে না। এটা তারা বার বারই বলছে। কাশ্মীর ইস্যুতে সেটা স্পষ্ট। কাজেই ভারত তার পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভূটান, নেপালে নিজেদের ডমিনেশনকেই এগিয়ে নিতে চায়। আর এটাই তাদের মূল বন্ধুত্বের অস্ত্র।

বিস্তারিত খবর

দুসরা ঈদ: আত্মত্যাগের কোরবানি উৎসব

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-০৫ ১১:৫৩:২৪

 'ঈদ' আরবি শব্দ। আসলে এর অর্থটাই হচ্ছে ফিরে আসা। এই ফিরে আসা'কে ঈদ বলা হয় এ কারণে যে, মানুষ বারংবার একত্রিত হয়ে সাধ্য মতো যার যা- উপার্জন তা অনেক খুশিতে আল্লাহ্ পাকের দরবরে সোয়াব এর আশায় আনন্দ উৎসব করে। বলা যায়, সোয়াবের পাশা পাশি একে অপরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ দূর হয়। সুতরাং ঈদকে দ্বারাই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে নিয়ামাত কিংবা অনুগ্রহে ধন্য করে থাকে। বারংবারই তাঁর ইহসানের নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে। আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিই ভালোবাসা লাভের উদ্দেশ্যে কিছু বিসর্জন দেয়াকে কোরবানী বলা যেতে পাবে। সুতরাং আর্থিক ভাবেই সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপরেই কোরবানির হুকুম পালন ওয়াজিব হয়েছে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্তে কেউ যদি কোরবানির মতো ইবাদত থেকে বিরত থাকে কিংবা কোরবানি না দেয়। তাহলে সেই ব্যক্তি অবশ্যই যেন গুনাহগার হবে। আল্লাহর হুকুমের আনুগত্যের মধ্যে কোরবানি একটি বিশেষ আমল। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মহান আল্লাহ পাক মুসলিম উম্মাদের জন্য যেন 'নিয়ামাত' হিসেবেই ঈদ দান করেছে। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় যখন আগমন করে ছিল তখন মদিনা বাসীদের ২টি দিবস ছিল, সে দিবসে তারা শুধুই খেলাধুলা করত।’ আনাস রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সঙ্গে প্রশ্ন করে ছিল এমন দুই দিনের তাৎপর্যটা কী? মদিনা বাসীগণ উত্তর দিলেন : আমরা জাহেলী যুগে এই দুই দিনে খেলা ধুলা করে কাটাতাম। তখন তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ রাববুল আলামিন এই দু'দিনের পরিবর্তেই তোমাদেরকে এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ দু’টো দিন দিয়েছেন। তাহচ্ছে মুসলিম উম্মার 'ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’

সুতরাং শুধু খেলা-ধুলা বা আমোদ-ফুর্তির জন্যই যে দু'দিন ছিল তাকে পরিবর্তন করেই সৃষ্টিকর্তা এইদুটি ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের ঈদের দিনকেই দান করে ছিল। সমগ্র উম্মতগণ যেন ঈদের দিনেই মহান আল্লাহর শুকরিয়া, জিকির এবং তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনার সহিত শালীনতায় আমোদ-ফুর্তি ও নিজস্ব সাজ-সজ্জা কিংবা খাওয়া-দাওয়ার ব্যপারেও সবাই সংযম হতে পারে। এমন কথা গুলো বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ পুস্তকে ইবনে জারীর রাদি আল্লাহু আনহুর অনেক বর্ণনায় উঠে এসেছে। জানা দরকার, দ্বিতীয় হিজরিতে প্রথম ঈদ করে ছিল 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।' তাই ইসলাম ধর্মে 'বড় দুইটি' ধর্মীয় উৎসবের দিনের মধ্যে একটি ঈদ হচ্ছে- ঈদুল আযহা। এইদেশে এমন উৎসবটিকে আবার অনেক মানুষরা কুরবানির ঈদ বলেও সম্বোধন করে। 'ঈদুল আযহা' মূলত 'আরবী বাক্যাংশ'। এর অর্থটা দাঁঁড়ায় 'ত্যাগের উৎসব।' এরই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টা হচ্ছে 'ত্যাগ করা'। এ দিনটিতে মুসলমান তাদের সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, গরু, দুম্বা, ছাগল কোরবানি কিংবা জবাই দিয়ে থাকে। ঈদুল আজহার দিন যেন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায় করে। তার পরে কুরবানি দিয়েই গোশত খায়। এটাই সুন্নাত এবং বিশ্ব নবী তাই করে ছিল। "বুরাইদা রাদি আল্লাহু আনহু" হেকে বর্ণিত রয়েছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে ঈদগাহে যেতো না। আবার ঈদুল আযহা'র দিন তিনি ঈদের সালাতের পূর্বেও খেতেন না। এমন "তাকওয়ার সহিত 'কোরবানি' আদায় করা দরকার। আবার এও জানা যায় যে, 'কোরবানী দেওয়া পশুর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা যেন সেই কোরবানি কবুল করে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে।

এখন এ ঈদ আনন্দের বাস্তবতার দিকে আসা যাক। 'ঈদ' শব্দটিকে যখন মানুষ প্রথম বুঝতে শিখে তখন তাঁদের শিশু কাল থাকে এবং সেসময় তারা বড়দের উৎসাহে ১ম ঈদের আনন্দকে উপভোগ করে। তারা সারা রাত না ঘুমিয়ে খুব ভোরে নতুন সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করে। তারপর ঈদের নামাজের জন্যই আতোর, সুরমা এবং নতুন নতুন জামা কাপড় পরে বাবা ভাইদের নিয়ে পাড়া- প্রতিবেশীদের সঙ্গেই যেন তারা প্রিয় ঈদগাহে যেত। তবে ঈদগাহে যে পরিবেশ হয়ে উঠে সেটিই মুলত ঈদের খুশি। ঈদগাহের মাঠে পায়ে হেঁটে যাওয়া বা আসার মজাই আলাদা। জানা যায়, 'আলী রাদি আল্লাহু আনহুর' বর্ণনা মতে সুন্নাত হলো ঈদগাহে- পায়ে হেঁটেই যাতাযাত করা। সুতরাং, উভয় পথের লোকদেরকে সালাম দেয়া এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করাও ভালো হয়। উদাহরণ স্বরূপ নবীকারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে এক পথে গিয়ে আবার অন্য পথেই ফিরেছে। "ঈদুল আযহার" তাৎপর্য হলো ইসলাম ধর্মের নানা বর্ননায় যা পাওয়া যায় তা হলো এই, মহান 'আল্লাহ তায়ালা' ইসলাম ধর্মেরই এক নবী 'হযরত ইব্রাহীম (আঃ)'কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকেই আল্লাহ তায়ালাকে খুশির উদ্দেশ্যেই কুরবানির নির্দেশ দিয়ে ছিল। সেই আদেশেই 'হযরত ইব্রাহিম(আঃ)' তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করার জন্যেই যেন প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্তা তাঁকে তা করতে বাধা দিয়ে ছিল। সেখানেই নিজ পুত্রের পরিবর্তেই একটি পশু কুরবানি হয়েছিল এবং তা হয়েছিল সৃষ্টিকর্তার নির্দেশেই। এ ঘটনাকে স্মরণ করেই বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা মহান আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্ঠি অর্জনে প্রতি বছর ঈদুল আযহা দিবসটি পালন হয়ে আসে। হিজরির বর্ষ পঞ্জির হিসাবেই জিলহজ্জ্ব মাসের দশ তারিখ থেকেই শুরু করে বারো তারিখ পর্যন্ত ৩ দিন ধরেই যেন ঈদুল আযহা চলে। হিজরি চান্দ্র বছরের গণনা অণুযায়ী “ঈদুল ফিতর” এবং ঈদুল আযহার মাঝে দু'মাস ১০ দিনের ব্যবধানেই হয়ে থাকে। আর দিন হিসেবেই তা সবোর্চ্চ ৭০ দিনও হতে পারে।

জানা দরকার ঈদুল আযহার দিন থেকেই শুরু করে যেন পরবর্তী দু'দিন পশু কুরবানির জন্যেই নির্ধারিত থাকে। বাংলাদেশের মুসলমানেরা সাধারণত গরু বা খাসী "কুরবানি" দিয়ে থাকে। এক ব্যক্তি একটি মাত্র গরু, মহিষ কিংবা খাসি কুরবানি করতে পারে। তবে গরু এবং মহিষের ক্ষেত্রেই সর্বোচ্য ৭ ভাগে কুরবানি করা যায় অর্থাৎ দুই, তিন, পাঁচ বা সাত ব্যক্তি একটি গরু, মহিষ কুরবানিতে শরিক হলে ক্ষতি নেই। তাই এ দেশে সাধারণত কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করেই- ১ ভাগ গরিব-দুঃস্থদের মধ্যে ১ ভাগ আত্মীয় -স্বজনদের মধ্যে এবং এক ভাগ নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখা উচিত, তবে ইসলামের আলোকেই জানা যায়, এই ঈদের মাংশ বিতরনের জন্য কোন প্রকার সুস্পষ্ট হুকুম নির্ধারিত নেই। এমন কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থগুলো দান করে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। কোনো মুসাফির অথবা ভ্রমণকারির ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। আবার ঈদুল আযহার ঈদের নামাজের আগেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পশু কুরবানি সঠিক হয় না। জানা যায়, এমন কুরবানির প্রাণী খাসী বা ছাগলের বয়স কমপক্ষে ১ বছর ও ২ বছর বয়স হতে হয় গরু কিংবা মহিষের বয়স। নিজ হাতে কুরবানি করাটাই উত্তম। এই কুরবানি প্রাণীটি দক্ষিণ দিকে রেখে কিবলা মুখী করে খুবই ধারালো অস্ত্র দ্বারা অনেক স্বযত্নে মুখে উচ্চারিত ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করাটা ইসলাম ধর্মের বিধান। সুতরাং এই 'ঈদ' আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। সবাই সবার প্রতি 'ভালোবাসা ও আনন্দ' নিয়ে একসঙ্গেই কাজী নজরুল ইসলামের ঈদুল আযহার গান অন্তরে ধ্বনিত করি:- "ঈদুল আযহার চাঁদ হাসে ঐ, এলো আবার দুসরা ঈদ, কোরবানি দে কোরবানি দে, শোন খোদার ফরমান তাকিদ।
এমনি দিনে কোরবানি দেন, পুত্রে হযরত ইব্রাহিম।
তেমনি তোরা খোদার রাহে, আয়রে হবি কে শহীদ।।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রভাষক।


বিস্তারিত খবর

‘তোষামোদির স্বাধীনতা’ হলো নতুন প্রেস স্বাধীনতা

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-০৪ ১৬:০৮:০৯

আধুনিক সভ্যতার মৌলিক ভিত্তি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। কমিউনিস্ট ব্লক ও স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীকে রক্ষা করে প্রায় সব দেশই তাদের সংবিধানে মিডিয়ার বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মিডিয়ার স্বাধীনতাকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতার আশ্রয় নেয়া হতো।
সংবাদকর্মীকে জেল দেয়া ছিল বেশ বিরল। আর একটি মিডিয়া আউটলেট বন্ধ করে দেয়ার কথা তো আরো সুদূরে ছিল।
দুঃখের বিষয়, আর না।
পপুলিজম, অতি জাতীয়তাবাদ, স্বৈরতন্ত্রের উত্থান, সত্য-পরবর্তী এবং নেতার উত্থানে- যিনি কোনো অন্যায় করতে পারেন না,  এমন যুগে সংবাদ মাধ্যমে নতুন এক স্বাধীনতার আবির্ভাব ঘটেছে। 
এটা হলো ‘তোষামোদী স্বাধীনতা’- যেখানে প্রেস পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন। কিন্তু তারা শুধু তোষামোদ করে এবং যে প্রেস যত বেশি তোষামোদি করতে পারে, তারা তত বেশি স্বাধীন বলে প্রত্যায়িত হয়।


এর একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি হলো ভুয়া খবর, ষড়যন্ত্র, জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা, উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিরোধিতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিরোধিতা।
‘স্নো হোয়াইট’ নামের রূপকথায় রানীর সুপরিচিত একটি প্রশ্নের জবাবে আয়না উত্তরে বলেছিল, ‘আমার রানী, আপনিই হলেন দেশের সবচেয়ে সুন্দরী’।
আজকের বিশ্বে অধিক থেকে অধিক পরিমাণে সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যাশা করেন মিডিয়া হবে ওই রূপকথার আয়নার মতো, যা শুধুই প্রশংসা গাইবে। এমন আয়না হবে না, যা সমাজের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়।
জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ সালের বিখ্যাত উপন্যাস “ওয়্যার ইজ পিস”, “ফ্রিডম ইজ স্লেভারি” ও “ইগনোরেন্স ইজ স্ট্রেংথ”-এ যেমনটা বলা হয়েছে বিশ্বের ‘তোষামোদির স্বাধীনতা’য় সত্য হলো মিথ্যা, তথ্য (ফ্যাক্ট) হলো অতথ্য (নন-ফ্যাক্ট), ভিন্ন মতাবলম্বীরা বিশৃংখলার বীজ বপন করে, জনগণকে ভুলপথে পরিচালিত করতে সরকারি ভাষ্যের বিরোধিতা করে। বিরোধীদের সুযোগ দেয়া হলো বিভাজনকে বাড়িয়ে তোলা। সৃষ্টিকর্তা না করুন, ক্ষমতার সর্বোচ্চে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি প্রকাশ করা হলো দেশকে ধ্বংস করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

যেহেতু এটা হলো মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, তারা এসবই করে। তাই তারা হলো ‘জনগণের শত্রু’।

একটি নতুন ভ্রান্ত জাতীয়তাবোধের গভীর অনুভূতি এখন ধ্বংস করে দিচ্ছে সহনশীলতা, বহু দৃষ্টিভঙ্গিকে। আর এর ফলে মুক্ত মিডিয়ার অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আকস্মিকভাবে সত্য না বলা, যে সত্য ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘ফ্যাক্টস’কে আহত করে, তার আর তাৎপর্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ডানিয়েল প্যাটিক মইনিহানের বিখ্যাত বিরত থাকা বিষয়ক উক্তি হলো, নিজস্ব মতামতের অধিকারী প্রত্যেকে। কিন্তু তারা নিজস্ব কোনো ফ্যাক্টের অধিকারী নন। বর্তমানে এটাকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে একটি ভিন্ন তত্ত্ব দিয়ে- যদি তথ্য বা ফ্যাক্ট কোনো নির্দিষ্ট বিতর্ককে সমর্থন না করে তাহলে তা অনুসন্ধান করুন। 
গত বেশ কয়েক বছর ধরে, একটি রাজনৈতিক সিস্টেম হিসেবে গণতন্ত্রের ইচ্ছাকৃত অবমূল্যায়ন প্রত্যক্ষ করছি।
এসব হলো ‘ঝঞ্ঝাটপূর্ণ’, ‘বিশৃংখল’, ‘দৃষ্টিভঙ্গি ওইসব মানুষের যারা অনেক জানেন না অথবা যাদের দৃষ্টিভঙ্গি দূরদর্শী নয়’, ‘সময় সাপেক্ষ’ এবং উন্নয়নে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, যা এসব বিষয় সম্পন্ন করে।
সর্বোপরি, নেতা যখন সব জানেন, তখন জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়গুলোকে বিভ্রান্ত করে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে।  এই মানসিকতার মধ্যে জনমত, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় এবং অনেক বেশি প্রশ্ন তোলার জন্য মিডিয়াও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়।
এমন মানসিকতা অনিবার্যভাবে মেগা দুর্নীতিতে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতিতে নেতৃত্ব দেয় এবং হয়ে ওঠে একটি স্বাভাবিক সহচর।
‘তদারকি’ সংস্থা হিসেবে পার্লামেন্টকে প্রত্যাখ্যান করা সাম্প্রতিক সময়ের এক করুণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
অতীতে সরকারগুলো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়া ও তাতে মারাত্মক সমালোচনার ভয়ে পার্লামেন্টে মুখোমুখি হতে ভয়ে থাকতো। ভালভাবে জানা ও ব্যাপক গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আসতো ওইসব প্রশ্ন। প্রশ্ন করতেন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উচ্চ মাত্রায় প্রতিশ্রুতিশীল ও মোটিভেটেড নির্বাচিত নেতাদের পক্ষ থেকে। 
পার্লামেন্টে বিরোধীদের ভূমিকাকে খর্ব করায় জবাবদিহিতায় খাতটিতে আরো বড় মাত্রা যোগ করেছে, যা আমরা সব সময়ই দেখছি।
বিচার বিভাগের অবস্থানও খুব বেশি আলাদা নয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের অধিকার ও সব রকম স্বাধীনতা সুরক্ষার দিকে যায় না। তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সরকারের ইচ্ছার দিকেই বেশি যায়।
দুঃখজনকভাবে, বিচার বিভাগ, আইনসভা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী শাখা, প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) ভেঙ্গে পড়েছে।
সময়ের সাথে সাথে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে ক্ষমতার ভারসাম্য ধাবিত হয়েছে নির্বাহী বিভাগের পক্ষে। যা একনায়কের শাসন, নির্বাচিত ‘একনায়ক’ এবং ‘ডেমিগগস’- যারা নিজেদেরকে উপদেবতা হিসেবে উপস্থাপন করেন- তাদের উত্থানে ভূমিকা রাখে।
সর্বশক্তিসম্পন্ন নির্বাহী বিভাগের উত্থানে- অর্থাৎ সরকারগুলো- সরাসরি ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে প্রেসের ওপর যাতে তারা সরকারের সীমাবদ্ধতার অধীনে থাকে। সংবাদ মাধ্যম সরকারের ‘পর্যবেক্ষক’ বা নজরদারি হয়ে উঠায় এভাবেই মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার ক্ষেত্রে আহত করা হয়।
যখন সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পাচ্ছে তখন বাক স্বাধীনতা খুব কমই রক্ষা পেতে পারে। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হলো ব্যক্তিবিশেষের স্বাধীনতা এবং কথা বলার স্বাধীনতা, যেখানে মুক্ত সংবাদ মাধ্যমকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
এর মধ্য দিয়ে বহু দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ করে ভিন্নমত পোষণকারীদের মুক্তভাবে মত প্রকাশ অনুমোদন করে মুক্ত সংবাদ মাধ্যম জনগণের অসন্তোষ প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে অবাধে।
এসব ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যমে মিডিয়া বহুমাত্রিক চিন্তাকে নিয়ে আসে জনগণের সামনে এবং এর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক গাঁথুনি, যা সমাজকে অনুমোদন করে ওইসব ধারণা বেছে তুলে নিতে, যে ধারণা তাদের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসবে।
ঠিক যেমনভাবে রক্ত আমাদের শরীরে খাঁটি অক্সিজেন সরবরাহ করে সেই অক্সিজেন ছাড়া আমাদের দেহকোষ যেমন মরে যায়, একইভাবে ‘সর্বশেষ তথ্য ও তরতাজা ধারণা’ ছাড়া একটি সমাজ মারা যায়। এসব ধারণা সামনে আসে একটি মুক্ত মিডিয়া ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যেমন একাডেমিয়া, থিংকট্যাংক, নাগরিক সমাজের সংগঠন প্রভৃতি।
একটি মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের টিকে থাকার পূর্বশর্ত হলো কথা বলার স্বাধীনতা এবং চিন্তা করার স্বাধীনতা। 
উগান্ডার সাবেক শক্তিশালী সামরিক নেতা হিসেবে পরিচিত ইদি আমিনের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘কথা বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু বক্তব্য দেয়ার পর আমি স্বাধীনতার গ্যারান্টি দিতে পারি না’। এটাই হলো ‘কথা বলার পরের স্বাধীনতা’ যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
যে পরিমাণ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে, জেল দেয়া হয়েছে, দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, জোরপূর্বক সেলফ সেন্সরশিপে বাধ্য করা হয়েছে- তাতে একটি ভয়াবহ চিত্র অঙ্কিত হয়।
যদিও এটা হলো পুরো ছবির একটি অংশমাত্র। যদি আমরা জানতে পারি যে কতজনের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে তাহলে এটা হতে পারে অনুধাবনমাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক এই ‘মিসিং’ আমাদের সমাজ ও আমাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃতপক্ষেই একটি ক্ষতি।
সবে ডিজিটাল বিপ্লব মিডিয়ার সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটা সরকারের নিয়ন্ত্রণেরও নতুন পথ খুলে দিয়েছে।
অনেক দেশে ডিজিটাল মিডিয়ার অপব্যবহার রোধের প্রেক্ষাপটে সুদূরপ্রসারি আইন আছে। এসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে প্রধানত খবর, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণাকে বিস্তৃত করতে দেয়ার পরিবর্তে তাতে বাধা দেয়ার জন্য। সরকার যেসব ডিজিটাল ও মূলধারার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে ক্রমশ জটিলতার মুখে তাদের দিকে দৃষ্টি রেখে এসব আইন কার্যকর করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এটাকে ‘তোষামোদির স্বাধীনতা’র নতুন যুগের চিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
একেবারে শুরু থেকেই তিনি কেবল ওইসব মিডিয়াকে গ্রহণ করেছেন, যারা তার প্রশংসা করে এবং অন্যদেরকে ‘জনগণের শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেছে, ওইসব মানুষের জন্য ঘৃণাসমৃদ্ধ শব্দ ছাড়া আর কিছু বলেনি এসব মিডিয়া। যদিও তিনি সংবাদ মাধ্যমকে ঘৃণা করা প্রথম কোনো নেতা বা সরকার প্রধান নন, তবু তিনি এই প্রবণতায় সবচেয়ে শক্তিশালী গতি দিয়েছেন অবশ্যই। 
বিশ্বের বিভিন্ন অংশের অনেক নেতা এখন ট্রাম্পের একান্ত অনুসরণকারী। তারা সবাই চান মিডিয়া তার প্রচলিত ‘ওয়াচডগের’ ভূমিকা পালন না করুক এবং তাদের কোলে লালিত হোক।
পপুলারিজম, উগ্র জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কার ও ঘৃণা সৃষ্টি করছে প্রতিদিন, যা থেকে অসহিষ্ণুতা এক নতুন উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে। এ বিষয় এখন মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই মুক্ত মিডিয়ার মৌলিক ভূমিকার অন্যতম হলো অপ্রিয় সত্যকে সামনে আনা, উচ্চ পর্যায় ও শক্তিশালীদের প্রশ্ন করা এবং সব রকম অধিকার ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখা।
এসব মিলে সাধারণত সমালোচনামুলক কাহিনী তৈরি করে যে, পপুলিজম, উগ্রবাদ এবং কর্তৃত্বপরায়ণতাকে ঘৃণাসহকারে পরিহার করা উচিত। অরওয়েলের ভাষায়, যদি স্বাধীনতা বলতে মোটেও কিছু বুঝায়, এর অর্থ হলো মানুষ যা শুনতে চায় না, তা মানুষের কাছে বলার অধিকার।
মিডিয়া এখন যার জন্য লড়াই করছে- এবং আরো শক্তিশালীভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে করছে তা হলো, মানব সভ্যতার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় অর্জন। তা হলো চিন্তার স্বাধীনতা এবং কথা বলার স্বাধীনতার অধিকার।
এ লড়াই এর চেয়ে কম কিছুর জন্য নয়।

( লেখক: ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

বিস্তারিত খবর

ভিআইপি ও ডিসিই তিতাসের খুনি

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-৩০ ০৫:৩৬:৪২

তিতাসকে কে খুন করেছে? মাদারীপুরের ডিসি ওয়াহিদুল? নাকি যুগ্মসচিব সবুর? তদন্ত কমিটি আমলাদের দিয়ে কেনো? সংসদীয় কমিটি করে দোষীদের বের করে, শাস্তি চাই। দেশটা কি একদল আমলা ও ডিসির বাপদাদার? বঙ্গবন্ধুর ডাকে এজন্য কি এতো রক্তে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো?

এক ধরনের ডিসি আছে যারা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলেও জেলা প্রশাসক হয়ে নিজেদের জেলার জমিদার মনে করে! কিছু সরকারি কর্মচারীকে বাড়ির চাকর বানায়। তাদের বউরা নিজেদের মহারানী মনে করে।

এদের কোন ছেলেবেলা নেই। এর ওর বাড়ি, খেয়ে থেকে টিউশনি করে বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ডাইনিংয়ে ডালের পাতলা পানিভাত নয়, রুমে হিটারে ভাত রেধে আলু ভর্তা দিয়ে খেয়েছে। ছাত্রজীবনের আনন্দভোগ কপালে জুটেনি। মনের দারিদ্রতা মুছেনি, গণমুখী মানবিক হয়নি। হীনমন্যতায় আমলা হয়ে ক্ষমতা দেখায়।
মাদারীপুরে ফেরি সময়মত ছাড়তে কিশোর তিতাসের মা পা ধরে আকুতি জানালেও ছাড়েনি। তিতাসকে বহন করা এ্যাম্বুলেন্স তিনঘণ্টা আটকে রেখেছিলো। ডিসি বলেছে, ভিআইপি যাবে! তাই বলে তিনঘণ্টা এক যুগ্মসচিবের জন্য ফেরি আটকে মর্যাদা! বিনিময়ে বিলম্ব হওয়ায় পথেই অধিক রক্তক্ষরণে তিতাস নামের ফুটফুটে শিশুর মৃত্যু!

এর আগে দুই টিএনও এক ডাক্তার ও এক শিক্ষককে পা ধরিয়েছে। এরা যদি এমপি মন্ত্রী হয়, জনগনণকে শায়েস্তা করতে আর কিছু লাগতোনা। বিমান আটকে দিতো। ঘরে ঘরে খাজনা তুলতো। ময়মনসিংহের এক ডিসিতো বিদায়বেলা নিজেও বউকে রাজা রাণীর পোষাকে সাজিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে শহরঘুরে দেশে হাসির খোরাক হয়েছিলেন।

এরা ডিসি, টিএনও, যুগ্মসচিব হলেও মানুষ হয়নি। এরা সংখ্যায় কম, কিন্তু বড় ঘটনা, ভয়ংকর অপরাধে শীর্ষে। এসব আমলার চেয়ে জনপ্রতিনিধি অনেক উত্তম। এই দুই খুনীকে বরখাস্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হোক। আর ভিআইপিদের গণমিছিল থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়া হোক।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিস্তারিত খবর

গভীর ষড়যন্ত্রের আলামত

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-২৫ ০০:৪৪:৩৭

একের পর এক ঘটে যাওয়া সব ঘটনা একটি চিত্রপটে নিয়ে এলে পর্যবেক্ষকদের মনে এই আশঙ্কা জন্ম নেবে যে, দেশে একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের ষড়যন্ত্র। ইমেজ নষ্ট করার ষড়যন্ত্র। সরকারকে ব্যর্থ বলে প্রমাণ করার এক গভীর রহস্যময় তৎপরতার ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রকে ও সরকারকে কঠোর হাতে মোকাবিলা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক গভীরে গিয়ে উদ্ঘাটন করতে হবে এবং এসব অপকর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারা জড়িত তাদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাঁড়াশি অপারেশন চালিয়ে সফল হতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপপ্রচার অপরাধ দমনে জনগণকে সুসংগঠিত করতে শাসক দলকে রাজনৈতিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। সারা দেশে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা জনমত গঠনের মাধ্যমে জনগণের মধ্য থেকে সব ভয় ও আতঙ্ক দূর করে সমাজের অস্থিরতা নিরসন করতে হবে। অপরাধী যেই হোক সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এমনকি সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব করা যাবে না। পদ্মা সেতুতে মানুষের জবাই করা মাথা লাগবে বলে যারা অপপ্রচার চালিয়েছে তাদের অনেককে প্রশাসন চিহ্নিত করেছে। অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে অনেক নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। এর প্রয়োজন ছিল। বছরের পর বছর গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের পরও তথ্য মন্ত্রণালয় অনলাইন নিউজ পোর্টালকে এখনো অনুমোদন দেয়নি। যাদের অনুমোদন দেওয়া উচিত তাদের অনুমোদন দিয়ে অনুমোদনহীন সব নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দিতে হবে। একুশ শতকের বিজ্ঞানমনস্ক তথ্য প্রযুক্তির চূড়ান্ত বিকাশে উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেখানে যুক্ত হয়েছে, অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে এ ধরনের মধ্যযুগীয় কাপালিক মিথ বা মানুষের মাথার অপপ্রচার চলতে পারে না। যমুনা সেতু বা বঙ্গবন্ধু সেতুতে যখন এ ধরনের প্রচারণা হয়নি সেখানে পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় যখন শেষ লগ্নে তখন এ ধরনের ভয়ঙ্কর অপপ্রচার ষড়যন্ত্রের ভয়ঙ্কর আলামত ছাড়া কিছুই নয়।

ছেলেধরা সন্দেহে একের পর এক মানুষ হত্যা গোটা দেশের মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। এ আতঙ্ক থেকে দেশকে বের করে না আনতে পারলে সমাজ জীবনে এই জঘন্য পথ ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সমাজ জীবনের নানামুখী বিরোধে হিংসাত্মক মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে। বাড্ডায় সিঙ্গেল মাদার তসলিমা বেগম রেণু সন্তানদের নিয়ে জীবনের কঠিন লড়াই করছিলেন। ছোট বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে কী নিষ্ঠুরভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছে। গোটা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত ও বিষাদগ্রস্ত করে দিয়েছে। এই বর্বর হত্যাকান্ডে র সঙ্গে মানসিক বিকারগ্রস্ত যেসব সন্তানতুল্য তরুণ অংশ নিয়েছিলেন, তাদের একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে গণপিটুনিতে গণহত্যার মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ব্যর্থ এটি প্রমাণ করার গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। পুলিশের আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ যারা গুজব ছড়াচ্ছেন ও অপরাধ করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তারা বসে নেই। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় র‌্যাব ও পুলিশকে সহযোগিতা করা জনগণের নৈতিক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গেলেই একটা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয় দেখা যাচ্ছে। এই গুজব, এই ছেলেধরা ও গণপিটুনি কঠোর হস্তে দমন করা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

এর আগে সিরিজ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গোটা দেশকে আক্রান্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে বরগুনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছায়ায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী বাহিনী মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট ও রিফাত হত্যাকান্ডে র ভয়াবহতা দেশ দেখেছে। ফেনীর ঘটনার মতো নানা নাটকীয়তার পর এখানেও এখন তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় এমপি ও পুলিশ প্রশাসন কীভাবে নয়ন বন্ডদের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন সেই খবর যেমন উঠে আসছে তেমনি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ডের হত্যাকা ও মিন্নির আসামি হিসেবে রিমান্ড অনেক রহস্যের জন্ম দিয়ে আসছে। এমপির বিষয়ে তার দলকে এবং পুলিশ সুপারের ব্যাপারে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। তাদের রেখে সেখানে এই হত্যাকান্ডে র ন্যায়বিচার ও অপরাধ জগৎ উৎখাত কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন রয়েছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক মলয় সাহার স্ত্রী ও অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব জগদীস দাশের বোন প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে বাংলাদেশকে যেভাবে দুনিয়ার বুকে একটি সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু নিপীড়ক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে ৩ কোটি ৪০ লাখ সংখ্যালঘু গুম হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাতে নির্লজ্জ রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন। এ ধরনের ঘটনার নেপথ্যে অবশ্যই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক ও তার নেপথ্য এবং সক্রিয় সহযোগীদের মুখোশ উন্মোচন রাষ্ট্রের সব গোয়েন্দা সংস্থারও দায়িত্ব। একজন প্রিয়া সাহাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনায় নিলেও তিনি যা ঘটিয়েছেন সেটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর ঘটনা। একজন মামুলি মানুষকে চরিত্রহীন বলায় দেশের অনেকে চরিত্রহারা হয়েছেন। সারা দেশে মামলার মিছিল ঘটিয়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে জেল খাটিয়েছিলেন। আরেকজন প্রিয়া সাহা গোটা রাষ্ট্রকে চরিত্রহীন করে দিয়েছেন। সেখানে অনেকে এটাকে ছোট ঘটনা বলে একটি মামলাও দায়ের করতে দেননি। ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে যেসব মা-খালা প্রতিবাদী হয়েছিলেন, যেসব পিতৃতুল্য ও ভ্রাতৃতুল্য মানুষেরা প্রতিবাদী হয়েছিলেন তারা এখন নীরব। প্রধানমন্ত্রী দেশে এলে নিশ্চয়ই জাতির উদ্দেশে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি ভাষণ বা সংবাদ সম্মেলন করবেন। কিন্তু তিনি আসার আগে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মানুষকে নানা গুজব ও অপরাধে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন এবং জড়িত হলে কঠোর ব্যবস্থা যে নেওয়া হবে সেই সতর্ক হুঁশিয়ারি দিতে পারেন।

শেয়ারবাজার বিপর্যয় নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। বিপর্যস্ত করুণ শেয়ারবাজার থেকে তিন দিনে এই সময়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সময়ে চারদিকে এত ঘটনা কিসের আলামত?

প্রিয়া সাহা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দিয়েছেন তাতে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে আজকে শেখ হাসিনা ১০ বছরে যে সম্প্রীতির সুতায় বেঁধেছেন সেখানে তিনি দুনিয়ার সামনে কঠিন আঘাত করেছেন। প্রিয়া সাহার অপরাধের জন্য সংবিধান ও আইনের আলোকে তিনি দায়ী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা প্রিয়া সাহার পক্ষে সাফাই গাইছেন তারা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধকে উসকানি দিচ্ছেন। আর যারা প্রিয়া সাহার অপরাধের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়কে আক্রমণ করছেন তারা ভিতরে পুষে রাখা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন। দুটিই অপরাধ। আমরা আমাদের সম্প্রীতির বাঁধন আরও শক্ত করে ধরে রাখতে চাই। সমাজে শাস্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার চাই। আমরা সুশাসন চাই। আমরা গণতান্ত্রিক সমাজ চাই। আমরা ভঙ্গুর হলেও সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত দেখতে চাই। কোনো অশুভ শক্তির উত্থান এই দেশের জন্য অতীতে যেমন সুখকর হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। তাই সব পরিস্থিতি মিলে যে গভীর ষড়যন্ত্রের আলাতম দেখা যাচ্ছে, তার মূলোৎপাটন চাই। শাসক দল আওয়ামী লীগকেও তার আদর্শবান নেতা-কর্মী ও জনগণকে নিয়ে নিজের রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। তাদের মনে রাখা উচিত, দুঃসময়ে পরীক্ষিতরাই তাদের মূল শক্তি। গত ১০ বছর ধরে যেসব দলদাস দলদাসী থেকে শুরু করে এককালের কট্টর বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা মুজিবকন্যার চেয়েও বিভিন্ন পেশা থেকে রাজনীতির বারান্দা পর্যন্ত বড় আওয়ামী লীগ ভক্ত হয়েছেন এরা বিপদ দেখলেই কেটে যাবে। এরা বিএনপি থেকে কেটেছিল। এরা অনেকের কাছ থেকে কেটে পড়ে এসেছে সুবিধাভোগ করতে। দলকে সাবধান থাকতে হবে। যেখানে বিভিন্ন পেশায় এককালের মুজিববিদ্বেষী ও কট্টর শেখ হাসিনা বিরোধীরা বিপজ্জনক সেখানে চিহ্নিত বহুল আলোচিত রাজাকার সন্তানরা আরও বেশি ভয়ঙ্কর। এদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

বিস্তারিত খবর

দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য প্রিয়া সাহাকে আইনের আওতায় আনা হোক

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-২০ ০৫:৫২:৪১


আমাদের সোনার বাংলা যুগ যুগ থেকে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে হিন্দু-বৌদ্ধ, খুস্টান-মুসলামন ভাই-ভাইয়ের মতো বসবাস করছেন। সবাই নিজ নিজ ধর্ম ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছে। পুরো পৃথিবীতে এমন সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিরল। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের সকল বর্ণের ও ধর্মের মানুষ একাত্ম্য ও সুখ-দুঃখে একে অপরের সহযোগীতা আরও বৃদ্ধি হয়েছে। তা বিগত অন্য সরকারের সময় এতটা ছিল না। সেই সোনার বাংলা ও সরকারের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ ট্রাম্পের কাছে তথাকথিত ভন্ড হিন্দু প্রিয় সাহা দিয়েছে, এটা মোটেও জাতির কাছে কাম্য না। এমন ঘটনায় আমরা হতবাক।
আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটা দেশে সকল বর্ণের ও ধর্মের মানুষ ধিক্কার ও সুষ্ঠ বিচার আশা করে। আমি বঙ্গবন্ধুর একজন কর্মী হয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ ও দাবি জানাই, যে ব্যক্তি বা অপশক্তি বঙ্গবন্ধুর ও জননেত্রীর পরিশ্রমের সোনার বাংলা ভাবমূর্তি ও গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশা করতে চায়, তাদের অচিরেই আইনের আওতায় আনা হোক | 
লেখক: প্রতিষ্ঠা যুগ্ম-আহ্বায়ক, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট আওয়ামী যুবলীগ

বিস্তারিত খবর

তরুণ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফেসবুক, ইউটিউব এবং গুগল ব্যবহার করে

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-১৩ ১২:২৬:২৮

বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতেই একটি আলোচিত বিষয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার। এমন ব্যবহারে সফলতার দিক যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ক্ষতির সম্মুখীনও হচ্ছে মানুষ। তরুণ প্রজন্মরা বাবা মাকে ধোঁকা দিয়ে ডুবে থাকছে নিজস্ব স্মার্টফোনের ফেসবুকে। স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা ফাঁকি দিয়েই নির্জন স্থানে বা চায়ের দোকানে অথবা পছন্দ মতো কোনো পার্কের বসে স্মার্টফোনেই খেলছে গেমস বা ব্যবহার করছে ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুক ও গুগল।
'ইউটিউব এবং গুগলে' আপত্তিকর ভিডিওতে তারা আসক্ত হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎও নষ্ট করছে। আসলে বিনা প্রয়োজনে অজস্র তরুণ প্রজন্মরা সময় নষ্ট ও আপত্তিকর ভিডিও দেখেই এক ধরনের উগ্রতা সৃষ্টি করে পারিবারিক কলহে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে লেখা পড়ার মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক মূল্য বোধেরও অবক্ষয় ঘটছে বলা যায়। সৌখিনতা পূরণ করতে গিয়ে অভিভাবক যেন নিজ সন্তানদের হাতে অজান্তে তুলে দিচ্ছে স্মার্ট ফোন। কোমলমতি এই শিক্ষার্থীরা এমন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারেই হারিয়ে ফেলছে সৃৃৃজনশীলতা এবং বাড়ছে উগ্রতা। বলতেই হয় যে, সারা বিশ্বের মানুষদের মাঝে বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য ছড়িয়ে দিলেও তৈরী কৃত ব্যক্তির পরিবার এর ক্ষেত্রে এসবের ভূমিকাটা ছিলো একেবারেই উল্টো। তাদের উঠতি বয়সের সন্তান'রা কোনো ভাবেই যেন প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসতে না পারে। সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করেছিল এই প্রযুক্তি বিশ্বের 'দুই দিকপাল'।২০১১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া একটি বৃহৎ সাক্ষাৎকারে স্টিভ জবস বলে ছিল, তাঁর সন্তানদের জন্য আইপ্যাড ব্যবহারে একেবারেই নিষিদ্ধ।

শহরের ছেলে-মেয়েদের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে তরুণ প্রজন্মের বহু ছেলেমেয়েরাও এখন মোবাইল ফোনে ফেসবুুক, ইউটিউব ও গুগলে প্রবেশ করে খুব মজা করছে। তবে এই মজার মধ্যে তারা শুধু যে সীমাবদ্ধ থাকছে তা নয়। তারা রাতদিন নেটে গেমস খেলছে। বলা যায় যে, এ মজার আনন্দ গ্রামের চেয়ে শহরেই অনেক বেশী। এক পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে গ্রামের তরুণ প্রজন্মের ছেলেরা সন্ধ্যায়, অন্ধকার পরিবেশে একটি নির্জন স্থানে জটলা হয়ে খুুব পাশাপাশি বসে নিজস্ব মোবাইলে গেম খেলার পাশা পাশি ফেসবুুক, ইউটিউব বা গুগলে কু-রুচি পূর্ণ ভিডিও চিত্র দেখেই যেন আনন্দ উপভোগ করছে। জানা দরকার যে এই দেশের মানুষদের সুযোগ সুবিধা জন্যে এ সরকার ৯ কোটির বেশিই ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছে। বর্তমান সরকারের তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের হিসাবে ফেসবুক ব্যবহার করছে প্রায় ৩ কোটি মানুষ। এমন
ইন্টারনেট সংযোগে সকল জনগণকে সচেতন করে দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তা অপব্যবহার করে 'চিন্তা চেতনার অবক্ষয়' যেন নিজ থেকেই সৃষ্টি করছে। এই বাংলাদেশের সচেতন কিংবা অসচেতন ফেসবুক ব্যবহারকারীর শতকরা তিরানব্বই ভাগের বয়সই হচ্ছে ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। সুুতরাং এ বিশাল জন গোষ্ঠী "ফেসবুকের সঙ্গে সম্পৃক্ত" হয়েই সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ্য করাও যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, এমন তরুণরা মিথ্যা গুজব এবং অপপ্রচার চালিয়ে অসচেতন জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। পড়া শোনাকে নষ্ট করে বিশাল এক তরুণ গোষ্ঠী ফেসবুকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং রাজনৈতিক চেতনার নামেই যেন ছোট বড় গোষ্ঠী সৃষ্টি করে সহিংসতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বাবা-মা তাদের সন্তানদেরকে ভালোবাসে, সন্তানের ছোট বড় সৌখিন চাহিদাও পুুরণ করে থাকে। কিন্তু-ছেলেমেয়েদেরকে যেন সখের মোবাইল ফোন কিনে দিয়ে অজান্তে ভবিষ্যত নষ্ট করছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ব্যাপারে কোনো ধরনের বিকল্প পথে সুযোগ রয়েছে কি নেই তা জানা নেই। তবে এই ব্যাপারে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বি টি আর সি) চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বি টি আর সির কোনো সক্ষমতা নেই। তবে সরকার বা বিটিআরসি 'ফেসবুককে অনুরোধ' করতে পারে। ফেসবুক ব্যবসা করতে এই দেশে এসেছে। ফেসবুক কতৃৃপক্ষ বলেন যে ১৮ বছরের নিচের ছেলেমেয়েরা তাদের গ্রাহক। আবার ৬৫ বছরের সকল মানুষরাও একই ধরনের গ্রাহক। ফেসবুক কিন্তু সব অভিযোগ বিবেচনায় নিতে বাধ্য নয়। ফলে, প্রযুক্তিতে ভালোর চেয়ে দিনে দিনে খারাপের দিকেই যেন ঝুঁকে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম। গবেষকদের এক সিদ্ধান্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন অতিমাত্রায় বিচরণের ফলে মাদকাসক্তির মতো খারাপ ফলাফল প্রকাশ পাচ্ছে।
অনৈতিক অবক্ষয় থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। কোমলমতী বহু ছেলে ও মেয়েদের আচার আচরণের পরিবর্তনও হচ্ছে। আবার এও দেখা যায় যে "হাতে মোবাইল পেয়ে" তারা ঠিক মতো বাসাতেই থাকতে চায় না। উড় উড় মন, লেখাপড়াতে মনযোগ দিতেই চায় না। পড়ার টেবিলে, ঘুমের ঘরে এমন কি খেতে বসেও ফোন চালাতে দেখা যায়। এক কথাতে আসি, যখনই তাদের দেখা যায়, ঠিক তখনই তাদের হাতে ফোন নামক যন্ত্রটি থাকা চাই। বয়ঃসন্ধি কালে পৌঁছার আগে ছেলে মেয়েরা যেন বহু নোংরা কাজে লিপ্ত হচ্ছে। মোবাইলে আসক্ত হয়েও তারাই প্রকাশ্য দিবালোকে অন্যদের মারপিট, খুন, গুম কিংবা ধর্ষণ করছে।

তরুণ প্রজন্মের সব ছেলেমেয়েরা তাদের মোবাইলে গেমের পাশা পাশি ইন্টারনেটেও অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে সেহেতু তাদের মস্তিষ্কেও নাকি রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটছে। এ আসক্তিতে তাদের মধ্যে হতাশা এবং উদ্বেগও সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিষয়ের প্রতি অবজ্ঞা না করে তাদের প্রতি কঠিন দৃষ্ট দিতে হবে। সুতরাং-গ্রাম হোক আর শহরই হোক না কেন, বাবা মা এবং তাদের বড়দের উচিৎ ঘরে-বাহিরে তারা কি করছে। রাত্রি বেলা না ঘুমিয়ে গেম খেলছে কিনা। লেখাপড়া শেষ করে রাত ১০টায় ঘুমিয়ে পড়ত যারা তারা রাত ১২টা বা এক টাতেও ঘুমাতে যায় না। ঘুমানোর ঘরে বালিশের নিচেই রাখে ফোন। সারাক্ষণই ফোন আর ফোন। গবেষকদের গবেষণায় জানা যায় যে, ঘুমের আগেই মোবাইলের 'ডিসপ্লের আলোক রশ্মি' ঘুমের হরমোনকে নাকি অনেক বাধা সৃষ্টি করে থাকে৷ তাই মা বাবাদের প্রতি গবেষকদের পরামর্শ হলো:- ঘুমের আগে যদি সন্তানকে এই ধরনের প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসতে দেওয়া হয় তা হলে খুব ক্ষতি হবে। অবশ্যই সন্তানদেরকে 'অহেতুক অথবা অকারণে' এ ধরনের ইলেকট্রোনিক্স যন্ত্র ব্যবহারে বাধা দেওয়া প্রয়োজন। ঘুম না হলে অসুস্থভাবে বেড়ে ওঠা সকল কমলমতি তরুণ তরুণীদের বহু ক্ষতি হয়। পরিপূর্ণ ঘুম না হলে যে তাদের অমূল্য সম্পদ 'স্মৃতি শক্তির স্বাভাবিকতা' বিনষ্ট হবে। সুতরাং সঠিক সময়েই যথাযত কাজের সমন্বয়েই সন্তানদের গড়ে তোলা দরকার।

জানা যায় যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৩ বছরের নিচে "ফেসবুক আইডি" খুলতে পারবে না। কিন্তু এই চোতুর ছেলে মেয়েরা বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের ভোটার আইডি দিয়ে 'মোবাইল সিম' ক্রয় করে নিজ বয়স বাড়িয়ে ফেসবুক আইডিও খুলে ফেলছে। '১৮ বছর' বয়সের নিচে ৬৫ ভাগ ছেলেমেয়েরা ফেসবুক ব্যবহার করছে। ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ সব 'মুঠোফোন বা ইলেকট্রোনিক্স' যন্ত্রের মতো- বহু বদঅভ্যাসকেই চিহ্নিত করে তাকে পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার চাইলে ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় ব্রাউজার তৈরি করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অবশ্যই বিটিআরসি ইচ্ছা করলে এ ফেসবুকের ওপরে বয়স ভেরিফিকেশন করতে পারে। এই দেশের সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করে ভবিষ্যত প্রজন্মকেই ভালো জায়গায় পৌঁছাতে হবে। সুতরাং বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে 'চীনের মতো ব্রাউজার' তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলেই মনে করছেন আইসিটি বিশেষজ্ঞরা। এই ব্যাপারে আমাদের দেশে তেমন কোনও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেই বলেই জানান আইসিটি বিশেষজ্ঞরা। আরও বলেন যে:- ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব-সহ বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি আসার আগে সেটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়া হচ্ছে না তরুণদের। এজন্যই সমাজ ও কালচার রক্ষা করতে হলে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব বা টিকটকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।


লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় বাগডিসি’র অগ্রযাত্রা এবং ফোবানা সম্মেলন-২০২১

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-০৫ ১৬:৩৪:১১

ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এলাকার অন্যতম বৃহৎ সংগঠন-  বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব গ্রেটার ওয়াশিংটন ডিসি (বাগডিসি)। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে বাগডিসি’র  সুদীর্ঘ এক দশকেরও বেশী সময় ধরে নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে এর প্রত্যয়ী পথচলা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও মানব কল্যানমূলক কাজের প্রতিশ্রূতি নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়ে, লক্ষ্য ছিল সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা, সেবা ও উন্নয়ন। বিগত বেশ কয়েক বছরে ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় সমাজের অন্যান্য সংগঠনগুলোর মাঝে বাগডিসির একটি স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে বাগডিসি’র বিভিন্ন কল্যানমূলক কার্যক্রমের জন্য। সমাজ উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি বাগডিসি পায়ের ছাপ রেখেছে ভিন্ন ধারায় মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়ে এবং সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় অবদান রেখে। এছাড়া স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতায় এগিয়ে গিয়েছে নানা প্রাকৃতিকে দুর্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় বাগডিসি’র সামাজিক ভূমিকা ও নেতৃত্ব অত্যন্ত বলিষ্ঠ। আর তাই ২০১৬ সালে ওয়াশিংটনে যে ৩০তম ফোবানা সম্মেলন হয়েছিল, তার স্বাগতিক সংগঠন ছিল বাগডিসি। এছাড়া ২০১৭ সালে আয়োজিত ৩১তম ফোবানা সম্মেলনে (মায়ামী, ফ্লোরিডা) এবং ২০১৮ সালে আয়োজিত ৩২তম ফোবানা সম্মেলনে (আটলান্টা, জর্জিয়া) সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে প্রথম পুরস্কার অর্জন করার গৌরব অর্জন করে।

বিগত সময়ে বাগডিসি বিশেষ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি উন্নয়নমূলক ও মানবকল্যান ক্ষেত্রেও বাগডিসি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে, যেমন- বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবেলায় বন্যার্তদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আর্থিক অনুদান প্রদান, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির আশ্রয়গ্রহণের পর তাদের সংকটময় মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো, মানবাধিকারের পক্ষে  বিবেকবোধ নিয়ে তাদের অমানবিক অবস্থার প্রতিবাদ করা এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ইতিবাচক মতবাদ গড়ে তোলার জন্য ওয়াশিংটন ডিসি’তে প্রতিবাদ সভা এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টে প্রতিবাদ স্মারকলিপি পেশ করা, বাংলাদেশের দুঃস্থ-পঙ্গুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সাহায্যার্থে  সিআরপির জন্য (সেন্টার ফর দি রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্যা প্যারালাইজড, সি আর পি) তহবিল সংগ্রহ ও আর্থিক সাহায্য করা ইত্যাদি। ভবিষ্যতে এর কার্যক্রমের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে, এটাই বাগডিসি’র অঙ্গীকার। 

ফোবানা সম্মেলন-২০২১ বাগডিসির ভাবনা:
অতীতে ফোবানা সম্মেলন (২০১৬) আয়োজনের অভিজ্ঞতার আলোকে ও দীর্ঘ সময় ধরে বলিষ্ঠ সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে আগামীতেও বাগডিসি ফোবানা সম্মেলন (২০২১) আয়োজন করার জন্য আগ্রহী এবং এ বিষয়ে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি আলোচনা শুরু করেছে। ফোবানা সম্মেলনের মতো বিশাল সম্মেলনের আয়োজনে সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য সংগঠন হিসেবে বাগডিসি আগামীতে এই ফোবানা সম্মেলন আয়োজনে ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার সমস্ত সংগঠনের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে একত্রে কাজ করবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে এবিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। এছাড়া বাগডিসি’র রয়েছে পর্যাপ্ত আর্থিক তহবিলের উৎস, যা ফোবানা সম্মেলনের মতো মহা সম্মেলন আয়োজনের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়। তাই ফোবানা কেন্দ্রীয় কমিটির সুযোগ্য নেতৃবৃন্দের সার্বিক সহযোগিতায় এবং ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার সকল সংগঠনের সক্রিয় সহযোগিতায় ফোবানা সম্মেলন-২০২১ আরেকটি ইতিহাস রচনা করবে বলে বাগডিসি আশা পোষণ করছে।

বাগডিসি’র নতুন কার্যকরী পরিষদে এসেছে নতুন-পুরাতনের সেতুবন্ধনে এক অভিনব নেতৃত্বের ছোঁয়া। প্রাজ্ঞজনের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নিয়ে অদম্য উৎসাহে এগিয়ে চলছে কার্যকরী পরিষদের নতুন নেতৃত্ব এবং আগামীতে বাগডিসি’র কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার জন্য তারা দৃঢ় প্রত্যয়ী। আগামীতেও বাগডিসি তাদের উন্নয়নমূখী, সমাজসেবামূলক পদক্ষেপ এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাবার প্রত্যাশা নিয়ে নানা কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বাগডিসি যেমন অতীতে, তেমনি আগামীতেও এর সামাজিক-সাংস্কৃতি কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদেরই প্রবাসী সমাজের কল্যানে- এটাই সমাজ কল্যানে বাগডিসি’র প্রত্যয়ী পথচলা।

বিস্তারিত খবর

কল্পনাকে জাগ্রত করেই সঠিক সাফল্য অর্জিত হয়

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৪-১৪ ১৩:৫২:৫১

শিক্ষাহীন মানুষের নিজস্ব জ্ঞান স্ব-পরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকে। 'শিক্ষা' তার নিজ পরিবেশ সহ বিভিন্ন সমাজ কিংবা সভ্যতা'র সম্পর্ক গড়ে তোলেই যেন সচেতন করে। মনীষীর জীবনকে পর্যালোচনায়, অতীতের আলোকে বর্তমানের স্বরূপ উদঘাটন, দেশ-কালের নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশের ''আদর্শ, নীতি, বিশ্বাস এবং সংস্কার'' এর বিভিন্নতার উপলব্ধি, সহানুভূতির "উদারতা ও প্রসস্ততা" কিংবা বিচারের দ্বীপ্তিতে কল্পনার ঔজ্জ্বল্য সম্পাদন করাই শিক্ষার অবদান। জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়েই যেন এই মানুষ যে শক্তি অর্জন করে, সেই শক্তি অর্জনই যেন শিক্ষার উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য থেকেই তো আসে সুস্থ 'কল্পনা বা স্বপ্ন পুরনের ইচ্ছা'। জ্ঞান না থাকলে বুদ্ধি আসে না আর বুদ্ধি ছাড়া মুক্তি বা সফলতা আসতে পারে না। জ্ঞান চর্চার মাধ্যমেই সফল হওয়ার লক্ষ্যে মানুষ 'কল্পনা' করেই নানা পরিকল্পনা করে। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ ''ছোট হোক কিংবা বড়ই হোক'' কোন না কোন স্বপ্ন নিয়েই থাকে, আর কল্পনা থেকেই যেন স্বপ্নের জন্ম। সে স্বপ্নগুলোকে অনেকেই বয়স কালে পূরণ করার চেষ্টা করে, আবার ছোট বেলার অনেক স্বপ্ন পূরণের উচ্চ আখাঙ্খা অকালে ঝরে পড়ে। এই স্বপ্ন পূরণের আখাঙ্খা ছোট থেকে হোক বা বড় হয়ে হোক স্বপ্ন পূরণের 'সূত্রপাত' কিন্তু, ছোটতেই জাগ্রত হয়। তাদের নানানকিছু চিন্তা করার মাধ্যমে তা চলে আসে। আর তারা কেউ কেউ খুব বেশি পড়াশোনাও করে এবং নিজের মস্তিস্কটি ব্যবহার করে, সেটি খুব কম চিন্তাভাবনার আবেগপূর্ণ অভ্যাসে পরিণত হয়। এইটি আলবার্ট আইনস্টাইনের উক্তি। তিনি আরও বলেছেন আমাদের মন অথবা ব্রেইন থেকেই কল্পনা আসে। মস্তিষ্ক হলো দেহের চালক। এই দেহের সমস্ত শারীর বৃত্তীয় কর্মকাণ্ড এটি দ্বারা চালিত হয়। এটির বিভিন্ন অংশের কর্মকাণ্ডে দেহের শ্রবণ, শ্বসন, চিন্তা-চেতনা, বিবেক, সৃজনশীল কাজ বা কল্পনাসহ পেশি চালনা ইত্যাদি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

সুতরাং এই মন ও ব্রেইন এ কারনে উল্লেখ করলাম, কারণ হলো উভয়েই একটা অপরটার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সব বড় বড় অর্জনের পেছনেই মন বা ব্রেইনের হাত অনেকাংশেই বেশি। তাই মানুষের মনের কাজ হচ্ছে মানুষকে 'স্বপ্ন' দেখাতে সাহস যোগায়। মানুষের যদি মন থেকে তা বিশ্বাস করে তাহলেই স্বপ্নপূরণ করাটা অনেক সহজ কাজ হয়। সব সময়ে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে। বেশি বেশি স্বপ্ন দেখতেই হবে। একজন কল্পনাবাজ কিংবা স্বপ্নবাজ হতেই হবে। যদি কারও স্বপ্ন থেকেই থাকে, তাকে সর্ব প্রথমে নিজস্ব স্বপ্ন'কে মূল্যায়ন করতে হবে, সম্মান করতেও হবে সেই নিজ স্বপ্ন ধারাটিকে। "স্বপ্ন" ছোট হোক বা বড় হোক সেটা নিয়েই গর্ব করতে হবে। তাই আলবার্ট আইনেস্টাইন বলেছিল- 'যদি তুমি একটি সুখী জীবন চাও, তাহলে এটাকে একটি লক্ষ্যের সাথেই বেধে ফেল, যে কোন মানুষ অথবা বস্তুর সাথে নয়'। আবার ডেল কার্নেগী স্বপ্ন পূূূরণের উদ্দেশ্যে বলেছিল যে, ''আত্ম বিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম ব্যর্থতা নামক রোগকে মারার সবচে বড় ওষুধ। এমনটাই আপনাকে একজন সফলকাম মানুষে পরিণত করবে।' সফলতা অর্জনের 'শর্টকাট' কোনো পদ্ধতি নেই। 'সাফল্য হল আপনি যা চান তা হাসিল করা। সুখ হল আপনি যা চান তা পাওয়া।' এ স্বপ্ন নিয়ে বলতে গেলে বলা যায়, এ পি জে আবদুল কালাম মতে 'স্বপ্ন সেইটা নয়, যেইটা মানুষরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে আর স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। বেশির ভাগ মানুষের 'স্বপ্ন' হয় আকাশ কুসুম কল্পনার মত। এমন স্বপ্নটাই দেখা উচিৎ হবে যে স্বপ্নটা পূরণের সাধ্য সকলের রয়েছে। জয় করার মতোই 'স্বপ্ন কিংবা কল্পনা' বিশ্বাস যোগ্য হতে হবে।

একটু পরিস্কার ধারণায় আসা যাক- ''কল্পনা থেকেই স্বপ্ন'', আর কল্পনাটিরও অসীম ক্ষমতা রয়েছে। এটি জ্ঞানের চাইতেও বেশি ''পরিধি সম্পন্ন''। কারণ, যিনি সব দিক থেকে অনেক বেশি জ্ঞান অর্জন করেছেন, যার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি, সর্ব ক্ষেত্রে তিনিই যেন অনেক কিছু নিজ কল্পনায় বিশ্লেষণ করতে পারেন। সেই কল্পনাকেই বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা তখন তাঁর কাছে প্রবল হয়ে ওঠে। সুতরাং মানুষ এ ভাবেই ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। অনেক ক্ষেত্রেই যে কোনো ব্যাপার নিয়ে কল্পনা করা যায় তখন সেই ব্যাপার সম্পর্কেই আরও বেশি জানবার আগ্রহটাও যেন বাড়ে। এজন্যে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিল,- ‘'কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ’'।
তিনি আরও বলেছেন,- যদি আমাকে একটি সমস্যা সমাধানের জন্য এক ঘন্টা বেধে দেয়া হয়, আমি ৫৫ মিনিট সমস্যাটা নিয়ে চিন্তা করি এবং আর বাকি ৫ মিনিট সমাধানটা নিয়ে চিন্তা করি। সুতরাং সমাধান হতে যে বাধ্য তা অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের এধরনের কল্পনা থেকেই বুঝা যায়। আপনার 'দর্শন ও স্বপ্ন'কে নিজের সন্তানের মত লালন করুন কারণ এ গুলোই আপনার চূড়ান্ত অর্জনের প্রতিচিত্র হয়ে উঠবে। এই কথা- "নেপোলিয়ন হিল" জানিয়ে আলোকিত মানুষ হওয়ায় যথেষ্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে ছিল। সত্যিকারের 'জ্ঞানী ব্যক্তি হতে চাইলে- কল্পনা এবং স্বপ্নের সঙ্গে প্রথমেই চরিত্রবান হতে হবে। বিনয়, ভদ্রতা বা কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা দরকার। পরিশ্রম, উৎসুক মন কিংবা সহজাত বুদ্ধিমত্তা ছাড়া জ্ঞানের জগতে খুব সহজেই যেকেউ প্রবেশ করতে পারে নি। 'ধৈর্য, সহ্য এবং সরলতা' না থাকলে জ্ঞানকে ধারণ করাও যায় না। তাই কৌশল, দক্ষতা, সময়জ্ঞান কিংবা সাহস না থাকলে জ্ঞানকে সুযোগমতো ব্যবহার করা যায় না। মানুষের হৃদয়ের বিশালতা থাকা প্রয়োজন, ক্ষমা করার ক্ষমতা এবং অপ্রিয় বিষয় গুলোকে মানুষকেই যেন ভুলে থাকার যোগ্যতা বা দক্ষতা দরকার। এ যোগ্যতা না থাকলে আপনার জ্ঞান বিস্মৃতির কবলে পড়ে দিন দিন হ্রাস পেতেও থাকবে। সংযম, দিব্যদৃষ্টি, অনুভূতিপ্রবণ বা সহানুভূতিশীল না হলে জ্ঞান কেউ গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে আসবে না। সুতরাং, মোহনীয় ব্যক্তিত্ব, কথা-কর্মের নান্দনিক মাধুর্য কিংবা পর্যাপ্ত রুচিশীলতা না থাকলে 'জ্ঞান' লোকারণ্যেও বিজ্ঞময় সুগন্ধি ছড়াবে না। 'পরিশ্রম করতেই হবে, কঠিন পরিশ্রম। আপনার কাজকে সহজ করতেই পরিশ্রম করতে হবে। কারণ, একবার পরিশ্রম করে যদি আপনি কাজকেই সঠিক ভাবে বুঝতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তী সময়ের কোন কঠিন কাজটি পরিশ্রম না করেই তার সঠিক ফায়দা লাভ করা যায়'।

তাই বলতে চাই- কল্পনা শক্তি জাগ্রত করেই পরিশ্রম করা প্রয়োজন। দার্শনিক মার্শাল বলেছিল, 'মানুষের কল্পনাশক্তি না থাকলে পৃথিবীর এতো উন্নতি সাধিত হত না!' জেনে রাখা দরকার যে, কোন ভিশন কিংবা মিশনকে সামনে রেখে সুদূর প্রসারি চিন্তা করা হলো কল্পনা আর নিজের অজান্তে বা ঘুমে যা চলে আসে তা স্বপ্ন! কেবলি স্বপ্ন! তাই জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে কি পেলাম 'কল্পনা শক্তি' দ্বারা সেটাই বড় প্রশ্ন নয়, বরং কি করেছি সেটাই বড় প্রশ্ন। জীবনের বহুমুখী কর্মটি এক কথায় পরিকল্পিত কল্পনাতে করতে হবে। এমন পরিকল্পনার ধাপ গুলোকে প্রয়োগ করে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ দরকার। তাই শারিরিক ও মানুষিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ধাপ গুলো সম্পূর্ণ করতে হবে। যদি সেইসকল কাজ সঠিক মত করা যায়, তাহলেই এই জীবনে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা যাবে। জানা দরকার শরীর রক্ষার পাশাপাশি জ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা এবং কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়েই জ্ঞান অর্জন অতীব জরুরি। কেউ যদি মন'কে পরিচালনার ধরন না জেনে জ্ঞানার্জন করে চায় তবে তার সুস্থশরীর ও শক্তি-সামর্থ্য অবশ্যই বিপদাপন্ন কিংবা বিপত্তি বয়ে আনতে পাবে। জানা কথা হলো, মানুষের "মন এবং মস্তিষ্ক" প্রায়ই দ্বিমুখী চিন্তা করে। আর বিপরীতমুখী সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে আবার পরস্পর বিরোধী স্বপ্ন দেখে। মানুষের 'পাঁচটি ইন্দ্রিয়' আবার পাঁচ রকমের-রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ দ্বারাই যেন পাঁচ ভাবে মন ও মস্তিষ্কের পরস্পরবিরোধী চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্নকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রেক্ষাপট বা পরিস্থিতিকে জটিল থেকেই জটিলতর করে তোলে। এমন এ জটিল সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবেশ-পরিস্থিতি, সমাজ-সংসার। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ কিংবা জ্ঞানী-গুণীদের নানা মুখী বুদ্ধি-পরামর্শ ও তাপ-চাপ ইত্যাদি। ফলে এত সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মানুষের মন ও মস্তিষ্ক কেবল তখনই সঠিক কল্পনাটি করতে পারে। আর যখনই সেখানে অতি প্রয়োজনীয় জ্ঞান উপস্থিত থাকে।

সত্য স্বপ্ন বা কল্পনা হলো মানুষের সম্প্রসারিত সুক্ষ সহজাত অনুভুতির ফল। প্রতিটি মানুষের ভেতরেই এ সুক্ষ সহজাত অনুভুতির উপস্থিতি কিছুটা হলেও থাকে। আসলে ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টাই যেন কল্পনার কাজ। যারা এ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের বেশির ভাগ ব্যক্তিই ভবিষ্যৎ কি হবে তা কল্পনার দ্বারা অনুমান করতে পেরে ছিল। এটাই মানুষের অনেক বড় একটা গুন। আসলেই ভবিষ্যৎ সবার জন্য অনিশ্চিত, যেটা ভাবব সেটা নাও ঘটতে পারে। কিন্তু অনুমান কতটুকু সঠিক হচ্ছে তাকে তো বুঝতে কল্পনার প্রয়োজন। সুতরাং- সবারই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব কল্পনা কিংবা স্বপ্নের রূপটাই বা কেমন তাকে অনুভব করা ও দেখার চেষ্টা করা উচিৎ। তাই কল্পনা শক্তিতে জাগ্রত করেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। "ব্রায়ান ট্র্যাসি" বলেছিল সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হল আমরা যা ভয় পাই সে গুলো অপেক্ষা- আমরা যা আশা করি বা পেতে চাই সেগুলোর উপর আমাদের সচেতন মনকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সুতরাং- কল্পনা বা স্বপ্নকে জাগ্রত করে জীবনের 'লক্ষ্য বা সফলতা' অর্জন করা প্রয়োজন। পরিশেষে 'আলবার্ট আইনস্টাইন' এর একটি উক্তির আলোকেই বলতে চাই, 'কল্পনা বিদ্যার চেয়েও শক্তি শালী কেননা বিদ্যারসীমা আছে কিন্তু কল্পনার সীমা নেই'।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

জ্ঞানহীন মানুষের হাতেই শুরু শিক্ষা ও সাক্ষরতা

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৩-২০ ১৭:১৭:০২

প্রস্তর যুগের আদিম মানুষ তাদের ক্রিয়াকলাপ, দেবতাকুলের শক্তি এবং লীলা বৈশিষ্ট্যের উপরেই যেন অন্ধবিশ্বাস ছিল, তখন ছিল না মনের ভাব প্রকাশের কোনো "ভাষা"। ঋতু চক্রের পরিবর্তনে জীবনকর্মের প্রয়োজনের তাগিদেই ধীরে ধীরেই নিরক্ষর মানুষ জাতিরাই সৃষ্টি করা শিখ ছিল ''ভাষা''। দীর্ঘ পথের পরিক্রমায় এমন নিরক্ষর মানব জাতি ভাষার সহিত অক্ষর আবিষ্কার করতে শিখে।এই মানব সমাজের উন্নয়ন বা অগ্রগমনের ইতিহাস যেমন বহুধা বিচিত্র। আবার সে উন্নয়নের পশ্চাতেই ক্রিয়াশীল শিক্ষার ইতিহাসও তেমনি "বিচিত্র কিংবা গতিময়"। এক একটি 'দেশ এবং জাতি' নানা ভাবেই নানা উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে বা তাদের সু-শিক্ষা ভাষা গড়ে তোলে। তাদেরই ভৌগোলিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক সহ ইত্যাদি উপাদান বারবারই সে সকল ব্যবস্থার পরিবর্তন এনেই যেন 'নবীকরণ ও সংস্কার' চালিয়ে সুশিক্ষার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তাই, এমন এই বাংলাদেশে 'প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস' শুরু হওয়ার এক বিশাল ইতিহাসও রয়েছে। আর সেই ইতিহাসটি 'নিরক্ষরতা' দূর করার জন্যেই বদ্ধপরিকর পরিবেশ সৃষ্টির এক ইতিহাস। এই পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই প্রায় ৪ শো বছরই বলা যায়, দীর্ঘদিনের একটি 'ইতিহাস'। আবারও বলি মানব সভ্যতার শুরু তো নিরক্ষরতার মাধ্যমেই, তাকে মোটা দাগের আলোকে অমর্ত্য সেন বলেছে, নিরক্ষর মানুষের হাতেই সমাজের সভ্যতার বড় বড় অনেক-"ভিত" গড়ে উঠেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে একটা সময় ছিল মানুষ তখন নিরক্ষর হয়েও শিক্ষা লাভ করে দেখিয়েছে। অনেক ধরনের 'ভাষা', কতো রকমের নানান 'অক্ষর' তাঁদের নিজস্ব হাত ও মুখ দ্বারাই যেন সৃষ্টি করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলাই যায়, নিরক্ষর মানুষ যে "জ্ঞানী ব্যক্তি" হননি এমনও বলতে চাই না। 'লালন শাহ' নিরক্ষর মানুষ কিন্তু বহু সাক্ষর মানুষ তাঁর কাছে যুক্তি তর্কে কখনো দাঁড়াতে পারেনি। তবুও যেন এই দেশের মানুষের সাক্ষরতার প্রয়োজন রয়েছে। অক্ষর আছে বলেই তো লালনের দর্শন ও গানগুলো আজও সমাজে রয়েছে। আসলে বলতে চাই যে, 'নিরক্ষরতা' যদি নাও দূর হয় তাহলে সবাই লালন শাহের মতো হয়ে যাবে। বলতে চাই যে, লালনসহ অনেক গুনী জনদের চিন্তা ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগটা বহুগুন বেড়ে যাবে।

সুতরাং, মানুষের কল্যাণেই যেন সাক্ষরতার দরকার আছে। সাক্ষরতা বিচরণের ক্ষেত্রটিকে বহুমুখী করে বাড়িয়ে তোলে অন্যের চিন্তা এবং অভিজ্ঞতার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। ১৯৭২ এ স্বাধীন বাংলাদেশে ১ম 'আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা' দিবসটিকে পালন করেছে। তাই প্রতি বছর এই দেশে সাক্ষরতা দিবসটি পালনের জন্য দেশের সরকার 'প্রাথমিক ও গণশিক্ষা' মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানেই ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। ইউনেস্কোর ইংরেজি থিমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে, ‘'সাক্ষরতা অর্জন করি, ডিজিটাল বিশ্ব গড়ি'’ এমনই স্লোগান সামনে রেখে, এ সরকার আগামীর ভবিষ্যৎ দেখছে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষা কিংবা সাক্ষরতার বিকল্প নেই। সাক্ষরতা মানুষকে কর্মদক্ষ করে, মানবসম্পদে পরিণত করে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিরক্ষর জন-গোষ্ঠী একটি অন্তরায়। সুতরাং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশা-পাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষারও গুরুত্ত্ব অপরিসীম। এ দেশের নিরক্ষর জন-গোষ্ঠী ও আষ্ঠানিক শিক্ষা হতে অনেক বঞ্চিত শিশু, কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে যুব ও বয়স্কদের 'সাক্ষরতা কিংবা মৌলিক শিক্ষা' প্রদানের পাশাপাশি যেন ট্রেডভিত্তিক দক্ষতা-প্রশিক্ষণ প্রদান হলে তারা উন্নত মানবসম্পদে পরিণত হয়েই দেশের 'অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা' রাখতে সক্ষম হবে। বর্তমান সরকার এইলক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নও করেছে। "সাক্ষরতার হার" বৃদ্ধির পেছনেই জাতির জনকের অবদান স্মরণে রাখা বাঞ্ছনীয়। এ অভিশাপ মোচনের লক্ষ্যেই যেন "বঙ্গবন্ধু"- গণমুখী শিক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়ে ছিল। ‘'ড. কুদরত-ই-খুদা'’ শিক্ষা কমিশন গঠনও করেছিল। তাই শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্য দূর করতে তিনি চেয়ে ছিল। কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সন্তানেরা যাতে নিরক্ষর না থাকে, সেই চিন্তা তিনিই করেছিল। শোষিতের ঘরে শিক্ষার আলো দান করতে চেয়েছিল। তাঁর প্রাণটিকে কেড়ে নেওয়ার কারণে সবকিছু ধূলায় লুণ্ঠিত হয়েছে। তাই সেই দিক থেকে- বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত গড়ে দিয়ে ছিল কৃষক সমাজের মাধ্যমেই, আজও তাঁরাই অর্থনীতিকে সচল রেখেছে শ্রম বা মেধা'র প্রচেষ্টায়।সেই "মজদুর" শ্রেণীরাই দেখা যাবে যে বেশির ভাগই তাঁরা "নিরক্ষর"। সাক্ষরতা সব সময় 'জ্ঞানের বাহন' নয়। তবুও 'নিরক্ষরতা থেকে মুক্তি' পাওয়ার জন্যেই সময়ের পরিক্রমায় সাক্ষরতার চাহিদাটাও বাড়ছে।নূন্যতম শিক্ষাযোগ্যতা অর্জন করা অবশ্যই দরকার রয়েছে। এ বাংলাদেশের অল্প শিক্ষিত ব্যক্তি আরজ আলী মাতব্বর শুধুমাত্র 'দ্বিতীয় শ্রেণী' পর্যন্ত পড়েও তিনি সুশিক্ষার আলো ছড়িয়েছে। বাংলা বই পড়েই যেন নানান প্রশ্ন মাথায় নিয়ে বহুকিছু রচনা করেছে, পাঠক সমাজে সমাদৃত হলেও এমন দুএকটি উদ্ধৃতি আঁকড়ে ধরে সামাজিক পরিমণ্ডলের দৃষ্টান্ত দেয়াটা অবশ্যই ব্যতিক্রম। সুতরাং নিরক্ষর থাকার সমস্যার দিক সত্যিই অনেক। আবার এ কথাও অবশ্যই সত্য মানুষ নিরক্ষর থাকলে তো আর না খেয়ে মারা যায় না। তবুও নিরক্ষরতা দূর করালে মানুষের বিচরণের সীমা বহু গুণ বেড়ে যায়। বাংলা সাহিত্যে'র একজন নন্দিত সু-লেখক "প্রমথ চৌধুরী" বলেছে, ‘'সুশিক্ষিত মানেই স্বশিক্ষিত।'’ স্বাক্ষর সম্পন্ন না হলে স্বশিক্ষিত হবেই বা কেমন করে। সুুতরাং কোন্ ব্যক্তি নিরক্ষর- সে ব্যক্তির স্বাক্ষর জ্ঞান নেই, তাঁর চেতনার মানটিও হবে অনেক নিম্ন মানের।

অজানাকে জানার মাধ্যম শুধু যে শিক্ষা বা সু-শিক্ষা তা কিন্তু নয়, ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন সেই সাথে শিক্ষার মাধ্যমে বহু অর্জিত জ্ঞানের দ্বারা বাস্তবতার সহিত খাপ খাওয়ায়েই সামনের দিকে চলার দক্ষতা অর্জন করাটাই 'শিক্ষা'। প্রতিটি বিশিষ্ট জাতি কিংবা সমাজে 'শিক্ষা' নামক বিষয়টির বোধ এবং তাৎপর্য ক্ষেত্রবিশেষে সমতাধর্মী কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে স্বতন্ত্র। একাধিক থেকেই দেখলে, ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের মানুষ একত্রিত হয়েই যেন সর্ব- বৃহৎ মানবগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। আর সেটিকে প্রকৃত অর্থে "সু-শিক্ষা" বলা যায়। এই মানবগোষ্ঠীর প্রভাব সামগ্রিক ভাবেই শিক্ষা নামক বোধটিকেই প্রভাবিত করে নানা ক্ষেত্রে, আবার অপরদিকে সমাজ কিংবা জাতি বিশেষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এবং লক্ষণ'কে সেই সমাজ বা জাতির শিক্ষা প্রক্রিয়াকেই অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে। একটু অতীতের দিকে তাকিয়ে ধরা যাক আদিম গোষ্ঠীর কথা, তখন থেকে বয়স্করা যুগ যুগ ধরে ছোটদেরকেই আগুনের ব্যবহার, মাছ ধরা, শিকার করা, গাছে চড়া, ডিঙি বা নৌকা তৈরিসহ তা চালানো, সাঁতার কাটা, যে কোনো বস্তুর ওজন এবং বস্তু বা মানুষের ক্ষমতার বিচার, দূূূূরত্বের বোধ, বসত বাড়ি কিংবা আশ্রয় তৈরি মতো অনেক বিষয়ে জ্ঞান নিয়ে থাকতো। এমন বেশ কিছু বিষয়ের পাশা পাশি ভাষা জ্ঞানের সহিত অক্ষর জ্ঞানেও দক্ষ হতে বয়স্ক ব্যক্তিরাই সহায়তা করতো। বয়স্করাই যে পরিপূর্ণতা নিয়ে সেই প্রস্তরযুগের আদিম মানুষ যথাযথ নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করতে পারতো তা নয়। সাময়িকভাবে তারা সমস্যার সমাধান করার কথা ভেবেই সেই সব মানুষ নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্যেই 'ভাষা কিংবা অক্ষর' আবিষ্কারের কথা ভেবে ছিল বা শিখে ছিল। শুরুতে নিরক্ষর মানুষের হাত ধরেই যেন নিজ ভাষা আসতে শুরু করেছে। তার পরেই তো আসে- অক্ষর জ্ঞান।

বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা'র সাথে বাংলা লিপি কিংবা অক্ষরের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলা লিপি কিংবা অক্ষর অথবা হরফের "উৎস ও উৎপত্তি" কী ভাবে হয়েছিল তা স্পষ্ট জানা না গেলেও গবেষণার মতে মনে করা হয়, বাংলা লিপি'র ব্যবহার খ্রিস্টাব্দ "একাদশ শতক" থেকেই প্রচলিত। ইংরেজ শাসনের বহু আগেই মুসলিম শাসনকালে তার শুরু। বাংলার সুলতানী শাসনে লিপির ব্যবহার এবং বাংলা ভাষার পুঁথি রচনা ব্যাপকতা পেতে থাকে। এমন এ "বাংলা" লিপির ব্যবহার প্রায়ই মধ্যযুগীয় ভারতের পূর্বাঞ্চলে যেন শুরু হয়েছিল। তারপরেই যেন পাল সাম্রাজ্যের মধ্যে ব্যবহার ছিল। আরো অনেক পরে বিশেষভাবে বাংলার অন্য অঞ্চলেও ব্যবহার অব্যাহত ছিল। এর পর 'বাংলা' লিপিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বের অধীনে 'ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর' এর দ্বারাই 'আধুনিক বাংলা' লিপিতে 'প্রমিত' করা হয়েছে। তাই বর্তমানে এই 'বাংলা লিপি কিংবা অক্ষর' বাংলাদেশ ভারতে সরকারী লিপিতেই পদমর্যাদা স্থান পেয়েছে।সুতরাং, বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে। তাই, অক্ষর দিয়েই তৈরি হয়েছে "পুঁথি বা গ্রন্থ", সে সকল গ্রন্থের মধ্যেই মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ হয়ে থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সব শ্রেণী পেশার মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণার কথাও ভাষার সাহায্যে বহু গ্রন্থের মধ্যেই লিপিবদ্ধ। বর্তমান কালেই তার বিশাল ব্যাপ্তি, বিচিত্র তার আকার। এই সম্পর্কে আরো পরিস্কার পরিসংখ্যানের আলোকেই বলতে চাই, গোপাল হালদার তাঁর "বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা" গ্রন্থে দেখিয়েছে যে, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলেই যেন 'বাংলা সাহিত্যে'র' বহু উন্নতি হয়েছিল। পাশাপাশি সতেরো শতকের মধ্যেই "পাঠশালা" নামক প্রারম্ভিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষায় সাক্ষরতা লাভ বা অ আ ক খ ইত্যাদি অক্ষর পরিচয়েরও সন্ধান মেলে। "বাংলা পাঠশালা" নামক প্রাথমিক শিক্ষার এক 'প্রথাবদ্ধ ধারা' চালু হয়ে ছিল সতেরো শতকে ইংরেজরা এই দেশ দখলের অনেক পূর্বেই। বিভিন্ন বাংলা সাহিত্যে পাঠশালা সম্পর্কে যা জানা যায় তা থেকে ধারণার আলোকে বলা যায় যে সতেরো শতকের আগেই হয়তো "পাঠশালা" শিক্ষার শুরু। সে হিসেবে বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার বয়স চার শো বছরের কম নয়। সুতরাং, 'বাংলা ভাষার অক্ষর' শিক্ষা কয়েক জন্মের মানুষরা তাকে পাঠ করে শেষ করতেও পারবে না। তাই তো,- ''মানুষের নিরক্ষরতা" দূর করতে এমন সব ''পুঁথি কিংবা বই'' পাঠ করবার সুযোগ দীর্ঘদিনের এক বৃহৎ ইতিহাস। আবার তাকে দিয়েইতো অন্যের বিচিত্র চিন্তার সাথে নিজের চিন্তা ভাবনার আদান-প্রদান করা যায়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরেই যেন 'সাক্ষরতা' শব্দের প্রথম উল্লেখ হয়েছে ১৯০১ সালে জণগন বা 'লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে'। সেই শুরুতে স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নামধাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০-এর দিকে পড়া লেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। ষাটের দশকেই পড়া এবং লেখার দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই যেন স্বাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখা-পড়া এবং হিসাব-নিকাশের পাশা পাশি সচেতনতা কিংবা দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পড়ার ক্ষমতার সঙ্গেসঙ্গেই যেন তারা সাক্ষরতার দক্ষতাতেই স্বীকৃতি পায়। সুুতরাং-আধুনিক তথাকথিত সভ্য সমাজের শিক্ষার ধারাতে এমন ইতিহাসের কথাগুলো বাংলাদেশের বেশ কিছু দক্ষতা বা নৈপুণ্যের শিক্ষা অথবা বৃত্তিমূলক শিক্ষার শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করবার কথা ভাবায়। কারণ,- যত দিন যায় 'সভ্যতা ও অগ্রগতির বিকাশ' হতেই থাকে, ততই বাস্তব প্রয়োজনের নিরিখে দরকার হয় শিক্ষা।সুতরাং, বয়স্ক সমাজেরই পরম্পরাগত কিছু নির্দেশ-অভিমুখী শিক্ষা যার মধ্যেই যেন "জ্ঞান নৈপুণ্য আর মূল্যবোধের সম্ভার' ওতেপ্রাত হয়ে থাকে। এপৃথিবীর প্রতিটি উন্নত দেশের মানুষ ১ শো ভাগ উচ্চ শিক্ষিত না হলেও ১০০ ভাগ স্বাক্ষর সম্পন্ন তা জোর দিয়েই বলা যায়। জ্ঞানের আঁধার মানুষের সুখ এবং সুবিধা নিশ্চিত করে, স্বল্প সম্পদের বহু-বিধ ব্যবহার অথবা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে, সুদক্ষ ও যোগ্য জন-শক্তি গড়তে শিক্ষার আমূল পরিবর্তন বর্তমান সময়ের চাহিদা। তত্ত্ব বা তথ্যে'র- প্রায়োগিক শিক্ষায় উৎপাদনমুখী সমাজে তার প্রয়োজন গভীর ভাবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এই সাক্ষরতার সহিত জীবন নির্বাহী দক্ষতা, যোগাযোগের জন্যেই দক্ষতা, ক্ষমতায়নের জন্য দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাতেও সংযোজিত হয়েছে। একটি
দেশের জন্যই 'সাক্ষরতা' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে 'সাক্ষরতা' আর সাক্ষরতার সঙ্গেই যেন দেশের উন্নয়নের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে দেশের সাক্ষরতার হার যত বেশি সেদেশ তত উন্নত। স্বাক্ষর জাতি সচেতন জাতি। শিক্ষা সাধারণত ৩ টি উপায়ে অর্জিত হয়। যা- 'আনুষ্ঠানিক', 'উপানুষ্ঠানিক' কিংবা 'অনানুষ্ঠানিক'। যারা "আনুষ্ঠানিক শিক্ষা" বঞ্চিত বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি তাদের স্বাক্ষরতার জন্যই 'উপানুষ্ঠানিকভাবেই শিক্ষা' দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সরকারি প্রচেষ্টার বাইরে বিভিন্ন এনজি সংস্থাগুলো 'সাক্ষরতা' বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক বাংলাদেশ গঠন করতে প্রত্যেকের অবস্থান থেকেই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সাক্ষরতাই হচ্ছে শত ভাগ শিক্ষিত করার প্রাথমিক ধাপ। সেইজন্য নিরক্ষরতা, ক্ষুধা বা দারিদ্র্য হলো দেশের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। এ সকল সমস্যাকে মোকাবেলা করতে পারে কেবল মাত্র শিক্ষা। প্রতিটি নাগরিককে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতেই সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার জরুরি।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত