আমেরিকা

তিন সন্তান হত্যায় লিন্ডসে ক্ল্যান্সি: ভিকটিম নাকি অপরাধী?

ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে তিন সন্তান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত মা লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি কি সন্তান হত্যার জন্য আইনগতভাবে দায়ী একজন অপরাধী, নাকি প্রসব-পরবর্তী গুরুতর মানসিক সমস্যার শিকার—প্রায় সাত সপ্তাহের বিচার শেষে এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। ক্ল্যান্সির সমর্থনে জোডি ফুর্নিয়ার নামে এক নারী ১৫ দিন আদালতের বাইরে অবস্থান করেন। তার ভাষ্য, একজন নারী ও মা হিসেবে ক্ল্যান্সির পাশে দাঁড়ানো তার কাছে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল। উত্তর ক্যারোলাইনার ক্যাটলিন কাজমিরচিও মায়ের সঙ্গে পারিবারিক শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে মামলাটি নিয়ে আগ্রহ থেকে আদালতে ঘুরে যান। আদালতের বাইরে অনেক নারী গোলাপি পোশাক পরে ক্ল্যান্সির সমর্থনে জড়ো হন। তবে সবাই ক্ল্যান্সির পক্ষে ছিলেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পারিবারিক আড্ডা—সর্বত্র এই মামলা নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়েছে। কেউ মনে করছেন ক্ল্যান্সি চিকিৎসাব্যবস্থার ব্যর্থতার শিকার এবং তার কারাগারের বদলে মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। অন্যদের মতে, মানসিক সমস্যার কথা বলে তিন শিশুকে হত্যার দায় এড়ানো উচিত নয়। ৩৬ বছর বয়সী ক্ল্যান্সি পেশায় একজন নার্স। প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, তিনি পরিকল্পিতভাবেই সন্তানদের হত্যা করেছেন। অন্যদিকে তার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি পোস্টপার্টাম সাইকোসিস বা প্রসব-পরবর্তী গুরুতর মানসিক বিকারের শিকার হয়েছিলেন। এ কারণে হত্যার সময় তিনি নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য আইনগতভাবে দায়ী ছিলেন না বলে দাবি করেন তারা। ক্ল্যান্সির পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে কোরা, তিন বছর বয়সী ছেলে ডসন এবং আট মাস বয়সী ছেলে ক্যালানকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এরপর তিনি বাড়ির দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে লাফ দেন। এতে তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়ে বর্তমানে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। বিচারের সময় ক্ল্যান্সির মানসিক ও প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্য নিয়ে ১০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য দেন। তবে তাদের বক্তব্যেও মতপার্থক্য দেখা যায়। ক্ল্যান্সির চিকিৎসক জেনিফার টাফটস জানান, পাঁচ মাসে এক ডজনেরও বেশি সেশনে চিকিৎসা দেওয়ার সময় তিনি ক্ল্যান্সির মধ্যে সাইকোসিসের লক্ষণ দেখতে পাননি। পরে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আভ্রাম ম্যাক বলেন, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন ‘পোস্টপার্টাম সাইকোসিস’কে আলাদা কোনো রোগনির্ণয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ক্ল্যান্সির সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, তিনি সাহায্য পাওয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করেছিলেন। সন্তান জন্মের পর তার মানসিক অবস্থার অবনতি শুরু হলে তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান, বিভিন্ন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এমনকি আত্মহত্যা প্রতিরোধ হটলাইনেও ফোন করেছিলেন। তার সমর্থকদের মতে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে তিনি সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাকে যথাযথভাবে সহায়তা করতে পারেনি। ম্যাসাচুসেটসের আদালতের বাইরে ক্ল্যান্সির মতো একই হাসপাতালে সন্তান জন্মের পর চিকিৎসা নেওয়া মেলিসা মেরিলও তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সন্তান জন্মের পর আত্মহত্যার চিন্তার অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ক্ল্যান্সির মধ্যে নিজের ছায়া দেখতে পান। আদালতে ক্ল্যান্সিকে কান্না করতে এবং আইনজীবীর হাত ধরে থাকতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, টেক্সাসের চার সন্তানের মা নিকোল রাসেল এই সহানুভূতিকে ‘বিষাক্ত সহমর্মিতা’ বলে সমালোচনা করেন। তার মতে, কঠিন মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে ক্ল্যান্সিকে উপস্থাপন করা উচিত নয়। কারণ লাখ লাখ মা সন্তান জন্মের পর নানা ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলেও তারা সন্তানদের ক্ষতি করেন না। মামলাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এমনকি ক্ল্যান্সির সাবেক স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সিকে নিয়েও নানা ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করার পাশাপাশি ঘটনা আড়াল করার অভিযোগও তোলা হয়। তবে ক্ল্যান্সি নিজেই সন্তানদের হত্যার বিষয়টি অস্বীকার করেননি এবং ঘটনার সময় বাড়িতে তিনিই একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। প্যাট্রিকের আইনজীবীরা আগস্টে সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও মানহানিকর বলে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, তিন সন্তান হারানোর ঘটনায় প্যাট্রিক যে অকল্পনীয় ক্ষতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তার সঙ্গে এসব মিথ্যা ও ক্ষতিকর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এই মামলা নারী-পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও সামনে এনেছে। ইলিনয়ের তিন সন্তানের বাবা ভিনসেনজো ভাসকেজ মনে করেন, ক্ল্যান্সির প্রতি মানুষের সহানুভূতির পেছনে তার নারী ও মা হওয়ার বিষয়টি ভূমিকা রাখছে। তার প্রশ্ন, একই অভিযোগে কোনো বাবা বিচারের মুখোমুখি হলে মানুষ কি একইভাবে তার পাশে দাঁড়াত? প্রায় সাত দিন ধরে আলোচনার পরও বিচারকাজে যুক্ত ১২ সদস্যের জুরি কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। প্রায় ৪০ ঘণ্টা আলোচনা করেও তারা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শুক্রবার বিচারক মিস্ট্রায়াল ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এই বিচার থেকে কোনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। এখন ক্ল্যান্সির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। চলতি মাসের শেষ দিকে একটি শুনানিতে সিদ্ধান্ত হতে পারে, রাষ্ট্রপক্ষ নতুন করে বিচার শুরু করবে কি না, নাকি কোনো সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। তবে আদালতের রায় যা-ই হোক, ক্ল্যান্সি ‘মানসিক রোগের শিকার নাকি অপরাধী’—এই বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে আরও কিছুদিন চলবে বলেই মনে হচ্ছে।   এলএবাংলাটাইমস/ওএম