লস এঞ্জেলেসের মেয়র পদপ্রার্থী নিথ্যা রমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য পরিচিত। তবে নগরীর নিরাপত্তা, পুলিশ বিভাগে নিয়োগ, গৃহহীন মানুষের জন্য নীতি এবং আবাসনসংক্রান্ত করের মতো বিষয়ে সময়ের সঙ্গে তাঁর অবস্থান বদলেছে। আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
লস এঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের সদস্য রমন ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় গৃহহীন মানুষের তাঁবু স্থাপন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ৬০ বারেরও বেশি ভোট দিয়েছেন। স্কুল, গ্রন্থাগার, পার্ক, মহাসড়কের ওপরের অংশসহ বিভিন্ন জনপরিসরের কাছে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব আনা হয়েছিল। কিন্তু মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে নিজের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন।
গত মে মাসে এক অনুষ্ঠানে রমন বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে সিটি কাউন্সিল নতুন কোনো এলাকায় ক্যাম্পিং নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনলে তিনি তাতে বাধা দেবেন না। তাঁর আগের অবস্থানের সঙ্গে এই বক্তব্যের পার্থক্য নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
পুলিশ বিভাগে অর্থায়ন ও কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়েও রমনের অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২০ সালে সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় তিনি পুলিশ বিভাগের অর্থায়ন কমানোর পক্ষে কথা বলেছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে তিনি লস এঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের বাজেট প্রায় ৩ শতাংশ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেন। এতে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ যুক্ত হয়েছিল।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মেয়র কারেন বাসের ১৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন রমন। বাসের যুক্তি ছিল, অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের জায়গায় নতুন নিয়োগ না হলে পুলিশ বিভাগের সদস্যসংখ্যা আরও কমে যাবে। কিন্তু মেয়র নির্বাচনের প্রচার শুরু করার কয়েক সপ্তাহ পর রমন বলেন, পুলিশ বিভাগের সদস্যসংখ্যা ধরে রাখা প্রয়োজন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যা কমতে দেওয়া উচিত নয়।
রমন তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় বলেছেন, নগরীর বাজেট ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার পর তিনি নিজের চিন্তাভাবনা পুনর্বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, পুলিশ বিভাগের বেতন বাড়ানোর কারণে বাজেটের অন্য জরুরি খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, পুলিশ বিভাগের জনবল ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
আবাসন খাতের কর নিয়েও রমনের অবস্থান বদলেছে। ২০২২ সালে তিনি ‘মেজার ইউএলএ’ নামের একটি প্রস্তাবের পক্ষে প্রচার চালান। এর আওতায় ৫৪ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের আবাসনসম্পত্তি বিক্রির ওপর কর আরোপের ব্যবস্থা করা হয়। ওই সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, এই করের কারণে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে প্রভাব খুব সামান্য হবে।
পরে রমন বলেন, এই কর আবাসন নির্মাণে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং এতে পরিবর্তন আনা জরুরি। গত জানুয়ারিতে তিনি যুক্তি দেন, আবাসনসংকট সমাধানের নামে এমন নীতি রাখা যায় না, যা উল্টো আবাসনের ঘাটতি বাড়ায়। করটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর নতুন প্রস্তাবও রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়েছে।
রমনের সমালোচকেরা বলছেন, মেয়র নির্বাচনের আগে মধ্যপন্থী ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার জন্য তিনি কিছু বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করছেন। সিটি কাউন্সিলের সদস্য ট্রেসি পার্কের মতে, পুলিশ নিয়োগ ও গৃহহীন মানুষের ক্যাম্পিং নিয়ে রমনের নতুন অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে রমনের সমর্থকেরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। সাবেক উপমেয়র রিক কোল বলেছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও নতুন তথ্যের আলোকে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা রমনের একটি শক্তি। তাঁর মতে, একজন জনপ্রতিনিধির উচিত ভুল বুঝতে পারলে তা স্বীকার করা এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্তের সমন্বয় করা।
মেয়র বাসের সঙ্গে রমনের সম্পর্কের পরিবর্তনও আলোচনায় রয়েছে। বছরের শুরুতে রমন বাসের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর নিজেই মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন। তিনি বলেছেন, নগরীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশা থেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রমনের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের তালিকায় গৃহহীনদের জন্য বাসের ‘ইনসাইড সেফ’ কর্মসূচিও রয়েছে। আগে তিনি কর্মসূচিটির সমর্থক ছিলেন এবং এর জন্য অর্থ বরাদ্দ করা একাধিক নগর বাজেটের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তিনি কর্মসূচিটির ব্যয় নিয়ে সমালোচনা করছেন। তাঁর বক্তব্য, কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনেক মানুষ আবারও গৃহহীন অবস্থায় ফিরে যাচ্ছেন।
পুলিশপ্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রেও রমনের অবস্থান বদলেছে। ২০২৪ সালে মেয়র বাসের মনোনীত সাবেক লস এঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ জিম ম্যাকডোনেলকে পুলিশপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার পর রমন তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় অভিবাসন অভিযানের সময় পুলিশপ্রধান পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।
এদিকে রমন তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভুল স্বীকারও করেছেন। ‘মেজার ইউএলএ’ পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আগেভাগে আলোচনা না করাকে তিনি সিটি হলে নিজের সবচেয়ে বড় ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় সমর্থন তৈরির কাজটি যথাযথভাবে না করায় অপ্রয়োজনীয় বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল।
লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে রমনের প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান মেয়র কারেন বাস। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে নগরীর গৃহহীন সংকট, জননিরাপত্তা, আবাসন ব্যয় এবং প্রশাসনিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। রমনকে সমর্থনকারী গোষ্ঠীগুলো তাঁর নীতিগত পরিবর্তনকে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, বারবার অবস্থান বদলানোর কারণে তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত রমনের অবস্থান পরিবর্তন ভোটারদের কাছে নমনীয় নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি সিদ্ধান্তহীনতা হিসেবে দেখা হবে, তা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন তথ্য ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির ভিত্তিতেই তিনি বিভিন্ন বিষয়ে নিজের চিন্তাভাবনা পুনর্বিবেচনা করেছেন।