ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সহকর্মীর পানিতে বিষ মেশানোর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এক ব্যক্তির গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী এক নারী প্রকৌশলী। দীর্ঘদিন ধরে বিষপ্রয়োগের শিকার হয়ে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ জানানো ওই নারী ক্ষুব্ধ হয়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তির সাজা নিয়ে। হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত কারাদণ্ড এড়িয়ে প্রবেশনে মুক্তি পান ওই ব্যক্তি। এখন নিজের অপরাধের রেকর্ড বাতিলের আবেদন করেছেন তিনি।
৪১ বছর বয়সী ডেভিড জুয়ের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে সহকর্মী রং ইউয়ানের খাবার ও পানিতে ক্যাডমিয়াম নামের অত্যন্ত বিষাক্ত ভারী ধাতু মেশানোর অভিযোগ ওঠে। তদন্তকারীদের দাবি, বার্কলির একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তিনি বারবার ইউয়ানের খাবার ও পানীয় দূষিত করেছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা এবং বিষপ্রয়োগের দুটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।
তবে মামলার প্রাথমিক অভিযোগের তুলনায় শেষ পর্যন্ত অনেক কম শাস্তি পান জু। সাবেক আলামেডা কাউন্টি জেলা অ্যাটর্নি পামেলা প্রাইসের সময়ে করা একটি সমঝোতার আওতায় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি বিষপ্রয়োগের একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগে দোষ স্বীকার না করেও দোষ মেনে নেওয়ার সমতুল্য আইনি আবেদন করেন। এর ফলে হত্যাচেষ্টার অভিযোগসহ আরেকটি বিষপ্রয়োগের অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।
সমঝোতা অনুযায়ী প্রথমে এক বছরের প্রবেশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের মার্চে সাজা ঘোষণার সময় বিচারক মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় সমঝোতাটিকে ‘অত্যন্ত উদার’ বলে মন্তব্য করেন এবং প্রবেশনের মেয়াদ বাড়িয়ে দুই বছর করেন। কারাগারে কাটানো সময়ের জন্যও ছাড় পান জু। ২০২৬ সালের মার্চে তাঁর প্রবেশনের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর তিনি আদালতে নিজের অপরাধের রেকর্ড বাতিলের আবেদন করেন।
৫০ বছর বয়সী রং ইউয়ানের কাছে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থা ইতিমধ্যে তাঁকে হতাশ করেছে। জনসমক্ষে ভিডিও প্রকাশ করাকে তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, যাতে ঘটনাটি সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে এবং মামলার পরিণতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
ইউয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয়। পরবর্তী দুই বছর ধরে তিনি বারবার বমি, বমি বমি ভাব, চুল পড়া এবং আরও নানা অজ্ঞাত শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। একাধিকবার হাসপাতালে যাওয়া এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার পরও অসুস্থতার কারণ শনাক্ত করা যাচ্ছিল না।
একপর্যায়ে নিজের কর্মস্থলে রাখা পানির বোতলে কেউ কিছু মেশাচ্ছে বলে সন্দেহ হয় তাঁর। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের কাজের জায়গার কাছে একটি গোপন ক্যামেরা স্থাপন করেন তিনি।
ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ভিডিওতে জুকে ইউয়ানের পানির বোতল রাখা জায়গার দিকে হাত বাড়াতে দেখা যায়। একই বছরের ৪ মার্চের আরেকটি ভিডিওতে একটি ছোট সাদা পাত্র থেকে বোতলে কোনো পদার্থ ঢালতে দেখা যায় তাঁকে বলে ইউয়ান দাবি করেছেন। পরে ভিডিওগুলো বার্কলি পুলিশকে দেন তিনি। এরপর তদন্ত শুরু হয়।
পরীক্ষাগারের নথি পর্যালোচনা করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউয়ানের পানীয় জলে ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। কোনো কোনো নমুনায় এর ঘনত্ব যুক্তরাষ্ট্রের পানীয় জলের জন্য নির্ধারিত ফেডারেল সীমার তুলনায় ৩৫ লাখ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। তদন্তকারীরা ইউয়ান এবং তাঁর মা-বাবার রক্তের নমুনাতেও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বছরের পরের দিকে জুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে মামলাটি নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর সময় লাগে। বিচারপ্রক্রিয়ার বেশির ভাগ সময় জু কারাগারের বাইরে ছিলেন। কিছু সময় তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির আওতায়ও থাকতে হয়েছিল।
সাজা ঘোষণার সময় আদালত জুকে ইউয়ান ও তাঁর মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ইউয়ানকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭ হাজার ৫৮ ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ইউয়ান প্রায় পাঁচ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন।
জুর পক্ষ থেকে জমা দেওয়া একটি বিষবিদ্যাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ক্যাডমিয়ামের সংস্পর্শে আসার কারণে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ইউয়ান ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন। তাঁর দাবি, বিষপ্রয়োগের প্রভাব এখনো তাঁর শরীরে রয়েছে এবং তিনি পূর্ণ সময় কাজ করতে পারছেন না।
এখন জুর অপরাধের রেকর্ড বাতিলের আবেদন নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইন অনুযায়ী, প্রবেশনের শর্ত সফলভাবে পূরণ করা যোগ্য ব্যক্তিরা আদালতে তাঁদের দণ্ড বাতিলের আবেদন করতে পারেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তে মূল আদালতের নথি মুছে যায় না এবং দণ্ডের সব পরিণতিও দূর হয় না। আলামেডা কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নির কার্যালয় জুর আবেদনটির বিরোধিতা করছে।
ইউয়ানের আশঙ্কা, দণ্ড বাতিল হলে ভবিষ্যতে চাকরিদাতাদের পক্ষে জুর অপরাধের ইতিহাস জানা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই তিনি গোপন ক্যামেরার ভিডিও প্রকাশ করে ঘটনার প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন।
মামলার তদন্তকারী বার্কলি পুলিশের সার্জেন্ট জেনিফার উইলসন জানিয়েছেন, ইউয়ানের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা প্রতিষ্ঠা করতে ভিডিও ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে, জু বা তাঁর আইনজীবী কেউই এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
জুর দণ্ড বাতিলের আবেদনের শুনানি সোমবার, ১২ অক্টোবর আলামেডা কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে হওয়ার কথা ছিল। তবে সোমবার রাত পর্যন্ত আদালত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট হয়নি।