সুপার-সাইজের এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা এমনিতেই বাড়ছে, তার ওপর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও ডেটা বিশেষজ্ঞদের দল ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব এই বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণা অনুযায়ী, জুন ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এল নিনোর অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে এটি স্বাভাবিক সময়ে তাপজনিত মৃত্যুর অতিরিক্ত হিসাব এবং এল নিনোর কারণে আগুন, বন্যা ও খরার মতো অন্যান্য দুর্যোগে সম্ভাব্য মৃত্যুও এর মধ্যে ধরা হয়নি।
গবেষকরা বলছেন, বর্তমান এল নিনো ইতোমধ্যে অস্বাভাবিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং উত্তর গোলার্ধের বসন্ত পর্যন্ত এর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তাপমাত্রার প্রভাব আরও কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী কয়েক মাসে এল নিনোর কারণে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ২ দশমিক ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি হতে পারে।
এই অতিরিক্ত উষ্ণতার ফলে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চরম তাপমাত্রার দিন ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বর্তমান এল নিনো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতির একটি আগাম সংকেতের মতো, যখন এমন তাপমাত্রা আরও নিয়মিত হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনোর তাপজনিত প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে। গবেষণায় নাইজেরিয়াকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলেও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই হিসাব তৈরি করতে বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের তথ্য এবং মৌসুমি তাপমাত্রার পূর্বাভাস ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য মৃত্যুর হিসাব ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ের গড় পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
তবে গবেষণাটি এখনো পিয়ার-রিভিউ হয়নি। ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত নন, বলেছেন ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর হিসাবটি একটি মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ হিসেবে সম্ভাব্য হলেও এটিকে নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা উচিত নয়। তার মতে, গবেষণাটির গুরুত্ব হলো এল নিনো-চালিত চরম তাপের সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাব এবং আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।
গবেষকদের মতে, আগাম তাপ সতর্কতা, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত শীতল ও পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে সম্ভাব্য প্রাণহানি কমানো সম্ভব। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই প্রস্তুতি নেওয়া গেলে এ বছরের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে চরম তাপমাত্রা নিয়মিত হয়ে উঠলে শুধু জরুরি ব্যবস্থা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।