আমেরিকা

ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় আটক, মুক্তির নির্দেশ বিচারকের

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় মসজিদের সভাপতি সালাহ সারসুরকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বলেছে, সারসুরের দাবি যথেষ্ট শক্তিশালী যে তাকে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল এবং তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া সারসুর যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা। গত ৩০ মার্চ তাকে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর কর্মকর্তারা আটক করেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার দাবি করে, তিনি দেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকি। তবে সারসুরের আইনজীবীদের বক্তব্য, প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনি অধিকার ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান প্রকাশের কারণেই তাকে আটক করা হয়েছে। ফেডারেল বিচারক জেমস প্যাট্রিক হ্যানলন রায়ে বলেন, সরকারপক্ষ সারসুরের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। একই সঙ্গে তারা ব্যাখ্যা করতেও ব্যর্থ হয়েছে যে, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার পর হঠাৎ করে কেন তাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিচারক আরও বলেন, “শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় উল্লেখ করলেই সংবিধানপ্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাতিল হয়ে যায় না।” তিনি নির্দেশ দেন, সারসুরকে ইন্ডিয়ানার একটি কাউন্টি কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে তার মিলওয়াকির বাসায় ফেরার সুযোগ দিতে হবে, যতক্ষণ না তার অভিবাসনসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়। রায়ের কয়েক ঘণ্টা পরই সারসুর মুক্তি পান। মুক্তির পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমি পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পেরে স্বস্তি বোধ করছি। ৮০ দিন ধরে আমি মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারিনি। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার অধিকার রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। আমি যেখানে থাকি না কেন, ফিলিস্তিন ও মানবতার পক্ষে কথা বলা কখনো বন্ধ করব না।” সারসুরের আইনজীবীরা জানান, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এই মসজিদ নেতা কারাগারে থাকার সময় ৩০ পাউন্ডেরও বেশি ওজন হারিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, কারাগারে তার রক্তে শর্করার মাত্রা মাসে মাত্র একবার পরীক্ষা করা হতো, যা তার স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এক বিবৃতিতে সারসুরকে “সন্ত্রাসী” বলে আখ্যা দেয় এবং দাবি করে, তিনি অতীতে মলোটভ ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তবে সারসুর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে একটি ইসরায়েলি সামরিক আদালত তাকে মলোটভ ককটেল ও পাথর নিক্ষেপের অভিযোগে এবং ১৯৯৫ সালে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তবে বিচারক উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার গত ২৫ বছর ধরে এসব অভিযোগ সম্পর্কে অবগত ছিল এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়নের সময়ও বিষয়গুলো বিবেচনা করেছিল। তারপরও ২০২৬ সালের আগে তাকে কখনো আটক করা হয়নি। সরকারপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয় যে, সারসুর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন, তাই তার মতপ্রকাশের অধিকার নাগরিকদের মতো নয়। কিন্তু বিচারক সেই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যারা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও বসবাস করেন, তারা দেশের ভেতরে অবস্থানকালে সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার ভোগ করেন। রায়ে বিচারক সারসুরের পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক অবস্থানকেও গুরুত্ব দেন। তার স্ত্রী, ছয় সন্তান এবং নয় নাতি-নাতনি সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এছাড়া তার স্বাস্থ্যগত অবস্থাও মুক্তির পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। মুক্তির খবরে সারসুরের ছেলে করিম সারসুর বলেন, “আমরা আমাদের বাবাকে ফিরে পাচ্ছি। প্রতিদিন তার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে দুশ্চিন্তা করা ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি সবসময় নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় আছি।”

এলএবাংলাটাইমস/ওএম