লস এঞ্জেলেস

হারিকেনে রূপ নিয়েছে ট্রপিক্যাল স্টর্ম ‘মেরি’, লেবার ডে ছুটিতে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বৃষ্টি ও বড় ঢেউয়ের আশঙ্কা

ট্রপিক্যাল স্টর্ম ‘মেরি’ বুধবার হারিকেনে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আবহাওয়ায় লেবার ডে-র ছুটির সপ্তাহান্তে পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

বুধবার সকালে ঝড়টি উত্তর দিকে এগোচ্ছিল। আবহাওয়ার বিভিন্ন কম্পিউটার মডেলের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, ঝড়টি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের কাছাকাছি চলে আসতে পারে। তবে সব মডেলের পূর্বাভাস এক নয়। কিছু মডেলে ঝড়টি উপকূলের তুলনামূলক কাছে আসার সম্ভাবনা দেখানো হলেও বেশিরভাগ মডেলেই এটি উপকূল থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে এখনো ঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে মেরি যদি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের কাছে চলে আসে, তাহলে লেবার ডে সপ্তাহান্তে সেখানে বৃষ্টি, দমকা বাতাস ও সমুদ্রের বড় ঢেউ দেখা দিতে পারে।

ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (এনডব্লিউএস) মঙ্গলবার সতর্ক করে জানিয়েছিল, লেবার ডে-তে সমুদ্রসৈকতে যাওয়া মানুষের জন্য বড় ঢেউ এবং শক্তিশালী রিপ কারেন্টের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণমুখী উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ক্ষতিকর মাত্রার জলোচ্ছ্বাস বা উপকূলীয় প্লাবনের মাঝারি আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন।

এদিকে ছুটির বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনের সময় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে এনডব্লিউএস। তবে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি, বজ্রঝড় এবং বন্যার আশঙ্কা তুলনামূলক কম বলে জানানো হয়েছে।

‘স্প্যাগেটি মডেল’ কী?

হারিকেনের সম্ভাব্য গতিপথ বোঝাতে আবহাওয়াবিদরা যে বিভিন্ন কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন, সেগুলোর সম্মিলিত চিত্রকে অনেক সময় ‘স্প্যাগেটি মডেল’ বলা হয়। মানচিত্রে অসংখ্য রেখা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকায় দেখতে অনেকটা প্লেটে রাখা স্প্যাগেটির মতো মনে হয়।

তবে এসব রেখা সাধারণ কোনো আঁকাবাঁকা দাগ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারগুলোর মাধ্যমে কোটি কোটি হিসাব করে এসব সম্ভাব্য গতিপথ তৈরি করা হয়। একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় বা হারিকেন কোন দিকে যেতে পারে, তা বোঝার জন্য এসব মডেল ব্যবহার করা হয়।

মডেলগুলোর রেখা যদি কাছাকাছি অবস্থান করে, তাহলে পূর্বাভাসের বিষয়ে আবহাওয়াবিদদের আস্থা বেশি থাকে। আর রেখাগুলো যদি অনেক দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে ঝড়টির গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

সব ‘স্প্যাগেটি মডেল’ কি একই?

না। হারিকেনের গতিপথের পূর্বাভাস দিতে বিভিন্ন ধরনের মডেল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডায়নামিক্যাল, স্ট্যাটিস্টিক্যাল এবং এনসেম্বল মডেল।

ডায়নামিক্যাল মডেলগুলো ঝড়ের গতিবিধি ও আবহাওয়ার বিভিন্ন ভৌত সমীকরণ বিশ্লেষণ করে। এসব হিসাব করতে সুপারকম্পিউটারে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেলগুলো অতীতের ঝড়ের আচরণ এবং ঝড়ের অবস্থান, সময়সহ বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস তৈরি করে।

আর এনসেম্বল বা কনসেনসাস মডেল তৈরি করা হয় একাধিক মডেলের পূর্বাভাস একত্র করে। এসব মডেলে সাধারণত ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ দেখানোর পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে ঝড়টি কতটা শক্তিশালী হতে পারে, সেই ধারণাও দেওয়া হয়।

কারা এসব মডেল তৈরি করে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব আবহাওয়া মডেল পরিচালনা করে। কিছু মডেল সবার জন্য উন্মুক্ত, আবার কিছু মডেল বেসরকারিভাবে ব্যবহৃত হয়।

অনেক সময় মডেলের নাম থেকেই বোঝা যায় সেটি কে পরিচালনা করে। যেমন ‘নেভি গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল মডেল’ পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ফ্লিট নিউমেরিক্যাল মেটিওরোলজি অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি সেন্টার।

এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মডেলগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের জিএফএস এবং আরেকটি ইউরোপের ইসিএমডব্লিউএফ। এগুলো যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

পৃথক মডেলের পূর্বাভাসগুলোকে একটি মানচিত্রে একসঙ্গে দেখানোর কাজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান করে থাকে। এতে ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

কখন এসব মডেল দেখা ভালো?

আবহাওয়ার মডেলগুলো দিনে একাধিকবার হালনাগাদ হয়। তাই ঝড়ের গতিপথ সম্পর্কে সর্বশেষ ধারণা পেতে নিয়মিত এসব পূর্বাভাস দেখা যায়।

তবে একটি নির্দিষ্ট মডেলের একটি পূর্বাভাসের দিকে না তাকিয়ে কয়েকবারের পূর্বাভাসে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সেটি দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—সব মডেল কি ধীরে ধীরে ঝড়টিকে উত্তরের দিকে সরিয়ে নিচ্ছে, নাকি দক্ষিণের দিকে? অথবা বেশিরভাগ মডেল কি দেখাচ্ছে যে ঝড়টি আগের চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে?

একইভাবে ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। পরপর কয়েকটি পূর্বাভাসে যদি ঝড়ের গতিপথ একই দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে, তাহলে সেই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পায়।

কোনো আবহাওয়ার পূর্বাভাসই শতভাগ নিশ্চিত নয়। তবে ‘স্প্যাগেটি মডেল’ শক্তিশালী ঝড় বা হারিকেন কোন দিকে যেতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে ঝড় আঘাত হানার আগে মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম