লস এঞ্জেলেস

লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে কারেন বাসকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন নিত্যা রামন

লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে বর্তমান মেয়র কারেন বাসকে পরাজিত করেছেন সিটি কাউন্সিল সদস্য নিত্যা রামন। এনবিসি নিউজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরটির নেতৃত্বে আসছেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ৪৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটানো নিত্যা রামন নির্বাচনী প্রচারে শহরের দীর্ঘদিনের ব্যর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, নগর প্রশাসন আবাসন সংকট ও গৃহহীন মানুষের সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, পরাজিত কারেন বাস ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে পরিচিত মুখ। তিনি ছয়বারের সাবেক কংগ্রেস সদস্য। তবে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় একাধিক ইস্যুতে তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্যাসিফিক প্যালিসেডস এলাকায় ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই সময় তিনি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানায় একটি প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। দাবানলটি লস এঞ্জেলেসের ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হয়। এতে হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয় এবং ১২ জনের মৃত্যু ঘটে। নির্বাচনী প্রচারে রামন অভিযোগ করেন, গৃহহীন মানুষের সংকট এবং বাড়িভাড়াসহ আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাস প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, শহরটির এখন যে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন, সিটি হল তা বাস্তবায়নে অনীহা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, কারেন বাস দাবি করেছিলেন, সিটি কাউন্সিলে ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পরও রামন মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নন। দুই প্রার্থীর মধ্যে ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ নিয়েও স্পষ্ট মতপার্থক্য ছিল। নির্বাচনের আগে সেপ্টেম্বর মাসে ইহুদি ফেডারেশন লস এঞ্জেলেস আয়োজিত এক আলোচনায় রামন বামপন্থী অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার হাসান পাইকারের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। তবে কারেন বাস এই অভিযোগের সঙ্গে একমত হননি। রামনের এই জয় যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টদের প্রভাব বৃদ্ধির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং ওয়াশিংটন ডিসির মেয়র নির্বাচনে জয়ী জেনিস লুইস জর্জের সঙ্গে এবার একই রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের নেতৃত্বে থাকবেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিকরা। নির্বাচনী প্রচারে রামনের সঙ্গে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির প্রচারণার তুলনা করা হয়েছে। মামদানির মতো তিনিও পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তুষ্ট ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য হলেও নিজের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টি প্রচারে গুরুত্ব দিয়েছেন রামন। মজার বিষয় হলো, বছরের শুরুতে রামন নিজেই কারেন বাসকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। পরে শেষ মুহূর্তে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। গত ২ জুনের প্রাথমিক নির্বাচনে বাস ও রামন শীর্ষ দুটি অবস্থান অর্জন করে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওঠেন। তাঁদের পেছনে পড়েন সাবেক রিয়েলিটি টেলিভিশন তারকা স্পেন্সার প্র্যাট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশ করে শহরের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন তিনি। রামন আগে নগর পরিকল্পনাবিদ ও অধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ভারতের জন্ম নেওয়া রামন শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পরবর্তী সময়ে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়াশোনা করেন। বর্তমানে সিটি কাউন্সিলে তিনি এমন একটি এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন, যার মধ্যে সান ফার্নান্দো ভ্যালি থেকে সান্তা মনিকা পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল রয়েছে। নতুন মেয়র হিসেবে রামনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজন। এই আয়োজনের জন্য শহরের অবকাঠামো, গণপরিবহন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে আবাসন সংকট ও গৃহহীন মানুষের সমস্যার সমাধানেও তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে নজর থাকবে।