২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষিত হওয়ার পর আলোচনায় আসে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন।
২০১৩ সালের ৫ মে তাদের ভাষায় নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তি, ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ বন্ধ করা, নারী নীতি ও শিক্ষা নীতি বাতিল করাসহ ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে সমাবেশের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ওই রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এবং দমনপীড়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে হেফাজতের দূরত্ব তৈরি হয়। পরে অবশ্য সরকার ও হেফাজতের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা তৈরি হয়।
কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ায় হেফাজতে ইসলাম ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়। সংবর্ধনার ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয় হেফাজতে ইসলাম। তবে সম্প্রতি নানা ইস্যুতে হেফাজত ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে হেফাজত নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা কী ভাবছেন, তা নিয়ে কথা বলেছেন এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুব উল আলম হানিফ হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, যারা জ্বালাও-পোড়াও করছে, তারা রেহাই পাবে না। তিনি আরও বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের সংবিধান মানতে চায় না। এরা জাতীয় সংগীত গাইতে চায় না এবং জাতীয় পতাকাকেও সম্মান দিতে চায় না। তারা বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানাতে চায়। যে কারণে কোনো ইস্যু ছাড়াই হেফাজত সারা দেশে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, রাষ্ট্রের সম্পদ নষ্ট করছে। যারা এ ধ্বংসকার্যের সঙ্গে জড়িত তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।’
হানিফ আরও বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। যারা সরাসরি হামলায় জড়িত, যারা ইন্ধন দিয়েছে, যারা পরামর্শ দিয়েছে, তারা যে দলেরই হোক, যত শক্তিশালীই হোক তাদের বিচার করা হবে।’
এর আগে গত ৩০ মার্চ দুপুরে পাবনা সার্কিট হাউজে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে হানিফ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ২০১৩ সালে যেভাবে বিএনপি-জামায়াতকে দমন করা হয়েছে, সেভাবে হেফাজতকেও দমন করা হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি সহনশীল দল। তারা যেকোনো পরিস্থিতি ধৈর্য্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে। হেফাজত যে তাণ্ডবলীলা করে যাচ্ছে তা ধৈর্য্যের বাইরে। আমি এতটুকুই বলব বৃষ্টির পানি যেদিক দিয়ে আসবে, সেদিকেই ছাতা ধরবে আওয়ামী লীগ।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এ জাগরণকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য নানাবিধ অপরাজনীতি করেছে বিএনপি, জামায়াতসহ উগ্র ডান ও বামপন্থিদের যোগসাজসে একটি গোষ্ঠী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হেফাজতসহ কয়েকটি কথিত ধর্মভিত্তিক সংগঠন। যারা ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতি করে, যারা আইএসের এজেন্ট, যারা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে মোটেও সন্তুষ্ট নয়, তারাই এসব করছে। তারা দেশের শত্রু, জাতির শত্রু। এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চায়।
বাহাউদ্দিন নাছিম আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। হেফাজত তার বিরোধিতার নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে। আমরা বার বার বলছি, আমরা কোনো ব্যক্তিকে নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এর বিরোধিতার মানে হলো ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির বিরোধিতা নয়, একটি দেশের বিরোধিতা করা।
হেফাজতের তাণ্ডবের কথা উল্লেখ করে নাছিম বলেন, এরা রেললাইন উপরে ফেলেছে, সরকারি অফিস-আদালতে হামলা করেছে, এরা একাত্তরের হানাদার বাহিনীর চেয়েও ভয়ংকর। এরা ব্যক্তিগত জীবনেও সৎ নয়, পারিবারিক জীবনেও সৎ নয়। নারী, শিশু থেকে শুরু করে এদের হাতে কেউ নিরাপদ নয়। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘হেফাজতের এ কর্মকাণ্ড আমাদের ৭০-এর নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে ইমান থাকবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিয়েছে, তাঁর ডাকে সারা দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। আর বর্তমানে আমরা তাদেরই উত্তরসূরিদের দেখছি, যারা এ অপকর্মগুলো করছে। আমরা বরাবরই বলছি আমরা কোনো ব্যক্তিকে দাওয়াত দেইনি, আমরা দিয়েছি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে। তাই আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত করেছি। আজকে যারা এসব করছে, তারা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের আওতায় তাদের আনা হবে এবং রাজনৈতিকভাবেও তাদের মোকাবিলা করা হবে।’
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম আফজালুর রহমান বাবু বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম যে অরাজকতা করেছে, আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তারা যে অরাজকতা করছে আমরা তা রাজনৈতিকভাবেই প্রতিহত করব। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বাংলাদেশ থেকে নির্মূল করতে হবে। তারা দেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। আমি মনে করি তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া উচিত। আমাদের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে এসব ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করতে বলা হয়েছে। যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।’
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের সভাপতি সমীর চন্দ বলেন, ‘যেহেতু আমরা সরকারি দলে আছি, তাই সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করছি। আইনগতভাবেই আমরা সামনে এগুচ্ছি। এ ছাড়া হেফাজতের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দিতে সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে।’
আওয়ামী লীগের আরেক সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বাবা একজন স্বঘোষিত রাজকার, যা তিনি বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। আমরা এ দেশবিরোধীদের হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, ছাত্রলীগ মাঠে আছে, আপনারা সাবধান হয়ে যান।’
এ সময় লেখক ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘হেফাজত ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানদের অনূভূতি নিয়ে খেলা করছে। মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থী ও এতিম বাচ্চাদের মাঠে নামিয়ে একটি অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করছে। আমরা ছাত্রলীগ পরিবারের পক্ষ থেকে বলতে চাই, করোনার মহামারির মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে ছাত্রলীগ সবসময় মাঠে আছে এবং থাকবে।’
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান বলেন, ‘করোনার সময়ে হেফাজতের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। সরকার যখন করোনা মোকাবিলায় মানবিকভাবে কাজ করছে, তখনই বিএনপি-জামায়াত হেফাজতের ওপর ভর করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের মানুষ এখন সচেতন, তাই আমার মনে হয় তাদের এ উদ্দেশ্য কোনোভাবেই পূরণ হবে না। আর সরকারও এদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির হেফাজত প্রসঙ্গে বলেন, ‘গত ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে তারা যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা নজিরবিহীন। একাত্তরে তারা ধর্মের দোহাই দিয়েও পরাজিত হয়েছে। তাদেরই উত্তরসূরিরা আজ আবার ধর্মের নামে এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করছে। তবে আমার বিশ্বাস, একাত্তরের মতোই তারা আবারও এ বাংলার মাটিতে পরাজিত হবে।’
এর আগে হেফাজতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কথা উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম নামের একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশের বিদ্যমান স্বস্তি এবং শান্তি বিনষ্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে অব্যাহত তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে, তা সহনশীলতার সব মাত্রা অতিক্রম করেছে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উসকানিদাতাদের তালিকা প্রস্তুত করে এদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি ও ভাস্কর্যের ওপর যারা হামলা করেছে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাদের এ ধৃষ্টতার জবাব দেবে।’
এলএবাংলাটাইমস/এলআরটি/বি
২০১৩ সালের ৫ মে তাদের ভাষায় নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তি, ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ বন্ধ করা, নারী নীতি ও শিক্ষা নীতি বাতিল করাসহ ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে সমাবেশের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ওই রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এবং দমনপীড়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে হেফাজতের দূরত্ব তৈরি হয়। পরে অবশ্য সরকার ও হেফাজতের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা তৈরি হয়।
কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ায় হেফাজতে ইসলাম ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়। সংবর্ধনার ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয় হেফাজতে ইসলাম। তবে সম্প্রতি নানা ইস্যুতে হেফাজত ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে হেফাজত নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা কী ভাবছেন, তা নিয়ে কথা বলেছেন এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুব উল আলম হানিফ হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, যারা জ্বালাও-পোড়াও করছে, তারা রেহাই পাবে না। তিনি আরও বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের সংবিধান মানতে চায় না। এরা জাতীয় সংগীত গাইতে চায় না এবং জাতীয় পতাকাকেও সম্মান দিতে চায় না। তারা বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানাতে চায়। যে কারণে কোনো ইস্যু ছাড়াই হেফাজত সারা দেশে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, রাষ্ট্রের সম্পদ নষ্ট করছে। যারা এ ধ্বংসকার্যের সঙ্গে জড়িত তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।’
হানিফ আরও বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। যারা সরাসরি হামলায় জড়িত, যারা ইন্ধন দিয়েছে, যারা পরামর্শ দিয়েছে, তারা যে দলেরই হোক, যত শক্তিশালীই হোক তাদের বিচার করা হবে।’
এর আগে গত ৩০ মার্চ দুপুরে পাবনা সার্কিট হাউজে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে হানিফ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ২০১৩ সালে যেভাবে বিএনপি-জামায়াতকে দমন করা হয়েছে, সেভাবে হেফাজতকেও দমন করা হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি সহনশীল দল। তারা যেকোনো পরিস্থিতি ধৈর্য্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে। হেফাজত যে তাণ্ডবলীলা করে যাচ্ছে তা ধৈর্য্যের বাইরে। আমি এতটুকুই বলব বৃষ্টির পানি যেদিক দিয়ে আসবে, সেদিকেই ছাতা ধরবে আওয়ামী লীগ।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এ জাগরণকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য নানাবিধ অপরাজনীতি করেছে বিএনপি, জামায়াতসহ উগ্র ডান ও বামপন্থিদের যোগসাজসে একটি গোষ্ঠী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হেফাজতসহ কয়েকটি কথিত ধর্মভিত্তিক সংগঠন। যারা ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতি করে, যারা আইএসের এজেন্ট, যারা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে মোটেও সন্তুষ্ট নয়, তারাই এসব করছে। তারা দেশের শত্রু, জাতির শত্রু। এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চায়।
বাহাউদ্দিন নাছিম আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। হেফাজত তার বিরোধিতার নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে। আমরা বার বার বলছি, আমরা কোনো ব্যক্তিকে নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এর বিরোধিতার মানে হলো ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির বিরোধিতা নয়, একটি দেশের বিরোধিতা করা।
হেফাজতের তাণ্ডবের কথা উল্লেখ করে নাছিম বলেন, এরা রেললাইন উপরে ফেলেছে, সরকারি অফিস-আদালতে হামলা করেছে, এরা একাত্তরের হানাদার বাহিনীর চেয়েও ভয়ংকর। এরা ব্যক্তিগত জীবনেও সৎ নয়, পারিবারিক জীবনেও সৎ নয়। নারী, শিশু থেকে শুরু করে এদের হাতে কেউ নিরাপদ নয়। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘হেফাজতের এ কর্মকাণ্ড আমাদের ৭০-এর নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে ইমান থাকবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিয়েছে, তাঁর ডাকে সারা দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। আর বর্তমানে আমরা তাদেরই উত্তরসূরিদের দেখছি, যারা এ অপকর্মগুলো করছে। আমরা বরাবরই বলছি আমরা কোনো ব্যক্তিকে দাওয়াত দেইনি, আমরা দিয়েছি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে। তাই আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত করেছি। আজকে যারা এসব করছে, তারা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের আওতায় তাদের আনা হবে এবং রাজনৈতিকভাবেও তাদের মোকাবিলা করা হবে।’
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম আফজালুর রহমান বাবু বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম যে অরাজকতা করেছে, আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তারা যে অরাজকতা করছে আমরা তা রাজনৈতিকভাবেই প্রতিহত করব। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বাংলাদেশ থেকে নির্মূল করতে হবে। তারা দেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। আমি মনে করি তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া উচিত। আমাদের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে এসব ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করতে বলা হয়েছে। যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।’
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের সভাপতি সমীর চন্দ বলেন, ‘যেহেতু আমরা সরকারি দলে আছি, তাই সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করছি। আইনগতভাবেই আমরা সামনে এগুচ্ছি। এ ছাড়া হেফাজতের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দিতে সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে।’
আওয়ামী লীগের আরেক সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বাবা একজন স্বঘোষিত রাজকার, যা তিনি বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। আমরা এ দেশবিরোধীদের হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, ছাত্রলীগ মাঠে আছে, আপনারা সাবধান হয়ে যান।’
এ সময় লেখক ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘হেফাজত ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানদের অনূভূতি নিয়ে খেলা করছে। মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থী ও এতিম বাচ্চাদের মাঠে নামিয়ে একটি অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করছে। আমরা ছাত্রলীগ পরিবারের পক্ষ থেকে বলতে চাই, করোনার মহামারির মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে ছাত্রলীগ সবসময় মাঠে আছে এবং থাকবে।’
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান বলেন, ‘করোনার সময়ে হেফাজতের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। সরকার যখন করোনা মোকাবিলায় মানবিকভাবে কাজ করছে, তখনই বিএনপি-জামায়াত হেফাজতের ওপর ভর করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশের মানুষ এখন সচেতন, তাই আমার মনে হয় তাদের এ উদ্দেশ্য কোনোভাবেই পূরণ হবে না। আর সরকারও এদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির হেফাজত প্রসঙ্গে বলেন, ‘গত ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে তারা যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা নজিরবিহীন। একাত্তরে তারা ধর্মের দোহাই দিয়েও পরাজিত হয়েছে। তাদেরই উত্তরসূরিরা আজ আবার ধর্মের নামে এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করছে। তবে আমার বিশ্বাস, একাত্তরের মতোই তারা আবারও এ বাংলার মাটিতে পরাজিত হবে।’
এর আগে হেফাজতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কথা উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম নামের একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশের বিদ্যমান স্বস্তি এবং শান্তি বিনষ্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে অব্যাহত তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে, তা সহনশীলতার সব মাত্রা অতিক্রম করেছে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উসকানিদাতাদের তালিকা প্রস্তুত করে এদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি ও ভাস্কর্যের ওপর যারা হামলা করেছে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাদের এ ধৃষ্টতার জবাব দেবে।’
এলএবাংলাটাইমস/এলআরটি/বি