আমেরিকা

সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে গোপন তথ্য বিক্রি করা সিআইএ এজেন্ট অলড্রিচ এমসের মৃত্যু

সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তথ্য বিক্রি করে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর দ্বিমুখী গুপ্তচরদের একজন হিসেবে পরিচিত সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা অলড্রিচ এমস মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানায়, সোমবার মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের কাম্বারল্যান্ডে অবস্থিত ফেডারেল কারেকশনাল ইনস্টিটিউশন কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। এমস যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন, যেখানে প্যারোলের কোনো সুযোগ ছিল না। ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল অলড্রিচ এমসকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি আদালতে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে রাশিয়ার কাছে গোপন তথ্য বিক্রি করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডে ১০০টিরও বেশি গোপন অভিযান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পশ্চিমা গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করা ৩০ জনের বেশি গুপ্তচরের পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। এর ফলে অন্তত ১০ জন সিআইএ গোয়েন্দা নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। আর্থিক দেনা পরিশোধের জন্যই তিনি গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়ান বলে জানান এমস। ১৯৮৫ সালের এপ্রিলে তিনি প্রথমবারের মতো কেজিবিকে (সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা) সিআইএ গুপ্তচরদের নাম দেন এবং এর বিনিময়ে পান ৫০ হাজার ডলার। কেজিবির কাছে তাঁর কোডনাম ছিল “কলোকল” (ঘণ্টা)। পরবর্তীতে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে কর্মরত সিআইএর প্রায় সব গুপ্তচরের পরিচয় ফাঁস করেন। আদালতে দেওয়া আট পৃষ্ঠার এক বক্তব্যে এমস বলেন, “আমার জন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কেজিবি ২০ লাখ ডলার আলাদা করে রেখেছে—এটা জেনে আমি নিজেই বিস্মিত হয়েছিলাম।” নয় বছরের মধ্যে তিনি মোট প্রায় ২৫ লাখ ডলার গ্রহণ করেন। এই অর্থে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করেন—নতুন জাগুয়ার গাড়ি কেনেন, বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের একটি বাড়ি কেনেন, যদিও তাঁর বার্ষিক বেতন কখনোই ৭০ হাজার ডলারের বেশি ছিল না। অলড্রিচ এমসের সিআইএ ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৬২ সালে। তাঁর বাবা নিজেও সিআইএর বিশ্লেষক ছিলেন এবং কলেজ ছেড়ে দেওয়ার পর ছেলেকে সংস্থাটিতে চাকরি পেতে সহায়তা করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি সহকর্মী সিআইএ এজেন্ট ন্যান্সি সেগেবার্থকে বিয়ে করেন। পরে তাঁকে তুরস্কে পাঠানো হয় বিদেশি এজেন্ট নিয়োগের দায়িত্বে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর তাঁর মদ্যপানের সমস্যা প্রকট হয় এবং দাম্পত্য জীবন ভেঙে পড়ে। একাধিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পরও—যার মধ্যে সাবওয়েতে গোপন নথিভর্তি ব্রিফকেস ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ছিল—তাঁকে ১৯৮১ সালে মেক্সিকো সিটিতে পাঠানো হয়। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া দেল রোজারিও কাসাস ডুপুইর সঙ্গে। তিনি কলম্বিয়ান দূতাবাসের সাংস্কৃতিক অ্যাটাশে ছিলেন এবং একই সঙ্গে সিআইএর একটি সম্পদ (অ্যাসেট)। পরে তাঁকেও এমসের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে এমস সিআইএর সোভিয়েত পাল্টা-গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হন—যদিও তাঁর মদ্যপান নিয়ে উদ্বেগ তখনো ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে দেনা ও ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি দেশদ্রোহিতার পথে হাঁটেন। ২০১৫ সালে বিবিসির উইটনেস হিস্ট্রি অনুষ্ঠানে এফবিআই এজেন্ট লেসলি জি. ওয়াইজার বলেন, “এটা পুরোপুরি টাকার জন্যই ছিল। তিনি কখনোই এটাকে অন্য কোনো আদর্শিক বিষয় বলে দেখাতে চাননি।” ১৯৯৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ তদন্তের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার বিনিময়ে একটি চুক্তির আওতায় তাঁর স্ত্রী রোজারিও তুলনামূলক কম সাজা পান এবং পাঁচ বছর পর মুক্তি পান। তৎকালীন সিআইএ পরিচালক আর. জেমস উলসি এমসকে আখ্যা দেন “দেশের জন্য এক মারাত্মক বিশ্বাসঘাতক” হিসেবে। তিনি বলেন, “এজেন্টদের মৃত্যু হয়েছে, কারণ এক খুনি বিশ্বাসঘাতক বড় বাড়ি আর একটি জাগুয়ার চেয়েছিল।”

এলএবাংলাটাইমস/ওএম