যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছে ফলাফল। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে যাওয়া এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা জানতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাবে। এর ওপর নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেতে কত আসন প্রয়োজন
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন জিততে হবে। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল খুবই সংকীর্ণ। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে নিট তিনটি আসন বাড়াতে হবে।
সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে এবার ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ৫১টি আসন প্রয়োজন। তবে সিনেটে ৫০-৫০ সমতা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের টাই-ব্রেকিং ভোটের কারণে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন।
নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি এবং দুইজন স্বতন্ত্র সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিতেন। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসনে নিট জয় প্রয়োজন।
কখন আসতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ফল
ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকের ফল সাধারণত সামগ্রিক নির্বাচনী চিত্র স্পষ্ট করে না। কেনটাকি ও ইন্ডিয়ানার মতো রিপাবলিকানদের শক্তিশালী রাজ্য এবং ভারমন্টের মতো ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটি থেকে আগে ফল আসতে পারে। এসব রাজ্যের ফল প্রত্যাশিত হলে তা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুব বেশি ধারণা দেবে না।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের নজর থাকবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর দিকে। বিশেষ করে ওহাইও, মেইন, আইওয়া, টেক্সাস, কানসাস ও আলাস্কার সিনেট নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
ওহাইওতে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর ফল রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে। মেইনের সিনেট নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কোনো প্রার্থী প্রথম পছন্দের ভোটে ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে র্যাঙ্কড-চয়েস ভোট গণনার পরবর্তী ধাপে যেতে হয়। এতে চূড়ান্ত ফল আসতে দেরি হতে পারে।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো ও রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের লড়াই বিশেষভাবে আলোচিত। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের জয় হলে তা দলটির সিনেট নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের ১৭তম, পেনসিলভানিয়ার ৮ম এবং ভার্জিনিয়ার ১ম কংগ্রেসনাল জেলার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলো ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
২০২২ সালের নির্বাচনে ফল জানতে কত সময় লেগেছিল
২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা নির্বাচনের পরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়েছিল। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে ধারণা করা হলেও সিনেটের লড়াই ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
১৭ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি আসন নিশ্চিত হওয়ার পর দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সিনেটে নেভাডার গুরুত্বপূর্ণ আসনের ফল গণনা করতে চার দিন লেগেছিল। সেখানে ডেমোক্র্যাটদের জয় দলটিকে ৫০ আসনে পৌঁছে দেয়। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের টাই-ব্রেকিং ভোটের কারণে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
জর্জিয়ার সিনেট নির্বাচনেও কোনো প্রার্থী নভেম্বরের ভোটে ৫০ শতাংশ না পাওয়ায় রান-অফ অনুষ্ঠিত হয়। ৬ ডিসেম্বরের সেই ভোটে ডেমোক্র্যাটরা জয় পায়।
ভোট গণনায় দেরি হয় কেন
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি অঙ্গরাজ্য নিজস্ব নিয়মে নির্বাচন পরিচালনা করে। কোথাও নির্বাচনের আগেই ডাকযোগে পাঠানো ও আগাম ভোট গণনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়, আবার কোথাও নির্বাচনের দিন থেকে গণনা শুরু হয়।
ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের খাম যাচাই, ভোটারের স্বাক্ষর পরীক্ষা এবং ব্যালট প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বড় রাজ্যে নির্বাচনের দিন জমা পড়া বিপুলসংখ্যক ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা করতে কয়েক দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। আলাস্কা ও মেইনের মতো রাজ্যে র্যাঙ্কড-চয়েস ভোট গণনার নিয়মও ফল ঘোষণায় বিলম্ব ঘটাতে পারে।
ভোটের ব্যবধান খুব কম হলে পুনর্গণনা, আইনি চ্যালেঞ্জ কিংবা নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগও ফল চূড়ান্ত হতে দেরি করাতে পারে।
ফল চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া
ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর স্থানীয় ও কাউন্টি পর্যায়ে ফল যাচাই করা হয়। এরপর অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ফল প্রত্যয়ন করা হয়। নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরা নির্দিষ্ট নিয়মে পুনর্গণনা বা আইনি চ্যালেঞ্জের আবেদন করতে পারেন।
নির্বাচিত নতুন সদস্যরা সাধারণত ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
সব মিলিয়ে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে শুধু দ্রুত আসা ফল নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর চূড়ান্ত গণনা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবধান যত কম হবে, ফল জানতে অপেক্ষাও তত দীর্ঘ হতে পারে।