কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে। দুই দেশই একে অপরের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এতে গাড়ি, বাড়ি নির্মাণের সামগ্রী, গৃহস্থালি পণ্য, অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে তার বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়ন শুরু করার পর থেকেই উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাত চলছে।
চলতি সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে ট্রাম্পও কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন।
দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি শুল্কের ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
গাড়ি
কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে এই শুল্ক কার্যকর হলে উত্তর আমেরিকার গাড়ি শিল্পে আরও চাপ তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশ ব্যাপকভাবে আমদানি-রপ্তানি হয়। এসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা তিন দেশের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ইয়ারোস বলেন, আগের শুল্কের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লেও এতদিন গাড়ি বিক্রেতারা এর বড় অংশ নিজেদের ওপর নিয়েছেন। তবে সেই সুযোগ আর বেশি দিন থাকবে না।
তার মতে, কানাডীয় গাড়ি, ট্রাক ও যন্ত্রাংশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে এবার এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
গাড়ির দাম বেড়ে গেলে নির্মাতারা তুলনামূলক দামি গাড়ি, এসইউভি ও পিকআপ ট্রাক উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। নতুন কম দামের গাড়ির সরবরাহ কমে গেলে পুরোনো গাড়ির বাজারেও দাম বাড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কার্নি ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকির সমান পাল্টা শুল্ক আরোপ করেননি। গত বছর থেকেই কিছু মার্কিন গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে।
বাড়ি নির্মাণের খরচ বাড়তে পারে
ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের মতো নির্মাণসামগ্রীর ওপর আগে থেকেই শুল্ক ছিল। নতুন করে কানাডা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সমান ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
এ ছাড়া প্লাইউডসহ বিভিন্ন মার্কিন কাঠজাত পণ্যের ওপরও শুল্ক বসিয়েছে কানাডা। এমনকি কাঠ জোড়া লাগাতে ব্যবহৃত স্ক্রুর মতো পণ্যও এর আওতায় পড়েছে।
ফলে এসব নির্মাণসামগ্রী আমদানি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ বাড়বে। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত বাড়ির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফরেস্ট প্রোডাক্টস অ্যাসোসিয়েশন অব কানাডা বলেছে, এই শুল্ক দুই দেশেরই খরচ বাড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হোম বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান বিল ওওয়েন্স ট্রাম্পকে নির্মাণসামগ্রীকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এমনিতেই আবাসন ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২৩ বিলিয়ন ডলারের কাঠজাত পণ্য আমদানি করেছিল। এর প্রায় অর্ধেকই এসেছিল কানাডা থেকে।
তবে বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ নিয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ নতুন নয়। ‘ল্যাম্বার ওয়ার’ নামে পরিচিত এই বাণিজ্য বিরোধ কয়েক দশক ধরে চলছে।
গৃহস্থালি পণ্য
এবারের শুল্কযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত গৃহস্থালি পণ্য। কানাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কার্পেট, ওয়াশিং মেশিন, আসবাবপত্র, ফ্রিজ এবং এমনকি ছুরি, কাঁটা ও চামচের ওপরও শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের উত্তর আমেরিকা বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ব্র্যাডলি সন্ডার্স মনে করেন, কানাডার মানুষ অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্যের দিকে ঝুঁকবেন।
তার মতে, কানাডা এমন পণ্যকে লক্ষ্য করেছে, যেগুলোর বিকল্প স্থানীয় বাজার থেকেই সহজে পাওয়া যায়।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রেও কাঠসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর ওপর শুল্কের কারণে আসবাবপত্র ও কিছু গৃহস্থালি সরঞ্জামের দাম সামান্য বাড়তে পারে।
অ্যালকোহল
অ্যালকোহলের দাম খুব বেশি বাড়বে না হলেও এই বাণিজ্যযুদ্ধ কানাডীয়দের পানীয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।
গত বছর আগের দফার শুল্কের জবাবে কানাডার বেশ কয়েকটি প্রদেশ মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে কানাডায় মার্কিন ওয়াইন ও স্পিরিটসের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমে যায় বলে জানিয়েছে মার্কিন অ্যালকোহল শিল্প।
বাণিজ্য আলোচনা চলার সময় প্রধানমন্ত্রী কার্নি প্রদেশগুলোকে দোকানের তাকগুলোতে আবার মার্কিন অ্যালকোহল রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে আলোচনা ভেঙে পড়ায় নিষেধাজ্ঞা আবারও ফিরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে শুধু সাসকাচোয়ান ও আলবার্টা প্রদেশে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। তবে সাসকাচোয়ান ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন আমদানি করা অ্যালকোহলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
চাকরিতেও প্রভাব পড়তে পারে
শুল্কের প্রভাব শুধু পণ্যের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সীমান্ত পেরিয়ে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আমদানি-রপ্তানি আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসার খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্যযুদ্ধকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ কমতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান তৈরির গতিও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্র্যাডলি সন্ডার্সের মতে, সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে নয়, বরং চাকরি হারানোর মাধ্যমে আসতে পারে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কোনো আসবাব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যদি যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর সরাসরি বড় প্রভাব পড়বে।
কানাডার বনশিল্পে প্রায় ২ লাখ মানুষ কাজ করেন। এই শিল্প সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে কানাডীয় কাঠের ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কানাডার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে নির্ভরযোগ্য প্রবেশাধিকার কোনো সহায়তা প্যাকেজ দিয়েই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তারা এই দফার কানাডা-সংক্রান্ত শুল্কযুদ্ধে জীবনযাত্রার ব্যয়ে খুব বড় পরিবর্তন হয়তো অনুভব করবেন না। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যে বাধা তৈরি হলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
এই বাণিজ্য উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
কানাডা ও মেক্সিকো চায় চুক্তিটি আরও ১৬ বছরের জন্য বাড়ানো হোক। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বর্তমান কাঠামোতে তারা চুক্তিটি নবায়ন করবে না।
চুক্তিটি এখনো কার্যকর থাকলেও শুল্ক নিয়ে বিরোধ ভবিষ্যতের আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। এতে সীমান্তপারের ব্যবসা ও বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।
ইয়েলের বাজেট ল্যাবের সহযোগী পরিচালক জন ইসেলিনের হিসাব অনুযায়ী, কানাডার সঙ্গে এই বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে একজন মার্কিন পরিবারের গড়ে প্রায় ৩ ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
তবে ট্রাম্পের বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে চলমান বৃহত্তর বাণিজ্যযুদ্ধ, বিশেষ করে চীনের ওপর শুল্ক, হিসাবের মধ্যে ধরলে একটি পরিবারের অতিরিক্ত খরচ প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ইসেলিন বলেন, কানাডার সঙ্গে এই ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখা কঠিন। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের বাণিজ্য বিরোধ চলছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে এবং প্রতিটি নতুন শুল্ক অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা তৈরি করছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে তার বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়ন শুরু করার পর থেকেই উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাত চলছে।
চলতি সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে ট্রাম্পও কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন।
দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি শুল্কের ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
গাড়ি
কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে এই শুল্ক কার্যকর হলে উত্তর আমেরিকার গাড়ি শিল্পে আরও চাপ তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশ ব্যাপকভাবে আমদানি-রপ্তানি হয়। এসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা তিন দেশের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ইয়ারোস বলেন, আগের শুল্কের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লেও এতদিন গাড়ি বিক্রেতারা এর বড় অংশ নিজেদের ওপর নিয়েছেন। তবে সেই সুযোগ আর বেশি দিন থাকবে না।
তার মতে, কানাডীয় গাড়ি, ট্রাক ও যন্ত্রাংশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে এবার এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
গাড়ির দাম বেড়ে গেলে নির্মাতারা তুলনামূলক দামি গাড়ি, এসইউভি ও পিকআপ ট্রাক উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। নতুন কম দামের গাড়ির সরবরাহ কমে গেলে পুরোনো গাড়ির বাজারেও দাম বাড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কার্নি ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকির সমান পাল্টা শুল্ক আরোপ করেননি। গত বছর থেকেই কিছু মার্কিন গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে।
বাড়ি নির্মাণের খরচ বাড়তে পারে
ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের মতো নির্মাণসামগ্রীর ওপর আগে থেকেই শুল্ক ছিল। নতুন করে কানাডা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সমান ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
এ ছাড়া প্লাইউডসহ বিভিন্ন মার্কিন কাঠজাত পণ্যের ওপরও শুল্ক বসিয়েছে কানাডা। এমনকি কাঠ জোড়া লাগাতে ব্যবহৃত স্ক্রুর মতো পণ্যও এর আওতায় পড়েছে।
ফলে এসব নির্মাণসামগ্রী আমদানি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ বাড়বে। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত বাড়ির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফরেস্ট প্রোডাক্টস অ্যাসোসিয়েশন অব কানাডা বলেছে, এই শুল্ক দুই দেশেরই খরচ বাড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হোম বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান বিল ওওয়েন্স ট্রাম্পকে নির্মাণসামগ্রীকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এমনিতেই আবাসন ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২৩ বিলিয়ন ডলারের কাঠজাত পণ্য আমদানি করেছিল। এর প্রায় অর্ধেকই এসেছিল কানাডা থেকে।
তবে বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ নিয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ নতুন নয়। ‘ল্যাম্বার ওয়ার’ নামে পরিচিত এই বাণিজ্য বিরোধ কয়েক দশক ধরে চলছে।
গৃহস্থালি পণ্য
এবারের শুল্কযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত গৃহস্থালি পণ্য। কানাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কার্পেট, ওয়াশিং মেশিন, আসবাবপত্র, ফ্রিজ এবং এমনকি ছুরি, কাঁটা ও চামচের ওপরও শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের উত্তর আমেরিকা বিষয়ক অর্থনীতিবিদ ব্র্যাডলি সন্ডার্স মনে করেন, কানাডার মানুষ অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্যের দিকে ঝুঁকবেন।
তার মতে, কানাডা এমন পণ্যকে লক্ষ্য করেছে, যেগুলোর বিকল্প স্থানীয় বাজার থেকেই সহজে পাওয়া যায়।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রেও কাঠসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর ওপর শুল্কের কারণে আসবাবপত্র ও কিছু গৃহস্থালি সরঞ্জামের দাম সামান্য বাড়তে পারে।
অ্যালকোহল
অ্যালকোহলের দাম খুব বেশি বাড়বে না হলেও এই বাণিজ্যযুদ্ধ কানাডীয়দের পানীয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।
গত বছর আগের দফার শুল্কের জবাবে কানাডার বেশ কয়েকটি প্রদেশ মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে কানাডায় মার্কিন ওয়াইন ও স্পিরিটসের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমে যায় বলে জানিয়েছে মার্কিন অ্যালকোহল শিল্প।
বাণিজ্য আলোচনা চলার সময় প্রধানমন্ত্রী কার্নি প্রদেশগুলোকে দোকানের তাকগুলোতে আবার মার্কিন অ্যালকোহল রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে আলোচনা ভেঙে পড়ায় নিষেধাজ্ঞা আবারও ফিরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে শুধু সাসকাচোয়ান ও আলবার্টা প্রদেশে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। তবে সাসকাচোয়ান ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন আমদানি করা অ্যালকোহলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
চাকরিতেও প্রভাব পড়তে পারে
শুল্কের প্রভাব শুধু পণ্যের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সীমান্ত পেরিয়ে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আমদানি-রপ্তানি আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসার খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্যযুদ্ধকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ কমতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান তৈরির গতিও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্র্যাডলি সন্ডার্সের মতে, সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে নয়, বরং চাকরি হারানোর মাধ্যমে আসতে পারে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কোনো আসবাব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যদি যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর সরাসরি বড় প্রভাব পড়বে।
কানাডার বনশিল্পে প্রায় ২ লাখ মানুষ কাজ করেন। এই শিল্প সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে কানাডীয় কাঠের ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কানাডার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে নির্ভরযোগ্য প্রবেশাধিকার কোনো সহায়তা প্যাকেজ দিয়েই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তারা এই দফার কানাডা-সংক্রান্ত শুল্কযুদ্ধে জীবনযাত্রার ব্যয়ে খুব বড় পরিবর্তন হয়তো অনুভব করবেন না। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যে বাধা তৈরি হলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
এই বাণিজ্য উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
কানাডা ও মেক্সিকো চায় চুক্তিটি আরও ১৬ বছরের জন্য বাড়ানো হোক। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বর্তমান কাঠামোতে তারা চুক্তিটি নবায়ন করবে না।
চুক্তিটি এখনো কার্যকর থাকলেও শুল্ক নিয়ে বিরোধ ভবিষ্যতের আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। এতে সীমান্তপারের ব্যবসা ও বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।
ইয়েলের বাজেট ল্যাবের সহযোগী পরিচালক জন ইসেলিনের হিসাব অনুযায়ী, কানাডার সঙ্গে এই বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে একজন মার্কিন পরিবারের গড়ে প্রায় ৩ ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
তবে ট্রাম্পের বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে চলমান বৃহত্তর বাণিজ্যযুদ্ধ, বিশেষ করে চীনের ওপর শুল্ক, হিসাবের মধ্যে ধরলে একটি পরিবারের অতিরিক্ত খরচ প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ইসেলিন বলেন, কানাডার সঙ্গে এই ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখা কঠিন। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের বাণিজ্য বিরোধ চলছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে এবং প্রতিটি নতুন শুল্ক অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা তৈরি করছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম