যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা প্রবাসীদের ওপর নজরদারি এবং প্রচারণা চালাতে চীনের গোপন তৎপরতার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের চায়নাটাউনে একটি সাধারণ অফিস ভবনের আড়ালে চীনের কথিত একটি গোপন “বিদেশি পুলিশ স্টেশন” পরিচালনার অভিযোগে চীনা বংশোদ্ভূত কমিউনিটি নেতা লু জিয়ানওয়াং দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। একই সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার আর্কেডিয়া শহরের মেয়র আইলিন ওয়াংও চীনা সরকারের নির্দেশে চীনপন্থী প্রচারণা চালানোর কথা স্বীকার করেছেন।
৬৪ বছর বয়সী লু জিয়ানওয়াং আমেরিকান চ্যাংলে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তিনি ২০২২ সালে ম্যানহাটনের চায়নাটাউনে একটি অফিস ভাড়া নেন। তার আইনজীবীদের দাবি ছিল, সেখানে প্রবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে সহায়তা করা এবং মাহজং ও পিংপং খেলার আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ওই অফিসে অভিযান চালিয়ে অভিযোগ করে, লু চীনা সরকারের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পরিচিত গোপন বিদেশি পুলিশ স্টেশন স্থাপন করেছিলেন।
প্রসিকিউটরদের মতে, এই অফিসের মাধ্যমে চীনা সরকারের সমালোচকদের ওপর নজরদারি করা হতো। এক ঘটনায় চীনের দীর্ঘদিনের সমালোচক শু জিয়ের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে লুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়। এ মামলায় তার সহ-আসামি চেন জিনপিং আগেই অবৈধভাবে বিদেশি সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার দায় স্বীকার করেছিলেন। লু জিয়ানওয়াং দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তার সর্বোচ্চ ৩০ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে প্রকাশ্য ও গোপন—দুই ধরনের কৌশল ব্যবহার করছে। কোথাও বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে “সফট পাওয়ার” প্রয়োগ করা হচ্ছে, আবার কোথাও গোপনে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রভাব বিস্তারের কাজ চলছে। গবেষকদের দাবি, বর্তমানে অন্তত ৫৩টি দেশে চীনের এমন প্রায় ১০০টি কথিত বিদেশি পুলিশ স্টেশনের তথ্য পাওয়া গেছে।
চীনের বিরুদ্ধে শুধু নজরদারি নয়, ভিন্নমত দমনে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনা কর্তৃপক্ষ বিদেশে থাকা সমালোচকদের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করা, তাদের বন্ধুদের গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ করা, এমনকি চীনে থাকা পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানোর মতো কৌশল ব্যবহার করে থাকে। এর মাধ্যমে সরকারবিরোধী কণ্ঠস্বরকে নীরব করার চেষ্টা করা হয়।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার আর্কেডিয়া শহরের মেয়র আইলিন ওয়াং স্বীকার করেছেন, চীনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনি চীনপন্থী লেখা প্রকাশ করেছিলেন। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, তিনি এমন একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন যেখানে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলমানদের ওপর গণহত্যা বা জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। শিনজিয়াংয়ে লাখ লাখ উইঘুরকে আটক শিবিরে রাখা এবং জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার অভিযোগে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে চীন, যদিও বেইজিং এসব কেন্দ্রকে “পুনঃশিক্ষা কেন্দ্র” বলে দাবি করে।
গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন গুপ্তচরবৃত্তিকে একটি “বৃহৎ পরিসরের কার্যক্রম” হিসেবে পরিচালনা করে। এতে হ্যাকিং, সামরিক ও প্রযুক্তিগত গোপন তথ্য চুরি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি—সবই অন্তর্ভুক্ত। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন মামলার সংখ্যা এত বেশি এবং প্রমাণ সংগ্রহ এত জটিল যে সবকিছু পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। সাম্প্রতিক এই দুই মামলার রায় প্রমাণ করছে, বিদেশে চীনের প্রভাব বিস্তারের গোপন কর্মকাণ্ড এখনও অব্যাহত রয়েছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম