লস এঞ্জেলেসে কোরিয়ান স্পাগুলো বেশ পরিচিত। সনা, স্টিম রুম, ঠান্ডা পানিতে ডুব আর শরীরের যত্ন নেওয়ার নানা সুবিধা নিতে সেখানে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পর্যটকেরাও। তবে শহরটির স্পা সংস্কৃতির আরেকটি পুরোনো ধারা রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। সেটি হলো রুশ বাথহাউস বা ‘বানিয়া’। কয়েক দশক ধরে এসব জায়গা শুধু শরীরের আরাম নেওয়ার কেন্দ্র নয়, পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের সামাজিক মিলনস্থল হিসেবেও পরিচিত।
লস এঞ্জেলেসের পিকো বুলেভার্ডে অবস্থিত সিটি স্পা এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৫ সালে পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের সামাজিক ক্লাব হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে জায়গাটি বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের আড্ডা ও যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে আছে। এখানে ইউক্রেনীয়, উজবেক, কাজাখ, চেচেন, আর্মেনীয়সহ পূর্ব ইউরোপ ও আশপাশের অঞ্চলের নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ আসেন। তাঁদের অনেকে রুশ ভাষায় কথা বললেও নিজেদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ধরে রেখেছেন।
সিটি স্পার মালিকপক্ষের পরিবারের সদস্য ড্যানিয়েল বেসারাতের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব ইউরোপীয় অভিবাসীদের জন্য এটি অনেকটা কমিউনিটি সেন্টারের মতো। সনার ভেতরে আড্ডা, নানা বিষয়ে আলোচনা কিংবা টেলিভিশনে বাস্কেটবল খেলা দেখা—সব মিলিয়ে জায়গাটি তাঁদের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বাথহাউসের সঙ্গে হলিউডেরও নানা গল্প জড়িয়ে আছে। জন বেলুশি, কোবে ব্রায়ান্ট ও জো ডিম্যাজিওর মতো পরিচিত ব্যক্তিদের এখানে আসার কথা জানা যায়। ১৯৬২ সালে মেরিলিন মনরোর মৃত্যুর পর জো ডিম্যাজিও নাকি শোক সামলাতে প্রতিদিন এখানে আসতেন। অতীতের বিভিন্ন সময়ে জন ট্রাভোল্টা, জেরেমি পিভেন এবং রোলিং স্টোনসের মিক জ্যাগার ও কিথ রিচার্ডসেরও এখানে আসার কথা উঠে এসেছে। তবে এসব তারকাখ্যাতির বাইরেও সাধারণ মানুষের নিয়মিত আনাগোনাই বাথহাউসটির মূল পরিচয়।
সিটি স্পায় প্রবেশের খরচ ৮৫ ডলার। ভেতরে রয়েছে উচ্চ তাপমাত্রার সনা, ঠান্ডা পানিতে ডুব দেওয়ার ব্যবস্থা, স্টিম রুম এবং লবণপাথরের ঘর। কোনো কোনো সনার তাপমাত্রা ২২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছায়। এখানে ‘ভেনিক’ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাধর্মী পরিচর্যাও করা হয়। এতে ওকগাছের পাতাসহ ডালপালার গুচ্ছ দিয়ে সনার ভেতরে শরীরে আলতোভাবে স্পর্শ করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পাতার সুগন্ধি তেল ও তাপ শরীরকে উদ্দীপিত করতে সহায়তা করে। তবে এসব পরিচর্যার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিবেচনা করা জরুরি।
খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। একজন আর্মেনীয় ও একজন উজবেক শেফ এখানে রান্না করেন। মেনুতে ভূমধ্যসাগরীয় খাবারের পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপের পরিচিত পদ—যেমন বোরশট স্যুপ, পিয়েরোগি ও মাশরুমের ক্রিম স্যুপ—পাওয়া যায়।
ওয়েস্ট হলিউডের ভোডা স্পাও রুশ বাথহাউস সংস্কৃতির আরেকটি পরিচিত ঠিকানা। ২০০৭ সাল থেকে এটি এলাকার রুশভাষী ও পূর্ব ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর মানুষকে সেবা দিয়ে আসছে। সিটি স্পার তুলনায় ভোডায় প্রতিদিন নারী-পুরুষ একসঙ্গে স্পা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এখানে সনা, সুইমিং পুল, শরীরের পরিচর্যা, গরম-ঠান্ডা পানির থেরাপি, ফেসিয়াল এবং স্মুদি বারের ব্যবস্থা আছে। সদস্য নন এমন অতিথিদের প্রবেশমূল্য ১১০ ডলার।
ভোডার স্পা পরিচালক হিদার ওয়ারেন জানান, তাঁদের কিছু সনার বাতাসকে নরম করতে ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ার ব্যবহার করা হয়। অন্য একটি শুষ্ক সনায় পাথর রাতভর গরম করে রাখা হয়, যাতে সেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে তাপ ছড়াতে পারে। এখানে ভেনিক পরিচর্যায় ব্যবহারের জন্য ইউক্রেন থেকে ওকগাছের ডালও আনা হয়।
ভোডায় কেউ কয়েক ঘণ্টা কাটান, আবার কেউ পুরো দিন থাকার পরিকল্পনা করেন। স্পাটি রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। গ্লেনডেল, বারব্যাঙ্ক ও সান ফার্নান্দো ভ্যালি থেকেও নিয়মিত অতিথিরা এখানে আসেন বলে জানিয়েছেন ওয়ারেন।
এই বাথহাউসগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি গুরুত্ব। সিটি স্পায় ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। ফলে অতিথিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততা থেকে দূরে থেকে সময় কাটাতে পারেন। তারকাদের জন্যও এটি স্বাভাবিক পরিবেশে থাকার সুযোগ তৈরি করে, যেখানে তাঁদের ছবি তোলার জন্য কেউ বারবার এগিয়ে আসবেন—এমন উদ্বেগ তুলনামূলকভাবে কম।
লস এঞ্জেলেসের রুশ বাথহাউসগুলো এখন পুরোনো অভিবাসী সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন দর্শকের কাছেও পরিচিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বানিয়া সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। একই ধারায় নিউইয়র্কভিত্তিক বাথহাউস ব্র্যান্ড আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সানসেট বুলেভার্ডে বড় একটি কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা করছে। জায়গাটি একসময় অ্যামিবা রেকর্ডসের অবস্থান ছিল।
বানিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে অভিবাসী জীবনের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন লিয়া ফেইগিন। তাঁর মতে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক মানুষের জন্য বাথহাউস ছিল শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার জায়গা নয়, বরং একত্র হওয়া, গল্প করা এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। সেখানে মানুষের পোশাক, পেশা বা আর্থিক অবস্থানের পার্থক্য অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
লস এঞ্জেলেসের কোরিয়ান স্পাগুলো যেখানে শহরের পরিচিত ওয়েলনেস সংস্কৃতির অংশ, সেখানে রুশ বাথহাউসগুলো ধরে রেখেছে ভিন্ন এক ঐতিহ্য। সনা, খাবার ও শরীরের পরিচর্যার পাশাপাশি এসব জায়গা অভিবাসীদের স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বন্ধনকে একসঙ্গে বাঁচিয়ে রেখেছে।