যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেইড কর্মসূচিতে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আলোচনায় ঝড় তুলেছেন সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেস (CMS)-এর প্রশাসক ড. মেহমেত ওজ। তিনি দাবি করেছেন, ক্যালিফোর্নিয়া অবৈধ অভিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার ফেডারেল অর্থ ব্যয় করেছে, যা ফেডারেল আইন লঙ্ঘনের শামিল।
তবে অভিযোগের মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা না করে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম বিষয়টি অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি তিনি একটি নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল করে দাবি করেন, ড. ওজ আর্মেনীয় আমেরিকান সম্প্রদায়কে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত করে বেআইনি বৈষম্য করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গভর্নরের এই রাজনৈতিক পদক্ষেপ মেডিকেইড জালিয়াতির গুরুতর সমস্যার সমাধান করে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যারাগন হেলথ ইনস্টিটিউট জানায়, গত এক দশকে ভুল বা জালিয়াতিমূলক মেডিকেইড অর্থপ্রদান ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। এতে সরাসরি প্রতারণা, ভুল বিলিং এবং ফেডারেল নিয়ম না মেনে দেওয়া অর্থ অন্তর্ভুক্ত।
মিনেসোটা রাজ্যের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০১৮ সাল থেকে মিনেসোটার ১৪টি কর্মসূচিতে দেওয়া ১৮ বিলিয়ন ডলারের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ চুরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ফেডারেল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য কোম্পানি গঠন করা হয়েছিল, কোনো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়নি।
ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস অ্যাটর্নি জো থম্পসন বলেন, “এটি কয়েকজন খারাপ ব্যক্তির অপরাধ নয়। এটি শিল্প-পর্যায়ের বিশাল জালিয়াতি।”
গত মাসে মিনেসোটার অ্যাটর্নি জেনারেল এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩ মিলিয়ন ডলার প্রতারণার অভিযোগ আনেন।
ক্যালিফোর্নিয়ায় মেডিকেইড জালিয়াতির পূর্ণ মাত্রা এখনও প্রকাশ পায়নি, তবে বিপুল অর্থ অপব্যবহারের ইঙ্গিত রয়েছে। ফাউন্ডেশন অন গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি (FGA) জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন রাজ্য অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ফেডারেল “জরুরি চিকিৎসা” তহবিলের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার দাবি করেছে।
FGA-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্যালিফোর্নিয়া শত শত মিলিয়ন ডলার জরুরি মেডিকেইড অর্থ পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কোম্পানিগুলোর কাছে পাঠিয়েছে, যারা অবৈধ অভিবাসীদের মেডিকেইড সুবিধা দেয়। শুধু ২০২৪ সালেই ক্যালিফোর্নিয়া ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরুরি মেডিকেইড ব্যয় দাবি করেছে।
সারা দেশে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য জরুরি মেডিকেইড খাতে দাবি করা অর্থ ২০২০ সালের ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৬.১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি জরুরি চিকিৎসা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়, বরং ফেডারেল নিয়মের আগ্রাসী ব্যাখ্যার ফল।
মেডিকেইড মূলত দরিদ্র ও অসহায় নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে, যা ৫ জনে ১ জন আমেরিকান এবং ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ৪০% বাসিন্দাকে কভার করে।
২০২৪ সালে মেডিকেইড ব্যয় ৯৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রতি ছয় ডলারের এক ডলার।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জালিয়াতি ও অপব্যবহার শুধু করদাতাদের অর্থ নষ্ট করে না, বরং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য নির্ধারিত তহবিলও কমিয়ে দেয়।
তাদের মতে, মেডিকেইড তহবিলের অপব্যবহার তদন্ত করা কোনো বৈষম্য নয় বা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়—এটি করদাতা ও সুবিধাভোগীদের প্রতি সরকারের দায়িত্ব। অপচয় হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং আইন প্রয়োগ করলে মেডিকেইড কর্মসূচিকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয় ঘোরানো দিয়ে সমস্যা সমাধান হবে না; মেডিকেইডের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নির্ভর করছে জবাবদিহিতার ওপর।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম