আমেরিকা

বিশ্বকাপ কি যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা করবে?

বিশ্বের অনেক দেশে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বরং জাতীয় আবেগের অংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে চিত্রটি ভিন্ন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল, বেসবল ও আইস হকির আধিপত্য থাকায় ফুটবল—যাকে যুক্তরাষ্ট্রে 'সকার' বলা হয়—এখনও জনপ্রিয়তার দৌড়ে পিছিয়ে। তবে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল নিয়ে আগ্রহ এখন চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। সোমবার শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামছে যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ দল। অনেকের প্রশ্ন, এই বিশ্বকাপ কি দেশটিতে ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে? বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্টেডিয়ামগুলো দর্শকে পরিপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন শহরে ফ্যান জোন, পার্ক, শপিং সেন্টার এমনকি জাদুঘরেও বড় পর্দায় ম্যাচ দেখার আয়োজন করা হয়েছে। ফুটবল জার্সি, পতাকা ও নানা ধরনের স্মারক কিনতে ভিড় করছেন সমর্থকেরা। রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে জনসমাগমের প্রায় সব জায়গাতেই মানুষ বিশ্বকাপের ম্যাচে চোখ রাখছেন। লস এঞ্জেলেসের এক ফ্যান জোনে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা এরিক ওলসেন। তিনি বলেন, এই বিশ্বকাপ বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসঙ্গে এনেছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকরা যেমন নিজেদের দলকে উৎসাহ দিচ্ছেন, তেমনি মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা কিংবা অন্য দেশের অভিবাসীরাও নিজেদের দেশের জন্য গলা ফাটাচ্ছেন। এই বৈশ্বিক ঐক্যের অনুভূতি বর্তমান সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজীবন ফুটবলপ্রেমী স্টিভ সালসেডো মনে করেন, বিশ্বকাপ শেষ হলেও ফুটবলের প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যাবে না। তার মতে, নতুন প্রজন্ম আগের তুলনায় অনেক বেশি ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তন স্থায়ী হতে পারে। ১৬ বছর বয়সী কিনা পাচেকো জানান, আগে তিনি মেক্সিকোকে সমর্থন করতেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের দলকে সমর্থন করছেন। বিশ্বকাপ দেখে আবারও ফুটবল খেলতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলেও জানান তিনি। এবারের বিশ্বকাপ টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা ও স্টেডিয়ামে উপস্থিতির দিক থেকেও নতুন রেকর্ড গড়ছে। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচটি ফক্সের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দেখেছেন। স্প্যানিশ ভাষার টেলেমুন্ডোতে ম্যাচটি আরও ৭০ লাখ দর্শক উপভোগ করেছেন। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের প্রথম দুই সপ্তাহেই স্টেডিয়ামে দর্শকসংখ্যা ৩৬ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এতে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের উপস্থিতির রেকর্ডও ভেঙেছে। দর্শকদের বড় একটি অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ চলাকালীন এই উন্মাদনা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রীড়া, বিনোদন ও গণমাধ্যম বিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ জেফ স্নাইডার বলেন, ফুটবল এখন আর প্রান্তিক কোনো খেলা নয়; এটি মূলধারায় প্রবেশ করেছে। তবে আমেরিকান ফুটবল বা বাস্কেটবলের মতো জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে এখনও সময় লাগবে। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলেস (ইউসিএলএ)-এর ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞ স্টিভ ব্যাংক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের মধ্যে ফুটবলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মাথায় আঘাত ও কনকাশনের ঝুঁকির কারণে অনেক পরিবার এখন শিশুদের আমেরিকান ফুটবলের পরিবর্তে ফুটবলে উৎসাহিত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের পর প্রতিষ্ঠিত মেজর লিগ সকার (এমএলএস) এই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাজুড়ে এমএলএসের ৩০টি দল রয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এই লিগে খেলছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাম্পিয়ার অ্যানালাইসিস-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রিয় খেলার তালিকায় ফুটবল এখন বেসবলকে অল্প ব্যবধানে পেছনে ফেলে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১০ শতাংশ আমেরিকান ফুটবলকে তাদের প্রিয় খেলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সহজে ম্যাচ দেখা, ফুটবলভিত্তিক জনপ্রিয় টিভি সিরিজ, ভিডিও গেম এবং ফুটবলপ্রেমী দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন—এসব কারণও দেশটিতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেকের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্বকাপে আরও ভালো ফল করে, তাহলে দেশটিতে ফুটবলের প্রসার আরও গতি পাবে। আর ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম