গত বছরের ভয়াবহ দাবানলের এক বছর পর ক্যালিফোর্নিয়া সরকার অগ্নিকাণ্ড-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ির চারপাশে উদ্ভিদশূন্য অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা করছে। ‘জোন জিরো’ নামে পরিচিত এই নতুন নিয়ম নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের অনেক বাসিন্দার মধ্যে উদ্বেগ ও বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ব্যয় বেশি এবং এটি শহুরে এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য অযৌক্তিক ও অসুবিধাজনক।
গত জানুয়ারির দাবানলের পর ক্যালিফোর্নিয়ায় ভবিষ্যৎ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং বাড়ির বীমা পাওয়ার যোগ্যতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত—তা নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। যদিও লস অ্যাঞ্জেলেসে হাজারো বাড়ি অত্যন্ত উচ্চ অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত, তবু প্রতিটি পাড়া ও এলাকার ঝুঁকির ধরন এক নয়। এই বাস্তবতা থেকেই অনেকেই ‘এক নিয়ম সবার জন্য’ ধরনের জোন জিরো আইনের বিরোধিতা করছেন।
জোন জিরো বলতে বাড়ির দেয়াল থেকে শূন্য থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত অংশকে বোঝানো হয়। নতুন আইনের লক্ষ্য হলো এই এলাকায় এমন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে আগুনের অঙ্গার বা স্পার্ক সহজে ঘরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। তবে নগরবাসীদের একটি বড় অংশ বলছেন, গ্রামীণ বা বনঘেঁষা এলাকার জন্য তৈরি নিয়ম শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রযোজ্য নয়।
ব্রেন্টউড এলাকার বাসিন্দা থেলমা ওয়াক্সম্যান বলেন, তিনি একটি শহুরে ও ঘন এলাকায় থাকেন, যেখানে আগুনের ঝুঁকি গ্রামীণ দাবানল অঞ্চলের মতো নয়। তার মতে, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বাতাসপ্রবণ দাবানলে ঘর পুড়ে যায় মূলত অঙ্গার ও ভবনের দুর্বল কাঠামোর কারণে, গাছপালার জন্য নয়। একই সুরে মাউন্ট ওয়াশিংটনের বাসিন্দা ইয়েল পারডেস বলেন, সব দায় গাছপালার ওপর চাপানো একটি চরম ও অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়া।
বর্তমানে জোন জিরো বিধিমালা খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির পাশে দাহ্য বস্তু সরিয়ে ফেলতে হবে, আঙিনা, ছাদ ও নালায় জমে থাকা শুকনো পাতা পরিষ্কার করতে হবে, দাহ্য গাছপালা অপসারণ করতে হবে এবং চিমনি থেকে অন্তত ১০ ফুট দূরে ঝুলে থাকা ডালপালা ছাঁটাই করতে হবে। পাশাপাশি গাছ ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক সচিব ওয়েড ক্রাউফুট বলেন, গত বছরের জানুয়ারির দাবানল জোন জিরোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। তার ভাষায়, প্যালিসেডস ও ইটন এলাকার দাবানলে দেখা গেছে, আগুন বাইরে থেকে এসে একবার কমিউনিটিতে ঢুকে পড়লে দাহ্য উপকরণের মাধ্যমে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই কারণেই শহুরে দাবানল ঝুঁকি কমাতে জোন জিরোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই খসড়া বিধিমালা নিয়ে হাজারো মানুষ বোর্ড অব ফরেস্ট্রির সঙ্গে মতামত বিনিময় করেছেন। এর ফলে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশের সময় পিছিয়ে বসন্তে নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে বাড়ির মালিকদের নিয়মগুলো বাস্তবায়নের জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হবে। প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমে শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমে জোর দেওয়া হবে এবং স্থানীয় সরকারগুলো নিজেদের মতো করে নিয়ম গ্রহণ করতে পারবে।
ওয়েস্ট লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রতিনিধি এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইন্স্যুরেন্স কমিশনার পদপ্রার্থী স্টেট সিনেটর বেন অ্যালেন বলেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন নীতি তৈরি করা, যা একদিকে মানুষের সম্পত্তির অধিকার ও নান্দনিক পছন্দকে সম্মান করবে, অন্যদিকে অগ্নিঝুঁকি কমাতে কার্যকর হবে। তার মতে, গাছের অবস্থান, ধরন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিবেচনা না করে বাড়ির পাঁচ ফুটের মধ্যে সব উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ কিছুটা অতিরিক্ত কঠোর।
অন্যদিকে, অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, বীমা কোম্পানিগুলো সবুজায়ন পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে চাপ দিচ্ছে। থেলমা ওয়াক্সম্যান বলেন, প্রশ্ন হলো—সরকার বিজ্ঞানীদের কথা শুনবে, নাকি বীমা কোম্পানির চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে।
বেন অ্যালেন স্বীকার করেন, অগ্নিঝুঁকি কমানো সবারই স্বার্থ, তবে তিনি বলেন, অনেক বাড়ির মালিক এখনও প্রয়োজনীয় অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, যা বীমা শিল্পের উদ্বেগের একটি কারণ।
বোর্ড অব ফরেস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, জোন জিরো বিধিমালা কার্যকর হলে প্রায় ২০ লাখ স্থাপনা এর আওতায় পড়বে, যা ক্যালিফোর্নিয়ার মোট স্থাপনার প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে এসব নিয়ম মানলেই যে বীমা পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মাউন্ট ওয়াশিংটনে প্রায় তিন দশক ধরে বসবাসকারী ইয়েল পারডেস বলেন, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি থাকার কারণেই তিনি সেখানে থেকে গেছেন। কিন্তু জোন জিরো বাস্তবায়িত হলে হয়তো তাকে এলাকা ছাড়তে হতে পারে। তার মতে, এই নিয়ম পরিবেশগত ভারসাম্য, ছায়া, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্যের পরিপন্থী এবং নিরাপত্তার দিক থেকেও তা যুক্তিসংগত নয়।
সব মিলিয়ে, ক্যালিফোর্নিয়ার জোন জিরো আইন একদিকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, অন্যদিকে এটি শহুরে বাসিন্দাদের জীবনযাপন, পরিবেশ ও সম্পত্তির ওপর কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম