লস এঞ্জেলেস

পুলিশপ্রধান জিম ম্যাকডোনেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বন্দ্ব, বাসের সমর্থনে রামানের নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি

লস এঞ্জেলেসে মেয়র নির্বাচন ঘিরে পুলিশ বিভাগের প্রধান জিম ম্যাকডোনেলকে নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বর্তমান মেয়র কারেন বাস তাঁকে দায়িত্বে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে, মেয়র পদে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সিটি কাউন্সিল সদস্য নিথিয়া রামান ক্ষমতায় এলে পুলিশপ্রধান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পুলিশের ভূমিকা, অভিবাসন অভিযান মোকাবিলা এবং সংস্কারের গতি নিয়ে দুই প্রার্থীর এই মতপার্থক্য এখন নির্বাচনী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ম্যাকডোনেলকে লস এঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের (এলএপিডি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন বাস। এর আগে তিনি লং বিচের পুলিশপ্রধান এবং লস এঞ্জেলেস কাউন্টির শেরিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিয়োগের সময় তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং বিভাগে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনাও বেড়েছে। পুলিশের গু লি চালানোর ঘটনা বৃদ্ধি, বিক্ষোভ দমনে কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য কঠোর কৌশলের ব্যবহার এবং পুলিশের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযানের সময় এলএপিডির ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রামান। রামানের বক্তব্য, ম্যাকডোনেলের নেতৃত্বে পুলিশ বিভাগ অভিবাসী সম্প্রদায়ের আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে, আইসিইর অভিযানের প্রেক্ষাপটে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, লস এঞ্জেলেসের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিবাসী সম্প্রদায়ের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে—এমন একজন নতুন পুলিশপ্রধান দরকার। তবে ম্যাকডোনেলকে ঠিক কখন সরানো হবে, সে বিষয়ে রামানের বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে তিনি বলেছিলেন, ম্যাকডোনেলের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০৩০ সালে নতুন পুলিশপ্রধান নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। পরে তিনি জানান, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে পরিবর্তন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ২০২৮ সালের অলিম্পিকের আগে এই পরিবর্তন ঘটবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। বাসের আশঙ্কা, অলিম্পিকের আগে পুলিশপ্রধান পরিবর্তন করলে বিভাগে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হতে পারে। ওই সময় লস এঞ্জেলেসে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন পুলিশপ্রধান খুঁজে বের করতে আগেরবার ১০ মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল বলে উল্লেখ করেছেন বাস। তাঁর মতে, একই সময় লাগলে অলিম্পিকের মাত্র সাত থেকে আট মাস আগে নতুন প্রধান দায়িত্ব নিতে পারেন, যা প্রস্তুতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাস অবশ্য ম্যাকডোনেলের নেতৃত্বের সব দিক নিয়ে সন্তুষ্ট নন। পুলিশের শৃঙ্খলাব্যবস্থা সংস্কারের ধীরগতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনেক সময় কম জবাবদিহির মুখে পড়েন—এমন ধারণা পুলিশের ভেতরেই রয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের গু লিতে সাধারণ নাগরিকদের আ হ ত হওয়ার ঘটনা, বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। গত সেপ্টেম্বরে বাস এলএপিডির নীতি ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ উন্নত করাও তাঁর পরিকল্পনার অংশ। অন্যদিকে, ম্যাকডোনেল বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিক্ষোভকারীদের একাংশ বোতল, ইট, মলোটভ ককটেল ও শক্তিশালী আতশবাজি ছুড়েছিলেন। এতে ৫২ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। এদিকে, রামানের পুলিশপ্রধান পরিবর্তনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে লস এঞ্জেলেস পুলিশ প্রোটেকটিভ লিগ। সংগঠনটি পুলিশের সাধারণ কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিশালী ইউনিয়ন। তারা বাসের পুনর্নির্বাচনকে সমর্থন করছে এবং রামানের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। তবে জননিরাপত্তার কিছু বিষয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থানে মিলও রয়েছে। দুজনই লাইসেন্স প্লেট শনাক্তকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফ্লক সেফটির কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করেছেন। পুলিশের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য জননিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগের পক্ষেও তাঁরা কথা বলেছেন। একই সঙ্গে পুলিশ বিভাগের জনবল আরও কমে যাওয়া ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচনের পর নতুন মেয়রকে পুলিশের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা। ২০২৩ সালে বাসের আলোচনায় পুলিশের বেতন বাড়ানোর যে চুক্তি হয়েছিল, রামানের মতে তা শহরের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বেতন বৃদ্ধি বাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সব মিলিয়ে, লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচন শুধু পুলিশপ্রধানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি পুলিশ সংস্কার, অভিবাসী সম্প্রদায়ের আস্থা, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েও দুই প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তুলে ধরছে।