যুক্তরাষ্ট্রে আজ শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

|   ঢাকা - 03:05pm

|   লন্ডন - 09:05am

|   নিউইয়র্ক - 04:05am

  সর্বশেষ :

  হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বকে বিশ্বজিৎ দে বাবলুর অভিনন্দন   ফ্লোরিডায় পিঠা মেলা অনুষ্ঠিত   ‘সেক্সিয়েস্ট এশিয়ান ওম্যান’ আলিয়া ভাট   ইতালীতে মহিলা সংস্থার বিজয় ফুল উৎসব   সেনাদের বিচারে মিয়ানমারের আশ্বাসে আস্থা নেই: গাম্বিয়া   বালিশকাণ্ড: মাসুদুলসহ ১৩ প্রকৌশলী গ্রেপ্তার   বেগম খালেদা জিয়ার জামিন হয়নি   গাজীপুরে ডায়রিয়ার প্রকোপ, পাঁচজনের মৃত্যু   যুক্তরাজ্যে আজ ভোট   নাইজারে সেনা ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা, নিহত ৭১   নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদে আসামে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় জনতা, গুলিতে নিহত ৩   বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের দৃষ্টান্ত নেই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী   সেনাপ্রধানসহ মিয়ানমারের ৪ কর্মকর্তার ওপর ফের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা   দিল্লির দূষণ নিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির অবাক করা বক্তব্য   নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদে উত্তাল ত্রিপুরা, মোবাইল-ইন্টারনেট সেবা বন্ধ

>>  কলাম এর সকল সংবাদ

মনের সুখই আসল সুখ

মানুষের এই জগত জীবন অতি সংক্ষিপ্ত জীবন। তাদের আছে দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি, আশা-ভরসা, সফলতা বা বিফলতার জীবন। এরই মধ্যে জীবনের নানা অপূূর্ণতাকে নিয়েই মানুষ অভিযোগ কিংবা ক্ষোভও প্রকাশ করে থাকে। তারা জীবন যাপনের অংশে যেন অনন্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আফসোস করে। তারা কোনোদিন তা পরিপূর্ণ করতে পারে না বা কোনো দিনই পরিতৃপ্ত হতে পারে না। কেউ কেউ খুব কঠোর পরিশ্রম করে সফল হলে বলতেই হয়, তা সৃষ্টিকর্তারই নিয়ামত। আসলে সুখ-শান্তির প্রত্যাশা হলো- মানুষদের সহজাত প্রবণতার একে বারেই ভিন্ন দিক। তাকে জোর জবরদস্তি করে কখনোই আদায় করা যায় না। ইসলাম চেয়েছে দেহ এবং মনের প্রয়োজন সমভাবে

বিস্তারিত খবর

অন্তরঙ্গ আলোকে: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১৬ ১১:৪৪:০৯

গণের মানুষ, মনের মানুষ, ঘরের মানুষ বাঙালী জাতির হাজার বছরের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।  উনার অন্তরঙ্গ আলোকে আলোকিত হয়েছি আমি মহা ভাগ্যবান অথচ কেহ নহি, মোট চার বার।

প্রথম বার - আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচীব এনায়েত করিম যখন ইন্তেকাল করেন ঢাকার  পি.জি. হাসপাতালে ১৯৭৪ সালের ২৪শে ফেব্রূয়ারি অতি ভোর বেলায়। মৃত্যু সংবাদে উনি চলে এসেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, "লোকটাকে আমিই মেরে ফেললাম। কেন উনাকে অর্ডার দিলাম না, আপনি আমেরিকাতেই থাকেন, এম্বাসেডর থাকেন বা জাতিসংঘে যান।" প্রেক্ষাপট হল, আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসের সর্বউর্ধতন বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে করিম ডিফেকশনের মাধ্যমে নিজ বাসভবনে বাংলাদেশ মিশন খোলেন এবং স্বাধীন  বাংলাদেশের লক্ষ্যে কাজ করা কালীন দুটি হৃদরোগ আক্রমণের শিকার হন। সর্বজন বিদিত যে তৃতীয় হৃদরোগ আক্রমণের হাত থেকে প্রাণ ফিরে পাওয়া দুষ্কর। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা তাঁকে পরোক্ষে দিয়েছিল এরূপ - তুমি এখানে বসে বাংলাদেশের জন্য কাজ করছো, দেশে তোমার বাবা মা ভাই বোনেরা নেই? কঠিন পরিশ্রম, তার উপরে এই মানসিক চাপ তাকে দুটি হার্ট এটাক দেয়। ডিসেম্বর আনুমানিক ১৪ তারিখে আলবদর বাহিনী তার বাবাকে উত্তোলন করতে গিয়েছিল। 

দ্বিতীয়বার - গুলশান এক নম্বর মার্কেটের ঠিক পেছন দিকে এনায়েত করিমের একতলা বাসভবনে যখন তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় একই মৃত্যুদিবসের সকালে। করিমের সুপরিসর ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং রুমের ড্রয়িং অংশের মাঝ বরাবর তাঁর মরদেহ রাখা হয়। যথা সময়ে প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান সেখানে আসেন ও মরদেহের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেন খানিকক্ষন। অনুমান হয় জাতির পিতার মনে তখন হয়তোবা এনায়েত করিমের সাথে তাঁর সুদীর্ঘ দিনের পরিচয়ের স্মৃতিগুলো সিনেমার দৃশ্যের মত একের পর এক খেলে যাচ্ছিল। সেই ১৯৫১-৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় উভয়ের একত্রে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবরণ, আটক অন্যান্য ভাষা সৈনিকদের সাথে। একজন ছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ ইয়াহিয়া যার কবর পাথরে খোদিত, "এখানে শায়িত ভাষাসৈনিক ......."।  করিমের বাসভবনে তখন ছিলেন করিমের পিতা এডভোকেট মোঃ ইয়াসিন। উনি বলছেন বঙ্গবন্ধুকে, "আপনারা দুইজন তখন জেলখানায়, জেলগেটের সামনে আপনার বাবা (শেখ লুৎফুর রহমান) আর আমি টিফিন ক্যারিয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম।"  সামনে করিমের দ্বিতীয় কন্যা শাহলা ও আমি দাঁড়ানো ছিলাম, জাতির পিতা শাহলার মাথায় একটা হাত রাখেন, কিন্তু তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, সেভাবেই বললেন, "কোনো চিন্তা নাই, আমি আছি।"  বঙ্গবন্ধু আনুমানিক তিরিশ মিনিট ছিলেন। মরহুম করিমের পত্নী হোসনে আরা করিম সেখানে ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে এক বৎসর পরিচালক, ওয়াশিংটন ডি.সি.তে পাঁচ বছর ভিসা ও পলিটিক্যাল কাউন্সেলর, অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ বছর অনুরূপ পরন্তু ডেপুটি হাই কমিশনার ও সর্বশেষ, মন্ত্রণালয়ে দুই বৎসর ডাইরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ত্ব পালন করেন। উনার দফতর ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নেপাল ও ভুটান সহ। বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরার মধ্যে এই সময়ে কোন বাক্য বিনিময় হয়নি।

তৃতীয়বার - সেদিনই রাত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আবার আসেন। আমি তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। গৃহের একমাত্র ইয়ং ম্যান হিসেবে আমি প্রধান মন্ত্রীর আসন্ন আগমন সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় বিশেষত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে সজাগ দায়িত্ত্ব পালনে তৎপর হয়েছিলাম। পোর্টিকোর সামনের বারান্দায় সারিবদ্ধ ভাবে দন্ডায়মান ছিলেন হোসনে আরা করিমের ছয় কনিষ্ঠ ভগিনীদের স্বামীগন - এনিম্যাল হাসবেনড্রির ডেপুটি পরিচালক আবুল ফয়েজ, পরিকল্পনার ডেপুটি সেক্রেটারি হায়দার আলী, তথ্য ও বেতারের ডেপুটি ডাইরেক্টর আসিফ আলী, লিভার ব্রাদার্সের ক্রেতাপ্রধান আজিজুর রহমান, ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম, ও সর্বশেষ টেলিফোন ও তার যোগাযোগের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। উনাদের পিছনে গৃহে প্রবেশের প্রধান দরজা, ডাইনে ডাইনিং স্পেসের দরজা বন্ধ, বামে আমার ঘরের দরজা বন্ধ। পাকের ঘরের সামনে বাইরে বাহিরিবার দরজা তালাবন্ধ, সর্বপিছনের বারান্দার দরজা তালাবন্ধ, গৃহের ডানদিকে হলওয়ের দরজা তালাবন্ধ। ইতিমধ্যে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি বন্দুক হাতে কয়েকজন সেনা প্রহরী দালানের চারিদিকে অবস্থান নিয়েছেন। বুঝলাম প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি এখনই ঢুকবে। পোর্টিকোতে দেখলাম বঙ্গবন্ধুর গাড়ি দাঁড়ানো, উনি তখনো সমাসীন, পোর্টিকোর বারান্দায় ছয় ভদ্রলোক পিছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি সেখানে গেলে তিনচারজন বলে উঠলেন, "ওই তো ঝন্টু এসেছে!" যেন প্রধানমন্ত্রীকে গাড়ি থেকে নামানো আমারই দায়িত্ত্ব। ড্রাইভ ওয়েতে ঢুকে গাড়ির মুখ সামনে, বন্ধ মেইন গেটের সামনে ও পিছনে দুজন করে বন্দুক হাতে দাঁড়ানো। বাঁ হাতে গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল ধরে ডান হাত জানালা দিয়ে ঢোকানো মাত্র বঙ্গবন্ধু উনার বিশাল থাবা দিয়ে আমার ডান হাত খপ করে ধরেছেন, "দেখি এখন ক্যামনে নামান!", "এটা কোন ব্যাপার না!" বলে আমি উনার ডান হাত আমার বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে গাড়ির দরজা খুললাম, উনার ডান হাত আবার আমার ডান হাতে নিয়ে বাঁ হাতে গাড়ির দরজা সম্পূর্ণ খুলে ধরলাম। ততক্ষনে উচ্চস্বরে উনার "হা-হা" হাসি শুরু হয়ে গিয়েছে, "শাবাশ!" বলে সেভাবেই হাসতে হাসতে আমর ডান কাঁধে হাত দিয়ে কার যেন খুলে দেওয়া দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। "কি নাম তোমার?", "ঝন্টু", "ঝন্টু!?, এইটা আবার একটা নাম হইলো?" উনার ছাদ ফাটানো সে-কি বিরাট অট্টহাস্য, থামতেই চায় না। এই সময় হোসনে আরা অনুচ্চ স্বরে উনাকে কিছু বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু মাথা সামান্য ঝুকিয়ে সেটা শুনলেন। আমি উনার অটোগ্রাফ কোথায় নেবো তাড়াতাড়িতে আমার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান দেহরক্ষী আমার গমনপথের দিকে সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আমি তাড়াতাড়িতে আমার গীতবিতান নিয়ে উনার সামনে মলাট উল্টিয়ে ধরলাম, উনি লিখে দিলেন, "ঝন্টুকে শুভেচ্ছা সহ"।  
 
বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত দিয়ে ঘরে ঢোকার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখি সেখানে আরো রয়েছেন ফরেন মিনিস্টার ডঃ কামাল হোসেন, ডেপুটি ফরেন সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন আহমেদ, পশ্চিম ইউরোপের ডি.জি. নবাব পরিবারের খড়গনাসা কায়সার মোর্শেদ, পূর্ব ইউরোপ সংক্রান্ত ডি.জি. রেজাউল করিম এবং পশ্চিম আফ্রিকা সংক্রান্ত ডি.জি. শামসুল আলম। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার বিষয়ে হোসনে আরার কথা শেষ হতেই সামনে এগিয়ে এসে ডি.জি. শামসুল আলম আমার দিকে খানিক ইশারা করে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, "স্যার উনি ফরেন অফিস জয়েন করবেন।" প্রধান মন্ত্রী আমাকে বললেন, "খালি জয়েন করলেই হইবো! করিমের মত ন্যাশনালিস্ট হইতে পারবা? এর পরে ডাইনিং স্পেসে ডাইনিং টেবিলে বসে বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরা মাথা নামিয়ে কিছু আলোচনা করলেন। সেখানে আলোচনা হয় হোসনে আরা এক বৎসর পরিচালক হিসেবে কাজ করে ওয়াশিংটন ডি.সি. যাবেন ও আমি দুই-তিন মাস পর ফাইনাল ইয়ার শেষ করে প্রারম্ভিক "সেকশন অফিসার" হিসেবে যোগ দিতে পারবো। বঙ্গবন্ধু সহ বাকি সকলের প্রস্থানের পর ফখরুদ্দিন আহমেদ আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বললেন এনায়েত করিমের কালো ফ্যালকন ৫০০ হোসনে আরা ব্যবহার করতে থাকবেন। পরের দিন সকালে দেখি পোর্টিকোর নিচে গাড়িটা দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধুর ডান হাত বিবেচিত এনায়েত করিমের ৩১ নম্বর রাস্তায় তৎকালীন দোতলা বাড়ি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ভবনের ঠিক পেছনে, কমন বাউন্ডারি দেয়াল। করিমকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "রিটায়ার করার পর আমরা বাউন্ডারি ওয়ালে একটা দরজা বানাবো, একদিন আমার উঠানে আর একদিন আপনার উঠানে বসে আমরা চা খাবো আর দাবা খেলব।" হায় কি হল! ১৯৭৪-এ ইন্তেকাল করলেন এনায়েত করিম, ১৯৭৫-এ বিপথগামী কিছু সেনা অফিসার নৃশংস ভাবে হত্যা করলো জাতির পিতা সহ উনার পুরো পরিবার। দুই বোন বিদেশে থাকার কারণে নিস্তার পেয়ে যান। সদ্য সমাপ্ত করিমের দুইতলার ছাদে আমি খেলতাম, উল্টোদিকের ছাদে দেখতাম আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানা ও ভাই শেখ কামাল ক্রীড়ারত।       

চতুর্থ বার - ১৯৭৪-এর মাঝামাঝি এক সরকারি ছুটির রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেলে হোসনা আরা আমাকে বললেন, "ঝন্টু শিগগির রেডি হও, আমরা প্রধান মন্ত্রীর বাসায় যামু।" করিমের অফিশিয়াল কালো ফ্যালকন উনি কয়েকদিন মাত্র ব্যবহার করে ফেরত দিয়ে দেন ও পারিবারিক প্রায় নতুন সাদা চার দরজা মাজদা ১৬০০ ব্যবহার শুরু করেন। গাড়িটা বেশ ভারী ছিল। উনি চালাচ্ছেন, আমি পাশে বসা। গাড়িটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভিতরে পার্ক করে পেছনে হেঁটে পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকে আলাদা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় আমরা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে উঠলাম। পেছন দিকে ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিল, তার সামনে ট্রিপল সোফায় বঙ্গবন্ধু বসা ছিলেন, উনার পেছনে কাজের ছেলেটা সোফায় ভর দিয়ে তাকিয়ে আছে, মাঝে ছোট সেন্টার টেবিল, উল্টো দিকের ডাবল সোফায় হোসনে আরা বসলেন, আমি সিঙ্গেল সোফাটায় বসলাম। বঙ্গবন্ধুর পরনে সাদা বেশ ঢিলা পাজামা, ততোধিক ঢিলা সাদা পাঞ্জাবির হাতা হাতের কব্জি পেরিয়ে প্রায় আঙুলের মাথা পর্যন্ত। জাতির পিতার ঢুলু ঢুলু চোখ চেহারায় গভীর প্রশান্তির ছাপ, বাংলাদেশকে উনি স্বাধীন করে দিয়েছেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালী জাতিকে উনি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। কাজের ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, "অই মেহমানদের চা দিবি কি দিয়া?", "নানা কেক আছে দিই?" উনি মৃদু মাথা নেড়ে যায় দিলেন। ফ্রট কেক আর চা। হোসনে আরা কিছু নিলেন না, জাতির পিতা চায়ের কাপে দুই-তিন চুমুক দিয়ে সেটা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি ছোট এক পিস্ কেক শেষ করলাম, কাপের চা প্রায় শেষ করলাম, উনি বেশ আমুদে চোখে হালকা অবলোকন করছেন। ছেলেটা টেবিল পরিষ্কার করলো। জাতির পিতা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঝন্টু সাহেব কিছু বলেন।", "কি বলবো?" , "এই যেমন প্রথম দিকে কত কত ব্যাংক ডাকাতি হইলো, দুইটা একটা এখনো হয়, সবাই বলে আমি যথেষ্ট কড়া না।"  আমি একটু চিন্তায় পড়লাম, ভাবছি এত কঠিন একটা প্রশ্ন! উনি সামান্য হেসে বললেন, "তোমার যা বলার নির্ভয়ে বলো।" উনি আমাকে পরীক্ষা করছেন। আমি বললাম, "সংবাদ পত্রের খবরে জানা যায় এই ডাকাতিগুলো হয়েছে অনেকাংশে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা আধুনিক পিস্তল ব্যবহার করে। আমার অনুমান হয় প্রথম দিকে এটা যারা করেছিল বা এখনো মাঝে মধ্যে করে তাদের মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা, এই পরিস্থিতি তো চিরদিন থাকবে না, অচিরেই শেষ হবে বলে আমার বিশ্বাস।" উনি শুনতে শুনতে একটু সোজা হয়ে বসেছেন, "ঝন্টু, একটা বাচ্চা ছেলে হইয়াও তুমি যেটা বুঝলা, আমি মানীগুণী মানুষদেরে সেইটা ক্যামনে বুঝাবো?" উনার চেহারা এখন সজাগ, মৃদুহাসি। আমার কূটনৈতিক উত্তরে উনি সন্তুষ্ট। "আর কোন উপদেশ!", "আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণে তেল অনুসন্ধানে প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে। ভারত বলছে এই তেল-গ্যাসে নাকি তাদের ভাগ রয়েছে, আমরা একতরফা ভাবে তেল উত্তোলন করতে পারবো না। আমার কথা হল তারা তাদের অংশে উত্তোলন করে না কেন, কে বাধা দিচ্ছে! আমার মনে হয় সমুদ্র-সীমা বা "maritime law" আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে জ্বালানি দফতরের দায়িত্ত্ব দিলে ভালো হবে। জাতির পিতার কিছুটা  আশ্চর্যান্বিত সহাস্য চেহারা আমার মনে আছে। "আমি তো ইতিমধ্যে ব্যারিস্টার কামালকে এই দায়িত্ত্ব দিবার ডিসিশন নিয়েছি!" হোসনে আরা এই সমস্ত সময়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করেননি, বলার জন্য নিয়ে গিয়েছেন আমাকে। আমরা চলে আসার সময় সিঁড়ির মাথায় একটু ঝুকে আমার মাথায় উনার সুবিশাল উষ্ণ থাবা বসিয়ে সামনে থেকে পিছনে একটু বুলিয়ে দিলেন, "তুমি আবার আসবা।" আমার আর যাওয়া হয়নি।              

বিস্তারিত খবর

অন্তরঙ্গ আলোকে: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১৬ ১১:৪২:৫৪

গণের মানুষ, মনের মানুষ, ঘরের মানুষ বাঙালী জাতির হাজার বছরের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।  উনার অন্তরঙ্গ আলোকে আলোকিত হয়েছি আমি মহা ভাগ্যবান অথচ কেহ নহি, মোট চার বার।

প্রথম বার - আমেরিকায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচীব এনায়েত করিম যখন ইন্তেকাল করেন ঢাকার  পি.জি. হাসপাতালে ১৯৭৪ সালের ২৪শে ফেব্রূয়ারি অতি ভোর বেলায়। মৃত্যু সংবাদে উনি চলে এসেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, "লোকটাকে আমিই মেরে ফেললাম। কেন উনাকে অর্ডার দিলাম না, আপনি আমেরিকাতেই থাকেন, এম্বাসেডর থাকেন বা জাতিসংঘে যান।" প্রেক্ষাপট হল, আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসের সর্বউর্ধতন বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে করিম ডিফেকশনের মাধ্যমে নিজ বাসভবনে বাংলাদেশ মিশন খোলেন এবং স্বাধীন  বাংলাদেশের লক্ষ্যে কাজ করা কালীন দুটি হৃদরোগ আক্রমণের শিকার হন। সর্বজন বিদিত যে তৃতীয় হৃদরোগ আক্রমণের হাত থেকে প্রাণ ফিরে পাওয়া দুষ্কর। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা তাঁকে পরোক্ষে দিয়েছিল এরূপ - তুমি এখানে বসে বাংলাদেশের জন্য কাজ করছো, দেশে তোমার বাবা মা ভাই বোনেরা নেই? কঠিন পরিশ্রম, তার উপরে এই মানসিক চাপ তাকে দুটি হার্ট এটাক দেয়। ডিসেম্বর আনুমানিক ১৪ তারিখে আলবদর বাহিনী তার বাবাকে উত্তোলন করতে গিয়েছিল। 

দ্বিতীয়বার - গুলশান এক নম্বর মার্কেটের ঠিক পেছন দিকে এনায়েত করিমের একতলা বাসভবনে যখন তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় একই মৃত্যুদিবসের সকালে। করিমের সুপরিসর ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং রুমের ড্রয়িং অংশের মাঝ বরাবর তাঁর মরদেহ রাখা হয়। যথা সময়ে প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান সেখানে আসেন ও মরদেহের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেন খানিকক্ষন। অনুমান হয় জাতির পিতার মনে তখন হয়তোবা এনায়েত করিমের সাথে তাঁর সুদীর্ঘ দিনের পরিচয়ের স্মৃতিগুলো সিনেমার দৃশ্যের মত একের পর এক খেলে যাচ্ছিল। সেই ১৯৫১-৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় উভয়ের একত্রে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবরণ, আটক অন্যান্য ভাষা সৈনিকদের সাথে। একজন ছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ ইয়াহিয়া যার কবর পাথরে খোদিত, "এখানে শায়িত ভাষাসৈনিক ......."।  করিমের বাসভবনে তখন ছিলেন করিমের পিতা এডভোকেট মোঃ ইয়াসিন। উনি বলছেন বঙ্গবন্ধুকে, "আপনারা দুইজন তখন জেলখানায়, জেলগেটের সামনে আপনার বাবা (শেখ লুৎফুর রহমান) আর আমি টিফিন ক্যারিয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম।"  সামনে করিমের দ্বিতীয় কন্যা শাহলা ও আমি দাঁড়ানো ছিলাম, জাতির পিতা শাহলার মাথায় একটা হাত রাখেন, কিন্তু তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, সেভাবেই বললেন, "কোনো চিন্তা নাই, আমি আছি।"  বঙ্গবন্ধু আনুমানিক তিরিশ মিনিট ছিলেন। মরহুম করিমের পত্নী হোসনে আরা করিম সেখানে ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে এক বৎসর পরিচালক, ওয়াশিংটন ডি.সি.তে পাঁচ বছর ভিসা ও পলিটিক্যাল কাউন্সেলর, অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ বছর অনুরূপ পরন্তু ডেপুটি হাই কমিশনার ও সর্বশেষ, মন্ত্রণালয়ে দুই বৎসর ডাইরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ত্ব পালন করেন। উনার দফতর ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নেপাল ও ভুটান সহ। বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরার মধ্যে এই সময়ে কোন বাক্য বিনিময় হয়নি।

তৃতীয়বার - সেদিনই রাত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আবার আসেন। আমি তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। গৃহের একমাত্র ইয়ং ম্যান হিসেবে আমি প্রধান মন্ত্রীর আসন্ন আগমন সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় বিশেষত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে সজাগ দায়িত্ত্ব পালনে তৎপর হয়েছিলাম। পোর্টিকোর সামনের বারান্দায় সারিবদ্ধ ভাবে দন্ডায়মান ছিলেন হোসনে আরা করিমের ছয় কনিষ্ঠ ভগিনীদের স্বামীগন - এনিম্যাল হাসবেনড্রির ডেপুটি পরিচালক আবুল ফয়েজ, পরিকল্পনার ডেপুটি সেক্রেটারি হায়দার আলী, তথ্য ও বেতারের ডেপুটি ডাইরেক্টর আসিফ আলী, লিভার ব্রাদার্সের ক্রেতাপ্রধান আজিজুর রহমান, ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম, ও সর্বশেষ টেলিফোন ও তার যোগাযোগের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। উনাদের পিছনে গৃহে প্রবেশের প্রধান দরজা, ডাইনে ডাইনিং স্পেসের দরজা বন্ধ, বামে আমার ঘরের দরজা বন্ধ। পাকের ঘরের সামনে বাইরে বাহিরিবার দরজা তালাবন্ধ, সর্বপিছনের বারান্দার দরজা তালাবন্ধ, গৃহের ডানদিকে হলওয়ের দরজা তালাবন্ধ। ইতিমধ্যে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি বন্দুক হাতে কয়েকজন সেনা প্রহরী দালানের চারিদিকে অবস্থান নিয়েছেন। বুঝলাম প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি এখনই ঢুকবে। পোর্টিকোতে দেখলাম বঙ্গবন্ধুর গাড়ি দাঁড়ানো, উনি তখনো সমাসীন, পোর্টিকোর বারান্দায় ছয় ভদ্রলোক পিছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি সেখানে গেলে তিনচারজন বলে উঠলেন, "ওই তো ঝন্টু এসেছে!" যেন প্রধানমন্ত্রীকে গাড়ি থেকে নামানো আমারই দায়িত্ত্ব। ড্রাইভ ওয়েতে ঢুকে গাড়ির মুখ সামনে, বন্ধ মেইন গেটের সামনে ও পিছনে দুজন করে বন্দুক হাতে দাঁড়ানো। বাঁ হাতে গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল ধরে ডান হাত জানালা দিয়ে ঢোকানো মাত্র বঙ্গবন্ধু উনার বিশাল থাবা দিয়ে আমার ডান হাত খপ করে ধরেছেন, "দেখি এখন ক্যামনে নামান!", "এটা কোন ব্যাপার না!" বলে আমি উনার ডান হাত আমার বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে গাড়ির দরজা খুললাম, উনার ডান হাত আবার আমার ডান হাতে নিয়ে বাঁ হাতে গাড়ির দরজা সম্পূর্ণ খুলে ধরলাম। ততক্ষনে উচ্চস্বরে উনার "হা-হা" হাসি শুরু হয়ে গিয়েছে, "শাবাশ!" বলে সেভাবেই হাসতে হাসতে আমর ডান কাঁধে হাত দিয়ে কার যেন খুলে দেওয়া দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। "কি নাম তোমার?", "ঝন্টু", "ঝন্টু!?, এইটা আবার একটা নাম হইলো?" উনার ছাদ ফাটানো সে-কি বিরাট অট্টহাস্য, থামতেই চায় না। এই সময় হোসনে আরা অনুচ্চ স্বরে উনাকে কিছু বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু মাথা সামান্য ঝুকিয়ে সেটা শুনলেন। আমি উনার অটোগ্রাফ কোথায় নেবো তাড়াতাড়িতে আমার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান দেহরক্ষী আমার গমনপথের দিকে সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আমি তাড়াতাড়িতে আমার গীতবিতান নিয়ে উনার সামনে মলাট উল্টিয়ে ধরলাম, উনি লিখে দিলেন, "ঝন্টুকে শুভেচ্ছা সহ"।  
 
বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত দিয়ে ঘরে ঢোকার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখি সেখানে আরো রয়েছেন ফরেন মিনিস্টার ডঃ কামাল হোসেন, ডেপুটি ফরেন সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন আহমেদ, পশ্চিম ইউরোপের ডি.জি. নবাব পরিবারের খড়গনাসা কায়সার মোর্শেদ, পূর্ব ইউরোপ সংক্রান্ত ডি.জি. রেজাউল করিম এবং পশ্চিম আফ্রিকা সংক্রান্ত ডি.জি. শামসুল আলম। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার বিষয়ে হোসনে আরার কথা শেষ হতেই সামনে এগিয়ে এসে ডি.জি. শামসুল আলম আমার দিকে খানিক ইশারা করে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, "স্যার উনি ফরেন অফিস জয়েন করবেন।" প্রধান মন্ত্রী আমাকে বললেন, "খালি জয়েন করলেই হইবো! করিমের মত ন্যাশনালিস্ট হইতে পারবা? এর পরে ডাইনিং স্পেসে ডাইনিং টেবিলে বসে বঙ্গবন্ধু ও হোসনে আরা মাথা নামিয়ে কিছু আলোচনা করলেন। সেখানে আলোচনা হয় হোসনে আরা এক বৎসর পরিচালক হিসেবে কাজ করে ওয়াশিংটন ডি.সি. যাবেন ও আমি দুই-তিন মাস পর ফাইনাল ইয়ার শেষ করে প্রারম্ভিক "সেকশন অফিসার" হিসেবে যোগ দিতে পারবো। বঙ্গবন্ধু সহ বাকি সকলের প্রস্থানের পর ফখরুদ্দিন আহমেদ আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বললেন এনায়েত করিমের কালো ফ্যালকন ৫০০ হোসনে আরা ব্যবহার করতে থাকবেন। পরের দিন সকালে দেখি পোর্টিকোর নিচে গাড়িটা দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধুর ডান হাত বিবেচিত এনায়েত করিমের ৩১ নম্বর রাস্তায় তৎকালীন দোতলা বাড়ি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ভবনের ঠিক পেছনে, কমন বাউন্ডারি দেয়াল। করিমকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "রিটায়ার করার পর আমরা বাউন্ডারি ওয়ালে একটা দরজা বানাবো, একদিন আমার উঠানে আর একদিন আপনার উঠানে বসে আমরা চা খাবো আর দাবা খেলব।" হায় কি হল! ১৯৭৪-এ ইন্তেকাল করলেন এনায়েত করিম, ১৯৭৫-এ বিপথগামী কিছু সেনা অফিসার নৃশংস ভাবে হত্যা করলো জাতির পিতা সহ উনার পুরো পরিবার। দুই বোন বিদেশে থাকার কারণে নিস্তার পেয়ে যান। সদ্য সমাপ্ত করিমের দুইতলার ছাদে আমি খেলতাম, উল্টোদিকের ছাদে দেখতাম আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানা ও ভাই শেখ কামাল ক্রীড়ারত।       

চতুর্থ বার - ১৯৭৪-এর মাঝামাঝি এক সরকারি ছুটির রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেলে হোসনা আরা আমাকে বললেন, "ঝন্টু শিগগির রেডি হও, আমরা প্রধান মন্ত্রীর বাসায় যামু।" করিমের অফিশিয়াল কালো ফ্যালকন উনি কয়েকদিন মাত্র ব্যবহার করে ফেরত দিয়ে দেন ও পারিবারিক প্রায় নতুন সাদা চার দরজা মাজদা ১৬০০ ব্যবহার শুরু করেন। গাড়িটা বেশ ভারী ছিল। উনি চালাচ্ছেন, আমি পাশে বসা। গাড়িটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভিতরে পার্ক করে পেছনে হেঁটে পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকে আলাদা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় আমরা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে উঠলাম। পেছন দিকে ছয় চেয়ারের ডাইনিং টেবিল, তার সামনে ট্রিপল সোফায় বঙ্গবন্ধু বসা ছিলেন, উনার পেছনে কাজের ছেলেটা সোফায় ভর দিয়ে তাকিয়ে আছে, মাঝে ছোট সেন্টার টেবিল, উল্টো দিকের ডাবল সোফায় হোসনে আরা বসলেন, আমি সিঙ্গেল সোফাটায় বসলাম। বঙ্গবন্ধুর পরনে সাদা বেশ ঢিলা পাজামা, ততোধিক ঢিলা সাদা পাঞ্জাবির হাতা হাতের কব্জি পেরিয়ে প্রায় আঙুলের মাথা পর্যন্ত। জাতির পিতার ঢুলু ঢুলু চোখ চেহারায় গভীর প্রশান্তির ছাপ, বাংলাদেশকে উনি স্বাধীন করে দিয়েছেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালী জাতিকে উনি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। কাজের ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, "অই মেহমানদের চা দিবি কি দিয়া?", "নানা কেক আছে দিই?" উনি মৃদু মাথা নেড়ে যায় দিলেন। ফ্রট কেক আর চা। হোসনে আরা কিছু নিলেন না, জাতির পিতা চায়ের কাপে দুই-তিন চুমুক দিয়ে সেটা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি ছোট এক পিস্ কেক শেষ করলাম, কাপের চা প্রায় শেষ করলাম, উনি বেশ আমুদে চোখে হালকা অবলোকন করছেন। ছেলেটা টেবিল পরিষ্কার করলো। জাতির পিতা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঝন্টু সাহেব কিছু বলেন।", "কি বলবো?" , "এই যেমন প্রথম দিকে কত কত ব্যাংক ডাকাতি হইলো, দুইটা একটা এখনো হয়, সবাই বলে আমি যথেষ্ট কড়া না।"  আমি একটু চিন্তায় পড়লাম, ভাবছি এত কঠিন একটা প্রশ্ন! উনি সামান্য হেসে বললেন, "তোমার যা বলার নির্ভয়ে বলো।" উনি আমাকে পরীক্ষা করছেন। আমি বললাম, "সংবাদ পত্রের খবরে জানা যায় এই ডাকাতিগুলো হয়েছে অনেকাংশে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা আধুনিক পিস্তল ব্যবহার করে। আমার অনুমান হয় প্রথম দিকে এটা যারা করেছিল বা এখনো মাঝে মধ্যে করে তাদের মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা, এই পরিস্থিতি তো চিরদিন থাকবে না, অচিরেই শেষ হবে বলে আমার বিশ্বাস।" উনি শুনতে শুনতে একটু সোজা হয়ে বসেছেন, "ঝন্টু, একটা বাচ্চা ছেলে হইয়াও তুমি যেটা বুঝলা, আমি মানীগুণী মানুষদেরে সেইটা ক্যামনে বুঝাবো?" উনার চেহারা এখন সজাগ, মৃদুহাসি। আমার কূটনৈতিক উত্তরে উনি সন্তুষ্ট। "আর কোন উপদেশ!", "আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণে তেল অনুসন্ধানে প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে। ভারত বলছে এই তেল-গ্যাসে নাকি তাদের ভাগ রয়েছে, আমরা একতরফা ভাবে তেল উত্তোলন করতে পারবো না। আমার কথা হল তারা তাদের অংশে উত্তোলন করে না কেন, কে বাধা দিচ্ছে! আমার মনে হয় সমুদ্র-সীমা বা "maritime law" আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে জ্বালানি দফতরের দায়িত্ত্ব দিলে ভালো হবে। জাতির পিতার কিছুটা  আশ্চর্যান্বিত সহাস্য চেহারা আমার মনে আছে। "আমি তো ইতিমধ্যে ব্যারিস্টার কামালকে এই দায়িত্ত্ব দিবার ডিসিশন নিয়েছি!" হোসনে আরা এই সমস্ত সময়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করেননি, বলার জন্য নিয়ে গিয়েছেন আমাকে। আমরা চলে আসার সময় সিঁড়ির মাথায় একটু ঝুকে আমার মাথায় উনার সুবিশাল উষ্ণ থাবা বসিয়ে সামনে থেকে পিছনে একটু বুলিয়ে দিলেন, "তুমি আবার আসবা।" আমার আর যাওয়া হয়নি।              

বিস্তারিত খবর

কাঁটাতারই বুঝাল বন্ধুত্বের আসল পরিচয়!

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১০ ১২:১২:২৭

পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের মনে হলেও আসল চিত্রটা ভিন্ন। নিজ স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদের বিষয়ে বাংলাদেশকে একবিন্দু ছাড় দিতে সব সময়ই নারাজ ভারত। এ জন্যই নতুন করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে, সম্পর্কটা যতই বন্ধুত্বের হোক সীমান্তের সম্পর্কটা ভিন্ন।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে দেশটি সীমান্তের পুরোটাতেই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কঠোর এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। শুধু তাই নয় এবার সরাসরি ভারত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর বিষয়ে বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করেছে। এটার মাধ্যমেই কি তবে ভারত তাদের সাম্প্রতিক এনআরসি ইস্যুতে পুশ ইন নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে?

গত মঙ্গলবার তিন দিনের সফরে ভারতে যান বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সফরকালে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌র সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল উভয় দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোসহ সীমান্তে চোরাচালান, সীমান্তে পাচার, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, জাল মুদ্রা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে আলাপ আলোচনা।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত বাংলাদেশিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে তা ঠেকাতে সীমান্তে বাংলাদেশকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। এছাড়া ভারত সীমান্তের পুরোটাতেই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে চায় বলে জানিয়েছে।

ভারতের আনা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জবাবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশি ভারতে যায় না। যারা যায় তারা ভিসার মাধ্যমে যায়। এছাড়া তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘আমাদের দেশ থেকে তোমাদের দেশে বেড়াতে যায়, চিকিৎসা সেবা নিতে যায় বা শিক্ষা সফরে যায়। নেক্সটডোর নেইবার (প্রতিবেশী) তোমরা, সেজন্যই যায়।’

সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘আইন অনুযায়ী করা হলে তাতে বাংলাদেশের আপত্তি করার কিছু নেই। জয়েন্ট বাউন্ডারি অ্যাক্ট অনুযায়ী যেভাবে আগে তারা করেছে সেভাবেই বাকিটা করলে আমাদের অসুবিধা নেই।’

এদিকে অনুপ্রবেশ ইস্যু যৌথ বিবৃতিতে রাখার বিষয়ে ভারত বাংলাদেশকে এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করেছে বলে সফররত বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন, অনুপ্রবেশ ইস্যু যৌথ বিবৃতিতে রাখার ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে একটা চাপ তৈরি করা হয়েছিল। দিল্লীর বৈঠকে এসব আলোচনা হলেও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। দুই দেশ আলাদা আলাদাভাবে বক্তব্য তুলে ধরেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যদিও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি এবার বাংলাদেশ এবং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের আলোচ্য-সূচিতে ছিল না, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের গুরুত্ব দিয়ে তোলা হয়। তবে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতের বক্তব্য গ্রহণ করেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতকে জানিয়েছেন, ‘অনুপ্রবেশের ব্যাপারে তারা যেটা আমাদেরকে বলছেন, যেটা ওনারা বলতে চাচ্ছেন, যে তোমাদের দেশ থেকে তো বহুলোক আসে। আমি সেখানে বলেছি, আমাদের দেশ থেকে এখন আর অবৈধভাবে যায় না। ভিসা নিয়েই যায়। অবৈধভাবে যাওয়ার কোন প্রশ্ন আসে না কারণ আমাদের দেশে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়ে গেছে।’

ভারতের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ২৩ লক্ষ লোক বৈধভাবে গিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘তারাই স্বীকার করলেন, গত বছর নাকি আমাদের ১৪ লক্ষ লোককে তারা ভিসা দিয়েছেন। আর মাল্টিপল ভিসা দেয়া ছিল। সব মিলিয়ে ২৩ লক্ষ বাংলাদেশের নাগরিক গত বছর ভারত গিয়েছিল।’

এছাড়া ভারতের পক্ষ থেকে পশ্চিমবাংলায় সামনের বিধানসভা নির্বাচনের সময় সীমান্তে নজরদারির জন্য বাংলাদেশকে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘ওনারা (ভারত) বলছিলেন যে, পশ্চিমবাংলায় ইলেকশন হবে, সেই সময় বর্ডারটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমি বলেছি, বর্ডার আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’

এদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করছে, তাদের দেশে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তারা এও দাবি করেছে, ১৯৭১ সালে বহু বাঙালি পূর্ব পাকিস্তানে নির্যাতনের শিকার হয়ে ওই সময় ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ্‌ ভারতে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত ও বহুবার দিয়েছেন। এছাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে ভারতে ভোটের প্রচারে নেমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তার সরকার অবৈধ বাংলাদেশিদের লোটাকম্বল নিয়ে ফেরত পাঠাবে।

মূলত ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর অমানবিক নির্যাতন বেড়েছে। গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের নির্যাতন হত্যার মতো চিত্র বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া মুসলিমদের জোড়পূর্বক ‘জয় শ্রীরাম’ বলার চিত্রও সাম্প্রতিক আলোচনায় আসে। জয় শ্রীরাম বলে মুসলিম হত্যার ঘটনাও ঘটে ভারতে।    


গত সেপ্টেম্বরে অবৈধ অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলে সম্বোধন করে অমিত শাহ্‌ বলেছিলেন, বিজেপি সরকার অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের এক এক করে খুঁজে বের করবে এবং তাদের বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেবে। তবে তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখদের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।  

সম্প্রতি বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত দৈনিক অধিকারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভারতে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন। তারই সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশ থেকে ৩৭ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ গুম হয়েছে বলে দাবি তুলেন।

তার এই দাবি মিথ্যা বলে জানিয়ে রানা দাশগুপ্ত বলেন, প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের কাছে যদি স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের গুম বা নিখোঁজ অর্থে বলে থাকেন তবে তা অসত্য।

তবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর বিষয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের এই নেতা বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের সনাক্তের নির্দেশ দিয়েছে। খুঁজে বের করা শুরু হয়ে গেছে। আসামে ৪০ লক্ষকে খুঁজে পেয়েছে। তার মধ্যে ১৭ লক্ষ মুসলিম এবং ২৩ লক্ষ হিন্দু সম্প্রদায়ের।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৪৭ সালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ছিল ৯৮ দশমিক ৪ ভাগ আজকে সেটা নেমে এসেছে ৪৮ থেকে ৪৯ ভাগে।

বাকিগুলো গেল কই বলে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ভারতে এখন যে জনগণনা হচ্ছে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে, এর মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে অনুপ্রবেশকারী কারা?

সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত বলে বিজেপি সরকার যে ঘোষণা দিয়েছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা অনুপ্রবেশকারীদের ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন টানছেন। আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করছি।

তিনি আরও বলেন, গত নির্বাচনে তারা বলেছেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত যারা গেছে তাদেরকে তারা শরণার্থী মর্যাদা দিয়ে নাগরিকত্ব দেবে। আমরা বলতে চাই যদি তারা এমনটি করে তবে বাংলাদেশে একটি সংখ্যালঘুও থাকবে না।

সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করার বিপক্ষে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান পরিষদের অবস্থান বলেও জানান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক। 


সীমান্ত হত্যায় চুপ ভারত

সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের গুলিতে প্রতিবছর নিরীহ বাংলাদেশি মারা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ থাকলেও কমেনি সীমান্ত হত্যা। মূলত বাণিজ্যিক খাতিরে সীমান্তের এপার ওপারের (ভারত-বাংলাদেশ) বসবাসকারীদের যাতায়াত রয়েছে। তবে সেটা শুধুমাত্রই আসা যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এক্ষেত্রে দুই দেশের মানুষের আসা যাওয়া থাকলেও বাংলাদেশিরাই ভারতের সীমান্তরক্ষীদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে সীমান্তে গরু চোরাকারবারি বলে বাংলাদেশি হত্যা যেন প্রতিনিয়তই দেখা যায়। কিন্তু মাদক চোরাকারবারির ক্ষেত্রে এ চিত্র আবার নেই বললেই চলে।

গত একদশকে সীমান্তে ২৯৪ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। সংসদে দাঁড়িয়ে এ তথ্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল৷

জাতীয় সংসদে পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছিলেন ৬৬ জন। এরপর ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ সালে ২৪, ২০১২ সালে ২৪, ২০১৩ সালে ১৮, ২০১৪ সালে ২৪, ২০১৫ সালে ৩৮, ২০১৬ সালে ২৫, ২০১৭ সালে ১৭ ও ২০১৮ সালে তিনজন নিহত হয়েছেন৷ (সূত্র: বণিক বার্তা, ১২ জুলাই ২০১৯)

গত বছরের চেয়ে এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ আরও বেড়েছে৷ যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসেনি৷ প্রথম পাঁচ মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ১৫৷

গত ১৫ জুন ঢাকার পিলখানা সদর দপ্তরে বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে তিনদিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়৷ বিএসএফের মহাপরিচালক রজনীকান্ত মিশ্র জানান, ‘হত্যাকাণ্ড’ শব্দের বদলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’ বলতে চান তিনি৷ তবে স্বীকার করেন, তার ভাষায় ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’র সংখ্যা বেড়েছে৷

ওইদিন রজনীকান্ত আরও জানান, ‘এ কারণে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত রয়েছে৷ বিএসএফকে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে৷ তবে পরিস্থিতি মাঝে মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়৷ কোনো বিকল্প না থাকায় প্রাণে বাঁচতে অল্প কিছু ঘটনায় বিএসএফ মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।’

যদিও ফেলানী হত্যাকাণ্ড আর মেহেরপুরে আম পাড়তে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত কিশোর হত্যার বিচার হয়েছে কিনা- তার উত্তর থাকে না বিএসএফ মহাপরিচালকের কাছে৷ তারা শুধু বন্ধু রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই দেখে৷  


বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা শুধু মাত্রই স্বার্থের। ভারত সব সময়ই তাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আর এটাই মূলত তাদের বন্ধুত্বের অস্ত্র।

তারা আরও মনে করেন, বাংলাদেশের ওপর ভারত সব সময়ই নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। যেটা বাংলাদেশের মানুষ মেনে নিতে পারছে না। আর কোনো স্বাধীন দেশের নাগরিকই নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যের কর্তৃত্ব মেনে নেবে না।             

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুখসানা কিবরিয়া মনে করেন, সীমান্তে মানুষ হত্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে ঢেকে দেয়ার জন্যই ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়কে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এনেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. জমির বলেন, ভারত কখনোই চায় না যে বাংলাদেশ তার কোণায় বসে এমন একটি অস্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছুক যেটি ভারতকেও প্রভাবিত করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে অনেকেই মনে করেন, গত নয় বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের স্বার্থকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছে, বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে ততটা মূল্যায়ন করেনি।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, দুই দেশের সরকারের মধ্যে ভালো সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণ সেটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কোনো স্বাধীন দেশের মানুষই তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য একটি দেশের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। দুটা স্তরে সম্পর্কটা তৈরি হয়। একটা হচ্ছে, সরকার এবং সরকার এবং অপরটি হচ্ছে জনগণের এবং জনগণের মধ্যে। সম্পর্ক যদি টেকসই হতে হয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং বিশ্বাসযোগ্য হতে হয় তাহলে দুই দেশের মানুষকে মনে করতে হবে যে এ সম্পর্কে আমি লাভবান হচ্ছি।’

জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের সভাপতি মাসুদ খান দৈনিক অধিকারকে বলেন, অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা বিজেপি সরকারের সেটা থেকে মূলত তারা কখনোই পিছপা হবে না। এটা তারা বার বারই বলছে। কাশ্মীর ইস্যুতে সেটা স্পষ্ট। কাজেই ভারত তার পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভূটান, নেপালে নিজেদের ডমিনেশনকেই এগিয়ে নিতে চায়। আর এটাই তাদের মূল বন্ধুত্বের অস্ত্র।

বিস্তারিত খবর

দুসরা ঈদ: আত্মত্যাগের কোরবানি উৎসব

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-০৫ ১১:৫৩:২৪

 'ঈদ' আরবি শব্দ। আসলে এর অর্থটাই হচ্ছে ফিরে আসা। এই ফিরে আসা'কে ঈদ বলা হয় এ কারণে যে, মানুষ বারংবার একত্রিত হয়ে সাধ্য মতো যার যা- উপার্জন তা অনেক খুশিতে আল্লাহ্ পাকের দরবরে সোয়াব এর আশায় আনন্দ উৎসব করে। বলা যায়, সোয়াবের পাশা পাশি একে অপরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ দূর হয়। সুতরাং ঈদকে দ্বারাই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে নিয়ামাত কিংবা অনুগ্রহে ধন্য করে থাকে। বারংবারই তাঁর ইহসানের নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে। আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিই ভালোবাসা লাভের উদ্দেশ্যে কিছু বিসর্জন দেয়াকে কোরবানী বলা যেতে পাবে। সুতরাং আর্থিক ভাবেই সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপরেই কোরবানির হুকুম পালন ওয়াজিব হয়েছে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্তে কেউ যদি কোরবানির মতো ইবাদত থেকে বিরত থাকে কিংবা কোরবানি না দেয়। তাহলে সেই ব্যক্তি অবশ্যই যেন গুনাহগার হবে। আল্লাহর হুকুমের আনুগত্যের মধ্যে কোরবানি একটি বিশেষ আমল। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মহান আল্লাহ পাক মুসলিম উম্মাদের জন্য যেন 'নিয়ামাত' হিসেবেই ঈদ দান করেছে। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় যখন আগমন করে ছিল তখন মদিনা বাসীদের ২টি দিবস ছিল, সে দিবসে তারা শুধুই খেলাধুলা করত।’ আনাস রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সঙ্গে প্রশ্ন করে ছিল এমন দুই দিনের তাৎপর্যটা কী? মদিনা বাসীগণ উত্তর দিলেন : আমরা জাহেলী যুগে এই দুই দিনে খেলা ধুলা করে কাটাতাম। তখন তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ রাববুল আলামিন এই দু'দিনের পরিবর্তেই তোমাদেরকে এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ দু’টো দিন দিয়েছেন। তাহচ্ছে মুসলিম উম্মার 'ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’

সুতরাং শুধু খেলা-ধুলা বা আমোদ-ফুর্তির জন্যই যে দু'দিন ছিল তাকে পরিবর্তন করেই সৃষ্টিকর্তা এইদুটি ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের ঈদের দিনকেই দান করে ছিল। সমগ্র উম্মতগণ যেন ঈদের দিনেই মহান আল্লাহর শুকরিয়া, জিকির এবং তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনার সহিত শালীনতায় আমোদ-ফুর্তি ও নিজস্ব সাজ-সজ্জা কিংবা খাওয়া-দাওয়ার ব্যপারেও সবাই সংযম হতে পারে। এমন কথা গুলো বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ পুস্তকে ইবনে জারীর রাদি আল্লাহু আনহুর অনেক বর্ণনায় উঠে এসেছে। জানা দরকার, দ্বিতীয় হিজরিতে প্রথম ঈদ করে ছিল 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।' তাই ইসলাম ধর্মে 'বড় দুইটি' ধর্মীয় উৎসবের দিনের মধ্যে একটি ঈদ হচ্ছে- ঈদুল আযহা। এইদেশে এমন উৎসবটিকে আবার অনেক মানুষরা কুরবানির ঈদ বলেও সম্বোধন করে। 'ঈদুল আযহা' মূলত 'আরবী বাক্যাংশ'। এর অর্থটা দাঁঁড়ায় 'ত্যাগের উৎসব।' এরই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টা হচ্ছে 'ত্যাগ করা'। এ দিনটিতে মুসলমান তাদের সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, গরু, দুম্বা, ছাগল কোরবানি কিংবা জবাই দিয়ে থাকে। ঈদুল আজহার দিন যেন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায় করে। তার পরে কুরবানি দিয়েই গোশত খায়। এটাই সুন্নাত এবং বিশ্ব নবী তাই করে ছিল। "বুরাইদা রাদি আল্লাহু আনহু" হেকে বর্ণিত রয়েছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে ঈদগাহে যেতো না। আবার ঈদুল আযহা'র দিন তিনি ঈদের সালাতের পূর্বেও খেতেন না। এমন "তাকওয়ার সহিত 'কোরবানি' আদায় করা দরকার। আবার এও জানা যায় যে, 'কোরবানী দেওয়া পশুর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা যেন সেই কোরবানি কবুল করে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে।

এখন এ ঈদ আনন্দের বাস্তবতার দিকে আসা যাক। 'ঈদ' শব্দটিকে যখন মানুষ প্রথম বুঝতে শিখে তখন তাঁদের শিশু কাল থাকে এবং সেসময় তারা বড়দের উৎসাহে ১ম ঈদের আনন্দকে উপভোগ করে। তারা সারা রাত না ঘুমিয়ে খুব ভোরে নতুন সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করে। তারপর ঈদের নামাজের জন্যই আতোর, সুরমা এবং নতুন নতুন জামা কাপড় পরে বাবা ভাইদের নিয়ে পাড়া- প্রতিবেশীদের সঙ্গেই যেন তারা প্রিয় ঈদগাহে যেত। তবে ঈদগাহে যে পরিবেশ হয়ে উঠে সেটিই মুলত ঈদের খুশি। ঈদগাহের মাঠে পায়ে হেঁটে যাওয়া বা আসার মজাই আলাদা। জানা যায়, 'আলী রাদি আল্লাহু আনহুর' বর্ণনা মতে সুন্নাত হলো ঈদগাহে- পায়ে হেঁটেই যাতাযাত করা। সুতরাং, উভয় পথের লোকদেরকে সালাম দেয়া এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করাও ভালো হয়। উদাহরণ স্বরূপ নবীকারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে এক পথে গিয়ে আবার অন্য পথেই ফিরেছে। "ঈদুল আযহার" তাৎপর্য হলো ইসলাম ধর্মের নানা বর্ননায় যা পাওয়া যায় তা হলো এই, মহান 'আল্লাহ তায়ালা' ইসলাম ধর্মেরই এক নবী 'হযরত ইব্রাহীম (আঃ)'কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকেই আল্লাহ তায়ালাকে খুশির উদ্দেশ্যেই কুরবানির নির্দেশ দিয়ে ছিল। সেই আদেশেই 'হযরত ইব্রাহিম(আঃ)' তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করার জন্যেই যেন প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্তা তাঁকে তা করতে বাধা দিয়ে ছিল। সেখানেই নিজ পুত্রের পরিবর্তেই একটি পশু কুরবানি হয়েছিল এবং তা হয়েছিল সৃষ্টিকর্তার নির্দেশেই। এ ঘটনাকে স্মরণ করেই বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা মহান আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্ঠি অর্জনে প্রতি বছর ঈদুল আযহা দিবসটি পালন হয়ে আসে। হিজরির বর্ষ পঞ্জির হিসাবেই জিলহজ্জ্ব মাসের দশ তারিখ থেকেই শুরু করে বারো তারিখ পর্যন্ত ৩ দিন ধরেই যেন ঈদুল আযহা চলে। হিজরি চান্দ্র বছরের গণনা অণুযায়ী “ঈদুল ফিতর” এবং ঈদুল আযহার মাঝে দু'মাস ১০ দিনের ব্যবধানেই হয়ে থাকে। আর দিন হিসেবেই তা সবোর্চ্চ ৭০ দিনও হতে পারে।

জানা দরকার ঈদুল আযহার দিন থেকেই শুরু করে যেন পরবর্তী দু'দিন পশু কুরবানির জন্যেই নির্ধারিত থাকে। বাংলাদেশের মুসলমানেরা সাধারণত গরু বা খাসী "কুরবানি" দিয়ে থাকে। এক ব্যক্তি একটি মাত্র গরু, মহিষ কিংবা খাসি কুরবানি করতে পারে। তবে গরু এবং মহিষের ক্ষেত্রেই সর্বোচ্য ৭ ভাগে কুরবানি করা যায় অর্থাৎ দুই, তিন, পাঁচ বা সাত ব্যক্তি একটি গরু, মহিষ কুরবানিতে শরিক হলে ক্ষতি নেই। তাই এ দেশে সাধারণত কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করেই- ১ ভাগ গরিব-দুঃস্থদের মধ্যে ১ ভাগ আত্মীয় -স্বজনদের মধ্যে এবং এক ভাগ নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখা উচিত, তবে ইসলামের আলোকেই জানা যায়, এই ঈদের মাংশ বিতরনের জন্য কোন প্রকার সুস্পষ্ট হুকুম নির্ধারিত নেই। এমন কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থগুলো দান করে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। কোনো মুসাফির অথবা ভ্রমণকারির ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। আবার ঈদুল আযহার ঈদের নামাজের আগেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পশু কুরবানি সঠিক হয় না। জানা যায়, এমন কুরবানির প্রাণী খাসী বা ছাগলের বয়স কমপক্ষে ১ বছর ও ২ বছর বয়স হতে হয় গরু কিংবা মহিষের বয়স। নিজ হাতে কুরবানি করাটাই উত্তম। এই কুরবানি প্রাণীটি দক্ষিণ দিকে রেখে কিবলা মুখী করে খুবই ধারালো অস্ত্র দ্বারা অনেক স্বযত্নে মুখে উচ্চারিত ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করাটা ইসলাম ধর্মের বিধান। সুতরাং এই 'ঈদ' আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। সবাই সবার প্রতি 'ভালোবাসা ও আনন্দ' নিয়ে একসঙ্গেই কাজী নজরুল ইসলামের ঈদুল আযহার গান অন্তরে ধ্বনিত করি:- "ঈদুল আযহার চাঁদ হাসে ঐ, এলো আবার দুসরা ঈদ, কোরবানি দে কোরবানি দে, শোন খোদার ফরমান তাকিদ।
এমনি দিনে কোরবানি দেন, পুত্রে হযরত ইব্রাহিম।
তেমনি তোরা খোদার রাহে, আয়রে হবি কে শহীদ।।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রভাষক।


বিস্তারিত খবর

‘তোষামোদির স্বাধীনতা’ হলো নতুন প্রেস স্বাধীনতা

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-০৪ ১৬:০৮:০৯

আধুনিক সভ্যতার মৌলিক ভিত্তি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। কমিউনিস্ট ব্লক ও স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীকে রক্ষা করে প্রায় সব দেশই তাদের সংবিধানে মিডিয়ার বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মিডিয়ার স্বাধীনতাকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতার আশ্রয় নেয়া হতো।
সংবাদকর্মীকে জেল দেয়া ছিল বেশ বিরল। আর একটি মিডিয়া আউটলেট বন্ধ করে দেয়ার কথা তো আরো সুদূরে ছিল।
দুঃখের বিষয়, আর না।
পপুলিজম, অতি জাতীয়তাবাদ, স্বৈরতন্ত্রের উত্থান, সত্য-পরবর্তী এবং নেতার উত্থানে- যিনি কোনো অন্যায় করতে পারেন না,  এমন যুগে সংবাদ মাধ্যমে নতুন এক স্বাধীনতার আবির্ভাব ঘটেছে। 
এটা হলো ‘তোষামোদী স্বাধীনতা’- যেখানে প্রেস পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন। কিন্তু তারা শুধু তোষামোদ করে এবং যে প্রেস যত বেশি তোষামোদি করতে পারে, তারা তত বেশি স্বাধীন বলে প্রত্যায়িত হয়।


এর একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি হলো ভুয়া খবর, ষড়যন্ত্র, জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা, উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিরোধিতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিরোধিতা।
‘স্নো হোয়াইট’ নামের রূপকথায় রানীর সুপরিচিত একটি প্রশ্নের জবাবে আয়না উত্তরে বলেছিল, ‘আমার রানী, আপনিই হলেন দেশের সবচেয়ে সুন্দরী’।
আজকের বিশ্বে অধিক থেকে অধিক পরিমাণে সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যাশা করেন মিডিয়া হবে ওই রূপকথার আয়নার মতো, যা শুধুই প্রশংসা গাইবে। এমন আয়না হবে না, যা সমাজের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়।
জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ সালের বিখ্যাত উপন্যাস “ওয়্যার ইজ পিস”, “ফ্রিডম ইজ স্লেভারি” ও “ইগনোরেন্স ইজ স্ট্রেংথ”-এ যেমনটা বলা হয়েছে বিশ্বের ‘তোষামোদির স্বাধীনতা’য় সত্য হলো মিথ্যা, তথ্য (ফ্যাক্ট) হলো অতথ্য (নন-ফ্যাক্ট), ভিন্ন মতাবলম্বীরা বিশৃংখলার বীজ বপন করে, জনগণকে ভুলপথে পরিচালিত করতে সরকারি ভাষ্যের বিরোধিতা করে। বিরোধীদের সুযোগ দেয়া হলো বিভাজনকে বাড়িয়ে তোলা। সৃষ্টিকর্তা না করুন, ক্ষমতার সর্বোচ্চে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি প্রকাশ করা হলো দেশকে ধ্বংস করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

যেহেতু এটা হলো মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, তারা এসবই করে। তাই তারা হলো ‘জনগণের শত্রু’।

একটি নতুন ভ্রান্ত জাতীয়তাবোধের গভীর অনুভূতি এখন ধ্বংস করে দিচ্ছে সহনশীলতা, বহু দৃষ্টিভঙ্গিকে। আর এর ফলে মুক্ত মিডিয়ার অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আকস্মিকভাবে সত্য না বলা, যে সত্য ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘ফ্যাক্টস’কে আহত করে, তার আর তাৎপর্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ডানিয়েল প্যাটিক মইনিহানের বিখ্যাত বিরত থাকা বিষয়ক উক্তি হলো, নিজস্ব মতামতের অধিকারী প্রত্যেকে। কিন্তু তারা নিজস্ব কোনো ফ্যাক্টের অধিকারী নন। বর্তমানে এটাকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে একটি ভিন্ন তত্ত্ব দিয়ে- যদি তথ্য বা ফ্যাক্ট কোনো নির্দিষ্ট বিতর্ককে সমর্থন না করে তাহলে তা অনুসন্ধান করুন। 
গত বেশ কয়েক বছর ধরে, একটি রাজনৈতিক সিস্টেম হিসেবে গণতন্ত্রের ইচ্ছাকৃত অবমূল্যায়ন প্রত্যক্ষ করছি।
এসব হলো ‘ঝঞ্ঝাটপূর্ণ’, ‘বিশৃংখল’, ‘দৃষ্টিভঙ্গি ওইসব মানুষের যারা অনেক জানেন না অথবা যাদের দৃষ্টিভঙ্গি দূরদর্শী নয়’, ‘সময় সাপেক্ষ’ এবং উন্নয়নে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, যা এসব বিষয় সম্পন্ন করে।
সর্বোপরি, নেতা যখন সব জানেন, তখন জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়গুলোকে বিভ্রান্ত করে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে।  এই মানসিকতার মধ্যে জনমত, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় এবং অনেক বেশি প্রশ্ন তোলার জন্য মিডিয়াও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়।
এমন মানসিকতা অনিবার্যভাবে মেগা দুর্নীতিতে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতিতে নেতৃত্ব দেয় এবং হয়ে ওঠে একটি স্বাভাবিক সহচর।
‘তদারকি’ সংস্থা হিসেবে পার্লামেন্টকে প্রত্যাখ্যান করা সাম্প্রতিক সময়ের এক করুণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
অতীতে সরকারগুলো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়া ও তাতে মারাত্মক সমালোচনার ভয়ে পার্লামেন্টে মুখোমুখি হতে ভয়ে থাকতো। ভালভাবে জানা ও ব্যাপক গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আসতো ওইসব প্রশ্ন। প্রশ্ন করতেন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উচ্চ মাত্রায় প্রতিশ্রুতিশীল ও মোটিভেটেড নির্বাচিত নেতাদের পক্ষ থেকে। 
পার্লামেন্টে বিরোধীদের ভূমিকাকে খর্ব করায় জবাবদিহিতায় খাতটিতে আরো বড় মাত্রা যোগ করেছে, যা আমরা সব সময়ই দেখছি।
বিচার বিভাগের অবস্থানও খুব বেশি আলাদা নয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের অধিকার ও সব রকম স্বাধীনতা সুরক্ষার দিকে যায় না। তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সরকারের ইচ্ছার দিকেই বেশি যায়।
দুঃখজনকভাবে, বিচার বিভাগ, আইনসভা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী শাখা, প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) ভেঙ্গে পড়েছে।
সময়ের সাথে সাথে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে ক্ষমতার ভারসাম্য ধাবিত হয়েছে নির্বাহী বিভাগের পক্ষে। যা একনায়কের শাসন, নির্বাচিত ‘একনায়ক’ এবং ‘ডেমিগগস’- যারা নিজেদেরকে উপদেবতা হিসেবে উপস্থাপন করেন- তাদের উত্থানে ভূমিকা রাখে।
সর্বশক্তিসম্পন্ন নির্বাহী বিভাগের উত্থানে- অর্থাৎ সরকারগুলো- সরাসরি ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে প্রেসের ওপর যাতে তারা সরকারের সীমাবদ্ধতার অধীনে থাকে। সংবাদ মাধ্যম সরকারের ‘পর্যবেক্ষক’ বা নজরদারি হয়ে উঠায় এভাবেই মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার ক্ষেত্রে আহত করা হয়।
যখন সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস পাচ্ছে তখন বাক স্বাধীনতা খুব কমই রক্ষা পেতে পারে। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হলো ব্যক্তিবিশেষের স্বাধীনতা এবং কথা বলার স্বাধীনতা, যেখানে মুক্ত সংবাদ মাধ্যমকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
এর মধ্য দিয়ে বহু দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ করে ভিন্নমত পোষণকারীদের মুক্তভাবে মত প্রকাশ অনুমোদন করে মুক্ত সংবাদ মাধ্যম জনগণের অসন্তোষ প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে অবাধে।
এসব ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যমে মিডিয়া বহুমাত্রিক চিন্তাকে নিয়ে আসে জনগণের সামনে এবং এর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক গাঁথুনি, যা সমাজকে অনুমোদন করে ওইসব ধারণা বেছে তুলে নিতে, যে ধারণা তাদের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসবে।
ঠিক যেমনভাবে রক্ত আমাদের শরীরে খাঁটি অক্সিজেন সরবরাহ করে সেই অক্সিজেন ছাড়া আমাদের দেহকোষ যেমন মরে যায়, একইভাবে ‘সর্বশেষ তথ্য ও তরতাজা ধারণা’ ছাড়া একটি সমাজ মারা যায়। এসব ধারণা সামনে আসে একটি মুক্ত মিডিয়া ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যেমন একাডেমিয়া, থিংকট্যাংক, নাগরিক সমাজের সংগঠন প্রভৃতি।
একটি মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের টিকে থাকার পূর্বশর্ত হলো কথা বলার স্বাধীনতা এবং চিন্তা করার স্বাধীনতা। 
উগান্ডার সাবেক শক্তিশালী সামরিক নেতা হিসেবে পরিচিত ইদি আমিনের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘কথা বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু বক্তব্য দেয়ার পর আমি স্বাধীনতার গ্যারান্টি দিতে পারি না’। এটাই হলো ‘কথা বলার পরের স্বাধীনতা’ যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
যে পরিমাণ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে, জেল দেয়া হয়েছে, দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, জোরপূর্বক সেলফ সেন্সরশিপে বাধ্য করা হয়েছে- তাতে একটি ভয়াবহ চিত্র অঙ্কিত হয়।
যদিও এটা হলো পুরো ছবির একটি অংশমাত্র। যদি আমরা জানতে পারি যে কতজনের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে তাহলে এটা হতে পারে অনুধাবনমাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক এই ‘মিসিং’ আমাদের সমাজ ও আমাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃতপক্ষেই একটি ক্ষতি।
সবে ডিজিটাল বিপ্লব মিডিয়ার সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটা সরকারের নিয়ন্ত্রণেরও নতুন পথ খুলে দিয়েছে।
অনেক দেশে ডিজিটাল মিডিয়ার অপব্যবহার রোধের প্রেক্ষাপটে সুদূরপ্রসারি আইন আছে। এসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে প্রধানত খবর, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণাকে বিস্তৃত করতে দেয়ার পরিবর্তে তাতে বাধা দেয়ার জন্য। সরকার যেসব ডিজিটাল ও মূলধারার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে ক্রমশ জটিলতার মুখে তাদের দিকে দৃষ্টি রেখে এসব আইন কার্যকর করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এটাকে ‘তোষামোদির স্বাধীনতা’র নতুন যুগের চিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
একেবারে শুরু থেকেই তিনি কেবল ওইসব মিডিয়াকে গ্রহণ করেছেন, যারা তার প্রশংসা করে এবং অন্যদেরকে ‘জনগণের শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেছে, ওইসব মানুষের জন্য ঘৃণাসমৃদ্ধ শব্দ ছাড়া আর কিছু বলেনি এসব মিডিয়া। যদিও তিনি সংবাদ মাধ্যমকে ঘৃণা করা প্রথম কোনো নেতা বা সরকার প্রধান নন, তবু তিনি এই প্রবণতায় সবচেয়ে শক্তিশালী গতি দিয়েছেন অবশ্যই। 
বিশ্বের বিভিন্ন অংশের অনেক নেতা এখন ট্রাম্পের একান্ত অনুসরণকারী। তারা সবাই চান মিডিয়া তার প্রচলিত ‘ওয়াচডগের’ ভূমিকা পালন না করুক এবং তাদের কোলে লালিত হোক।
পপুলারিজম, উগ্র জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কার ও ঘৃণা সৃষ্টি করছে প্রতিদিন, যা থেকে অসহিষ্ণুতা এক নতুন উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে। এ বিষয় এখন মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই মুক্ত মিডিয়ার মৌলিক ভূমিকার অন্যতম হলো অপ্রিয় সত্যকে সামনে আনা, উচ্চ পর্যায় ও শক্তিশালীদের প্রশ্ন করা এবং সব রকম অধিকার ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখা।
এসব মিলে সাধারণত সমালোচনামুলক কাহিনী তৈরি করে যে, পপুলিজম, উগ্রবাদ এবং কর্তৃত্বপরায়ণতাকে ঘৃণাসহকারে পরিহার করা উচিত। অরওয়েলের ভাষায়, যদি স্বাধীনতা বলতে মোটেও কিছু বুঝায়, এর অর্থ হলো মানুষ যা শুনতে চায় না, তা মানুষের কাছে বলার অধিকার।
মিডিয়া এখন যার জন্য লড়াই করছে- এবং আরো শক্তিশালীভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে করছে তা হলো, মানব সভ্যতার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় অর্জন। তা হলো চিন্তার স্বাধীনতা এবং কথা বলার স্বাধীনতার অধিকার।
এ লড়াই এর চেয়ে কম কিছুর জন্য নয়।

( লেখক: ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

বিস্তারিত খবর

ভিআইপি ও ডিসিই তিতাসের খুনি

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-৩০ ০৫:৩৬:৪২

তিতাসকে কে খুন করেছে? মাদারীপুরের ডিসি ওয়াহিদুল? নাকি যুগ্মসচিব সবুর? তদন্ত কমিটি আমলাদের দিয়ে কেনো? সংসদীয় কমিটি করে দোষীদের বের করে, শাস্তি চাই। দেশটা কি একদল আমলা ও ডিসির বাপদাদার? বঙ্গবন্ধুর ডাকে এজন্য কি এতো রক্তে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো?

এক ধরনের ডিসি আছে যারা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলেও জেলা প্রশাসক হয়ে নিজেদের জেলার জমিদার মনে করে! কিছু সরকারি কর্মচারীকে বাড়ির চাকর বানায়। তাদের বউরা নিজেদের মহারানী মনে করে।

এদের কোন ছেলেবেলা নেই। এর ওর বাড়ি, খেয়ে থেকে টিউশনি করে বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ডাইনিংয়ে ডালের পাতলা পানিভাত নয়, রুমে হিটারে ভাত রেধে আলু ভর্তা দিয়ে খেয়েছে। ছাত্রজীবনের আনন্দভোগ কপালে জুটেনি। মনের দারিদ্রতা মুছেনি, গণমুখী মানবিক হয়নি। হীনমন্যতায় আমলা হয়ে ক্ষমতা দেখায়।
মাদারীপুরে ফেরি সময়মত ছাড়তে কিশোর তিতাসের মা পা ধরে আকুতি জানালেও ছাড়েনি। তিতাসকে বহন করা এ্যাম্বুলেন্স তিনঘণ্টা আটকে রেখেছিলো। ডিসি বলেছে, ভিআইপি যাবে! তাই বলে তিনঘণ্টা এক যুগ্মসচিবের জন্য ফেরি আটকে মর্যাদা! বিনিময়ে বিলম্ব হওয়ায় পথেই অধিক রক্তক্ষরণে তিতাস নামের ফুটফুটে শিশুর মৃত্যু!

এর আগে দুই টিএনও এক ডাক্তার ও এক শিক্ষককে পা ধরিয়েছে। এরা যদি এমপি মন্ত্রী হয়, জনগনণকে শায়েস্তা করতে আর কিছু লাগতোনা। বিমান আটকে দিতো। ঘরে ঘরে খাজনা তুলতো। ময়মনসিংহের এক ডিসিতো বিদায়বেলা নিজেও বউকে রাজা রাণীর পোষাকে সাজিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে শহরঘুরে দেশে হাসির খোরাক হয়েছিলেন।

এরা ডিসি, টিএনও, যুগ্মসচিব হলেও মানুষ হয়নি। এরা সংখ্যায় কম, কিন্তু বড় ঘটনা, ভয়ংকর অপরাধে শীর্ষে। এসব আমলার চেয়ে জনপ্রতিনিধি অনেক উত্তম। এই দুই খুনীকে বরখাস্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হোক। আর ভিআইপিদের গণমিছিল থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়া হোক।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিস্তারিত খবর

গভীর ষড়যন্ত্রের আলামত

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-২৫ ০০:৪৪:৩৭

একের পর এক ঘটে যাওয়া সব ঘটনা একটি চিত্রপটে নিয়ে এলে পর্যবেক্ষকদের মনে এই আশঙ্কা জন্ম নেবে যে, দেশে একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের ষড়যন্ত্র। ইমেজ নষ্ট করার ষড়যন্ত্র। সরকারকে ব্যর্থ বলে প্রমাণ করার এক গভীর রহস্যময় তৎপরতার ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রকে ও সরকারকে কঠোর হাতে মোকাবিলা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক গভীরে গিয়ে উদ্ঘাটন করতে হবে এবং এসব অপকর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারা জড়িত তাদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাঁড়াশি অপারেশন চালিয়ে সফল হতে হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপপ্রচার অপরাধ দমনে জনগণকে সুসংগঠিত করতে শাসক দলকে রাজনৈতিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। সারা দেশে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা জনমত গঠনের মাধ্যমে জনগণের মধ্য থেকে সব ভয় ও আতঙ্ক দূর করে সমাজের অস্থিরতা নিরসন করতে হবে। অপরাধী যেই হোক সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এমনকি সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব করা যাবে না। পদ্মা সেতুতে মানুষের জবাই করা মাথা লাগবে বলে যারা অপপ্রচার চালিয়েছে তাদের অনেককে প্রশাসন চিহ্নিত করেছে। অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে অনেক নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। এর প্রয়োজন ছিল। বছরের পর বছর গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের পরও তথ্য মন্ত্রণালয় অনলাইন নিউজ পোর্টালকে এখনো অনুমোদন দেয়নি। যাদের অনুমোদন দেওয়া উচিত তাদের অনুমোদন দিয়ে অনুমোদনহীন সব নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দিতে হবে। একুশ শতকের বিজ্ঞানমনস্ক তথ্য প্রযুক্তির চূড়ান্ত বিকাশে উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেখানে যুক্ত হয়েছে, অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে এ ধরনের মধ্যযুগীয় কাপালিক মিথ বা মানুষের মাথার অপপ্রচার চলতে পারে না। যমুনা সেতু বা বঙ্গবন্ধু সেতুতে যখন এ ধরনের প্রচারণা হয়নি সেখানে পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় যখন শেষ লগ্নে তখন এ ধরনের ভয়ঙ্কর অপপ্রচার ষড়যন্ত্রের ভয়ঙ্কর আলামত ছাড়া কিছুই নয়।

ছেলেধরা সন্দেহে একের পর এক মানুষ হত্যা গোটা দেশের মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। এ আতঙ্ক থেকে দেশকে বের করে না আনতে পারলে সমাজ জীবনে এই জঘন্য পথ ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সমাজ জীবনের নানামুখী বিরোধে হিংসাত্মক মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে। বাড্ডায় সিঙ্গেল মাদার তসলিমা বেগম রেণু সন্তানদের নিয়ে জীবনের কঠিন লড়াই করছিলেন। ছোট বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে কী নিষ্ঠুরভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছে। গোটা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত ও বিষাদগ্রস্ত করে দিয়েছে। এই বর্বর হত্যাকান্ডে র সঙ্গে মানসিক বিকারগ্রস্ত যেসব সন্তানতুল্য তরুণ অংশ নিয়েছিলেন, তাদের একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে গণপিটুনিতে গণহত্যার মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ব্যর্থ এটি প্রমাণ করার গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। পুলিশের আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ যারা গুজব ছড়াচ্ছেন ও অপরাধ করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তারা বসে নেই। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় র‌্যাব ও পুলিশকে সহযোগিতা করা জনগণের নৈতিক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গেলেই একটা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয় দেখা যাচ্ছে। এই গুজব, এই ছেলেধরা ও গণপিটুনি কঠোর হস্তে দমন করা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

এর আগে সিরিজ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গোটা দেশকে আক্রান্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে বরগুনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছায়ায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী বাহিনী মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট ও রিফাত হত্যাকান্ডে র ভয়াবহতা দেশ দেখেছে। ফেনীর ঘটনার মতো নানা নাটকীয়তার পর এখানেও এখন তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় এমপি ও পুলিশ প্রশাসন কীভাবে নয়ন বন্ডদের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন সেই খবর যেমন উঠে আসছে তেমনি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ডের হত্যাকা ও মিন্নির আসামি হিসেবে রিমান্ড অনেক রহস্যের জন্ম দিয়ে আসছে। এমপির বিষয়ে তার দলকে এবং পুলিশ সুপারের ব্যাপারে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। তাদের রেখে সেখানে এই হত্যাকান্ডে র ন্যায়বিচার ও অপরাধ জগৎ উৎখাত কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন রয়েছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক মলয় সাহার স্ত্রী ও অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব জগদীস দাশের বোন প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে বাংলাদেশকে যেভাবে দুনিয়ার বুকে একটি সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু নিপীড়ক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে ৩ কোটি ৪০ লাখ সংখ্যালঘু গুম হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাতে নির্লজ্জ রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন। এ ধরনের ঘটনার নেপথ্যে অবশ্যই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক ও তার নেপথ্য এবং সক্রিয় সহযোগীদের মুখোশ উন্মোচন রাষ্ট্রের সব গোয়েন্দা সংস্থারও দায়িত্ব। একজন প্রিয়া সাহাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনায় নিলেও তিনি যা ঘটিয়েছেন সেটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর ঘটনা। একজন মামুলি মানুষকে চরিত্রহীন বলায় দেশের অনেকে চরিত্রহারা হয়েছেন। সারা দেশে মামলার মিছিল ঘটিয়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে জেল খাটিয়েছিলেন। আরেকজন প্রিয়া সাহা গোটা রাষ্ট্রকে চরিত্রহীন করে দিয়েছেন। সেখানে অনেকে এটাকে ছোট ঘটনা বলে একটি মামলাও দায়ের করতে দেননি। ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে যেসব মা-খালা প্রতিবাদী হয়েছিলেন, যেসব পিতৃতুল্য ও ভ্রাতৃতুল্য মানুষেরা প্রতিবাদী হয়েছিলেন তারা এখন নীরব। প্রধানমন্ত্রী দেশে এলে নিশ্চয়ই জাতির উদ্দেশে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি ভাষণ বা সংবাদ সম্মেলন করবেন। কিন্তু তিনি আসার আগে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মানুষকে নানা গুজব ও অপরাধে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন এবং জড়িত হলে কঠোর ব্যবস্থা যে নেওয়া হবে সেই সতর্ক হুঁশিয়ারি দিতে পারেন।

শেয়ারবাজার বিপর্যয় নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। বিপর্যস্ত করুণ শেয়ারবাজার থেকে তিন দিনে এই সময়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সময়ে চারদিকে এত ঘটনা কিসের আলামত?

প্রিয়া সাহা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দিয়েছেন তাতে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে আজকে শেখ হাসিনা ১০ বছরে যে সম্প্রীতির সুতায় বেঁধেছেন সেখানে তিনি দুনিয়ার সামনে কঠিন আঘাত করেছেন। প্রিয়া সাহার অপরাধের জন্য সংবিধান ও আইনের আলোকে তিনি দায়ী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা প্রিয়া সাহার পক্ষে সাফাই গাইছেন তারা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধকে উসকানি দিচ্ছেন। আর যারা প্রিয়া সাহার অপরাধের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়কে আক্রমণ করছেন তারা ভিতরে পুষে রাখা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছেন। দুটিই অপরাধ। আমরা আমাদের সম্প্রীতির বাঁধন আরও শক্ত করে ধরে রাখতে চাই। সমাজে শাস্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার চাই। আমরা সুশাসন চাই। আমরা গণতান্ত্রিক সমাজ চাই। আমরা ভঙ্গুর হলেও সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত দেখতে চাই। কোনো অশুভ শক্তির উত্থান এই দেশের জন্য অতীতে যেমন সুখকর হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। তাই সব পরিস্থিতি মিলে যে গভীর ষড়যন্ত্রের আলাতম দেখা যাচ্ছে, তার মূলোৎপাটন চাই। শাসক দল আওয়ামী লীগকেও তার আদর্শবান নেতা-কর্মী ও জনগণকে নিয়ে নিজের রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। তাদের মনে রাখা উচিত, দুঃসময়ে পরীক্ষিতরাই তাদের মূল শক্তি। গত ১০ বছর ধরে যেসব দলদাস দলদাসী থেকে শুরু করে এককালের কট্টর বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা মুজিবকন্যার চেয়েও বিভিন্ন পেশা থেকে রাজনীতির বারান্দা পর্যন্ত বড় আওয়ামী লীগ ভক্ত হয়েছেন এরা বিপদ দেখলেই কেটে যাবে। এরা বিএনপি থেকে কেটেছিল। এরা অনেকের কাছ থেকে কেটে পড়ে এসেছে সুবিধাভোগ করতে। দলকে সাবধান থাকতে হবে। যেখানে বিভিন্ন পেশায় এককালের মুজিববিদ্বেষী ও কট্টর শেখ হাসিনা বিরোধীরা বিপজ্জনক সেখানে চিহ্নিত বহুল আলোচিত রাজাকার সন্তানরা আরও বেশি ভয়ঙ্কর। এদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

বিস্তারিত খবর

দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য প্রিয়া সাহাকে আইনের আওতায় আনা হোক

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-২০ ০৫:৫২:৪১


আমাদের সোনার বাংলা যুগ যুগ থেকে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে হিন্দু-বৌদ্ধ, খুস্টান-মুসলামন ভাই-ভাইয়ের মতো বসবাস করছেন। সবাই নিজ নিজ ধর্ম ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করছে। পুরো পৃথিবীতে এমন সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিরল। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের সকল বর্ণের ও ধর্মের মানুষ একাত্ম্য ও সুখ-দুঃখে একে অপরের সহযোগীতা আরও বৃদ্ধি হয়েছে। তা বিগত অন্য সরকারের সময় এতটা ছিল না। সেই সোনার বাংলা ও সরকারের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ ট্রাম্পের কাছে তথাকথিত ভন্ড হিন্দু প্রিয় সাহা দিয়েছে, এটা মোটেও জাতির কাছে কাম্য না। এমন ঘটনায় আমরা হতবাক।
আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটা দেশে সকল বর্ণের ও ধর্মের মানুষ ধিক্কার ও সুষ্ঠ বিচার আশা করে। আমি বঙ্গবন্ধুর একজন কর্মী হয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ ও দাবি জানাই, যে ব্যক্তি বা অপশক্তি বঙ্গবন্ধুর ও জননেত্রীর পরিশ্রমের সোনার বাংলা ভাবমূর্তি ও গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশা করতে চায়, তাদের অচিরেই আইনের আওতায় আনা হোক | 
লেখক: প্রতিষ্ঠা যুগ্ম-আহ্বায়ক, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট আওয়ামী যুবলীগ

বিস্তারিত খবর

তরুণ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফেসবুক, ইউটিউব এবং গুগল ব্যবহার করে

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-১৩ ১২:২৬:২৮

বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতেই একটি আলোচিত বিষয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার। এমন ব্যবহারে সফলতার দিক যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ক্ষতির সম্মুখীনও হচ্ছে মানুষ। তরুণ প্রজন্মরা বাবা মাকে ধোঁকা দিয়ে ডুবে থাকছে নিজস্ব স্মার্টফোনের ফেসবুকে। স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা ফাঁকি দিয়েই নির্জন স্থানে বা চায়ের দোকানে অথবা পছন্দ মতো কোনো পার্কের বসে স্মার্টফোনেই খেলছে গেমস বা ব্যবহার করছে ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুক ও গুগল।
'ইউটিউব এবং গুগলে' আপত্তিকর ভিডিওতে তারা আসক্ত হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎও নষ্ট করছে। আসলে বিনা প্রয়োজনে অজস্র তরুণ প্রজন্মরা সময় নষ্ট ও আপত্তিকর ভিডিও দেখেই এক ধরনের উগ্রতা সৃষ্টি করে পারিবারিক কলহে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে লেখা পড়ার মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক মূল্য বোধেরও অবক্ষয় ঘটছে বলা যায়। সৌখিনতা পূরণ করতে গিয়ে অভিভাবক যেন নিজ সন্তানদের হাতে অজান্তে তুলে দিচ্ছে স্মার্ট ফোন। কোমলমতি এই শিক্ষার্থীরা এমন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারেই হারিয়ে ফেলছে সৃৃৃজনশীলতা এবং বাড়ছে উগ্রতা। বলতেই হয় যে, সারা বিশ্বের মানুষদের মাঝে বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য ছড়িয়ে দিলেও তৈরী কৃত ব্যক্তির পরিবার এর ক্ষেত্রে এসবের ভূমিকাটা ছিলো একেবারেই উল্টো। তাদের উঠতি বয়সের সন্তান'রা কোনো ভাবেই যেন প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসতে না পারে। সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করেছিল এই প্রযুক্তি বিশ্বের 'দুই দিকপাল'।২০১১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া একটি বৃহৎ সাক্ষাৎকারে স্টিভ জবস বলে ছিল, তাঁর সন্তানদের জন্য আইপ্যাড ব্যবহারে একেবারেই নিষিদ্ধ।

শহরের ছেলে-মেয়েদের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে তরুণ প্রজন্মের বহু ছেলেমেয়েরাও এখন মোবাইল ফোনে ফেসবুুক, ইউটিউব ও গুগলে প্রবেশ করে খুব মজা করছে। তবে এই মজার মধ্যে তারা শুধু যে সীমাবদ্ধ থাকছে তা নয়। তারা রাতদিন নেটে গেমস খেলছে। বলা যায় যে, এ মজার আনন্দ গ্রামের চেয়ে শহরেই অনেক বেশী। এক পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে গ্রামের তরুণ প্রজন্মের ছেলেরা সন্ধ্যায়, অন্ধকার পরিবেশে একটি নির্জন স্থানে জটলা হয়ে খুুব পাশাপাশি বসে নিজস্ব মোবাইলে গেম খেলার পাশা পাশি ফেসবুুক, ইউটিউব বা গুগলে কু-রুচি পূর্ণ ভিডিও চিত্র দেখেই যেন আনন্দ উপভোগ করছে। জানা দরকার যে এই দেশের মানুষদের সুযোগ সুবিধা জন্যে এ সরকার ৯ কোটির বেশিই ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছে। বর্তমান সরকারের তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের হিসাবে ফেসবুক ব্যবহার করছে প্রায় ৩ কোটি মানুষ। এমন
ইন্টারনেট সংযোগে সকল জনগণকে সচেতন করে দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তা অপব্যবহার করে 'চিন্তা চেতনার অবক্ষয়' যেন নিজ থেকেই সৃষ্টি করছে। এই বাংলাদেশের সচেতন কিংবা অসচেতন ফেসবুক ব্যবহারকারীর শতকরা তিরানব্বই ভাগের বয়সই হচ্ছে ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। সুুতরাং এ বিশাল জন গোষ্ঠী "ফেসবুকের সঙ্গে সম্পৃক্ত" হয়েই সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ্য করাও যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, এমন তরুণরা মিথ্যা গুজব এবং অপপ্রচার চালিয়ে অসচেতন জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। পড়া শোনাকে নষ্ট করে বিশাল এক তরুণ গোষ্ঠী ফেসবুকের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং রাজনৈতিক চেতনার নামেই যেন ছোট বড় গোষ্ঠী সৃষ্টি করে সহিংসতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বাবা-মা তাদের সন্তানদেরকে ভালোবাসে, সন্তানের ছোট বড় সৌখিন চাহিদাও পুুরণ করে থাকে। কিন্তু-ছেলেমেয়েদেরকে যেন সখের মোবাইল ফোন কিনে দিয়ে অজান্তে ভবিষ্যত নষ্ট করছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ব্যাপারে কোনো ধরনের বিকল্প পথে সুযোগ রয়েছে কি নেই তা জানা নেই। তবে এই ব্যাপারে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বি টি আর সি) চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বি টি আর সির কোনো সক্ষমতা নেই। তবে সরকার বা বিটিআরসি 'ফেসবুককে অনুরোধ' করতে পারে। ফেসবুক ব্যবসা করতে এই দেশে এসেছে। ফেসবুক কতৃৃপক্ষ বলেন যে ১৮ বছরের নিচের ছেলেমেয়েরা তাদের গ্রাহক। আবার ৬৫ বছরের সকল মানুষরাও একই ধরনের গ্রাহক। ফেসবুক কিন্তু সব অভিযোগ বিবেচনায় নিতে বাধ্য নয়। ফলে, প্রযুক্তিতে ভালোর চেয়ে দিনে দিনে খারাপের দিকেই যেন ঝুঁকে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম। গবেষকদের এক সিদ্ধান্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন অতিমাত্রায় বিচরণের ফলে মাদকাসক্তির মতো খারাপ ফলাফল প্রকাশ পাচ্ছে।
অনৈতিক অবক্ষয় থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। কোমলমতী বহু ছেলে ও মেয়েদের আচার আচরণের পরিবর্তনও হচ্ছে। আবার এও দেখা যায় যে "হাতে মোবাইল পেয়ে" তারা ঠিক মতো বাসাতেই থাকতে চায় না। উড় উড় মন, লেখাপড়াতে মনযোগ দিতেই চায় না। পড়ার টেবিলে, ঘুমের ঘরে এমন কি খেতে বসেও ফোন চালাতে দেখা যায়। এক কথাতে আসি, যখনই তাদের দেখা যায়, ঠিক তখনই তাদের হাতে ফোন নামক যন্ত্রটি থাকা চাই। বয়ঃসন্ধি কালে পৌঁছার আগে ছেলে মেয়েরা যেন বহু নোংরা কাজে লিপ্ত হচ্ছে। মোবাইলে আসক্ত হয়েও তারাই প্রকাশ্য দিবালোকে অন্যদের মারপিট, খুন, গুম কিংবা ধর্ষণ করছে।

তরুণ প্রজন্মের সব ছেলেমেয়েরা তাদের মোবাইলে গেমের পাশা পাশি ইন্টারনেটেও অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে সেহেতু তাদের মস্তিষ্কেও নাকি রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটছে। এ আসক্তিতে তাদের মধ্যে হতাশা এবং উদ্বেগও সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিষয়ের প্রতি অবজ্ঞা না করে তাদের প্রতি কঠিন দৃষ্ট দিতে হবে। সুতরাং-গ্রাম হোক আর শহরই হোক না কেন, বাবা মা এবং তাদের বড়দের উচিৎ ঘরে-বাহিরে তারা কি করছে। রাত্রি বেলা না ঘুমিয়ে গেম খেলছে কিনা। লেখাপড়া শেষ করে রাত ১০টায় ঘুমিয়ে পড়ত যারা তারা রাত ১২টা বা এক টাতেও ঘুমাতে যায় না। ঘুমানোর ঘরে বালিশের নিচেই রাখে ফোন। সারাক্ষণই ফোন আর ফোন। গবেষকদের গবেষণায় জানা যায় যে, ঘুমের আগেই মোবাইলের 'ডিসপ্লের আলোক রশ্মি' ঘুমের হরমোনকে নাকি অনেক বাধা সৃষ্টি করে থাকে৷ তাই মা বাবাদের প্রতি গবেষকদের পরামর্শ হলো:- ঘুমের আগে যদি সন্তানকে এই ধরনের প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসতে দেওয়া হয় তা হলে খুব ক্ষতি হবে। অবশ্যই সন্তানদেরকে 'অহেতুক অথবা অকারণে' এ ধরনের ইলেকট্রোনিক্স যন্ত্র ব্যবহারে বাধা দেওয়া প্রয়োজন। ঘুম না হলে অসুস্থভাবে বেড়ে ওঠা সকল কমলমতি তরুণ তরুণীদের বহু ক্ষতি হয়। পরিপূর্ণ ঘুম না হলে যে তাদের অমূল্য সম্পদ 'স্মৃতি শক্তির স্বাভাবিকতা' বিনষ্ট হবে। সুতরাং সঠিক সময়েই যথাযত কাজের সমন্বয়েই সন্তানদের গড়ে তোলা দরকার।

জানা যায় যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৩ বছরের নিচে "ফেসবুক আইডি" খুলতে পারবে না। কিন্তু এই চোতুর ছেলে মেয়েরা বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের ভোটার আইডি দিয়ে 'মোবাইল সিম' ক্রয় করে নিজ বয়স বাড়িয়ে ফেসবুক আইডিও খুলে ফেলছে। '১৮ বছর' বয়সের নিচে ৬৫ ভাগ ছেলেমেয়েরা ফেসবুক ব্যবহার করছে। ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ সব 'মুঠোফোন বা ইলেকট্রোনিক্স' যন্ত্রের মতো- বহু বদঅভ্যাসকেই চিহ্নিত করে তাকে পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার চাইলে ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় ব্রাউজার তৈরি করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অবশ্যই বিটিআরসি ইচ্ছা করলে এ ফেসবুকের ওপরে বয়স ভেরিফিকেশন করতে পারে। এই দেশের সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করে ভবিষ্যত প্রজন্মকেই ভালো জায়গায় পৌঁছাতে হবে। সুতরাং বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে 'চীনের মতো ব্রাউজার' তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলেই মনে করছেন আইসিটি বিশেষজ্ঞরা। এই ব্যাপারে আমাদের দেশে তেমন কোনও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেই বলেই জানান আইসিটি বিশেষজ্ঞরা। আরও বলেন যে:- ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব-সহ বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি আসার আগে সেটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়া হচ্ছে না তরুণদের। এজন্যই সমাজ ও কালচার রক্ষা করতে হলে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব বা টিকটকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।


লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় বাগডিসি’র অগ্রযাত্রা এবং ফোবানা সম্মেলন-২০২১

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-০৫ ১৬:৩৪:১১

ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এলাকার অন্যতম বৃহৎ সংগঠন-  বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব গ্রেটার ওয়াশিংটন ডিসি (বাগডিসি)। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে বাগডিসি’র  সুদীর্ঘ এক দশকেরও বেশী সময় ধরে নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে এর প্রত্যয়ী পথচলা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও মানব কল্যানমূলক কাজের প্রতিশ্রূতি নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়ে, লক্ষ্য ছিল সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা, সেবা ও উন্নয়ন। বিগত বেশ কয়েক বছরে ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় সমাজের অন্যান্য সংগঠনগুলোর মাঝে বাগডিসির একটি স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে বাগডিসি’র বিভিন্ন কল্যানমূলক কার্যক্রমের জন্য। সমাজ উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি বাগডিসি পায়ের ছাপ রেখেছে ভিন্ন ধারায় মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়ে এবং সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় অবদান রেখে। এছাড়া স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতায় এগিয়ে গিয়েছে নানা প্রাকৃতিকে দুর্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় বাগডিসি’র সামাজিক ভূমিকা ও নেতৃত্ব অত্যন্ত বলিষ্ঠ। আর তাই ২০১৬ সালে ওয়াশিংটনে যে ৩০তম ফোবানা সম্মেলন হয়েছিল, তার স্বাগতিক সংগঠন ছিল বাগডিসি। এছাড়া ২০১৭ সালে আয়োজিত ৩১তম ফোবানা সম্মেলনে (মায়ামী, ফ্লোরিডা) এবং ২০১৮ সালে আয়োজিত ৩২তম ফোবানা সম্মেলনে (আটলান্টা, জর্জিয়া) সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে প্রথম পুরস্কার অর্জন করার গৌরব অর্জন করে।

বিগত সময়ে বাগডিসি বিশেষ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি উন্নয়নমূলক ও মানবকল্যান ক্ষেত্রেও বাগডিসি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে, যেমন- বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবেলায় বন্যার্তদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আর্থিক অনুদান প্রদান, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির আশ্রয়গ্রহণের পর তাদের সংকটময় মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো, মানবাধিকারের পক্ষে  বিবেকবোধ নিয়ে তাদের অমানবিক অবস্থার প্রতিবাদ করা এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ইতিবাচক মতবাদ গড়ে তোলার জন্য ওয়াশিংটন ডিসি’তে প্রতিবাদ সভা এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টে প্রতিবাদ স্মারকলিপি পেশ করা, বাংলাদেশের দুঃস্থ-পঙ্গুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সাহায্যার্থে  সিআরপির জন্য (সেন্টার ফর দি রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্যা প্যারালাইজড, সি আর পি) তহবিল সংগ্রহ ও আর্থিক সাহায্য করা ইত্যাদি। ভবিষ্যতে এর কার্যক্রমের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে, এটাই বাগডিসি’র অঙ্গীকার। 

ফোবানা সম্মেলন-২০২১ বাগডিসির ভাবনা:
অতীতে ফোবানা সম্মেলন (২০১৬) আয়োজনের অভিজ্ঞতার আলোকে ও দীর্ঘ সময় ধরে বলিষ্ঠ সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে আগামীতেও বাগডিসি ফোবানা সম্মেলন (২০২১) আয়োজন করার জন্য আগ্রহী এবং এ বিষয়ে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি আলোচনা শুরু করেছে। ফোবানা সম্মেলনের মতো বিশাল সম্মেলনের আয়োজনে সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য সংগঠন হিসেবে বাগডিসি আগামীতে এই ফোবানা সম্মেলন আয়োজনে ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার সমস্ত সংগঠনের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে একত্রে কাজ করবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে এবিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। এছাড়া বাগডিসি’র রয়েছে পর্যাপ্ত আর্থিক তহবিলের উৎস, যা ফোবানা সম্মেলনের মতো মহা সম্মেলন আয়োজনের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়। তাই ফোবানা কেন্দ্রীয় কমিটির সুযোগ্য নেতৃবৃন্দের সার্বিক সহযোগিতায় এবং ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার সকল সংগঠনের সক্রিয় সহযোগিতায় ফোবানা সম্মেলন-২০২১ আরেকটি ইতিহাস রচনা করবে বলে বাগডিসি আশা পোষণ করছে।

বাগডিসি’র নতুন কার্যকরী পরিষদে এসেছে নতুন-পুরাতনের সেতুবন্ধনে এক অভিনব নেতৃত্বের ছোঁয়া। প্রাজ্ঞজনের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নিয়ে অদম্য উৎসাহে এগিয়ে চলছে কার্যকরী পরিষদের নতুন নেতৃত্ব এবং আগামীতে বাগডিসি’র কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার জন্য তারা দৃঢ় প্রত্যয়ী। আগামীতেও বাগডিসি তাদের উন্নয়নমূখী, সমাজসেবামূলক পদক্ষেপ এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাবার প্রত্যাশা নিয়ে নানা কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বাগডিসি যেমন অতীতে, তেমনি আগামীতেও এর সামাজিক-সাংস্কৃতি কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদেরই প্রবাসী সমাজের কল্যানে- এটাই সমাজ কল্যানে বাগডিসি’র প্রত্যয়ী পথচলা।

বিস্তারিত খবর

কল্পনাকে জাগ্রত করেই সঠিক সাফল্য অর্জিত হয়

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৪-১৪ ১৩:৫২:৫১

শিক্ষাহীন মানুষের নিজস্ব জ্ঞান স্ব-পরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকে। 'শিক্ষা' তার নিজ পরিবেশ সহ বিভিন্ন সমাজ কিংবা সভ্যতা'র সম্পর্ক গড়ে তোলেই যেন সচেতন করে। মনীষীর জীবনকে পর্যালোচনায়, অতীতের আলোকে বর্তমানের স্বরূপ উদঘাটন, দেশ-কালের নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশের ''আদর্শ, নীতি, বিশ্বাস এবং সংস্কার'' এর বিভিন্নতার উপলব্ধি, সহানুভূতির "উদারতা ও প্রসস্ততা" কিংবা বিচারের দ্বীপ্তিতে কল্পনার ঔজ্জ্বল্য সম্পাদন করাই শিক্ষার অবদান। জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়েই যেন এই মানুষ যে শক্তি অর্জন করে, সেই শক্তি অর্জনই যেন শিক্ষার উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য থেকেই তো আসে সুস্থ 'কল্পনা বা স্বপ্ন পুরনের ইচ্ছা'। জ্ঞান না থাকলে বুদ্ধি আসে না আর বুদ্ধি ছাড়া মুক্তি বা সফলতা আসতে পারে না। জ্ঞান চর্চার মাধ্যমেই সফল হওয়ার লক্ষ্যে মানুষ 'কল্পনা' করেই নানা পরিকল্পনা করে। সুতরাং প্রত্যেক মানুষ ''ছোট হোক কিংবা বড়ই হোক'' কোন না কোন স্বপ্ন নিয়েই থাকে, আর কল্পনা থেকেই যেন স্বপ্নের জন্ম। সে স্বপ্নগুলোকে অনেকেই বয়স কালে পূরণ করার চেষ্টা করে, আবার ছোট বেলার অনেক স্বপ্ন পূরণের উচ্চ আখাঙ্খা অকালে ঝরে পড়ে। এই স্বপ্ন পূরণের আখাঙ্খা ছোট থেকে হোক বা বড় হয়ে হোক স্বপ্ন পূরণের 'সূত্রপাত' কিন্তু, ছোটতেই জাগ্রত হয়। তাদের নানানকিছু চিন্তা করার মাধ্যমে তা চলে আসে। আর তারা কেউ কেউ খুব বেশি পড়াশোনাও করে এবং নিজের মস্তিস্কটি ব্যবহার করে, সেটি খুব কম চিন্তাভাবনার আবেগপূর্ণ অভ্যাসে পরিণত হয়। এইটি আলবার্ট আইনস্টাইনের উক্তি। তিনি আরও বলেছেন আমাদের মন অথবা ব্রেইন থেকেই কল্পনা আসে। মস্তিষ্ক হলো দেহের চালক। এই দেহের সমস্ত শারীর বৃত্তীয় কর্মকাণ্ড এটি দ্বারা চালিত হয়। এটির বিভিন্ন অংশের কর্মকাণ্ডে দেহের শ্রবণ, শ্বসন, চিন্তা-চেতনা, বিবেক, সৃজনশীল কাজ বা কল্পনাসহ পেশি চালনা ইত্যাদি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

সুতরাং এই মন ও ব্রেইন এ কারনে উল্লেখ করলাম, কারণ হলো উভয়েই একটা অপরটার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সব বড় বড় অর্জনের পেছনেই মন বা ব্রেইনের হাত অনেকাংশেই বেশি। তাই মানুষের মনের কাজ হচ্ছে মানুষকে 'স্বপ্ন' দেখাতে সাহস যোগায়। মানুষের যদি মন থেকে তা বিশ্বাস করে তাহলেই স্বপ্নপূরণ করাটা অনেক সহজ কাজ হয়। সব সময়ে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে। বেশি বেশি স্বপ্ন দেখতেই হবে। একজন কল্পনাবাজ কিংবা স্বপ্নবাজ হতেই হবে। যদি কারও স্বপ্ন থেকেই থাকে, তাকে সর্ব প্রথমে নিজস্ব স্বপ্ন'কে মূল্যায়ন করতে হবে, সম্মান করতেও হবে সেই নিজ স্বপ্ন ধারাটিকে। "স্বপ্ন" ছোট হোক বা বড় হোক সেটা নিয়েই গর্ব করতে হবে। তাই আলবার্ট আইনেস্টাইন বলেছিল- 'যদি তুমি একটি সুখী জীবন চাও, তাহলে এটাকে একটি লক্ষ্যের সাথেই বেধে ফেল, যে কোন মানুষ অথবা বস্তুর সাথে নয়'। আবার ডেল কার্নেগী স্বপ্ন পূূূরণের উদ্দেশ্যে বলেছিল যে, ''আত্ম বিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম ব্যর্থতা নামক রোগকে মারার সবচে বড় ওষুধ। এমনটাই আপনাকে একজন সফলকাম মানুষে পরিণত করবে।' সফলতা অর্জনের 'শর্টকাট' কোনো পদ্ধতি নেই। 'সাফল্য হল আপনি যা চান তা হাসিল করা। সুখ হল আপনি যা চান তা পাওয়া।' এ স্বপ্ন নিয়ে বলতে গেলে বলা যায়, এ পি জে আবদুল কালাম মতে 'স্বপ্ন সেইটা নয়, যেইটা মানুষরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে আর স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। বেশির ভাগ মানুষের 'স্বপ্ন' হয় আকাশ কুসুম কল্পনার মত। এমন স্বপ্নটাই দেখা উচিৎ হবে যে স্বপ্নটা পূরণের সাধ্য সকলের রয়েছে। জয় করার মতোই 'স্বপ্ন কিংবা কল্পনা' বিশ্বাস যোগ্য হতে হবে।

একটু পরিস্কার ধারণায় আসা যাক- ''কল্পনা থেকেই স্বপ্ন'', আর কল্পনাটিরও অসীম ক্ষমতা রয়েছে। এটি জ্ঞানের চাইতেও বেশি ''পরিধি সম্পন্ন''। কারণ, যিনি সব দিক থেকে অনেক বেশি জ্ঞান অর্জন করেছেন, যার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি, সর্ব ক্ষেত্রে তিনিই যেন অনেক কিছু নিজ কল্পনায় বিশ্লেষণ করতে পারেন। সেই কল্পনাকেই বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা তখন তাঁর কাছে প্রবল হয়ে ওঠে। সুতরাং মানুষ এ ভাবেই ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। অনেক ক্ষেত্রেই যে কোনো ব্যাপার নিয়ে কল্পনা করা যায় তখন সেই ব্যাপার সম্পর্কেই আরও বেশি জানবার আগ্রহটাও যেন বাড়ে। এজন্যে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিল,- ‘'কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ’'।
তিনি আরও বলেছেন,- যদি আমাকে একটি সমস্যা সমাধানের জন্য এক ঘন্টা বেধে দেয়া হয়, আমি ৫৫ মিনিট সমস্যাটা নিয়ে চিন্তা করি এবং আর বাকি ৫ মিনিট সমাধানটা নিয়ে চিন্তা করি। সুতরাং সমাধান হতে যে বাধ্য তা অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের এধরনের কল্পনা থেকেই বুঝা যায়। আপনার 'দর্শন ও স্বপ্ন'কে নিজের সন্তানের মত লালন করুন কারণ এ গুলোই আপনার চূড়ান্ত অর্জনের প্রতিচিত্র হয়ে উঠবে। এই কথা- "নেপোলিয়ন হিল" জানিয়ে আলোকিত মানুষ হওয়ায় যথেষ্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে ছিল। সত্যিকারের 'জ্ঞানী ব্যক্তি হতে চাইলে- কল্পনা এবং স্বপ্নের সঙ্গে প্রথমেই চরিত্রবান হতে হবে। বিনয়, ভদ্রতা বা কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা দরকার। পরিশ্রম, উৎসুক মন কিংবা সহজাত বুদ্ধিমত্তা ছাড়া জ্ঞানের জগতে খুব সহজেই যেকেউ প্রবেশ করতে পারে নি। 'ধৈর্য, সহ্য এবং সরলতা' না থাকলে জ্ঞানকে ধারণ করাও যায় না। তাই কৌশল, দক্ষতা, সময়জ্ঞান কিংবা সাহস না থাকলে জ্ঞানকে সুযোগমতো ব্যবহার করা যায় না। মানুষের হৃদয়ের বিশালতা থাকা প্রয়োজন, ক্ষমা করার ক্ষমতা এবং অপ্রিয় বিষয় গুলোকে মানুষকেই যেন ভুলে থাকার যোগ্যতা বা দক্ষতা দরকার। এ যোগ্যতা না থাকলে আপনার জ্ঞান বিস্মৃতির কবলে পড়ে দিন দিন হ্রাস পেতেও থাকবে। সংযম, দিব্যদৃষ্টি, অনুভূতিপ্রবণ বা সহানুভূতিশীল না হলে জ্ঞান কেউ গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে আসবে না। সুতরাং, মোহনীয় ব্যক্তিত্ব, কথা-কর্মের নান্দনিক মাধুর্য কিংবা পর্যাপ্ত রুচিশীলতা না থাকলে 'জ্ঞান' লোকারণ্যেও বিজ্ঞময় সুগন্ধি ছড়াবে না। 'পরিশ্রম করতেই হবে, কঠিন পরিশ্রম। আপনার কাজকে সহজ করতেই পরিশ্রম করতে হবে। কারণ, একবার পরিশ্রম করে যদি আপনি কাজকেই সঠিক ভাবে বুঝতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তী সময়ের কোন কঠিন কাজটি পরিশ্রম না করেই তার সঠিক ফায়দা লাভ করা যায়'।

তাই বলতে চাই- কল্পনা শক্তি জাগ্রত করেই পরিশ্রম করা প্রয়োজন। দার্শনিক মার্শাল বলেছিল, 'মানুষের কল্পনাশক্তি না থাকলে পৃথিবীর এতো উন্নতি সাধিত হত না!' জেনে রাখা দরকার যে, কোন ভিশন কিংবা মিশনকে সামনে রেখে সুদূর প্রসারি চিন্তা করা হলো কল্পনা আর নিজের অজান্তে বা ঘুমে যা চলে আসে তা স্বপ্ন! কেবলি স্বপ্ন! তাই জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে কি পেলাম 'কল্পনা শক্তি' দ্বারা সেটাই বড় প্রশ্ন নয়, বরং কি করেছি সেটাই বড় প্রশ্ন। জীবনের বহুমুখী কর্মটি এক কথায় পরিকল্পিত কল্পনাতে করতে হবে। এমন পরিকল্পনার ধাপ গুলোকে প্রয়োগ করে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ দরকার। তাই শারিরিক ও মানুষিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ধাপ গুলো সম্পূর্ণ করতে হবে। যদি সেইসকল কাজ সঠিক মত করা যায়, তাহলেই এই জীবনে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা যাবে। জানা দরকার শরীর রক্ষার পাশাপাশি জ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা এবং কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়েই জ্ঞান অর্জন অতীব জরুরি। কেউ যদি মন'কে পরিচালনার ধরন না জেনে জ্ঞানার্জন করে চায় তবে তার সুস্থশরীর ও শক্তি-সামর্থ্য অবশ্যই বিপদাপন্ন কিংবা বিপত্তি বয়ে আনতে পাবে। জানা কথা হলো, মানুষের "মন এবং মস্তিষ্ক" প্রায়ই দ্বিমুখী চিন্তা করে। আর বিপরীতমুখী সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে আবার পরস্পর বিরোধী স্বপ্ন দেখে। মানুষের 'পাঁচটি ইন্দ্রিয়' আবার পাঁচ রকমের-রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ দ্বারাই যেন পাঁচ ভাবে মন ও মস্তিষ্কের পরস্পরবিরোধী চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্নকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রেক্ষাপট বা পরিস্থিতিকে জটিল থেকেই জটিলতর করে তোলে। এমন এ জটিল সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবেশ-পরিস্থিতি, সমাজ-সংসার। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ কিংবা জ্ঞানী-গুণীদের নানা মুখী বুদ্ধি-পরামর্শ ও তাপ-চাপ ইত্যাদি। ফলে এত সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মানুষের মন ও মস্তিষ্ক কেবল তখনই সঠিক কল্পনাটি করতে পারে। আর যখনই সেখানে অতি প্রয়োজনীয় জ্ঞান উপস্থিত থাকে।

সত্য স্বপ্ন বা কল্পনা হলো মানুষের সম্প্রসারিত সুক্ষ সহজাত অনুভুতির ফল। প্রতিটি মানুষের ভেতরেই এ সুক্ষ সহজাত অনুভুতির উপস্থিতি কিছুটা হলেও থাকে। আসলে ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টাই যেন কল্পনার কাজ। যারা এ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের বেশির ভাগ ব্যক্তিই ভবিষ্যৎ কি হবে তা কল্পনার দ্বারা অনুমান করতে পেরে ছিল। এটাই মানুষের অনেক বড় একটা গুন। আসলেই ভবিষ্যৎ সবার জন্য অনিশ্চিত, যেটা ভাবব সেটা নাও ঘটতে পারে। কিন্তু অনুমান কতটুকু সঠিক হচ্ছে তাকে তো বুঝতে কল্পনার প্রয়োজন। সুতরাং- সবারই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব কল্পনা কিংবা স্বপ্নের রূপটাই বা কেমন তাকে অনুভব করা ও দেখার চেষ্টা করা উচিৎ। তাই কল্পনা শক্তিতে জাগ্রত করেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। "ব্রায়ান ট্র্যাসি" বলেছিল সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হল আমরা যা ভয় পাই সে গুলো অপেক্ষা- আমরা যা আশা করি বা পেতে চাই সেগুলোর উপর আমাদের সচেতন মনকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সুতরাং- কল্পনা বা স্বপ্নকে জাগ্রত করে জীবনের 'লক্ষ্য বা সফলতা' অর্জন করা প্রয়োজন। পরিশেষে 'আলবার্ট আইনস্টাইন' এর একটি উক্তির আলোকেই বলতে চাই, 'কল্পনা বিদ্যার চেয়েও শক্তি শালী কেননা বিদ্যারসীমা আছে কিন্তু কল্পনার সীমা নেই'।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

জ্ঞানহীন মানুষের হাতেই শুরু শিক্ষা ও সাক্ষরতা

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৩-২০ ১৭:১৭:০২

প্রস্তর যুগের আদিম মানুষ তাদের ক্রিয়াকলাপ, দেবতাকুলের শক্তি এবং লীলা বৈশিষ্ট্যের উপরেই যেন অন্ধবিশ্বাস ছিল, তখন ছিল না মনের ভাব প্রকাশের কোনো "ভাষা"। ঋতু চক্রের পরিবর্তনে জীবনকর্মের প্রয়োজনের তাগিদেই ধীরে ধীরেই নিরক্ষর মানুষ জাতিরাই সৃষ্টি করা শিখ ছিল ''ভাষা''। দীর্ঘ পথের পরিক্রমায় এমন নিরক্ষর মানব জাতি ভাষার সহিত অক্ষর আবিষ্কার করতে শিখে।এই মানব সমাজের উন্নয়ন বা অগ্রগমনের ইতিহাস যেমন বহুধা বিচিত্র। আবার সে উন্নয়নের পশ্চাতেই ক্রিয়াশীল শিক্ষার ইতিহাসও তেমনি "বিচিত্র কিংবা গতিময়"। এক একটি 'দেশ এবং জাতি' নানা ভাবেই নানা উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে বা তাদের সু-শিক্ষা ভাষা গড়ে তোলে। তাদেরই ভৌগোলিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক সহ ইত্যাদি উপাদান বারবারই সে সকল ব্যবস্থার পরিবর্তন এনেই যেন 'নবীকরণ ও সংস্কার' চালিয়ে সুশিক্ষার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তাই, এমন এই বাংলাদেশে 'প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস' শুরু হওয়ার এক বিশাল ইতিহাসও রয়েছে। আর সেই ইতিহাসটি 'নিরক্ষরতা' দূর করার জন্যেই বদ্ধপরিকর পরিবেশ সৃষ্টির এক ইতিহাস। এই পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই প্রায় ৪ শো বছরই বলা যায়, দীর্ঘদিনের একটি 'ইতিহাস'। আবারও বলি মানব সভ্যতার শুরু তো নিরক্ষরতার মাধ্যমেই, তাকে মোটা দাগের আলোকে অমর্ত্য সেন বলেছে, নিরক্ষর মানুষের হাতেই সমাজের সভ্যতার বড় বড় অনেক-"ভিত" গড়ে উঠেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে একটা সময় ছিল মানুষ তখন নিরক্ষর হয়েও শিক্ষা লাভ করে দেখিয়েছে। অনেক ধরনের 'ভাষা', কতো রকমের নানান 'অক্ষর' তাঁদের নিজস্ব হাত ও মুখ দ্বারাই যেন সৃষ্টি করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলাই যায়, নিরক্ষর মানুষ যে "জ্ঞানী ব্যক্তি" হননি এমনও বলতে চাই না। 'লালন শাহ' নিরক্ষর মানুষ কিন্তু বহু সাক্ষর মানুষ তাঁর কাছে যুক্তি তর্কে কখনো দাঁড়াতে পারেনি। তবুও যেন এই দেশের মানুষের সাক্ষরতার প্রয়োজন রয়েছে। অক্ষর আছে বলেই তো লালনের দর্শন ও গানগুলো আজও সমাজে রয়েছে। আসলে বলতে চাই যে, 'নিরক্ষরতা' যদি নাও দূর হয় তাহলে সবাই লালন শাহের মতো হয়ে যাবে। বলতে চাই যে, লালনসহ অনেক গুনী জনদের চিন্তা ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগটা বহুগুন বেড়ে যাবে।

সুতরাং, মানুষের কল্যাণেই যেন সাক্ষরতার দরকার আছে। সাক্ষরতা বিচরণের ক্ষেত্রটিকে বহুমুখী করে বাড়িয়ে তোলে অন্যের চিন্তা এবং অভিজ্ঞতার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। ১৯৭২ এ স্বাধীন বাংলাদেশে ১ম 'আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা' দিবসটিকে পালন করেছে। তাই প্রতি বছর এই দেশে সাক্ষরতা দিবসটি পালনের জন্য দেশের সরকার 'প্রাথমিক ও গণশিক্ষা' মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানেই ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। ইউনেস্কোর ইংরেজি থিমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে, ‘'সাক্ষরতা অর্জন করি, ডিজিটাল বিশ্ব গড়ি'’ এমনই স্লোগান সামনে রেখে, এ সরকার আগামীর ভবিষ্যৎ দেখছে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষা কিংবা সাক্ষরতার বিকল্প নেই। সাক্ষরতা মানুষকে কর্মদক্ষ করে, মানবসম্পদে পরিণত করে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিরক্ষর জন-গোষ্ঠী একটি অন্তরায়। সুতরাং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশা-পাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষারও গুরুত্ত্ব অপরিসীম। এ দেশের নিরক্ষর জন-গোষ্ঠী ও আষ্ঠানিক শিক্ষা হতে অনেক বঞ্চিত শিশু, কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে যুব ও বয়স্কদের 'সাক্ষরতা কিংবা মৌলিক শিক্ষা' প্রদানের পাশাপাশি যেন ট্রেডভিত্তিক দক্ষতা-প্রশিক্ষণ প্রদান হলে তারা উন্নত মানবসম্পদে পরিণত হয়েই দেশের 'অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা' রাখতে সক্ষম হবে। বর্তমান সরকার এইলক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নও করেছে। "সাক্ষরতার হার" বৃদ্ধির পেছনেই জাতির জনকের অবদান স্মরণে রাখা বাঞ্ছনীয়। এ অভিশাপ মোচনের লক্ষ্যেই যেন "বঙ্গবন্ধু"- গণমুখী শিক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়ে ছিল। ‘'ড. কুদরত-ই-খুদা'’ শিক্ষা কমিশন গঠনও করেছিল। তাই শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্য দূর করতে তিনি চেয়ে ছিল। কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সন্তানেরা যাতে নিরক্ষর না থাকে, সেই চিন্তা তিনিই করেছিল। শোষিতের ঘরে শিক্ষার আলো দান করতে চেয়েছিল। তাঁর প্রাণটিকে কেড়ে নেওয়ার কারণে সবকিছু ধূলায় লুণ্ঠিত হয়েছে। তাই সেই দিক থেকে- বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত গড়ে দিয়ে ছিল কৃষক সমাজের মাধ্যমেই, আজও তাঁরাই অর্থনীতিকে সচল রেখেছে শ্রম বা মেধা'র প্রচেষ্টায়।সেই "মজদুর" শ্রেণীরাই দেখা যাবে যে বেশির ভাগই তাঁরা "নিরক্ষর"। সাক্ষরতা সব সময় 'জ্ঞানের বাহন' নয়। তবুও 'নিরক্ষরতা থেকে মুক্তি' পাওয়ার জন্যেই সময়ের পরিক্রমায় সাক্ষরতার চাহিদাটাও বাড়ছে।নূন্যতম শিক্ষাযোগ্যতা অর্জন করা অবশ্যই দরকার রয়েছে। এ বাংলাদেশের অল্প শিক্ষিত ব্যক্তি আরজ আলী মাতব্বর শুধুমাত্র 'দ্বিতীয় শ্রেণী' পর্যন্ত পড়েও তিনি সুশিক্ষার আলো ছড়িয়েছে। বাংলা বই পড়েই যেন নানান প্রশ্ন মাথায় নিয়ে বহুকিছু রচনা করেছে, পাঠক সমাজে সমাদৃত হলেও এমন দুএকটি উদ্ধৃতি আঁকড়ে ধরে সামাজিক পরিমণ্ডলের দৃষ্টান্ত দেয়াটা অবশ্যই ব্যতিক্রম। সুতরাং নিরক্ষর থাকার সমস্যার দিক সত্যিই অনেক। আবার এ কথাও অবশ্যই সত্য মানুষ নিরক্ষর থাকলে তো আর না খেয়ে মারা যায় না। তবুও নিরক্ষরতা দূর করালে মানুষের বিচরণের সীমা বহু গুণ বেড়ে যায়। বাংলা সাহিত্যে'র একজন নন্দিত সু-লেখক "প্রমথ চৌধুরী" বলেছে, ‘'সুশিক্ষিত মানেই স্বশিক্ষিত।'’ স্বাক্ষর সম্পন্ন না হলে স্বশিক্ষিত হবেই বা কেমন করে। সুুতরাং কোন্ ব্যক্তি নিরক্ষর- সে ব্যক্তির স্বাক্ষর জ্ঞান নেই, তাঁর চেতনার মানটিও হবে অনেক নিম্ন মানের।

অজানাকে জানার মাধ্যম শুধু যে শিক্ষা বা সু-শিক্ষা তা কিন্তু নয়, ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন সেই সাথে শিক্ষার মাধ্যমে বহু অর্জিত জ্ঞানের দ্বারা বাস্তবতার সহিত খাপ খাওয়ায়েই সামনের দিকে চলার দক্ষতা অর্জন করাটাই 'শিক্ষা'। প্রতিটি বিশিষ্ট জাতি কিংবা সমাজে 'শিক্ষা' নামক বিষয়টির বোধ এবং তাৎপর্য ক্ষেত্রবিশেষে সমতাধর্মী কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে স্বতন্ত্র। একাধিক থেকেই দেখলে, ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের মানুষ একত্রিত হয়েই যেন সর্ব- বৃহৎ মানবগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। আর সেটিকে প্রকৃত অর্থে "সু-শিক্ষা" বলা যায়। এই মানবগোষ্ঠীর প্রভাব সামগ্রিক ভাবেই শিক্ষা নামক বোধটিকেই প্রভাবিত করে নানা ক্ষেত্রে, আবার অপরদিকে সমাজ কিংবা জাতি বিশেষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এবং লক্ষণ'কে সেই সমাজ বা জাতির শিক্ষা প্রক্রিয়াকেই অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে। একটু অতীতের দিকে তাকিয়ে ধরা যাক আদিম গোষ্ঠীর কথা, তখন থেকে বয়স্করা যুগ যুগ ধরে ছোটদেরকেই আগুনের ব্যবহার, মাছ ধরা, শিকার করা, গাছে চড়া, ডিঙি বা নৌকা তৈরিসহ তা চালানো, সাঁতার কাটা, যে কোনো বস্তুর ওজন এবং বস্তু বা মানুষের ক্ষমতার বিচার, দূূূূরত্বের বোধ, বসত বাড়ি কিংবা আশ্রয় তৈরি মতো অনেক বিষয়ে জ্ঞান নিয়ে থাকতো। এমন বেশ কিছু বিষয়ের পাশা পাশি ভাষা জ্ঞানের সহিত অক্ষর জ্ঞানেও দক্ষ হতে বয়স্ক ব্যক্তিরাই সহায়তা করতো। বয়স্করাই যে পরিপূর্ণতা নিয়ে সেই প্রস্তরযুগের আদিম মানুষ যথাযথ নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করতে পারতো তা নয়। সাময়িকভাবে তারা সমস্যার সমাধান করার কথা ভেবেই সেই সব মানুষ নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্যেই 'ভাষা কিংবা অক্ষর' আবিষ্কারের কথা ভেবে ছিল বা শিখে ছিল। শুরুতে নিরক্ষর মানুষের হাত ধরেই যেন নিজ ভাষা আসতে শুরু করেছে। তার পরেই তো আসে- অক্ষর জ্ঞান।

বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা'র সাথে বাংলা লিপি কিংবা অক্ষরের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলা লিপি কিংবা অক্ষর অথবা হরফের "উৎস ও উৎপত্তি" কী ভাবে হয়েছিল তা স্পষ্ট জানা না গেলেও গবেষণার মতে মনে করা হয়, বাংলা লিপি'র ব্যবহার খ্রিস্টাব্দ "একাদশ শতক" থেকেই প্রচলিত। ইংরেজ শাসনের বহু আগেই মুসলিম শাসনকালে তার শুরু। বাংলার সুলতানী শাসনে লিপির ব্যবহার এবং বাংলা ভাষার পুঁথি রচনা ব্যাপকতা পেতে থাকে। এমন এ "বাংলা" লিপির ব্যবহার প্রায়ই মধ্যযুগীয় ভারতের পূর্বাঞ্চলে যেন শুরু হয়েছিল। তারপরেই যেন পাল সাম্রাজ্যের মধ্যে ব্যবহার ছিল। আরো অনেক পরে বিশেষভাবে বাংলার অন্য অঞ্চলেও ব্যবহার অব্যাহত ছিল। এর পর 'বাংলা' লিপিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বের অধীনে 'ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর' এর দ্বারাই 'আধুনিক বাংলা' লিপিতে 'প্রমিত' করা হয়েছে। তাই বর্তমানে এই 'বাংলা লিপি কিংবা অক্ষর' বাংলাদেশ ভারতে সরকারী লিপিতেই পদমর্যাদা স্থান পেয়েছে।সুতরাং, বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে। তাই, অক্ষর দিয়েই তৈরি হয়েছে "পুঁথি বা গ্রন্থ", সে সকল গ্রন্থের মধ্যেই মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ হয়ে থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সব শ্রেণী পেশার মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণার কথাও ভাষার সাহায্যে বহু গ্রন্থের মধ্যেই লিপিবদ্ধ। বর্তমান কালেই তার বিশাল ব্যাপ্তি, বিচিত্র তার আকার। এই সম্পর্কে আরো পরিস্কার পরিসংখ্যানের আলোকেই বলতে চাই, গোপাল হালদার তাঁর "বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা" গ্রন্থে দেখিয়েছে যে, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলেই যেন 'বাংলা সাহিত্যে'র' বহু উন্নতি হয়েছিল। পাশাপাশি সতেরো শতকের মধ্যেই "পাঠশালা" নামক প্রারম্ভিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষায় সাক্ষরতা লাভ বা অ আ ক খ ইত্যাদি অক্ষর পরিচয়েরও সন্ধান মেলে। "বাংলা পাঠশালা" নামক প্রাথমিক শিক্ষার এক 'প্রথাবদ্ধ ধারা' চালু হয়ে ছিল সতেরো শতকে ইংরেজরা এই দেশ দখলের অনেক পূর্বেই। বিভিন্ন বাংলা সাহিত্যে পাঠশালা সম্পর্কে যা জানা যায় তা থেকে ধারণার আলোকে বলা যায় যে সতেরো শতকের আগেই হয়তো "পাঠশালা" শিক্ষার শুরু। সে হিসেবে বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার বয়স চার শো বছরের কম নয়। সুতরাং, 'বাংলা ভাষার অক্ষর' শিক্ষা কয়েক জন্মের মানুষরা তাকে পাঠ করে শেষ করতেও পারবে না। তাই তো,- ''মানুষের নিরক্ষরতা" দূর করতে এমন সব ''পুঁথি কিংবা বই'' পাঠ করবার সুযোগ দীর্ঘদিনের এক বৃহৎ ইতিহাস। আবার তাকে দিয়েইতো অন্যের বিচিত্র চিন্তার সাথে নিজের চিন্তা ভাবনার আদান-প্রদান করা যায়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরেই যেন 'সাক্ষরতা' শব্দের প্রথম উল্লেখ হয়েছে ১৯০১ সালে জণগন বা 'লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে'। সেই শুরুতে স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নামধাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০-এর দিকে পড়া লেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। ষাটের দশকেই পড়া এবং লেখার দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই যেন স্বাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখা-পড়া এবং হিসাব-নিকাশের পাশা পাশি সচেতনতা কিংবা দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পড়ার ক্ষমতার সঙ্গেসঙ্গেই যেন তারা সাক্ষরতার দক্ষতাতেই স্বীকৃতি পায়। সুুতরাং-আধুনিক তথাকথিত সভ্য সমাজের শিক্ষার ধারাতে এমন ইতিহাসের কথাগুলো বাংলাদেশের বেশ কিছু দক্ষতা বা নৈপুণ্যের শিক্ষা অথবা বৃত্তিমূলক শিক্ষার শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করবার কথা ভাবায়। কারণ,- যত দিন যায় 'সভ্যতা ও অগ্রগতির বিকাশ' হতেই থাকে, ততই বাস্তব প্রয়োজনের নিরিখে দরকার হয় শিক্ষা।সুতরাং, বয়স্ক সমাজেরই পরম্পরাগত কিছু নির্দেশ-অভিমুখী শিক্ষা যার মধ্যেই যেন "জ্ঞান নৈপুণ্য আর মূল্যবোধের সম্ভার' ওতেপ্রাত হয়ে থাকে। এপৃথিবীর প্রতিটি উন্নত দেশের মানুষ ১ শো ভাগ উচ্চ শিক্ষিত না হলেও ১০০ ভাগ স্বাক্ষর সম্পন্ন তা জোর দিয়েই বলা যায়। জ্ঞানের আঁধার মানুষের সুখ এবং সুবিধা নিশ্চিত করে, স্বল্প সম্পদের বহু-বিধ ব্যবহার অথবা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে, সুদক্ষ ও যোগ্য জন-শক্তি গড়তে শিক্ষার আমূল পরিবর্তন বর্তমান সময়ের চাহিদা। তত্ত্ব বা তথ্যে'র- প্রায়োগিক শিক্ষায় উৎপাদনমুখী সমাজে তার প্রয়োজন গভীর ভাবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এই সাক্ষরতার সহিত জীবন নির্বাহী দক্ষতা, যোগাযোগের জন্যেই দক্ষতা, ক্ষমতায়নের জন্য দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাতেও সংযোজিত হয়েছে। একটি
দেশের জন্যই 'সাক্ষরতা' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে 'সাক্ষরতা' আর সাক্ষরতার সঙ্গেই যেন দেশের উন্নয়নের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে দেশের সাক্ষরতার হার যত বেশি সেদেশ তত উন্নত। স্বাক্ষর জাতি সচেতন জাতি। শিক্ষা সাধারণত ৩ টি উপায়ে অর্জিত হয়। যা- 'আনুষ্ঠানিক', 'উপানুষ্ঠানিক' কিংবা 'অনানুষ্ঠানিক'। যারা "আনুষ্ঠানিক শিক্ষা" বঞ্চিত বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি তাদের স্বাক্ষরতার জন্যই 'উপানুষ্ঠানিকভাবেই শিক্ষা' দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সরকারি প্রচেষ্টার বাইরে বিভিন্ন এনজি সংস্থাগুলো 'সাক্ষরতা' বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক বাংলাদেশ গঠন করতে প্রত্যেকের অবস্থান থেকেই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সাক্ষরতাই হচ্ছে শত ভাগ শিক্ষিত করার প্রাথমিক ধাপ। সেইজন্য নিরক্ষরতা, ক্ষুধা বা দারিদ্র্য হলো দেশের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। এ সকল সমস্যাকে মোকাবেলা করতে পারে কেবল মাত্র শিক্ষা। প্রতিটি নাগরিককে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতেই সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার জরুরি।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলা, ধর্ম ও বর্ণবাদের সম্মিলিত রূপ

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৩-১৫ ০৭:৩৩:৫৮

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা বিশ্বে যে ঘৃণার চাষ হচ্ছে তারই উৎপাদিত ফল এটা। আমাদের দেশের অনেককেই দেখলাম, তার মধ্যে কেউকেটাও অনেকে রয়েছেন। বলছেন, যারা এই নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে না কেন? এ বিষয়ে বলার আগে, এমন নৃশংতার জন্য দায়ীদের ৭৪ পৃষ্ঠার বক্তব্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া প্রয়োজন, যা তারা প্রকাশ করেছে সামাজিকমাধ্যমে। যাকে এই খুনি গোষ্ঠী বলছে, ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’।

সেই বক্তব্যটি একটু খুঁটিয়ে দেখলেই, খুনি ব্রেন্টনদের ঘৃণাবাদী চিন্তার কতগুলো কারণ পরিষ্কার হয়ে যাবে। যার মধ্যে প্রধান দুটি হচ্ছে ধর্ম ও বর্ণবাদী চিন্তা। ইসলামের প্রতি ঘৃণা এই গোষ্ঠীটির শুধু সাম্প্রতিককালের আল কায়েদা বা আইএসের পাল্টা প্রতিক্রিয়া নয়। এই ঘৃণা শত বছরের। ব্রেন্টন বা তার গোষ্ঠী জানাচ্ছে, ‘ইউরোপিয়রা দাস ছিল মুসলিমদের। মুসলিমরা তাদের ‍ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন শত বছর ধরে। সেই ইউরোপিয়ানদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছে ব্রেন্টন টারান্ট।’ এটা হলো ধর্মীয় দিকের কথা। এর বাইরে রয়েছে বর্ণবাদী আরেকটি বক্তব্য। ব্রেন্টন বা তাদের চিন্তা জানাচ্ছে, ‘বাদামীদের কোনোভাবেই ইউরোপের মাটিতে মেনে নেওয়া হবে না।’ শুধু ধর্ম নয়, এদের ভেতর কাজ করছে বর্ণবাদী উগ্রতাও। এরা পরিষ্কার জানাচ্ছে, ‘ইউরোপের ভূমি মুক্ত করতে হবে নন হোয়াইটদের কাছ থেকে।’ একেবারে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের কথা এবং তার সাথে যোগ হয়েছে ধর্মীয় চিন্তার।

এই গোষ্ঠীর চিন্তার সঙ্গে যদি আল কায়েদা বা আইএসে’র চিন্তার তুলনায় করা যায়, তাহলে দেখা যাবে ধ্বংসের পরিধি এই গোষ্ঠীটির দ্বিগুন। আইএস বা আলকায়েদার কোনো বর্ণবাদী চিন্তা নেই। অনেক সাদা চামড়ার মানুষ আইএসে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করেছে, এ ক্ষেত্রে আইএসের চিন্তায় বর্ণ কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তথাকথিত ধর্মীয় চিন্তাই ছিল প্রধান। কিন্তু ব্রেন্টন গোষ্ঠীর চিন্তাটা দ্বিগুণ ভয়াবহ। এরা ইসলামকে ইউরোপে ঠাঁই দিতে চায় না, সাথে সাদা বাদে অন্য চামড়ার কাউকেও নয়। অর্থাৎ এই গোষ্ঠীটি শুধু ধর্মীয়ভাবেই উগ্র নয়, উগ্র বর্ণবাদীও। আর ধ্বংসবাদী এমন দুটি চিন্তার সম্মিলন, সত্যিকার অর্থেই ভয়ানক। এমন চিন্তার মানুষের কাছে মুসলমান কেন, কোনো ধর্মের মানুষই নিরাপদ নয়। বাদামী বা কালো চামড়ার খ্রিস্টান হলেও নয়।

ব্রেন্টন গোষ্ঠী এটাকে সশস্ত্র সংগ্রাম বা যুদ্ধ হিসাবে ঘোষণা করেছে। তারা যে কোনো প্রক্রিয়ায় সাদা চামড়া ব্যতীত অন্যদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে এবং সেটা গণহত্যার মাধ্যমে হলেও। কী ভয়াবহ কথা। আইএসও সম্ভবত গণহত্যার কথা এমন পরিষ্কারভাবে বলেনি। ব্রেন্টন গোষ্ঠীর ক্ষোভ অভিবাসীদের প্রতি, এমন কথা যারা বলতে চান, তারা মূল সমস্যাটাকে পাশ কাটাতে চাচ্ছেন। ব্রেন্টন গোষ্ঠীর ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্টে’ এমন কথা থাকলেও এটা মূল কথা নয়। মূল কথা হলো, এক সময় ইউরোপে মুসলমানদের কর্তৃত্ব ছিল এটা তাদের ক্ষোভের বিষয় এবং হোয়াইট সুপ্রিমেসি তথা সাদা চামড়ার প্রভুত্ব তাদের দাবির বিষয়। আর অভিবাসীদের কারণে সাদা চামড়ার বর্তমান প্রাধান্য ক্ষুণ্ন হতে পারে এটা তাদের আশঙ্কার বিষয়। ধর্ম আর বর্ণ হলো তাদের ঘৃণার গাছের গোড়া আর অভিবাসী বিষয়টি হলো ডালপালা।

সুতরাং ব্রেন্টন গোষ্ঠীর মূল তথা গাছের গোড়া হলো ধর্ম ও বর্ণবাদ। দুটি ভয়ঙ্কর উগ্রপন্থার সংযোগ, সম্মিলিত রূপ। এই রূপের কাছে আল কায়েদা বা আইএস নস্যি। এই রূপকে ব্রেন্টন গোষ্ঠী লুকিয়েও রাখেনি। ব্রেন্টন নিজেকে দাবি করেছে রেসিস্ট ও ফ্যাসিস্ট হিসাবে। সত্যিকার উগ্রবাদীদের কোনো রাখঢাক থাকে না, তারা যা করবে পরিষ্কার জানায় এবং করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, এমন চিন্তার ধারকরা তাদের টার্গেটদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তাদের নিয়ে পরিহাস করে। ব্রেন্টন গোষ্ঠীর বক্তব্যও তার প্রমাণ দেয়।

ব্রেন্টন ও তার চিন্তা বলছে, ‘তুমি যদি পরাজিত হও তবে ইতিহাস তোমাকে দানব বলবে, সেখানে পদ্ধতি কোনো ব্যাপার না। প্রথমে জয়ী হও, তারপর না হয় ইতিহাস রচিত হবে।’ নচিকেতার গানের কথা আবার উল্লেখ করতে হয়। ‘বিজয়ীরা বরাবর ভগবান এখানেতে, পরাজিতরাই পাপী এখানে’- রেসিস্ট এবং ফ্যাসিস্টরা এ কথাটাকেই তাদের মূলমন্ত্রভাবে। তারা যেকোনো মূল্যে জয়ী হতে চায়, চাণক্যের ‘সাম-দাম-ভেদ-দণ্ড’, যেকোনো উপায়ে। গুম-খুন-গণহত্যা রেসিস্ট বা ফ্যাসিস্টদের কাছে কোনো ব্যাপারই না। তারা ভাবে, ‘রাম যদি হেরে যেত রাবণ দেবতা হতো’ এবং ইতিহাসও যেত রাবণের পক্ষে।

ফুটনোট : পৃথিবীর তাবৎ আক্রান্তদের চিত্র এক, পরিবারের মর্মবেদনা এক। ধর্ম-বর্ণ, চিন্তা-দর্শনের বিভেদকে যারা ঘৃণায় রূপান্তরিত করে তাদের চেহারাও এক।

আক্রান্তদের পাশ দাঁড়ানো, সে যেই হোক মানুষের মানবিক দায়িত্ব। সমপরিমাণ দায়িত্ব ঘৃণাবাদীদের চিহ্নিত করা। ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে জানিয়ে দেওয়া, এরা ঘৃণার চাষ করে, আমরা করি মানবতার।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

বিস্তারিত খবর

২৬ মার্চের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পূর্ণ বিজয়

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৩-০৬ ১৪:০৪:৩৬

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব ও অহংকার। এ মুুুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর- সেই সোনার বাংলাদেশ এবং দিনেদিনেই এসে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের নিকট থেকে এদেশের জনগণ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানের- দুই প্রদেশের মধ্যে যেন বিভিন্ন প্রকার ইস্যু নিয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, সেগুলোর মধ্যে কিছু তুলে ধরা যেতে পারে যেমন ভূূমিসংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি বা প্রশাসনের কার্যক্রমের মধ্যে দু'প্রদেশের অনেক বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নানা ধরনের সংশ্লিষ্ট বিষয়েই সংঘাত ঘটে। মূলত ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের মুুুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা বলা যায়। বাঙালিরা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ক্ষমতায় গিয়েও পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলাকে শাসন করার অধিকার পায়নি। তখন পূূর্ব বাংলার জনগণ মূলত "২১-দফা" প্রণয়ন করেই জনগণকে সংঘবদ্ধ করে রাজনৈতিক আন্দোলনের চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। আবার ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আজকের আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করলে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের সেই সামরিক এবং বেসামরিক নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের জননেতা- শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসাতেই যেন অস্বীকার করে। সুতরাং, 'জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু' তার প্রতিবাদে 'অসহযোগ আন্দোলনের ডাক' দেয়। তিনি ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অর্থাৎ বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জন-সমুদ্রে ঘোষণা করেছিল এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তাঁরই এই ঘোষণায় সাধারণ মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এর পর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে আবারও বঙ্গবন্ধু ''স্বাধীনতার ডাক" দিলেই বাংলার মুক্তিকামী মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মুুুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ 'নয় মাস' রক্ত ক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় সূচিত হয়। অর্জিত বাংলার স্বাধীনতা।
২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর দুটি দিবস কিংবা দিনকে বুঝতে বা বুুঝাতে একটু হয়তো বা অনেকের সমস্যা হয়। 'স্বাধীনতা দিবস' ২৬ মার্চ আবার 'বিজয় দিবস' ১৬ ডিসেম্বর। "স্বাধীনতা" ও "বিজয়" দিবসকে নিয়ে বহুজনেরই উলটাপালটা হয়ে থাকে এবং অনেকের দুই জায়গার কথাগুলোকেই গুলিয়ে একাকার করে ফেলে। পরিস্কার ধারণার আলোকেই বলতে হয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হচ্ছে ২৬ মার্চ তারিখে পালিত হওয়া এক 'জাতীয় দিবস'। এটিকেই ১৯৭১ সালের "২৫ মার্চ" রাতে তৎকালীন 'পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ' আনুষ্ঠানিকভাবেই স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করে। আর সেই মুহূর্তের "২৬ মার্চ" 'স্বাধীনতা দিবস' বলতে, "২৬ মার্চের রাত- ১২টা" থেকে স্বাধীনতাকেই এ দেশের জনতার ধরে আসছে। কারণটা হলো যে:- বারোটার ঠিক পর মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান কিংবা এই বাংলাদেশের জমিনে যতধরণের পাকিস্তানী সেনারা ছিলো তারাই যেন হয়ে গেলো বিদেশী হানাদার শত্রু বাহিনী এবং তাদের নিজস্ব "জন্মভূমির মাটি" থেকে তাড়াতেই যে যুদ্ধ শুরু হলো- সেটাই হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার যুদ্ধ কথাটা- "একটু ভুল"। আর '২৬ মার্চ' থেকে যদি আমরা শুরুর প্রক্রিয়াতে "স্বাধীন" না হই তাহলে, মুক্তিযুদ্ধটা কিন্তু আর- "মুক্তিযুদ্ধ" থাকে না, পাকিস্তানের সহিত গৃহ যুদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং, এমন বিদেশী দখলদার বাহিনীদের সহিত দীর্ঘ- ''নয় মাস''
আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে এদেশে 'বিজয়' আনে, তাই তো আমরা পেয়েছি ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস।
পৃথিবীতে মাত্র দুইটি দেশ 'স্বাধীনতার 'ডাক বা কথা' ঘোষণা দিয়েই স্বাধীন হয়েছে। এই 'বাংলাদেশ' আর আমেরিকা। সে হিসেবে '২৬ মার্চ' থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীন, তা সাংবিধানিক ভাবেই প্রতিষ্ঠিত, এটা নিয়ে আদৌ তর্কের কোন অবকাশ নেই। বলা দরকার যে, পাকিস্তানের শাসকরাই চেয়ে ছিল ক্ষমতা সব সময় পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে থাকুক। সুতরাং তারাই দিনে দিনে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মানুষকে যাঁতাকলে বন্দি রাখার কৌশল অবলম্বন করে। পূর্ব পাকিস্তানের 'পাট', 'চামড়া' আর 'চা' রপ্তানি করে যে বিদেশি মুদ্রা আয় হতো তাকেই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজে চতুরতা সঙ্গে তারা ব্যয় করতো। পূর্ব পাকিস্তানের চাষ করা ফসলের বাজার দাম পশ্চিম পাকিস্তানে কম আর পূর্ব পাকিস্তানে বেশি। এই সব অসংখ্য তথ্য রয়েছে যা পূর্বপাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশের জনগণ মেনে নিতেই পারেনি। ভেতরে ভেতরে একধরনের ক্রোধ সৃৃষ্টি হয়েছিল এই দেশের জনগণের। সারা পূর্বপাকিস্তান বা আজকের এদেশ তখন মিছিলের নগরী হয়ে ছিল। ১মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট 'ইয়াহিয়া খান' সাহেব জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার পর থেকে কার্যত পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান মুখো-মুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়।পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠির "মুখোশ উম্মোচিত" হয়। পূর্ব বাংলার মানুষ বুুঝতেই পারে এই বার আলাদা জন্ম ভূমি গড়তে হবে। তারপর এদেশের পরিস্হিতি যেন আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে ৩ মার্চ ঢাকায় কারফিউ জারি হলো। এমন খবর জানার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকার বাইরের যারা তাদেরও উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে ছিল। সেই সময় মিছিল মিটিংয়ের নতুন গতি পায়। ২ মার্চে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান ডাকসুর ভিপি- "আ স ম আব্দুর রব" আর ৪ মার্চ ঢাকায় 'স্বাধীনতার ইশতেহার' পাঠ করে ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজ। তাইতো এদেশে "কারফিউ"। আসলেই- মার্চ থেকে ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। আওয়ামীলীগের ডাকেই সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দু'টা পর্যন্ত হরতালও পালিত হয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এর নির্দেশে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত যেন অতিজরুরি কাজ করার জন্য সরকারি বেসরকারি অফিস এবং ব্যাংক খোলে রাখার নির্দেশ দিয়ে ছিল। তা ছাড়াও, তিনি- জরুরি সার্ভিস, হাসপাতাল, ঔষধের দোকান অ্যাম্বুলেন্স, সংবাদ পত্র কিংবা সংবাদ পত্রের গাড়ি, পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোন এসব সে হরতালের বাহিরে রেখে ছিল । এক কথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যা যা বলেছিল তাই ঘটেছিল। তাঁর নির্দেশেই পূর্ব বাংলার সকল জনতা একীভূত হয়ে এ দেশ স্বাধীন করেছে।আরো জানা দরকার ৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট 'ইয়াহিয়া খান' রেড়িওতে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দেয়। এতে ''২৫ মার্চ'' জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে বসার ঘোষণা ছিল। আর তার সাথে বিশৃঙ্খলা যেন না হয়, এক প্রকার হুমকি বা ধমক দিয়েছিল। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তা একেবারেই যেন সহ্য করতে পারেন নি, তিনিও ৭ মার্চের ভাষণেই তার বহু জবাব দিয়েছিল। আবার ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আমাদের পূর্ব পাকিস্তান আসে এবং ১৬ মার্চ মুজিব -ইয়াহিয়ার গুরুত্ব পূর্ণ বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে কাজ না হলে বঙ্গবন্ধু- শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ছাড়ার ডাক দেন। ক্ষুব্ধ "ইয়াহিয়া" রাগেই যেন ফোঁস ফোঁঁস করে। এমন ধরনের আরও 'বৈঠক' হয়। কিন্তু কোন আর কাজ হয় না। অনেক কালক্ষেপণের মধ্য দিয়ে যেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই গোলা বারুদ, সৈন্য-সামন্ত এই দেশে আসতে থাকে। তখনই পূর্ব বাংলার মানুষরা যুক্তি তর্কের উর্ধ্বে উঠে স্বাধীনতা অর্জনের নেশায় উম্মত্ত হয়ে যায় এবং যা ছিল- গাইতি, বল্লম, রামদা, বর্শা, লাঠি এই সব নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। সুতরাং তাঁরাই তো আমাদের 'মুক্তিযোদ্ধা', তাঁরা এই বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে।
"স্বাধীনতা সংগ্রাম" ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে। ১৮ মার্চ এক অসহযোগ আন্দোলনে ১৬ দিনে পদার্পণ করে। এআন্দোলনের ঢেউ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। সংকটাপন্ন অবস্থায় এ দেশ, যুদ্ধ চলছে, চলছে লাশের মিছিল।২০ মার্চ জয়দেব পুর এর রাজ-বাড়ীতে অবস্থিত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দক্ষ ব্যাটালিয়ন তাদের হাতিয়ার ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রকেই 'নস্যাৎ' করে দেয়। তার পরপরে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ একত্রিত হয়েই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সবাই মিলে টঙ্গী বা জয়দেব পুর মোড়ে অনেক ব্যারিকেড গড়ে তোলে নব নির্বাচিত 'জাতীয় পরিষদের সদস্য' শামসুল হকের নেতৃত্বে। ২২ মার্চেও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য বাঙালী সংগ্রামে গর্জে ওঠে। এমন ভাবে যতই দিন গড়াচ্ছিল, 'রাজনৈতিক সঙ্কট' ততই গভীরতর হয়ে যাচ্ছিল। এরপর আরও আসে ইতিহাসের ভয়ালতম কালো রাত্রি। সেই কালো রাত বাঙালির ইতিহাসে সব থেকে যেন আতংকের রাত। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক সরকার থেকেই- "গণ হত্যার নির্দেশ" আসে। তখন ব্যাপক পরিমাণেই যেন পশ্চিমপাকিস্তানি সৈন্যের সমাগম ঘটে। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হয় এমন রাতেই। ২৫ মার্চ কালোরাত ও অপারেশন সার্চলাইট অপারেশনে নেমেছিল সেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নির্বিচার হত্যার সঙ্গে যেন জ্বালাও-পোড়াও স্বাধীনতাকামী বাঙালীর কণ্ঠ বুলেট দিয়েই চিরতরে স্তব্ধ করার আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এ অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিলো ইপিআর- ("ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস", বর্তমানে বিজিবি) এবং এদেশের পুলিশসহ বাঙালী সেনা সদস্যদের নিরস্ত্র করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামীলীগ এর নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ১৬ জন ব্যক্তির বাসায় হানা দিয়ে তাদের গ্রেফতার। জ্বলছে ঢাকা, মরছে বাঙালী। একই সঙ্গে শুরু হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার প্রথম প্রহর।
এমন ভাবেই 'মুক্তিযুদ্ধ' চলতে চলতে যখন হানাদার পাকবাহিনী বুঝে গেল যে পরাজয় তাদের অনিবার্য, তখন তারা এ পূর্ব বাংলাকে মেধা-শূন্য, পঙ্গু, কিংবা নেতৃত্বহীন করার জন্যেই চোদ্দ ডিসেম্বর 'রাজাকার', 'আল-বদর', 'আল-শামস' বাহিনীর সহযোগিতাতেই অন্ধকার রাতে হত্যা করেছে- অধ্যাপক, প্রকৌশলী, ডাক্তার, আইনজীবী, শিল্পী ও কবি-সাহিত্যিকদের।তথ্যের ভিত্তি আলোকেই প্রথম সারির দুই শতাধিক বাঙালি বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যার মাধ্যমে ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা করেছিল তারা। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই প্রায় দু' লাখ মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময়েই যেন এমন স্বাধীনতা৷ আবার বহু জন তাঁদের মূল্যবান সহায়, সম্পদকেও হারিয়ে ছিল। 'অগ্নি সংযোগ', 'নারী ধর্ষণ', 'গণহত্যা', 'সংঘর্ষ' বা 'হামলা', আবার লুটতরাজের মতোই বহু অপ্রীতিরক ঘটনা- ঘটে যাওয়ার পরপরই বাঙালির চেতনায় যেন স্বাধীনতা ছিল। ইশতেহারে বলা আজ থেকে "স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ" এমন ঘোষণার কথা পূর্ণ বাংলার মানুষের প্রাণশক্তি , আর তাই তো ৫৪ হাজার বর্গমাইলের '৭ কোটি' মানুষদের আবাস ভূূমির নাম পাবে 'বাংলাদেশ', এতেই বাঙালি গর্বিত।মুক্তিযোদ্ধারা "যুদ্ধের পর যুদ্ধ" সু-কৌশলে চালিয়েই পাক-বাহিনীর আত্ম সমর্পণের মধ্য দিয়েই "৭১" এর মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় করেছে। সুতরাং, অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন বাংলাদেশের। সারা বিশ্বের মানচিত্রে সংযোজিত হয় 'নতুন ও স্বাধীন' দেশ, ''গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ''। এ বাংলার জনপ্রিয় নেতা, জেল থেকে বাহির হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তিনিই এদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই যুুুুগে যুগেই এমন কালজয়ী, সর্বশ্রেষ্ঠ মহা-নায়কের হাত ধরেই অর্জিত হয়েছিল- লাল সবুজের জাতীয় পতাকা আর পেয়ে গেছে বাংলার এই "স্বাধীনতা"।

লেখক : কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

নৌকায় গাওয়া 'ভাটি' অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোক-সঙ্গীত ভাটিয়ালি গান

 প্রকাশিত: ২০১৯-০২-০৬ ১৩:৫৬:৫০

সৃষ্টিশীল যা কিছু দৃশ্যমান, তার সবকিছুই প্রবহমান। আর এই চলমানতাই যেন জীবনের বৈশিষ্ট্য। মানুষ একদিনেই কোনো কাজের সফলতা কিংবা দক্ষতা অর্জন করতে পারেনা। তাই তাদের 'দক্ষতা' লাভের পেছনেই রয়েছে দীর্ঘ দিনের অভ্যাস আর অনুশীলন। 'পরিশ্রম এবং উদ্যম' ছাড়া কোনো কাজে সফলতা লাভ করা যায় না। "বিজ্ঞানী নিউটন" বলেন, ''আমার আবিষ্কারের কারণ প্রতিভা নয়, বহু বছরের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ও পরিশ্রম।" তাই সাধারণ মানুষ পরিশ্রম আর সাধনা দ্বারা যুগেযুগেই আবহমান বাংলায় 'সঙ্গীত' সাধকরাই যেন 'গানচর্চা' করে আসছে। সঙ্গীতেই হয় জ্ঞান ও সঙ্গীতেই সাধক সম্প্রদায়ের ধ্যান। চৌষট্টি প্রকার কলা বিদ্যার মধ্যে সঙ্গীতের স্হান সবার শীর্ষেই রয়েছে। মানব জাতির পরিচিতি বহনেই সঙ্গীতের 'ভাষা এবং কৃষ্টি' ওপরেই অনেক মানুষ নির্ভরশীল। সুতরাং বলতে চাই বাংলা লোক সঙ্গীতের শক্তিশালী একটি 'ঐতিহ্যবাহী ধারা' ভাটিয়ালি গান। এই ভাটিয়ালি গানের সুর ও কথার মধ্যে জাতির হৃদয়ের তলদেশে মনোমুগ্ধকর ভাবের সন্ধান পাওয়া যায়। এমন গানের অন্তর্মুখী আবেদন শ্রোতাকেই যেন 'মনের গভীরে' টেনে নিয়ে পারে। সু-সঙ্গীতে আধ্যাত্মিকতার সন্ধান অনেক যুগযুগ ধরেই ছিল এবং আজও আছে আগামীতেও থাকবে। দেশ ও জাতির সমৃদ্ধির জন্য নানা প্রকার সঙ্গীত শিল্পকে জাতীয় সংস্কৃতির গন্ডির আওতায় যথাযথ মূল্যায়ন করা দরকার।
জানা দরকার যে 'ভাটি' শব্দের উত্তর ভাবার্থে 'আল' প্রত্যয় যোগ করেই ''ভাটিয়াল''। অতঃপর ভাটিয়ালি শব্দ গঠিত হয়েছে। ভাটি অঞ্চলের গান বলেই তারা নাম পেয়েছে "ভাটিয়ালি"। এটিই সাধারণ মানুষদের বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করে 'ভাটিয়ালি গান' এদেশের 'প্রাণের গভীরের গান বা চেতনার খোরাক'। সুতরাং, এই গানই তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্তু ডঃ রীনা দত্তের বক্তব্য একটু ভিন্ন মতামত। তিনি বলেন, গান গুলির বিচার করতে গেলে ভাটিয়ালি গান আসলেই 'প্রবন্ধ যুগের গান'। এ প্রবন্ধ-সঙ্গীতে- 'আলী' নামক প্রবন্ধে নাকি উল্লেখ রয়েছে। তাই তো, 'আলী' প্রকরণটিকে আবার অলংকৃত প্রবন্ধের সঙ্গে মিশ্র রূপে, সাধারণ ভাট পর্যায়ের লোকেরাই যেন ব্যবহার করতো। তাই, ভাটিয়ালির মধ্যেই যেন "আলী" প্রকরণের প্রভাব বা ছায়া রয়েছে। তাঁর এ ভাবনা নেহাৎ অযৌক্তিক নয়। সুতরাং তাঁর মতেই প্রবন্ধ-সঙ্গীতের আলী প্রকরণের অন্তর্গত হলো- ভাটিয়ালি গান। তিনি আবার স্বীকার করেও নিলেছিল তবে আংশিক। তা হলো, ভাটমুখে 'ভাটিয়ালি সঙ্গীত' মূল গান হলেও পরবর্তীতে কালে নৌকার 'মাঝি-মাল্লারা' এমন গানেই যেন ইতিহাসের কালজয়ী সাক্ষী হয়ে বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়েছে।
বাংলা লোকসঙ্গীতের এ ভাটিয়ালি গানকে নিয়ে যে যাই বলুক, এমন শিল্পের গুরুত্ব ও সৃজনশীলতাকেই অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আসলে জোর দিয়ে বলতে পারি,- সব জাতির কাছেই "সঙ্গীতশিল্প" একটি গুরুত্বপূর্ণ 'শিল্প মাধ্যম'। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি সাহিত্য তত্ত্বে সবধরনের গান সম্পর্কে বলেছে- 'ইহকাল, মহাকাল, জীবন-তরী এবং ফসল কিংবা পরপারের সান্নিধ্য লাভেই সঙ্গীতের- 'কথা ও সুরে' আধ্যাত্মিকতা এবং নান্দনিক রূপ ফুটে উঠে'। সুতরাং বলতেই পারি, ভাটিয়ালি গানের সুরের দ্বারা প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার ধ্যান-জ্ঞানের সহিত 'সৌন্দর্য-মাধুর্যের উৎস' নিহিত আছে। তাই 'বিশ্বাসকেই মুখ্য' করে সাধারণ মানুষের 'সৃজনশীল ক্ষমতা' কত উচ্চ ও উন্নত হতে পারে, তা এ ভাটিয়ালি গানেরই প্রমাণ মিলে। ভাব, ভাষা, সুর, ছন্দ, প্রকৃতি কিংবা পরিবেশ সমন্বয়েই এমন গানের একটি নিজস্ব ভূবন ও স্বতন্ত্র চরিত্র ফুটে উঠেছে। এইগানের প্রতিই আকর্ষণবোধ মানুষের চিরন্তনী স্বভাব। তাই বিজ্ঞান ভিক্তিক চিন্তা চেতনায় আজকের তরুণ গবেষকরা গবেষণায় ব্রত হয়ে এমন ভাটিয়ালি গানকে বলেছেন- বাংলা লোক সঙ্গীতের ধারা ভিত্তিক পরিচিতির মুখ্য কারণ, এমন গানের মধ্যেই রয়েছে- ''করুন সুর''। এর আরও মুখ্য ভাব- প্রেম, লৌকিক কিংবা আধ্যাত্মিক উভয় প্রেমে বিচ্ছেদ জনিত করুণ রস সঞ্চারিত হয় সব মানুষের আত্মায়। তারা ভাটিয়ালি গান গেয়ে বা শুনে পার্থিব ও অপার্থিব জীবনের আস্বাদন করে। সুতরাং, এমন গানের 'ভাবের মাহাত্ম্য' এবং কথা ও সুরের লালিত্য একেবারেই অনন্য।
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। নদীর সঙ্গে নৌকা এবং নৌকার মাঝির যোগসূত্র অত্যন্ত নিবিড়। তাই, কোন্ অদৃশ্য সুরকার ও গায়ক গঙ্গা, যুমনা, মেঘনা, গড়াই, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যার মতোই কতো নামের নদ-নদী যে আছে। তাদের নিয়েই এমন সুরকার এবং গায়ক রূপালী তারে কোমল অঙ্গুলি স্পর্শ করে এই দেশের শাশ্বত কালের প্রানের গান ভাটিয়ালি সুর এবং কথা সৃষ্টি করেছে। জানা যায় যে, ভাটি অঞ্চলের মানুষরা নৌকা বেয়ে সুদূর শহরে বাণিজ্য করতে যেত। তারা বহুদিন পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পানির উপর ভাসে। তাদের সামনে থাকে সুদূর প্রসারী নদী পথ আর মাথার উপরে অনন্ত অসীম নীল আকাশ। দিগন্ত ব্যাপি এ নদীর শূন্যতার উপর নৌকার বাদাম উড়িয়ে একক ভাবেই ভাটিয়ালি গান গাইতো। এমন গানের সৃষ্টির শুরুতে যেন বাদ্য-যন্ত্রের ব্যবহার হতো না। ধীরে ধীরেই নানা লোকজ বাদ্যযন্ত্রেরও ব্যবহার হয়। দিগন্ত ব্যাপি টেউয়ের তালে তালে ভাবের উদয় ঘটিয়ে গানের কথা গুলো বানিয়ে বানিয়েই সুললিত কণ্ঠে গভীর আবেগে গাইতো। অবসরে রংবে-রঙের নৌকায় বসে মনের মধ্যে বহু জিজ্ঞাসার উত্তর উদয় করেই গান গাইতো। পূর্ব বাংলার এমন গানই- মুলত ভাটিয়ালি গান। পল্লী কবি জসীমউদ্দীন পূর্ববাংলার নৌকার মাঝি-মাল্লাদেরকেই- 'ভাটিয়ালি গানের মুখ্য রূপকার' হিসেবেই পরিগণিত করেছে। তবুও- জানা যায় যে, এমন ''ভাটিয়ালির নামকরণের অর্থ'' নানান জনে নানা ভাবেই মন্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেছে। কেউ বলে, নদীর ভাটির স্রোতের টানেই- 'বিভিন্ন প্রকারের নৌকা' ভাসিয়ে মাঝিগণ যে গান করতো, সেই গানই 'ভাটিয়ালি'। আবার কেউ কেউ বলেছে, এই বাংলার ভাটি অঞ্চলের নৌকা-মাঝির গানই ভাটিয়ালি গান। যে যাই বলুক না কেন আশরাফ সিদ্দিকীর অভিমত হলো, নদনদীর ভাটি দিয়ে নৌকা বেয়ে যেতো, মাঝি মাল্লারা অবসর বা উদাস মনে সে নৌকায় যে গুলো গান গাইতো সেই গুলিই ভাটিয়ালি গান।
ভাটিয়ালি মুখ্যত পূর্ব বাংলার মাটি ও মানুষের গান।
ভাটিয়ালি গান বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের অনেক জনপ্রিয় সঙ্গীত। বিশেষ করে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলগুলিতেই ভাটিয়ালি গানের মূল সৃষ্টি, চর্চাস্থল এবং সেখানে এমন গানের ব্যাপক প্রভাব আছে। এই ভাটি অঞ্চলের ভাটিয়ালি গানের দীর্ঘকালের ঐতিহ্য রয়েছে। এগানের 'সুর ও কথা' মন এবং জীবনের জন্যই যেন সৃষ্টি, যুগে যুগে এমন ভাটিয়ালি গানের শৈল্পিক ব্যবহার- আবহমান বাংলায় মানব জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।
তাদের শ্রবণইন্দ্রিয়কে আকৃষ্ট করবার চেষ্টায় ভাটির টানে নৌকা ছেড়ে দিয়েই যেন- বিনা আয়াসে নৌকা চালাতে থাকে। আর এমন 'অনায়াস' এবং তজ্জাত 'অবসর'ই ভাটিয়ালি রচনাগত উৎস বলা যায়। তাই তাদের স্বরচিত ভাটিয়ালি গানকে সারিগানের মতো বললেও ভুল হবে না। নদী, নৌকা বা মাঝি কেন্দ্রিক সারিগান। উভয় গানের 'বিষয় বস্তু' লৌকিক কিংবা আধ্যাত্মিক প্রেম, রাধাকৃষ্ণ লীলার মতো ধ্যান এবং জ্ঞানের চেতনায় মগ্ন হওয়ার মিল রয়েছে। তাই এই মিলটা শুধুমাত্র বাইরে, অভ্যন্তরে উভয় গানে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। জানা যায়, সারি গান নৌকার মাঝি মাল্লাদের শ্রম-সঙ্গীত, আবার এমন "ভাটিয়ালি গান" নৌকার মাঝি-মাল্লাদেরই "শ্রম-হীন" অবসরের গান।
সুতরাং ভাটিয়ালি একটি নান্দনিক সুরের নাম এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এ ভাটিয়ালি গানের বিষয়, পটভূমি, পরিবেশ, রূপক-প্রতীক, সুর-লয় এবং শব্দ ভান্ডার ইত্যাদি থেকে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতেই পারি নদী ও নৌকার যুক্ত মাঝি-মাল্লার জীবনকেই আশ্রয় করে এ গানের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রসার ঘটেছে।
বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত এই ভাটিয়ালির সুর এবং তালের গান নামকরণেই যেন সার্থক। এপরিসংখ্যান প্রদানে মুখ্য উদ্দেশ্য, ভাটিয়ালি গানের যেমন উৎস-ভূমি আছে। তেমনি উদ্ভব কালও আছে। এই গানের যে ভাবের গভীরতা কিংবা সুরের মাধুর্য সত্যিই যেন অতুলনীয়। উদাসী ভাবের করুণ-বিষাদের সুর বলে তা মধুরতম আবেদন সৃষ্টি করে। আধ্যাত্মিক স্তরের গানগুলোতেও অধ্যাত্ম এবং দেহতত্ত্বের কথা রূপক প্রতিকের আশ্রয়েই পরোক্ষভাবে প্রকাশিত করেছে। ভবসংসারের যন্ত্রণা থেকে 'মুক্তি' বা 'আল্লাহ্', 'দয়াল গুরু কিংবা মুর্শিদের চরণাশ্রয়' কামনা করাটাই যেন ভাটিয়ালি গান জন্ম বা রচনার ক্ষণ। তাই- শুধুই যে, বাউল সংস্কৃতিতেই এমন ভাব ফুটে উঠেছে তা নয়।এদিক থেকে 'বৈষ্ণব', 'সুফী' বা 'বাউল'দের ভাবনার সঙ্গে ভাটিয়ালির 'এক শ্রেনীর গানের' নিকট সম্পর্ক রয়েছে। আধুনিক ভাটিয়ালি লোক-সঙ্গীতে মরমিয়া চেতনার ধারাবাহিকতাও যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং, আধুনিক ভাটিয়ালি সঙ্গীত অনেকাংশেই 'বস্তুবমূখী' চেতনায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। নৌকার মাঝি অথবা নৌকায় নৌকায় ব্যবসারত সওদাগরের মনে লাভ-লোকসান এর হিসাব প্রাধান্য পায় ভাটিয়ালি গানে।
'ভাটিয়ালি গান' সঙ্গীতশাস্ত্রের একটি রাগিণীর নাম।শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে 'রাগ' অর্থে একাধিক পদেই তা উল্লেখ আছে। বৈষ্ণব ও সুফীপদেও বহুস্হলে এমন ভাটিয়ালি রাগের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। 'মঙ্গলকাব্য' বা প্রণয়োপাখ্যানগুলিতেও এমন সুর এবং সুরে রচিত গীতের উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়াও বলা যায়, 'হলায়ুধ মিশ্র' রচিত- সেক শুভোদয়া সংস্কৃত গ্রন্থে 'ভাটিয়ালি রাগেন গীয়তে' নামক এক 'ছড়া-ধর্মী' সঙ্গীতেও যেন উল্লেখযোগ্য ভাটিয়ালি গান। যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য রচিত বাঙ্গালার বৈষ্ণবভাবাপন্ন মুসলমান কবি গ্রন্থে নানা রাগ-রাগিণীর কথাও উল্লেখযোগ্য, তার মধ্যেই ৪৮টি শীর্ষে রয়েছে। এর মধ্যে এখনও দেশ-প্রচলিত ভাটিয়ালি গানের সহিত খুব ব্যবহার রাগ-রাগিণী তা হলো 'ভাটিয়াল', 'করুণা-ভাটিয়াল', 'দুঃখ ভাটিয়াল', ও নাগোধা ভাটিয়াল। বাংলাদেশে ভাটিয়ালি গানের শিল্পী, রচয়িতা, সংগ্রাহক এবং গীতিকারদের মধ্যেই অন্যতম। 'জালালখাঁ', 'মিরাজ আলী', 'উকিল মুন্সী', 'জংবাহাদুর', 'রশিদ উদ্দিন', 'উমেদআলী'সহ বাউল সম্রাট 'শাহ আবদুল করিম' প্রমূখ। এইবাংলার গান, প্রাণের গান, মনের গান, জীবনের গান, প্রেমের গান, ভালোবাসার গান ভাটিয়ালি গান। জীবনের চাওয়া, পাওয়া, না পাওয়া, আনন্দ কিংবা দুঃখ ভাগা-ভাগিই হলো ভাটিয়ালি গান। জীবনের পরতে পরতেই যেন মিশে আছে বাঙ্গালী ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীতের এই ভাটিয়ালি গান।..."আমি যে গহীন গাঙের নাইয়া।
সাঁঝের বেলায় নাও বাইয়া যাই,
আপন মনে চাইয়া। ভাটির টানে বাইয়া চলি, ভাইটালি সুরে গাইয়া"।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পর্যবেক্ষেণেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজন

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-২৬ ১১:৫৩:২৯

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজ আমল থেকে আরম্ভ করে আজঅবধি চলে আসছে। এই ব্যবস্থা আসলেই পুস্তক কেন্দ্রিকই বলা চলে। পাঠ্য বইয়ের কথা গুলো কোনও রকমে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উদ্গীরণ করতে পারলে যেন, কৃতিত্বের সহিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অসুবিধাটি তাদের আসে না। সুতরাং এমন এ পরীক্ষায় জ্ঞানের পরীক্ষা না হলেও 'স্মৃতি-শক্তির' পরীক্ষায় পর্যবসিত হয়েছে। তাদের সুন্দর জীবন গঠনে পুঁথিগত বিদ্যার কিছুটা প্রয়োজন আছেও বৈকি। এইকথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু, 'পুঁথিগত' শিক্ষা মানুষকে জীবনের সমস্যা সমাধান করে না। জার্মানির বোখুম শহরের একটি স্কুলে পড়াশোনা বিষয়টি একবারেই নতুন পদ্ধতিতে কিংবা খেলাধুলার ছলে শেখান হয়৷ সেখানে প্রোমোশন ও ভালো রেজাল্ট বড় কথা নয়৷ ছোট ছেলে-মেয়েরা কারিগরি ক্লাসে তরোয়াল তৈরি করতেই শেখে৷ আসলেই তারা খেলার ছলেই শেখে বিভিন্ন কায়দাকানুন৷ তাছাড়াও প্রতিটি শিশুর কাজ করার ধরনও আলাদা৷ সুতরাং শিশুরাই যেন প্রস্তাব দেয়, তারা কী করতে চায় বা না চায়৷ শিশুর ইচ্ছেটা প্রতি এখানে পুরোপুরি দাম দেয়া হয়। শিক্ষা লাভের ক্ষেত্র সঙ্কীর্ণ নয়- বলা যায় 'বিস্তৃত'। বিদ্যালয়ে লেখা পড়া ছাড়াও যে সমস্ত কাজ গুলো বিদ্যালয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, সেই গুলোকে আপাত-দৃষ্টিতে অর্থহীন বলে মনে হলেও যেন প্রকৃত পক্ষে তা- নয়। যেমন, বাগান করা, পিকনিক করা, নানাবিধ উৎসব পালনে শিক্ষা, গণতান্ত্রিক জীবনযাপনে শিক্ষা, ছড়া
-আবৃত্তি এবং গল্পে শিক্ষা, কর্মসঙ্গীত, সাফাই কিংবা প্রার্থনায় শিক্ষা, চলতি খবর, সমবায় সমিতি মাধ্যমে শিক্ষা, পরিবেশ পর্যবক্ষেণে শিক্ষা, দিনলিপির দ্বারা শিক্ষা, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত এবং খেলাধুলাসহ ইত্যাদি ধরনের অনেক কাজ আছে, সেগুলোর দ্বারা তাদের শিক্ষার উন্নতি প্রসারিত হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুকিশোরা শিক্ষা ব্যবস্থায় বড্ড বেশিই একমুখী হয়ে যাচ্ছে। উপযুক্ত 'কর্মমুখী' শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিশু-কিশোররা যেন মনুষ্যত্ব অর্জনে যথার্থ ''মানুষ'' হতে পাবে। সুতরাং, সন্তানের শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠিত আছে শিক্ষা গ্রহণের নানা ধরনের 'প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো'। সকল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে 'জ্ঞানদান' করা। কিন্তু, "কারিগরি" জ্ঞানাঅর্জনের মাধ্যমেই যেন শিশু কিশোররা দিনে দিনে যোগ্যতা অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছে। সে উদ্দেশ্যে আজও তেমন 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠান' গড়ে উঠেনি। শিশু কিশোরদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ'কে যদি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বলে শিকার করি, তবেই এ প্রচলিত শিক্ষাকে কখনোই পরিপূর্ণ শিক্ষা আখ্যা দেয়া যায় না। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যক্তিসত্তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। শিশু কিশোরদের অতি স্বাভাবিক মানসিক পরিনতি এবং কৌতূহল, আগ্রহ, আবেগ, আনন্দ, সামর্থ্য কিংবা অনুরাগের মতো এই
"স্বাভাবিক প্রবণতা" গুলোকে একেবারেই অস্বীকার করা হয়েছে। শিশুদের সুস্থ সবল দেহ ও মন, সাহস, ধৈর্য, কর্তব্য বোধ বা দ্বায়িত্ব পালনের যোগ্যতা, সত্য, সুন্দরের প্রতি শ্রদ্ধাবান হওয়া, কর্ম-ক্ষমতা বাড়ানো, স্বার্থ ত্যাগ, সহযোগিতা, রুচিবোধ, স্বদেশ প্রেম এবং নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা ছাড়াও বহু কিছুই আছে, যা এমন প্রচলিত পুঁথিগত শিক্ষা ব্যবস্থায় দেয়া হয় না।
শিশু তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে জ্ঞান লাভ করে কেবল তার কান দুটি দ্বারা শুনে। তাই শিক্ষায় সমস্ত ইন্দ্রিয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিশু স্বভাবতই কর্মী- কিন্তু শ্রোতা হতে কষ্ট বোধ করে। ধৈর্য তাদের অনেকাংশে কম। কর্মচঞ্চলতাই তাদের স্বাভাবিক ধর্ম। শিশুদের এমন প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্মকে অস্বীকার না করে, নানা রকম শিল্প এবং হাতের কাজের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ দরকার। শিশুর প্রয়োজনের দিক গুলোকে দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে নিরানন্দ মনটিকে আনন্দিত করা বাঞ্ছনীয়। তারা লিখতে, পড়তে, অঙ্ক কষতেই শিখেছে, কিন্তু শেখেনি কাজের মানুষ হতে, সামাজিক হতে, স্বাবলম্বী বা আত্মপ্রত্যয়শীল হয়েও উঠা তাদের কখনোই হয়নি। এক কথায় বলাই যায়, প্রচলিত শিক্ষায় শিশুদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাতে পারেনি। শিক্ষার মুল কথা হল, শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ, তাদের দৈহিক বৃদ্ধি, মানসিক এবং আত্মার উন্নতি সাধন করা, আবেগ অনুভূতির যোগ্য প্রকাশের সুযোগ করানোটাকেই মনে করি।
বাংলাদেশের শিশু কিশোররা যোগ্যতা দিয়ে- শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে কেমন করে সেটিই আসলেও ভাবনার বিষয়। শিক্ষাতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিবর্তন না হলে তা কখনো সম্ভব নয়। শিশুরা যখন সারা বিশ্বে উন্নতি এবং অগ্রগতির অবদানের পাশাপাশি খেলা-ধুলা সহ সৃষ্টিশীলতায় পারদর্শিকতা অর্জনের সঙ্গেই সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছে। তখন এমন এ বাংলাদেশের 'শিশু কিশোররা' ক্রমশই যেন পিছিয়ে পড়ছে। সুতরাং, শিশুদের এগিয়ে যাওয়ার বিনোদন ক্ষেত্র সৃষ্টি করতেই হবে। শিশুদের বিনোদনের জন্য একেবারেই শৈশব থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে খেলার ব্যবস্থা করাতে হবে। শুধু তাই নয়, এ 'খেলা' গুলো যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়, সে দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। শ্রেণী কক্ষে আবধ্য শিশুদের কচি মুখের দিকে দৃষ্টি দিলে মনে কষ্ট জাগে। বদ্ধ কক্ষে বসে শিক্ষকদের 'বতৃতা' শুনতে নারাজ। একটু নড়া চড়াতেই যেন শিক্ষকের ধমকানী। তাদের দৈহিক এবং মানসিক দিক থেকে বিচার করলে এই শিক্ষা পদ্ধতি মনোবিজ্ঞান সস্মত নয়। শিশুকে অবাধ খেলাধুলার স্বাধীনতা কখনোই দেওয়া হয় না। আসলে ক্লাশ শুরুর আগে খেলাধুলা করলে সব শিশুরা শান্ত মনে এবং স্হির চিত্তে বিদ্যা পাঠে বা শিক্ষা গ্রহণে মনোযোগী হতে পারে। বিভিন্ন কারণে তাদের অনেকের মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ এবং ভয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। মনের মধ্যে ঐ সকল প্রবৃত্তি, ভাবাবেগ, শান্ত মন, অস্থির চিত্ত দূর হবে।
সুস্থ কিংবা সবল জাতি গঠনেই খেলা ধুলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুর পাঠাভ্যাসে একঘেয়েমির জন্যে স্কুলমূখী হতে চায় না। আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমেই পাঠদান করানো দরকার। রবীন্দ্রনাথ বলেছে তাহল ''বাল্যকাল হইতেই আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নেই, কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যক, তা কন্ঠস্হ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না। সঠিক শিক্ষা না হলেই যে পারিবারিক, সামাজিক- দ্বায়িত্ব পালনে তারা তেমন কোনও সহায়তাই করে না। সুতরাং জীবনের বৃহত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে- যে গুণাবলির প্রয়োজন, সেই গুলো পুঁথিগত শিক্ষা থেকেই আহরণ করা যায় না। জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়েই যে শক্তি অর্জিত হয়, সে শক্তি অর্জনটাই যেন- শিক্ষার উদ্দেশ্য। শিশুদের জন্মগ্রহণ করালেই সে শিশু প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। শিশু সন্তানকে যথার্থ মানুষের মতো মানুষ করে তোলার জন্যে সাধনার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হয়। কোমলমতী শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। শৈশবের সময়টাই প্রাণোচ্ছলতা কিংবা আরামের মুহূর্ত। সেই দিকটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে লালন-পালন করতে হবে। সন্তানরা তো কখনো সখনো 'ক্লান্ত-শ্রান্ত' হয়েই ঘুমে ঢুলুঢুলু বা অস্থির কিংবা চঞ্চল হয়। ঠিক তখন শিশুকে পাঠাভ্যাসে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণটা হলো তখন এসব শিক্ষা মনে বসবে না। এমনকি সে এসম্পর্কে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখাতেও পারে। তাই শিশুদের গল্প শুনাতে হবে। শিশুদের বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের গল্প, গাছপালা নিয়ে গল্প, রূপকথার গল্প, সহজ পৌরাণিক গল্প, মজার গল্প, জিন- পরীর গল্প এবং জন্তু-জানোয়ারের গল্পগুলি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করা প্রয়োজন। কাল্পনিক গল্পই শিশুরা অনেক ভালবাসে কারণ তারা কল্পনা প্রবণ।
সৃজনশীলতা বাড়াতেই পাঠ্য পুস্তকের পড়া-শোনার পাশাপাশি কল্পনা ও কর্মমুখী বিষয়গুলোতেই জোর তাগিদ দেয়া আবশ্যক।
পড়াশোনাকে প্রাণবন্ত এবং উপভোগ্য করবার জন্য মাঝে মধ্যে তাদেরকে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন রয়েছে বৈকি। মানসিক গঠনের জন্যে যে "মূল-মন্ত্র" আছে, তাকে পরিপূর্ণতা দিতে শিশু, কিশোর কিংবা শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষা-মূলক মজার মজার সহজ পুস্তক তুলে দেয়া দরকার। প্রযুক্তি গত ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, তাদেরকে এনে দিতেই পারে- সৃজনশীলতা, মননশীলসম্পন্ন অনেক আবেগ। তাদের পাঠ চর্চায় কঠোরতার কারণে- শিশুদের মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্য প্রীতি যেন বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা দিনে দিনেই মাদকতা, সন্ত্রাস, নেশা, দুর্নীতি সহ খুন নিয়েই কোনো না কোনো ভাবেই বড় হবে। এ সকল সংঘটিত হচ্ছে উঠতি বয়সী কোমলমতি সন্তানদের মাধ্যমেই। ফলে, যোগ্য হিসেবে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতেও পারছে না। এমন নানা ভাবনা চিন্তাবিদরা হরহামেশা পরামর্শ দিয়ে থাকে। এথেকে পরিত্রাণের উৎকৃষ্ট উপায়টি হচ্ছে বিনোদন মূলক বই পড়ানোর অভ্যাস সৃষ্টি করা। বই পাঠে তাদের আনন্দ আসবে, মানসিক পরিবর্তন ঘটবে এবং সন্তানের উন্নত ধ্যান ধারণাও জন্মাবে। ফলত তারাই আপন জগতকেও চিনবে। অপরাধবোধ, অপচিন্তা দূর হবে। দেশ-প্রেম, জাতি-প্রেম, আপনাতেই জেগে উঠবে। আর তখনই উন্নত-সমৃদ্ধর 'জাতি' তৈরির পাশাপাশিও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে। শিশুর শিক্ষার প্রধান কথা শেষ নিরিখে বলা যায় আগ্রহ সৃষ্টি। তাই ভালো লাগা, মন্দ লাগা এবং রুচিশীলতা বৃদ্ধি করার সঙ্গে বুদ্ধির প্রবণতাকেই কর্মমুখী শিক্ষায় জীবন গড়ানো প্রয়োজন। কর্মমুখী শিক্ষার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবেই সরকারি উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ একটি সুনামধন্য অতিশয় গুনান্বিত নাগরিক জাতি পাবে।
লেখক: কলামিস্ট এবং প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

শান্তি ও মানবাধিকারের অনন্য আশ্রয়ভূমি ফ্রান্স

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-২৩ ০৫:২২:৫৬

প্যারিসের প্লাস দো লা রিপাবলিক স্কয়ারের প্রধান ভাস্কর্য হিসেবে মারিয়ানের যে মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, তার এক হাতে শান্তির প্রতীক জলপাইয়ের শাখা, অন্য হাতে একটি বই। বইয়ের মলাটে লেখা ‘মানবাধিকার’। এর মাধ্যমে ফরাসি প্রজাতন্ত্র বিশ্বকে এই বার্তা দিয়ে আসছে যে তারা শান্তি ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী।

কিন্তু এই শান্তি আর মানবাধিকার নিশ্চিতকরণের পদযাত্রাটি খুব সহজেই অর্জিত হয়নি।সার্বজনিন মানবাধিকার আর শান্তি নিশ্চিতকরনের পিছনে রয়েছে দীর্ঘতম আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই। যাকে অভিহিত করা হয় আলোকায়নের যুগ নামে। আর এটি হলো সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার প্রধান উপজীব্য বিষয় ছিল ব্যক্তিস্বকীয়তা, মানব স্বাধীনতা, যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠা ও মানব ঐতিহ্য। এই বিপ্লবের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান বিকশিত করে প্রথাগত বিশ্বাস ও কুসংস্কারের শাসন থেকে মানুষকে মুক্ত করে সমাজকে মানবিকতার পথে পরিচালিত করা। এই আন্দোলন মানুষকে বিজ্ঞান চিন্তা, সংশয়বাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শনের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে। এই আন্দোলনের পূর্বে সমাজে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত সমাজের ধনিক শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠিত ধর্মের প্রদর্শিত সংস্কৃতি ও অভিপ্রায় অনুযায়ী। তবে মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম সংঘটিত এই দার্শনিক বিপ্লব মানুষের সমাজব্যবস্থার জন্য কিছু মূলনীতির জন্ম দেয় যেগুলো হলো কোন বিষয় সম্পর্কে উপসংহারে আসার জন্য সঠিক যুক্তি ব্যবহার করা, যুক্তিগুলো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিয়ে ঝালিয়ে নেওয়া এবং পুনরায় প্রমাণের আলোকে মূলনীতিগুলো পর্যালোচনা করা।

আলোকিত দার্শনিকরা সমাজের অসহিষ্ণুতা ও কুসংস্কারের বিপক্ষে ছিলেন। তৎকালীন যুগে কিছু স্বৈরশাসক আলোকিত যুগের দর্শন, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার সমন্বয়ে আলোকিত শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিল যার ফলশ্রুতিতে আলোকিত যুগের মূলনীতিগুলো সমাজে ও সরকার ব্যবস্থায় জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বলা বাহুল্য শত প্রচেষ্টার পরেও আলোকিত দর্শন নিয়ে এ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা সফলতার মুখ দেখে নি। তবে এ ধরনের পদক্ষেপগুলো পরবর্তিতে সমাজে পরিবর্তন আনতে সহায়তা করেছে। আলোকিত যুগের চিন্তাগুলো পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

আলোকিত যুগের দর্শনের মতে রাজতন্ত্র এবং ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্ব লোপ পায়, এবং প্রথা বা ঐতিহ্যের পরিবর্তনে যুক্তির উপর ভিত্তি করে একটি নতুন সমাজব্যবস্তার সৃষ্টি হয়।

বাস্তিলের পতনের মধ্যদিয়ে সংগঠিত হয় ফরাসী বিপ্লব। পৃথবীর মানচিত্রে ফ্রান্সই সর্বপ্রথম  নিজেকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। যা বদলে দেয় পুরো ইউরোপের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যাবস্তাকে। এই বিপ্লবের হাওয়া লাগে সারা বিশ্বব্যাপি।

পৃথীবির বিভিন্ন প্রান্তে যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘঠনা সংঘটিত হচ্চে তার বিপক্ষে সোচ্চার ভুমিকা অব্যাহত রেখেছে মানবতার মহান দেশ ফ্রান্স। ইঙ্ঘ মার্কিন বাহিনী কর্তৃক  ইরাকে আক্রমে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে গুরুত্তপূর্ণ ভুমিকা পালন করে ফ্রন্স। আর তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে মুক্তমনা আর বাকস্বাধীনতার জন্যে যারাই সংগ্রাম করে, তাদের পক্ষে অবস্তান এবং আশ্রয় দিয়ে বিড়ল দৃষ্টান্ত স্তাপন করেছে দেশটি।আর তাই ১৯৪৮ সালের ১০ দিসেম্বর Universal Declaration of Human Rights (UDHR) ঘোষণাপত্রটি ফ্রান্সের রাজধানী ‘প্যারিসে স্বাক্ষরিত হওয়াটাও বেশ যথার্থই বলে মনে হয়।


লেখক : সাংবাদিক।

বিস্তারিত খবর

জ্ঞান অন্বেষণে বই বিতরণ উৎসবের কোনো বিকল্প নেই

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-১২ ১৩:৫৭:২৫

বই হলো জ্ঞান অর্জন ১ম মাধ্যম। বই উৎসবটিই হচ্ছে 'আলোর উৎসব'। নতুন বছরের শুরুতে বাংলাদেশের মানুষ বিজয়ের নতুন সূর্য দেখেছে। কোমলমতী শিশু, কিশোররা অন্তহীন আনন্দের মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জনের এমন এ উৎসব আগামী দিনের স্বপ্ন দেখতে প্রস্তুত হচ্ছে। সুনগারিক গড়ে তুলতে শিশু কিশোরসহ এই দেশের জনগণের হাতে বই তুলে দেওয়া প্রয়োজন। আসলেই বইয়ের মাধ্যমে নানা ভাবনার সংমিশ্রনে ব্যক্তিগত ধারনা ও বিশ্বাস দৃঢ় হয়। যে সকল নাগরিক নিজস্ব সু-চিন্তিত মতবাদের ওপর আস্থাবান তারাই গণতন্ত্রের সম্পদ। আর এমন রকম নাগরিক পেতে হলেই দেশের শিশু থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী, পেশার মানুষের হাতে বই তুলে দেয়ার বিকল্প নেই। সারাবিশ্বের মনীষীদের বইয়ের নেশার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে মানব জীবনকে এক দৃষ্টান্ত মূলক উক্তি দিয়েছিলেন টলস্টয়। সেটি ঠিক এমন, ”জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই, এবং বই।” জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যমই হচ্ছে বই। তাই মানব জীবনযাত্রাকে সফলতার আলোকে আলোকিত করবার প্রধান উপায় হচ্ছে বই। সুতরাং ভালো বই পড়েই জ্ঞান অর্জন করে যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়েই সমাজ বা রাষ্ট্রের অনেক পরিবর্তনের চিন্তা করা বাঞ্ছনীয়।

বাংলা সাহিত্যে 'বই পড়া' আর 'বই কেনা' নিয়ে দুটি বিখ্যাত প্রবন্ধ আছে। শিক্ষিত লোকদের এই প্রবন্ধ দুটির সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। প্রথম ভারিক্কি প্রবন্ধটি প্রথম চৌধুরীর। আবার দ্বিতীয়টি রূপ-রস-গন্ধে ভরা রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর। প্রথম চৌধুরীর বই না পড়ার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকেই দায়ী করেছে। তারপর তিনি এও দেখিয়েছে অর্থকরী নয় এমন সব কিছুই এই দেশে অনর্থক বলে বিবেচনায় নিয়েছিল। ঠিক তখন থেকে লোকজনের বই পড়ার প্রতি অনেক অনীহা। "প্রথম চৌধুরী" ব্রিটিশ আমলে বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লব্ধ জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ নয়। পক্ষান্তরে যদি দেখি একবার বিদ্যাসাগরের বই চুরি গেল, দুষ্প্রাপ্য- "সংস্কৃত বই"। যিনি নিয়েছিল- তিনি ফেরত দেননি এবং সে কথা আর স্বীকারও করেনি বিদ্যাসাগর পড়েছিল মুসকিলে। বন্ধু জনকেই কিছু বলতে পারেনি। তাঁর বন্ধু সেই বই বইওয়ালার কাছে বিক্রি করেছে। তাই বই বা পুস্তক নিয়েও ভালো মন্দ অনেক কথাই রয়েছে। কিন্তু আবার যদি 'বই' পড়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করি তা হলে, 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর' ও 'মনোমোহন তর্কালঙ্কার' কথা চলে আসে। যৌথভবে তাঁরা একটি বইয়ের দোকান দিয়েছিল। সেখানে বই বিক্রি করে লাভ করতে না পারলেও তাঁরা সবাইকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলেছি। সুতরাং, বলতে হয় যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু অভিজ্ঞতার আলোকেই সকল জনগণকে বই প্রেমী করে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সারা দেশের "কোমলমতি শিক্ষার্থীরা"- ২০১৯ সালে অর্থাৎ বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই হাতে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধে শিশুরা আনন্দিত, মাতোয়ারা। আবার শিক্ষা মন্ত্রীও বলেছে, দেশ ও পৃথিবীকেই 'বই কিংবা সংবাদপত্র' আমদের ঘরের মধ্যেই এনে দিয়েছে। 'বই বা পত্রিকার' প্রচার না ঘটলে জাতীয়তা বোধ ও আন্তর্জাতিক ভাবনায় কোন ধরনের বিকাশ ঘটত কিনা সন্দেহ। জননেত্রী শেখ হাসিনা'র সরকার গ্রন্থ প্রকাশনা সহক করবার জন্য একটি জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন করেছে। তাই, জ্ঞান অন্বেষনে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং, সারা বিশ্বের বরেণ্য মনীষীর জীবন ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক কথার সত্যতা চোখে পড়বে। বইয়ের পাতায় পাতায় ডুবে দিয়ে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ইবনে সিনা, আল রাযী, ইবনে রুশদ, যুবরাজ ফাতিক, মাদাম মেরি কুরিসহ বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ এবং ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ মতো বহুসংখ্যক জ্ঞান পিপাসুরাই 'বই পাঠে' ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সবার জ্ঞাতার্থের আলোকে মহৎ জীবনের আলোকে আজও তেমনি ভাবেই বই পড়ুয়া অসংখ্য ব্যক্তির সৃৃষ্টি হচ্ছে এবং আগামীতেও হবে।

নতুন প্রজন্মকেই আগামী দিনের "উন্নত বাংলাদেশ" গড়ায় বড় ভূমিকা পালন করবে এই 'বই'। আধুনিক এবং উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত একটি জাতি গঠনে এই সরকার "বই বিতরণের উদ্যোগ" বাস্তবায়ন করেছে। এক সময় "পুস্তক অথবা শিক্ষা" সরঞ্জামের অভাবে কোমলমতী শিশুরা যেন স্কুলে যেত না প্রতি বছরেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। এখন সেই ঝরে পড়ার হার নেই বললেই চলে। টানা তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বছরের ১ম দিনেই গত দশ বছরের মত ছাত্র/ছাত্রীরা বিনামূল্যে বই পাচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির পাশাপাশি নতুন নতুন স্কুলের ভবন পাচ্ছে ও হচ্ছে। বই নিয়েই যে হবে এমন নয়, পরিবেশের সহিত তাদের আর্থিক সচ্ছলতার প্রয়োজন আছে। তাই শিক্ষার উন্নয়নসহ দেশের চলমান উন্নয়ন অব্যাহত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সেই ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর যেন বছরের ১ম দিনে বিনা মূল্যে বই বিতরণের উৎসব করে আসছে। 'বই বা পুস্তক' লেখা আর পাঠকের হাতে তা পৌঁছানোর জোর তাগিদও দিয়েছে।গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই বছর চার কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে- ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি বই। আর ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২টি বই বিতরণ করা হয়েছে। আবার কিছু কিছু বিতর্কিত কথাও উঠে এসেছে তাহলো, বই ছাপানো নিয়ে বিতর্ক। এ বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছে। তিনি বলেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটাকে অসম্ভব মনে করলেও এমন দেশে তা সম্ভব হয়েছে। বছরের প্রথম দিনেই "বই" তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এখন আর বই সংগ্রহ করতে বছরের অর্ধেক সময়ে চলে যায় না। প্রধানমন্ত্রী 'শেখ হাসিনা' বলেন, বিগত দিনের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেই নতুন এই সরকার এই খাতকে আরও অগ্রাধিকার ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। আগামী বছরগুলোতেও উৎসব মুখর ভাবেই 'জাতীয় বই বিতরণের ধারাবাহিকতা' বজায় রাখবে। "বই" উৎসবে শিক্ষার্থীদের কাছে এবার মূল প্রতিপাদ্য হলো- ‌বই পড়া, বই ছাপানো এবং বইয়ের কপিরাইট সংরক্ষণ করাসহ ইত্যাদি বিষয়েও সকল শিক্ষার্থী এবং জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। যথা যোগ্য মর্যাদার সাথেই যেন-এই "বই বিতরণ উৎসব" পালিত হোক। "বই হোক নিত্যা সঙ্গী"।

লেখক : টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

বিস্তারিত খবর

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-১১ ০৬:২৭:০৩

৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন দুই দিন পরে ১০ জানুয়ারী। উপস্থিত জনতার ঢলে ভেসে যাচ্ছিল বিমানবন্দর। বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বঙ্গবন্ধু, নাতিদীর্ঘ ভাষনে জাতিকে দেন দিক নির্দেশনা। নিচে পুরো ভাষণটি তুলে ধরা হলো-

আমি প্রথমে স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবি জনগণকে, হিন্দু মুসলমানকে যাদের হত্যা করা হয়েছে আমি তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করি।

আমি আপনাদের কাছে দু-এক কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবি যে ভাবে সংগ্রাম করেছে আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালি কে দাবায় রাখতে পারবে না। আমি আমার সেই যেই ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে তাদের আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

আজ প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ কে মেরে ফেলা হয়ে হয়েছে ২য় বিশ্ব যুদ্ধে ১ম বিশ্ব যুদ্ধেও এত মানুষ এত সাধারন জনগণকে মৃত্যু বরণ করে নাই শহীদ হয় নাই যা আমার ৭ কোটির বাংলায় করা হয়েছে। আমি জানতাম না আমি আপনাদের কাছে ফিরে আসবো আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম, তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও কোন আপত্তি নাই মৃত্যুর পরে তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙ্গালির কাছে দিয়ে দিও এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।

আমি মোবারকবাদ জানাই ভারত বর্ষের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কে,আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের জনগণকে আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের সামরিক বাহিনীকে,আমি মোবারকবাদ জানাই রাশিয়াকে জনগণকে,আমি মোবারকবাদ জানাই জার্মানি, ব্রিটিশ, ফ্রান্স সব জায়গার জনগণকে তাদের আমি মোবারকবাদ জানাই যারা আমাকে সমর্থন করেছে।

আমি মোবারকবাদ জানাই আমেরিকার জনসাধারণ কে, মোবারকবাদ জানাই সারা বিশ্বের মজলুম জনগণকে যারা আমার এই মুক্ত সংগ্রাম কে সাহায্য করেছে। আমার বলতে হয় ১ কোটি লোক এই বাংলাদেশ থেকে ঘর বাড়ি ছেড়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিলো ভারতের জনসাধারণ মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় দিয়েছেন তাদের আমি মোবারকবাদ না দিয়ে পারি না। যারা অন্যরা সাহায্য করেছেন তাদেরামার মোবারকবাদ দিতে হয়।

তবে মনে রাখা উচিত বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র।বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না। বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। আমি যাবার আগে বলেছিলাম ও বাঙালি এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম আমি বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে সংগ্রাম করছো আমি আমার সহকর্মীদের মোবারক বাদ জানাই। আমার বহু ভাই বহু কর্মী আমার বহু মা-বোন আজ দুনিয়ায় নাই তাদের আমি দেখবো না।

আমি আজ বাংলার মানুষ কে দেখলাম, বাংলার মাটি কে দেখলাম, বাংলার আকাশ কে দেখলাম বাংলার আবহাওয়া কে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।

আমি আশা করি দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন আমার রাস্তা নাই আমার ঘাট নাই আমার খাবার নাই আমার জনগণ গৃহহারা সর্বহারা,আমার মানুষ পথের ভিখারী। তোমরা আমার মানুষ কে সাহায্য করো মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র এর কাছে আমি সাহায্য চাই। তোমরা আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও দিতে হবে, উপায় নাই দিতে হবে। আমি আমরা হার মানবো না আমরা হার মানতে জানি না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-

"সাত কোটি বাঙ্গালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নাই"

কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমান হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ।আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।

আজ থেকে আমার অনুরোধ আজ থেকে আমার আদেশ আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছো তোমরা রক্ত দিয়েছো, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।

একটা কথা একটা কথা আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়। বাংলায় যারা অন্য লোক আছে অন্য দেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক বাংলায় কথা বলে না তাদের বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমি আমার ভাইদের বলছি তাদের উপর হাত তুলো না আমরা মানুষ ,মানুষ ভালোবাসি।

তবে যারা দালালি করছে যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করছে তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে। তাদের বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন, একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে। আমি দেখিয়ে দিতে চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালি রক্ত দিতে জানে শান্তিপূর্ণ বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।

আমায় আপনারা পেয়েছেন আমি আসছি। জানতাম না আমার ফাসির হুকুম হয়ে গেছে আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোড়া হয়েছিলো। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম আমি বাঙালি আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে ২ বার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো আমার বাঙালি জাত কে অপমান করে যাবো না তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না।

এবং যাবার সময় বলে যাবো জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙ্গালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।

ভাইয়েরা আমার যথেষ্ট কাজ পরে রয়েছে আমার সকল জনগণকে দরকার যেখানে রাস্তা ভেঙে গিয়েছে নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে যাও ধান বুনো, কর্মচারীদের বলি একজন ও ঘুষ খাবেন না। মনে রাখবেন তখন সুযোগ ছিলো না,আমি অপরাধ ক্ষমা করবো না।

ভাইয়েরা আমার যাওয়ার সময় আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাজউদ্দীন, নজরুলেরা আমাকে ছেড়ে যায়,আমি বলেছিলাম ৭ কোটি বাঙালির সাথে মরতে আমার ডেকো না।আমি আশীর্বাদ করছি ওরা কাঁদছিল আমি বলি তোরা চলে যা আমার আস্তা রইলো আমি এই বাড়িতে মরতে চাই।এটাই হবে বাংলায় জায়গা এখানেই আমি মরতে চাই ওদের কাছে মাথানত করে আমি পারবো না।

ডাঃ কামাল কে নিয়ে ৩ মাস জেরা করছে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দাও কয়েকজন বাঙালি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে তাদের আমরা জানি চিনি এবং তাদের বিচার ও হবে। আপনারা বুঝতে পারেন-

"নম নম নম সুন্দরী মম জননী জন্মভুমি গঙ্গার তীর সিন্ধ সুমীর জীবনও জুড়ালে তুমি"

আজ আমি যখন এখানে নামছি আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষ কে আমি এত ভালোবাসি, যে জাত কে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের বলি তোমরা সুখে থাকো। তোমার সামরিক বাহিনীর লোকেরা যা করেছে আমার মা বোনদের রেপ করেছে, আমার ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দিয়েছে, যাও সুখে থাকো। তোমাদের সাথে আর না শেষ হয়ে গেছে তোমরা স্বাধীন থাকো, আমিও স্বাধীন থাকি।

তোমাদের সাথে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বন্ধু হতে পারে তাছাড়া বন্ধু হতে পারেনা। তবে যারা অন্যায় ভাবে অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হবে। আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাই আমি আরেকদিন বক্তৃতা করবো একটু সুস্থ হয়ে লই। আপনারা চেয়ে দেখেন আমি সেই মুজিবর রহমান আর নাই। আমার বাংলার দিকে চেয়ে দেখেন সমান হয়ে গেছে জায়গা, গ্রাম এর পর গ্রাম পুড়ে গেছে এমন কোন পরিবার নাই যার মধ্যে আমার লোককে হত্যা করা হয় নাই।

কতবড় কাপুরুষ যে নিরপরাধ লোক কে এভাবে হত্যা করে এভাবে সামরিক বাহিনীর লোকেরা, আর তারা বলে কি আমরা পাকিস্তানের মুসলমান সামরিক বাহিনী ঘৃণা করা উচিত জানানো উচিত দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরে বাংলাদেশই ২য় মুসলিম দেশ,ভারত ৩য়, পাকিস্তান ৪র্থ।


আমরা মুসলমান, মুসলমান মা বোনদের রেপ করে। আমার রাষ্ট্রে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র এই বাংলাদেশে হবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যারা জানতে চান আমি বলে দিবার চাই আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা হয়েছে আমি আপনাদের বলতে পারি তাকে জানি আমি তাকে আমি শ্রদ্ধা করি সে পন্ডিত নেহেরুর কন্যা সে মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তারা রাজনীতি করেছে ত্যাগ করেছে তারা আজকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে যেদিন আমি বলবো সেদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু সরিয়ে নিচ্ছেন।

যে সাহায্য তিনি করেছেন আমি আমার ৭ কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে তাকে, তার সরকার কে ভারতের জনগণকে শ্রদ্ধা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই।

ব্যক্তিগতভাবে এমন কোন রাষ্ট্র প্রধান নাই যার কাছে তিনি আপিল করেন নাই শেখ মুজিব কে ছেড়ে দিতে। তিনি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রে কাছে বলেছেন তোমরা ইয়াইয়া খান কে বল শেখ মুজিব কে ছেড়ে দিতে একটা রাজনৈতিক সমাধান করতে। ১কোটি লোক নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছে? এমন অনেক দেশ আছে যেখানে লোক সংখ্যা ১০ লাখ, ১৫ লাখ, ২০ লাখ, ৩০ লাখ, ৪০ লাখ, ৫০ লাখ। শতকরা ৬০ ভাগ দেশে লোকসংখ্যা ১ কোটির কম আর আমার বাংলা থেকে ১ কোটি লোক মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে ভারতে স্থান নিয়েছিলো কত অসুস্থ হয়ে মারা গেছে, কত না খেয়ে কষ্ট পেয়েছে, কত ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এই পাষাণদের দল।

ক্ষমা করো আমার ভাইয়েরা ক্ষমা করো আজ আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলো না অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দিবো আইন নিজের হাতে তুলে নিও না। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তোমরা আমার সালাম গ্রহন করো, ছাত্রসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহন করো, শ্রমিকসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহন করো, বাংলার হতভাগ্য হিন্দু-মুসলমান আমার সালাম গ্রহন করো।

আর আমার কর্মচারী পুলিশ, ইপিআর যাদের উপর মেশিনগান চালিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা মা বোন ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছে তার স্ত্রীদের ধরে কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়া হয়েছে তোমাদের আমি সালাম জানাই, তোমাদেরকে আমি শ্রদ্ধা জানাই।

নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা,বাংলার মানুষ হাসবে বাংলার মানুষ খেলবে বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে এই আমার সাধনা এই আমার জীবনের কাম্য আমি যেন এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারি এই আশীর্বাদ এই দোয়া আপনার আমাকে করবেন। এই কথা বলে আপনাদের কাছে থেকে বিদায় নিবার চাই। আমার সহকর্মী দের আমি ধন্যবাদ জানাই যাদের আমি যে কথা বলে গিয়েছিলাম তারা সকলে একজন একজন করে প্রমাণ করে দিয়ে গেছে মুজিব ভাই বলে গিয়েছে তোমরা সংগ্রাম করো, তোমরা স্বাধীন করো, তোমরা জান দাও বাংলার মানুষ কে মুক্ত করো।

আমার কথা চিন্তা করো না আমি চললাম যদি ফিরে আসি আমি জানি আমি ফিরে আসতে পারবো না আজ আল্লাহ আছে তাইআজ আমি আপনাদের কাছে ফিরে এসেছি। তোমাদের আমি মোবারকবাদ জানাই আমি জানি কি কষ্ট তোমরা করছো। আমি কারাগারে ছিলাম ৯ মাস আমাকে কাগজ দেয়া হয় নাই। এ কথা সত্য আসার সময় ভুট্টো আমায় বললেন শেখ সাব দেখেন ২ অংশের কোন একটা বাঁধন রাখা যায় নাকি আমি বললাম আমি বলতে পারি না আমি বলতে পারবো না আমি কোথায় আছি বলেত পারি না আমি বাংলায় গিয়ে বলবো আজ বলছি ভুট্টো সাহেব সুখে থাকো বাঁধন ছিঁড়ে গেছে আর না। তুমি যদি কোন বিশেষ শক্তির সাথে গোপন করে আমার বাংলার স্বাধীনতা হরণ করতে চাও মনে রেখ দলের নেতৃত্ব দিবে শেখ মুজিবুর রহমান মরে যাব স্বাধীনতা হারাতে দিবো না।

ভাইয়েরা আমার, আমার ৪ লক্ষ বাঙালি আছে পাকিস্তানে আমি অনুরোধ করবো তবে একটা জিনিস আমি বলতে চাই ইন্টারন্যাশনাল ফোরামে জাতিসংঘের মাধ্যমে অথবা ওয়ার্ল্ড জুরির পক্ষ থেকে ১টা ইনকোয়ারি হতে হবে কি পাশবিক অত্যাচার কিভাবে হত্যা করা হয়েছে আমার লোকেদের এ সত্য দুনিয়ার মানুষকে জানতে হবে। আমি দাবী করবো বাংলাদেশ জাতিসংঘ কে বাংলাদেশ কে আসন দাও এবং ইনকোয়ারি করো। ভাইয়েরা আমার যদি কেউ চেষ্টা করেন ভুল করবেন আমি জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই সাবধান বাঙালিরা ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই।

একদিন বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো,একদিন বলেছিলাম যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধ করো,বলেছিলাম এ সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এ জায়গায় ৭ মার্চ। আজ বলছি তোমরা ঠিক থাকো একতাবদ্ধ থাকো,কারো কথা শুনো না।

ইনশাল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি স্বাধীন থাকবো একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে এই সংগ্রাম চলবে। আজ আমি আর বক্তৃতা করতে পারছি না একটু সুস্থ হলে আবার বক্তৃতা করবো। আপনারা আমাকে মাফ করে দেন আপনারা আমাকে দোয়া করেন আপনারা আমার সাথে সকলে একটা মুনাজাত করেন।

সমস্ত মাঠ জুড়ে মানুষ মুনাজাত করছেন। অসংখ্য সাংবাদিক দেশি বিদেশি সাংবাদিক তাদের ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত।

বিস্তারিত খবর

মাদকের চেয়ে ধর্ষণ নিকৃষ্ট

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-০৬ ১৩:১৪:৫৯

মাদক কারবার ও ধর্ষণ দুটোই নিকৃষ্ট অপরাধকর্ম। মাদকে ব্যক্তি নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ধর্ষণে শুধু ধর্ষিতা নয়; নারী, সমাজ ও দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মাদকে কতিপয় রোগের প্রতিষেধক রয়েছে, ধর্ষণে তা নেই। ধর্ষণ শুধুই অপরাধকর্ম। সুতরাং মাদকের চেয়ে ধর্ষণ নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য।
সম্প্রতি বাংলাদেশে মাদক বিরোধী অভিযানে অসংখ্য নাগরিক ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরাম হত্যাকান্ড ভাইরাল হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলায় কামারখন্দে আসান আলীকে তারাবীহ নামাজ শেষে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে। ক্রসফায়ারের ২বছর আগেই সে মাদক কারবারি ছেড়ে দিয়েছিল। এভাবে পূর্বে কখনো মাদক মামলায় সংল্লিষ্ট থাকায়, বহু ব্যক্তি নির্মম ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছে। হত্যাকান্ডের শিকার পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের কষ্ট দেখে পাষন্ড হৃদয়ও বিগলিত হয়। মাদক বিরোধী অভিযানের নামে এ নির্মমতা দেখে জাতি হতবাক।
মাদকের চেয়ে ধর্ষণ নিকৃষ্ট। মাদকে পরিণতি ক্রসফায়ার হলে, ধর্ষণে প্রকাশ্যে ফাঁসি বা আরো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রযোজ্য। ধর্ষণের শাস্তি অবৈধ যৌনকর্ম তথা যেনার চেয়ে গুরুতর। পবিত্র কোরআনে যেনা একটি নিকৃষ্ট কর্ম হিসেবে, এতে কঠিন শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। বিবাহিত নারী বা পুরুষ যেনায় লিপ্ত হলে শাস্তি- পাথর মেরে হত্যা করা। অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে একশ চাবুক মারা। ধর্ষণের শাস্তি আরো কড়া। সম্প্রতি নোয়াখালী জেলায় সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেয়ার অভিযোগে দুর্বৃত্তরা ৪সন্তানের এক মাকে ধর্ষণ করেছে। এ জঘন্য কর্মকান্ড বিবেকে নাড়া দিয়েছে। সরকার মাদক বিরোধী অভিযানে নির্বিচার ক্রসফায়ার দিলেও চিহ্নিত ধর্ষকদের এখনো জীবিত রেখেছে এবং অনেককে আটক করেনি। এর চেয়ে লজ্জা ও ব্যর্থতা আর নেই।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে নির্বাচন পরবর্তী নির্লজ্জ ধর্ষণের ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ভাইরাল হয়েছে। জনগণ ক্রমে প্রতিবাদমূখর হচ্ছে। সরকার ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে, এ প্রতিবাদ আরো তীব্র হবে। কান টানলে মাথা আসার মতো, নির্বাচনও বাতিল হতে পারে। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। কিছুদিন আগে একজন নারী সাংবাদিককে শুধু মুখে চরিত্রহীন বলাতেই ব্যরিষ্টার মঈনুল মামলা, আটক, আদালতে হেনস্থার শিকার ও চরমভাবে লান্থিত হয়েছেন। (অথচ চরিত্রহীন শব্দটি পুংলিঙ্গবাচক। এটি মাসুদা ভাট্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তার ক্ষেত্রে চরিত্রহীনা শব্দ প্রযোজ্য)। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। ধর্ষণের ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পরও সরকার অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে শুধু মুখে বলছে- অপরাধী যেই হোক, ছাড় পাবেনা। জনগণ এ প্রহসন মানেনা। জনগণ ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করে প্রমাণ করবে- মাদকের চেয়ে ধর্ষণ নিকৃষ্ট।

বিস্তারিত খবর

অবিচার ও হাহাকারের গতি প্রকৃতি

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-০৪ ১০:৫২:৫২

মানবতার হাহাকার আজ চারিদিকে। কোথাও যেন কেউ নেই তাদেরকে পক্ষে দাঁড়ানোর। সবখানেই ক্ষমতা এখন দুর্বৃত্তদের হাতে। মানবতার দুশমনদের দখলে যেন চলে গেছে সব। তাদের অবস্থা এখন রমরমা। মানবতা এখন চলে তাদেরই মর্জিতে ও ইচ্ছায়। জগতের সব বিত্ত-বৈভব এখন তাদের হাতে।দেশের আমলা-কামলা, আলেম, বুদ্ধিজীবী- শিক্ষাবিদরাও সবাই যেন তাদের তাবেদার। সব এখন তাদেরই দলে ও দখলে। সবাইযেনএখন ক্ষমতাসীনদুর্বৃত্তদেরদালাল ও লাঠিয়াল। এমনকি কবি-সাহিত্যিকদের মত মুক্ত চিন্তার কাণ্ডারিদেরঅনবদ্য শব্দাবলীও এখননিথর এদের অতি অনাচারের কালচারে।

দুঃসহ এই অবস্থার মাঝে কেউ যদিওবা মুখ খোলেন সাহস করে কিম্বা ভুল করে, পরক্ষণেই তিনি হারিয়ে যান অজানায়। তারা নিজে থেকেই হারিয়ে যান নাকি তাদেরকে হারিয়ে যেতে বাধ্য করা হয় তা পরিষ্কার না হলেও সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় সম্ভাবনাই বেশী বলে ধারণা করা যায়। হঠাৎ মুখ হা করা তেমনি এক কবির উচ্চারণে কিছুটা হলেও উঠে এসেছে আজকের জটিল অবস্থার ভয়াবহ চিত্র। অসহায় সেই কবি অকপটেই বলেছেন ‘দেখেশুনেমনেহয়বিধাতাযেনদুনিয়াটাকেবেঁচেদিয়েছেনশয়তানেরকাছে’।দারুণএকউচ্চারণ, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। সেই কবিও এখন নীরব, চলে গেছেন যেন অজ্ঞাতবাসে।

পরিস্থিতির শেষ বুঝাতে এমন বাক্য বিন্যাস অতি যথার্থ। চরম অসহায়ত্বের মুখে বিধাতাকে এভাবে একতরফা দায়ী করাও নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পরম বিধাতার কোন কাজ এমন সস্তা কেনা-বেচার বিষয় নয় বরং তাঁর সব কাজের পেছনেই রয়েছে সুনির্দিষ্ট কোন না কোন উদ্দেশ্য। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের অনাদি কালের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণ ও উদ্দেশ্যও।

উল্লেখ্য যে মহান আল্লাহ পাক শুধু বিশ্বাসীদেরই স্রষ্টা নন, তিনি একই ভাবে চরম নাস্তিকদেরও স্রষ্টা। তিনি বিশ্বাসীদের চাহিদা যেমন ভাবে পূরণ করে থাকেন ঠিক একই ভাবে পূরণ করে থাকেন অবিশ্বাসীদের চাহিদাও। তিনি জানেন মানুষের মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাও, সেজন্যেই তিনি সর্বজ্ঞ। তাই অবিশ্বাসীরা কি চায় তা তাঁর মোটেই অজানা নয়। আল্লাহ পাক তার পবিত্র কালামে ওয়াদা করেছেন অবিশ্বাসীদের চাহিদা পূরণ করার। অবিশ্বাসীদের কাজের ফল তিনি তাদের চেষ্টা অনুপাতেই দিয়ে থাকেনকিন্তু শর্ত হচ্ছে পরকালে তাদের প্রাপ্য হবে শূন্য যেহেতু তারা তাতে বিশ্বাসই করে না(সূরা৩:আয়াত১৪৫; ৪২:২০ দ্রষ্টব্য)। তাই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসহীন ভালো কাজগুলোও বস্তুত:পক্ষে একেবারেই মূল্যহীন।
আল্লাহ পাক ভালো করেই জানেন যে ফেরাউনের করুণ পরিণতি জানা থাকা সত্ত্বেও দুনিয়াতে এমন বহু মানুষ থাকবে যারা মনে প্রাণে চাইবে ফেরাউনের মত রাজত্ব, হতে চাইবে তার চেয়েও বেশী ক্ষমতাবান। দেশে-দেশান্তরের অনেকেই যে যেনতেন উপায়ে সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা ও তদবিরে ব্যস্ত থাকেন তা আমরা জানি সবাই। সেই তালিকায় আছে মুসলিম নামধারীরাও। বলাই বাহুল্য যে শুধুমাত্র মুসলিম নামের কারণে কেউ বিশ্বাসী হয় না। বরং অনেক সময় ভয়ংকর অবিশ্বাসীরাও লুকিয়ে থাকে নিরীহ মুসলিম নামের আড়ালে। সে ভাবেই বরং পাপাচার করা যায় নির্বিঘ্নে কারণ তাতে ধরা পড়ার ভয় থাকে কম। কিন্তু তারপরও ধরা তাদের পড়তেই হয়। মাটি ফুঁড়ে চারা গাছ বের হওয়ার মতই তাদের পাপাচারও এক সময় বেরিয়ে পড়ে তাদের কথিত মুসলিম পরিচয়ের খোলস ফুঁড়ে। অতঃপর সেই পাপিষ্ঠকে আল্লাহ পাক উৎখাত করে থাকেন ফেরাউনের মতই সমূলে। ফেরাউন হওয়ার স্বাদ মিটিয়ে দেন চিরতরে ফেরেউনের মতই লোমহর্ষক পতনের মধ্য দিয়ে। সেটাই ঘটেছে সাদ্দাম ও গাদ্দাফির ক্ষেত্রে, সে পথেই চলছে আজকের সিসি ও সালমানেরা। হাসিনার অবস্থাও তাদের চেয়ে ভালো কিছু নয়, তেমনই দেখা যাচ্ছে তার আমলের কথিত বহুবিধ উন্নয়ন প্রকল্পআর তথাকথিত সব ইলেকশানগুলোর মত অতি সাম্প্রতিক ইলেকশানের কারিগরিতে। এহেন শত ভাগ, আশিভাগভোট খেকোদের পথ সাধারণত একমুখীই হয়ে থাকে, ফেরার রাস্তা এরা হারিয়ে ফেলে চিরতরে।
আল্লাহ পাক বস্তুত এভাবেই এদের মনোবাঞ্ছাগুলো পূরণ করে থাকেন যতটুকুতিনিচান,যেমনকরেছিলেন ফেরাউনের ক্ষেত্রে। অতঃপর চোরের দশ দিনের পর আসবে সেই একটি দিন যখন এক লহমায় ক্ষান্ত হবে দলবল সহ সব অনাচারী এবং তাদের সমস্ত অনাচার। এটা মহান আল্লাহ পাকের এমনই এক সর্বময় কর্ম পদ্ধতি যার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকেন পাপিষ্ঠ স্বৈরাচারদের পাপকে(৩৫:৩৯ দ্রষ্টব্য)। তারা পাপ কামায় সম্পদ ও ক্ষমতা থেকে, সেই পাপ বাড়তে থাকে মজলুমের নিত্য আর্তনাদ আর অভিশাপের অব্যাহত ধারা থেকে। অতঃপর সেটাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে আল্লাহ পাক উৎপীড়িতের পাপগুলোকেও চাপিয়ে থাকেন ঐ সব স্বৈর-পাপিষ্ঠদের উপর। সবশেষে তাদের ভালো কাজের সওয়াবগুলোকেও কেড়ে নিয়ে বিলিয়ে দেন তাদের হাতে নির্যাতিতদের মাঝে। এভাবেই সর্বস্বান্ত ও সর্বব্যাপী ধিক্কৃত হয়ে বিদায় নেয় স্বৈরশাসকেরা। সর্বশক্তিমানের এই অনবদ্য মহান বিচার ব্যবস্থাই বস্তুত ইতিহাসের পরম শিক্ষা যা থেকে দুর্ভাগ্যবশত কেউই কখনও শিক্ষা নেয় না। এই শিক্ষার উপসংহারে নির্যাতিত প্রজাদেরকেই সব সময় দেখা যায় টিকে থাকতে আর জমিদারদের রাজকীয়প্রাসাদগুলোকে পড়ে থাকতে দেখা যায়ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে। এমনই দুরবস্থা হয় অত্যাচারিদেরপ্রাসাদগুলোর যে অতি গরীব প্রজারাও থাকতে চায় না সেখানে। সেখানে বাসা বাঁধে সাপ-খোক, পাখী আর পশুদের দল। একালের প্রজাদেরও মুক্তির সেই দিন খুব বেশী দূরে নয়ইনশাআল্লাহ। 

লেখকের বই পেতে: Search ‘Mainul Ahsan’ at ‘amazon.com’

বিস্তারিত খবর

প্রশাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শীঘ্রই

 প্রকাশিত: ২০১৯-০১-০২ ০৫:৪০:৫৭

এবার গণবিক্ষোভ আওয়ামীলীগের বিরূদ্ধে নয়; নীতিবিবর্জিত ও স্বার্থান্ধ প্রশাসনের বিরূদ্ধে। জনগণ যেকোন সময় প্রশাসনের বিরূদ্ধে গণবিক্ষোভে ফেটে পড়তে পারে। প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ আওয়ামীলীগ সরকারের কাছ থেকে বেপরোয়া সুযোগ-সুবিধা পেয়ে স্বার্থান্ধ ও তাবেদারে পরিণত হয়েছে। তারা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রশাসক বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের স্বার্থান্ধ ও তাবেদারি চরিত্রকেও হার মানিয়েছে। মীরজাফর স্বার্থের মোহে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা ইংরেজদের কাছে বিকিয়েছে। বর্তমান প্রশাসন স্বার্থের বশে একাদশ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে অন্যায়ভাবে আওয়ামীলীগকে বিজয়ী করেছে। অথচ তাদের স্বার্থ জনগণের করের পয়সা থেকেই আসে। তারা তাদের মেধা, মনন ও নৈতিকতার গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান থেকে কলঙ্কের আস্তাকুড়েঁ পতিত হয়েছে। এর মূল নায়ক সাবেক প্রশাসক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা। পুলিশ, সেনা, বিজিবি ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাও নিকৃষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনের পূর্বমুহুর্তে বিরোধী নেতাকর্মীদের বেআইনী আটক করে ইতিহাসে কালো অধ্যায় সূচণা করেছে। জনগণ তাদের করের পয়সায় এমন অন্ধ ও তাবেদার প্রশাসন পুষবেনা। দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে তাবেদার প্রশাসনকে সরিয়ে তদস্থলে যোগ্যদের নিযুক্ত করবে।
একাদশ নির্বাচনের পর জনগণ আওয়ামীলীগকে গ্রহণ করেছে ইংরেজ শাসক হিসেবে আর বর্তমান প্রশাসনকে গ্রহণ করেছে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর হিসেবে। বাংলার জনগণ ইংরেজদের চেয়ে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরকে অধিক ঘৃণা করে। একাদশ নির্বাচনের পর বর্তমান প্রশাসনও তেমনি ঘৃণিত হয়েছে। এখন গণআন্দোলনের পালা। জনগণ তাবেদার প্রশাসনের বিরূদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলবে।
১৯৭১ সালে এদেশের অসংখ্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা পাক হানাদার বাহিনীর তাবেদারি করেছে। তাদের মধ্যে বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জামাতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড, ওয়াজেদ মিয়া পরমাণু কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া ম, খা, আলমগীর ও আশিকুর রহমান গং মহকুমা প্রশাসক ছিলেন। তারা পাক হানাদারদের তাবেদারি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বাধাগ্রস্থ করেছে। দেশের জনগণ তাদের ক্ষমা করেনি। অধিকাংশই করুণ পরিণতি ভোগ করেছে। বাঙ্গালি জাতির পিতা নিজের জামাতার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কতিপয়কে দায়মুক্ত করেছেন। নইলে তাদের পরিণতিও একই হতো। বর্তমান প্রশাসন তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট। তারা জনগণের মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার কেড়ে বেপরোয়া গুম, খুন ও অবিচারে মেতেছে। একটি অনুমিত সুত্র থেকে জানা গেছে, আওয়ামীলীগ সরকার বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসককে দু’একটি করে আসন ঐক্যফ্রন্টকে ছাড়তে বলেছিল। কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা অতি উৎসাহী হয়ে নিজেদের পদোন্নতির আশায় একচেটিয়া আওয়ামীলীগকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। এতে নির্বাচন শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগও অতি উৎসাহী কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছে। তারাও প্রশাসনের বিরূদ্ধে গণবিক্ষোভে অংশ নিতে পারে। মূলত দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় বর্তমান মীরজাফর প্রশাসনকে হটানো জরুরী।

বিস্তারিত খবর

এবারের নির্বাচন সাঈদী মুক্তির নির্বাচন

 প্রকাশিত: ২০১৮-১২-২৫ ১৪:১৬:৩৯

মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী প্রতিহিংসার শিকার। এ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক হলেও, এর বিচারক ও অপরাধী সবাই বাঙ্গালী। আওয়ামীলীগের বিচারকগণ এ ট্রাইব্যুনালে বসে পাকবাহিনীর পরিবর্তে শুধু নিজের দেশের নাগরিকদের অভিযুক্ত করেছেন। তারা প্রমাণ করেছেন, ১৯৭১ সালে সকল অপরাধকর্ম বাঙ্গালিরাই করেছে। পাকবাহিনী অপরাধী নয়। বাঙ্গালিরাই ৩০লাখ শহীদের ঘাতক। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী তেমনি একজন বাঙ্গালী ঘাতক। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে দেশেই ছিলেন। পাকবাহিনী থেকে বাঁচতে ভারতে যাননি। তিনি বঙ্গবন্ধু জামাতা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. ওয়াজেদ মিয়াসহ যুদ্ধকালে মহকুমা প্রশাসক ম.খা. আলমগীর ও অন্যান্যদের মতো পাকিস্তান সরকারের বেতনভুক্ত আমলা বা ভাতাপ্রাপ্ত রাজাকার ছিলেন না। তিনি বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কোলাবরেটরস্ বা দালাল আইনে পরিচালিত মামলার আসামীও ছিলেননা। তিনি ছিলেন যুদ্ধাক্রান্ত, ভুক্তভোগী ও একজন সাধারণ বাঙ্গালী। তিনি বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দানকারী সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙ্গালির অন্তর্ভুক্ত। অথচ স্বাধীনতার ৪০ বছর পর, তিনি বাংলাদেশের আওয়ামী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত।
মাওলানা সাঈদী যে ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হয়েছেন, এটি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরদের ট্রাইব্যুনাল। মীরজাফর যেভাবে নিজ দেশের স্বাধীনতা ইংরেজদের কাছে বিকিয়েছিল, তেমনি আওয়ামী বিচারকগণ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে পাকবাহিনীর পরিবর্তে বাঙ্গালীদের অভিযুক্ত করে নিজ দেশকে কলঙ্কিত করেছে। তারা পাকবাহিনীর অপরাধ খুঁজে পায়নি। তারা পাকবাহিনীর অপরাধে সাঈদীকে অভিযুক্ত করেছে। এ বিচারে পাকিস্তানিরা কলঙ্কিত হয়নি, বাঙ্গালীরাই কলঙ্কিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের নাগরিকগণ বিদেশে গেলে ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের প্রজন্ম হিসেবে লান্থিত হয়। পাকিস্তানিরা লান্থিত হয়না। আওয়ামী বিচারকগণ তাদের নিজস্ব আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে সাঈদীকে অভিযুক্ত করে এভাবেই বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করেছে।
দেশের জনগণ বাংলাদেশকে যেভাবে চেনে, সাঈদীকেও তেমনি চেনে। সাঈদী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী প্রতিহিংসার শিকার, জনগণ তা ভালোভাবেই জানে। জনগণ সাঈদীর জন্য প্রাণ দিতেও জানে। সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজবে শত শত মানুষ গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে মাত্র একদিনে। সাঈদীভক্ত এ বিশাল জনতা সাঈদীকে মুক্ত করতে জীবন দিয়ে হলেও ভূমিকা রাখবে, একাদশ নির্বাচনে। তারা আওয়ামীলীগকে হটাবে, মূলত দুটি কারণে। তাহলো- সাঈদীর মুক্তি ও বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধাপরাধের কলঙ্ক মোচনে। তাই এবারের শ্লোগান- একাদশ নির্বাচন সাঈদী মুক্তির নির্বাচন। একাদশ নির্বাচন কলঙ্ক মুক্তির নির্বাচন।
এ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। এ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পরাজয় হলে, সাঈদী মুক্ত হবে। আর সাঈদী মুক্ত হলে, বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধের কলঙ্কমুক্ত হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন হবে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দানকারী ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃত হবে। প্রাণ বিসর্জনকারী ৩০লাখ শহীদও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃত হবে। প্রচলিত ২লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা, প্রদত্ত ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আর বাঙ্গালী নয়, পাকবাহিনী অভিযুক্ত হবে।

বিস্তারিত খবর

সিলেটের প্রকৃতি ও প্রিয় মানুষগুলো

 প্রকাশিত: ২০১৮-১২-০৩ ১৩:৪৯:০৯

আজ সকালে ফেসবুক সিলেট নিয়ে একটা মেমরি মনে করিয়ে দিল। অনেকবার ভেবেছি সিলেট নিয়ে কিছু লিখি। কিন্তু চেষ্টা করেও পারিনি। কি লিখব এই প্রিয় শহরটা নিয়ে? সিলেটের রূপের বর্ণনা করার মত সাহিত্যিক উপমা আমার স্টকে নেই। আর প্রথম আলোর সুবাদে সিলেটের ব্রিদটেকিং বিউটি নিয়ে সবাই কম বেশি জানে।আমি চিন্তা করতে লাগলাম সিলেটের সব চেয়ে কি বেশি ভালো লেগেছে আমার কাছে। সিলেটের চমৎকার আবহাওয়া, ঝরঝরে পাতলা বাতাস, ওখানকার ঘন সবুজ চা বাগান, টিলা, গভীর রাতের বৃষ্টি, সিলেটের মেঘ সব কিছু ছাপিয়ে আমার বোধহয় সবচেয়ে ভালো লেগেছে সিলেটের মানুষগুলো।

মানুষ ভালো লাগার মত কিছু কিনা এই প্রশ্নটা এসেছে আমার মনে। চিন্তা করে দেখলাম সিলেটের মেয়েরা খুব ভালো। বিশেষ করে বউ হিসেবে। অধিকাংশ সিলেটি ছেলেদের বাজার করার মত পেইনফুল কাজটা করতে তীব্র অনীহা দেখেছি। বাড়ির বউয়েরাই বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনার পথে কিম্বা কোচিংয়ে দিয়ে আসার সময়, নিদেনপক্ষে বাইরে না বেরুলে ওই ভ্যানওয়ালাদের কাছ থেকেই টুকটাক সবজী, মাছ কিনে নেয়। চাল ডাল তেল নুন মাসে একবার কিম্বা পাশের মুদী দোকান থেকে ঐ মেয়েরাই করে নেয়। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল দিতে হবে, বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে, ঈদের শপিং, রোজায়-ঈদে ননদের শ্বশুরবাড়ি ইফতার বা মাংস পাঠানো এই দায়িত্বগুলাও দেখি মেয়েরা ছেলেদের কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান না করে অবলীলায় নিষ্ঠার সাথে পালন করে যায়।

আমি সিলেটি মেয়েদের শ্বশুর শাশুড়িকে অসম্ভব ভক্তি শ্রদ্ধা করতে দেখেছি। কি হিন্দু, কি মুসলিম এখোনো জয়েন্ট ফ্যামিলি টিকে আছে সিলেটে। আর জয়েন্ট না টিকলেও চাচা চাচি ফুফু ফুফা মিলে এমন বন্ডিং আসলে অন্যান্য অনেক এলাকাতেই দেখা যায়না।

সিলেটি ছেলেরা তুলনামূলক অলস প্রকৃতির। আমি আমার ছোটবেলা থেকে দেখেছি ‘লাইফ ইজ এ রেস, ইফ ইউ ডোন্ট রান ফাস্ট ইউ আর লাইক ব্রোকেন আন্ডা’ টাইপ রেস সব জায়গায়। কিন্তু সিলেটি ছেলেরা কেমন একটা বিন্দাস, মানমৌজি ধরণের পরিবেশ পায়। লেখাপড়া করতে হয় বলেই করা। চাকরি তো কোন সিলেটি ছেলের দুঃস্বপ্নেও আসে না মনে হয়। সিলেটের বাইরে যেতে হবে শুনলে গায়ে জ্বর আসে তাদের। সিলেটের বাইরে একটাই জায়গা আছে যাওয়ার মত তা হল লন্ডন। ইন্টার চলা অবস্থায় অথবা পাশের পর লন্ডনে থাকা চাচা, মামা কিম্বা ফুফুর ঘরের ভাই বা খালার ঘরের ভাইকে ফোন দিয়ে বলবে, “দ্যাশো বালা লাগের না বা, নৌক্কাগি তুমার টাইন” তো বাস এসে গেলো তোমার লন্ডনের টিকেট। এরপর পাঁচ/দশ বছর বিদেশে বসে কষ্ট করবে এরপর দেশে এসে কোন একটা মার্কেটে ভালো একটা দোকান নিয়ে বা রেস্টুরেন্ট খুলে বসে পড়বে।

সিলেটি মানুষজন ব্যবসা করতে বা স্বাধীন পেশা বেছে নিতে পছন্দ করে। সিলেটে এমন বহু গ্রাজুয়েট আছে যারা জীবনে একটিবারের জন্যেও কোন পাবলিক পরিক্ষায় বসেনি। পারবে না এজন্য নয়, বরং ঢাকা গিয়ে পরিক্ষা দিতে হবে, কোথায় না কোথায় গিয়ে চাকরি করা লাগবে, সেখানকার পরিবেশ, খাবার স্যুট করবে কিনা এইজন্য। সিলেটিদের ঢাকা প্রীতি কম, ভীতি বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে আমি এমন বহু এলাকার মানুষ দেখেছি যারা ঢাকায় আসার পর ঢাকার বাইরে নিজেদের জীবন কল্পনা করতে পারেনা। ঈদে, পূজায় বাড়িতে গিয়েও এরা বেশিদিন থাকতে পারেনা। অথচ আমি এমন একটা সিলেটি ছেলের গল্প জানি যে ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে পরে ওসমানীতে মাইগ্রেট করার বহু চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষপর্যন্ত সাস্টে ইকনোমিক্স নিয়ে পড়েছে।

তবে একটা জিনিস কি এই মনমৌজে চলা টেনশান ফ্রি মানুষগুলোর টাকা আমার কাছে খুব হালাল, খুব পবিত্র মনে হয়। ভালো একটা চাকরির জন্য সেই শিশুকাল থেকে করা ইঁদুর দৌড় আর নানা রকম রাজনীতি দূর্নীতির কঠিন ভয়াবহ পরিনতির পেরোনোর চেয়ে বেলা এগারোটায় ঘুম থেকে উঠে বারোটার সময় নাস্তাপানি সেরে মজাসে একটা পান চিবুতে চিবুতে ছোট্ট একটা দোকান খুলে বসা সিলেটি মানুষগুলোকে আমার ভীষন ভালো লেগেছে।

লেখক : সাবেক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সিলেট জজ কোর্ট।
[লেখাটি লেখকের ফেইসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া]

বিস্তারিত খবর

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত