বাংলাদেশ

ছাত্রদের বিক্ষোভে উত্তাল রাজধানী

বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। শহরের ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা অবস্থান নেয়ায় যানচলাচল থমকে গেছে। বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুরের কারণে ঢাকার রাস্তায় গণপরিবহন কমে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বুধবার চতুর্থ দিনের মতো রাস্তায় নামে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা। সকালে শনির আখড়ায় অবস্থান নেয় নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ, ইউনিভার্সাল ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ, শেখদি আব্দুল্লাহ মোল্লা স্কুল এন্ড কলেজ, দনিয়া কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
এ সময় তারা বিভিন্ন গণপরিবহন থামিয়ে চালকদের লাইসেন্স দেখতে চান। লাইসেন্স না থাকলে গাড়ি ভাঙচুর করেন।
এক পর্যায়ে একটি পিকআপ চালকের লাইসেন্স দেখতে চায় শিক্ষার্থীরা। তখন ওই পিকআপভ্যানের চালক ছাত্রদের উপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দেয়। এ সময় ছাত্ররা সবাই সরে যেতে পারলেও নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ গুরুতর আহত হন। তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী মোড়ে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, শহীদ জিয়া গার্সল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল, দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ক্যামিব্রিয়ান কলেজ, রোকেয়া আহসান কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়।
এ সময় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, গণহত্যা আর না আর না’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে, মানতে হবে’, ‘আমার বোন কবরে, খুনি কেনো বাহিরে’ এসব স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।
দুপুর ১২টার দিকে শাহবাগে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। তারা সেখানে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এসময় লাইসেন্স না থাকায় তারা একটি গাড়ি ভাঙচুর করে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে ওই সড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ জনগণ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। তাই অনেককে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং শেখ বোরহান উদ্দীন কলেজের শিক্ষার্থীরাও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশি এলাকায় জড়ো হয়।
অন্যদিকে আজিমপুর থেকে সাইন্সল্যাব পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করতে থাকে। ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই বিক্ষোভে অংশ নেন।
এছাড়া উত্তরার বিমানবন্দর থেকে জসিম উদ্দিন হয়ে হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত সড়কের দুইপাশ দখলে নিয়ে সকাল থেকেই বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে রাজউক স্কুল এন্ড কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, বঙ্গবন্ধু কলেজ, উত্তরা কলেজ, উত্তরা হাই স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্কুলের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। সড়ক অবরোধের কারণে এই এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াদ হোসেন বলেন, এত সংখ্যক শিক্ষার্থী আজ রাস্তায় নেমেছে যে পুলিশের কিছুই করার নাই।
মিরপুর ১০ নম্বরের গোলচত্বর থেকে এক নম্বর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হয়ে আন্দোলন করছেন ওই এলাকার আশপাশের স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বেলা বারোটার দিকে তারা হুট করেই গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় পুলিশ ৫ শিক্ষার্থীকে আটক করে।
মতিঝিল শাপলা চত্বর মোড়েও দুপুরের দিকে অবস্থান নেয় নটের ডেম কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল, মতিঝিল মডেলসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। বেশ কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করে।
প্রসঙ্গত, গত রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাস বিমানবন্দর সড়কের জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই দু’জন নিহত হন।
নিহতরা হলেন- শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির আবদুল করিম এবং একাদশ শ্রেণির দিয়া খানম মিম।
এ ঘটনায় দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম রোববার রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যার অভিযোগ আনা হয় ওই মামলায়।
ওই ঘটনার পর দোষীদের বিচার চেয়ে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সোমবার ও মঙ্গলবার সারাদিনই বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্নভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে, মিরপুর-আব্দুল্লাহপুর রুটের জাবালে নূরের একাধিক বাস পাল্লাপাল্লি করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটায়। প্রতিবাদে সোমবার দিনভর বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনায় ঘাতক বাসের চালক মো. মাসুম বিল্লাহসহ ৫জন গ্রেফতার হয়েছেন। গতকাল তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি :
১. বেপোরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে।
২. নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
৩. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে।
৫. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে।
৬. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে।
৭. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে।
৯. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।
আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটাম :
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি মানতে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। অন্যথায় শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে ঢাকা শহর অচল করার হুমকি দিয়েছে তারা।
বুধবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে হাসিব হাসান এ ঘোষণা দেন।
এই ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনকারীরা সরে গেলে শাহবাগ এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
গত রোববার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা অবরোধ-বিক্ষোভ করছে। বুধবার চতুর্থ দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকেই ইউনিফর্ম গায়ে ক্লাস বর্জন করে তারা মূল সড়কগুলোতে জড়ো হতে থাকে।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার উত্তরা হাউজ বিল্ডিং, যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তা, ফার্মগেট, সায়েন্সল্যাবে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। এ সময় নিরাপদ সড়কের দাবিতে হাতে হাতে ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড বহন করে তারা। সহপাঠীদের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত চালক ও তাদের সহকারীদের যথোপযুক্ত শাস্তিসহ রাজধানীর সমস্ত চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও দক্ষতা নিয়ে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয় তাদের আন্দোলন থেকে।

দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর :
রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ঘাতক চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
বুধবার বিকাল ৩টায় সচিবালয়ে তিন মন্ত্রীকে নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন থেকে সড়কে ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি যাতে না চলে, আমরা সেই ব্যবস্থা করব।
বাস টার্মিনালেই এসব পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, গাড়ির ফিটনেস না থাকলে সেটি টার্মিনাল থেকে বের হতে দেয়া হবে না। একইভাবে চালকেরও লাইসেন্স পরীক্ষা করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তায় থাকবে। যে গাড়িটি সন্দেহ হবে, সেটিকেই তারা চ্যালেঞ্জ জানাবে। সব কিছু ঠিকঠাক দেখাতে না পারলে তা আটকে দেয়া হবে।
তিনি বলেন, এ ছাড়া শ্রমিক ও গাড়িচালকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে মালিকরা ব্যবস্থা নেবেন।
কোনো চালক কিংবা পরিবহন অবৈধ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে সেগুলো দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তোমাদের বার্তা দেশব্যাপী পৌঁছে গেছে। তোমাদের দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। কাজেই তোমরা অবরোধ তুলে নাও, ক্লাসে ফিরে যাও।
অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনাদের সন্তানদের ক্লাসে ফিরিয়ে নেন। সারা দেশ অচল হয়ে গেছে। এটি কারও কাম্য হতে পারে না।


এলএবাংলাটাইমস/এন/এলআরটি