যুক্তরাষ্ট্রে আজ শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ইং

|   ঢাকা - 04:38am

|   লন্ডন - 11:38pm

|   নিউইয়র্ক - 06:38pm

  সর্বশেষ :

  প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক, অন্তর্দ্বন্দ্বে নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ আদালতের   তুরস্কে চলছে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট কুরআন প্রদর্শনী   যেসব খাবারের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে   মেসিকে ছাড়াই কোপার পরিকল্পনা আর্জেন্টিনার!   বিন সালমানের অপসারণ চাইলেন সৌদির ওলামা পরিষদ   ‘যত বার ওর অফিসে গিয়েছি, তত বারই চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেছেন’   প্রতি দুইদিনে একজন বিলিয়নার তৈরি করে চীন   ভারতে নারীরাই তাদের অধিকারের বিরোধী!   বিকল্পধারা থেকে বি. চৌধুরী ও মাহী চৌধুরীকে বহিষ্কার   ভারতে রাবণ বধ দেখতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত ৫০   প্যাটারসনে বাংলাদেশ কমিউনিটি অব নিউজার্সির শোকসভা ও দোয়া মাহফিল   সিলেটের বিশিষ্ট আলেম প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানের ইন্তেকাল   ইস্তাম্বুলের জঙ্গলে জামাল খাসোগির লাশ!   নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে কান্দাহারের গভর্নর-পুলিশপ্রধান-গোয়েন্দাপ্রধান নিহত   যুক্তরাজ্যসহ তিন দেশের সৌদি সম্মেলন বয়কট

মূল পাতা   >>   কলাম

আজ শরতে কাশের বনে হাওয়ার লুটোপুটি

প্রভাষ আমিন, নিউজ ডেস্ক

 প্রকাশিত: ২০১৭-০৯-২৪ ০১:৪৫:০২

প্রভাষ আমিন: এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি,

কবি কি অতিরিক্ত আবেগ থেকে এ কথা লিখেছেন, আমরা কি কট্টর জাতীয়তাবাদী ভাবনা থেকে এ গান গাই; নাকি সত্যি সত্যি আমাদের জন্মভূমি সকল দেশের রানী? এটা ঠিক সবার কাছেই তার জন্মভূমিকে সকল দেশের রানী মনে হতে পারে। নিছক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, জন্মভূমির সাথে মিশে থাকে মানুষের আবেগ। আমার হৃদয়ে বৃষ্টি নিয়ে যত আবেগ, একজন ভিনদেশির কাছে হয়তো বৃষ্টি মানেই জল কাদা মাখা নোংরা দেদার। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে তুষারপাত, জাপানের মানুষের কাছে চেরি ফোটার দিন, কানাডার মানুষের কাছে পাতা ঝরার কাল যতটা আবেগ নিয়ে আসে; কৃষ্ণচূড়াও বাঙালির মনে ততটাই আবেগ সঞ্চার করে। আবেগ দূরে রেখেও আমি ভেবে দেখেছি, বাংলাদেশ কি নিছক জন্মভূমি বলেই আমার এত প্রিয়, নাকি সত্যিই বাংলাদেশ সুন্দর? আমি মন থেকে বলছি, বাংলাদেশ সত্যি অনেক সুন্দর। কোনো নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবেচনায় হয়তো অন্য কোনো দেশ এগিয়ে থাকবে। কিন্তু বৈচিত্র্যে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ। এই যে আমরা বলি ষড়ঋতুর বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের অনন্যতা হলো ছয়টি আলাদা ঋতুর আলাদা বৈশিষ্ট্যে। বাংলাদেশের ছয় ঋতুর আলাদা রং আছে, রূপ আছে, গন্ধ আছে। আপনি যদি ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে নাও তাকান, প্রকৃতির দিকে তাকালেই বলে দিতে পারবেন এখন কোন ঋতু। কৃষ্ণচূড়া গাছে যখন আগুন লাগে, আপনি বুঝে যাবেন গ্রীষ্মের দাপট; গন্ধরাজ-বেলি বা দোলনচাঁপার সৌরভ বা কদমের সৌন্দর্য আপনাকে বর্ষার গান মনে করিয়ে দেবে। শিউলি, কাশের ঢেউ আর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা জানিয়ে দেবে শরৎ এসেছে। হেমন্তে ধানের খেতে বাতাসের ঢেউ আপনাকে উদাস করবে। শীত এসে প্রকৃতিকে কিছুটা জবুথবু করে দেয় বটে, তবে শীতের ফুলের রং রাঙিয়ে দেবে আপনার মন। পলাশ-শিমুল আপনার মনে বসন্তের হাওয়ার দোলা এনে দেবে। কিন্তু এত সুস্পষ্ট আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকার পরও আমরা কি সবাই শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষার বাইরে অন্য ঋতুগুলো অনুভব করতে পারি?

বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ। কিন্তু আমার প্রিয় বর্ষা। অবশ্য এবার বর্ষা নগরবাসীর জন্য এমন ভোগান্তি নিয়ে এসেছিল যে, জোর গলায় সে ভালোবাসার কথা বলতে পারিনি। বসন্ত যদি ঋতুর রাজা হয়, তাহলে ঋতুর রানী শরৎ। বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্য যতটা দেখার, তারচেয়ে বেশি অনুভবের। তবে ইটকাঠের নাগরিক জঙ্গলে থেকে আপনি ঋতুর মজাটা অনুভব করতে পারবেন না। আপনাকে একটু আশপাশে যেতে হবে। কাশের সমুদ্রের ঢেউ আপনাকে জানিয়ে দেবে শরৎ এসেছে। আর শরৎ মানেই বাতাসে উৎসবের গন্ধ, ঢোলের আওয়াজ। শরৎ নিয়ে গান-কবিতার কমতি নেই। শরৎ নিয়ে মান্না দের একটা গান আছে, ‘আজ শরতে কাশের বনে হাওয়ার লুটোপুটি, মন রয় না, রয় না এই বিদেশে, চায় যে এবার ছুটি।’ কবি এখানে বিদেশ বলতে শহর বুঝিয়েছেন আর ছুটি মানে পূজার ছুটি। কাশের মজাটা হলো, এর বীজ লুকিয়ে থাকে বালুর গভীরে। শরৎ এলেই ফোটে কাশ। মনে আছে ১৯৯২ বা ’৯৩ সালে বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করার সময় একবার শাহবাগ থেকে কাশফুলের ছবি তুলিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর পাশের খালি জায়গা, এখন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কিং, সেখানে বাতাস ঢেউ খেলে যেত কাশের সমুদ্রে। হয়তো কোনো নদীর চর থেকে বালু এনে ভরাট করা হয়েছিল জায়গাটি। এখন আর শহরের এমন প্রাণকেন্দ্রে কাশ খুঁজে লাভ নেই। তবে এই ঢাকায় এখনো কাশের সমারোহ আছে। উত্তরার দিয়াবাড়ি, আফতাবনগর, আশুলিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় গেলেই কাশের সমুদ্রে হারিয়ে যেতে পারবেন। তবে ইদানীং নগরবাসীর কাশ বিলাসিতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কের পাশের খালি জায়গা। শুক্রবার বিকালে সেদিকে গেলেই চমকে যাবেন আপনি। শত শত মানুষ ছুটে যায় সেখানে। তবে আমার শঙ্কা, শাহবাগের কাশ যেমন হারিয়ে গেছে বছর দশেক পর হয়তো দিয়াবাড়ি, আফতাবনগর বা পূর্বাচলের কাশের সমুদ্র দখল করে নেবে জনসমুদ্র। তখন কাশের খোঁজে হয়তো আপনাকে আরো দূরে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী বা পদ্মার চরে যেতে হবে।

শুধু কাশ নয়; ছাতিম, জারুল, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, কামিনী, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, নয়নতারা, কল্কেসহ নানা ফুলে ফুলে সাজে শরতের প্রকৃতি। তবে কাশের মতোই শরতের আরেকটি পরিচিতি হলো শিউলি। ভোরবেলা হালকা কুয়াশায় শিউলিতলায় সাদা চাদর বিছিয়ে রাখা ফুল অন্যরকম এক আবেশ তৈরি করে। এখনো ঢাকার অনেক বাড়িতে শিউলি গাছ আছে। তবে আমি সবচেয়ে বড় শিউলি গাছ দেখেছি নাজিমউদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে। একটি নয়, একাধিক আকাশছোঁয়া শিউলি গাছ আছে সেখানে। এছাড়া শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, রমনা পার্কসহ আরো অনেক জায়গায় মিলবে শিউলির দেখা। তবে শিউলির দেখা পেতে আপনাকে যেতে হবে ভোরবেলায়। কারণ শিউলির সাথে সূর্যের আড়ি আছে। গল্প আছে, এক নাগরাজার অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যা পারিজাতিকা সূর্যের প্রেমে পড়েন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও সূর্যকে না পেয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। তার চিতাভস্ম থেকে জন্ম নেয় যে গাছ, তাতেই ফোটে শিউলি ফুল। কিন্তু সূর্যের দেখা পেলেই বেদনায় ঝরে পড়ে বিরহী শিউলি। শিউলি নিয়ে হাহাকার কবির কণ্ঠেও। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন:

শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ
এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথী কই...।

কবি-সাহিত্যিকদের আদিখ্যেতা সবচেয়ে বেশি সম্ভবত বসন্ত নিয়ে। এরপর হয়তো বৃষ্টি নিয়ে। তবে বাংলা সাহিত্যে শরৎ বন্দনারও কমতি নেই। চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শরৎ বন্দনায় ব্যয় হয় অনেক কালি। মহাকবি কালিদাস শরতে এনেছেন ভিন্ন ব্যঞ্জনা, ‘কাশফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালিধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নববধূর মতো শরৎকাল আসে।’ বাঙালির সব আবেগ মূর্ত হয় যার কলমে, শরৎ নিয়ে সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি:

শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি
ছড়িয়ে গেল ছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি।
শরৎ, তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে-
বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে
আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।
শরৎ নিয়ে সব লেখা উদ্ধৃত করলে লেখার আকার ভদ্রতা ছাড়িয়ে যাবে। তবু কাজী নজরুল ইসলামের একটা গানের কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না:
এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।
দলি শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল
নীল লাল ঝরায়ে ঢল ঢল এসো অরণ্য পর্বতে।

আমরা সাধারণ মানুষ। অত কাব্য বুঝি না। প্রকৃতি ভালোবাসি। প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে ভালো লাগে। অমল ধবল পালে যে মন্দ মধুর হাওয়া লাগে আমরা তাতে ভেসে যাই। তাই মন্দ মধুর শীতল হাওয়ার ছোঁয়া পেতে ভোরেই বেরিয়ে পড়–ন শিউলির খোঁজে। নরম আলোর বিকালটা কাশের সাথে কাটাতে চাইলে ঘুরে আসুন আপনার বাড়ির পাশের কোনো নদীর চর থেকে। আর ঢাকায় থাকলে চলে যান দিয়াবাড়ি, আফতাবনগর বা পূর্বাচলে। একটাই অনুরোধ ক্যামেরার চোখে, ফেসবুকের ওয়ালে বা ট্যাবের পর্দায় নয়; প্রকৃতি দেখুন নিজের চোখে, অনুভব করুন হৃদয় দিয়ে।


এলএবাংলাটাইমস/সি/এলআরটি

এই খবরটি মোট পড়া হয়েছে ৮৩০ বার

আপনার মন্তব্য