আমেরিকা

‘শত্রু আর কেউ নয়, আমরাই’, ট্রাম্প শিবিরের ভেতরের ব্যর্থতার চিত্র প্রকাশ্যে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে দলটি। নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের শীর্ষ রাজনৈতিক উপদেষ্টারাও যে ভরাডুবির আশঙ্কা করেছিলেন, এখন সামনে আসছে তার নানা তথ্য। দলের ভেতরের ভুল সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক চাপ, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে বলে উঠে এসেছে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। নির্বাচনের ছয় দিন আগে ট্রাম্পের দুই ডজনের বেশি শীর্ষ কৌশলবিদ একটি ব্যক্তিগত ভিডিও কলে অংশ নেন। আলোচনার শুরুতেই পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার প্রকাশ ঘটে। ট্রাম্পের প্রধান জনমত জরিপকারী টনি ফাব্রিজিও সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেন। রিপাবলিকানদের জন্য একটি আশাবাদী সম্ভাবনা থাকলেও অন্যটি ছিল বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয়। ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা জেমস ব্লেয়ার তখন রসিকতা করে বলেন, তিনি নিজের বিষয়-সম্পত্তি গুছিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদেরও একই কাজ করা উচিত। আলোচনায় এমনকি কারাগারের খাবার, ক্ষমা পাওয়ার সম্ভাবনা এবং দেশ ছেড়ে পালানোর প্রসঙ্গও আসে। এর আগে আরেক আলোচনায় ব্লেয়ার বলেছিলেন, ‘আমি শত্রুকে দেখেছি, আর সে হলো আমরা নিজেরাই।’ ফাব্রিজিওর জবাব ছিল, ‘অনেক জায়গাতেই।’ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হয়ে ওঠে ইরান যুদ্ধ। নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল বুঝতে পেরেছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাদের ভোটের হিসাবে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্লেয়ার হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে একটি বিশ্লেষণী উপস্থাপনা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ইরান যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে রিপাবলিকানদের জনসমর্থনের ওঠানামা দেখানো হয়। যুদ্ধ চলার সময় ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে যাওয়া, যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হলে ব্যবধান কমা এবং আবার সংঘাত বাড়লে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা বেড়ে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়। বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি এবং জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব না হলে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা কঠিন হবে। বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যায়। গ্যাসোলিনের দামও গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে ওঠে। নির্বাচনের ফলাফলে রিপাবলিকানরা জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১৩ পয়েন্টের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে। প্রতিবেদনের হিসাবে, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর গত প্রায় অর্ধশতকের মধ্যে এটি দলটির সবচেয়ে বড় নির্বাচনী বিপর্যয় হতে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নতুন যুদ্ধে জড়াবেন না এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত চিত্র তৈরি করে। এ ছাড়া ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নিজের ও ঘনিষ্ঠদের আর্থিক স্বার্থ, শুল্কনীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ে। দলের কিছু উপদেষ্টা মনে করছিলেন, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চেয়ে ট্রাম্প নিজের বলরুম, গলফ কোর্স ও অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রকল্প নিয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তারা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনার পাশাপাশি এমন প্রার্থীদের সামনে আনে, যাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয় ও অভিজ্ঞতা ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হাতে বিপুল অর্থ থাকলেও তা দলটির আসন ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়নি। ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠী ও ধনকুবের ইলন মাস্কের অর্থায়নে বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। বিশেষ করে টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে জেতাতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার খরচ করা হয়। কিন্তু তিনি ১২ পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে যান। ট্রাম্পের সমর্থন ও প্রচারকৌশল নিয়ে দলের ভেতরেও মতবিরোধ ছিল। কিছু উপদেষ্টা অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে থাকলেও অন্যরা সাংস্কৃতিক ইস্যুতে প্রচার চালাতে চেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে সতর্কবার্তা থাকলেও ট্রাম্প শিবির সেগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা আগেভাগেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে প্রার্থী বাছাই ও প্রচারের প্রস্তুতি নেয়। শেষ পর্যন্ত তাদের জয় শুধু কয়েকটি আসনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই ফলাফল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক শক্তিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাঁকে আরও কঠিন রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।