ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র “খুব শক্ত” সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। টানা তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ৫০০ বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। তবে বিবিসিকে দেওয়া বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
রোববার ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে “খুব শক্ত বিকল্প” বিবেচনা করছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছেন। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, “একটি বৈঠকের আগেই আমাদের হয়তো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।”
ইরানের শীর্ষ নেতারা বিক্ষোভকারীদের “কয়েকজন দাঙ্গাবাজ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং সোমবার সরকারপন্থী সমাবেশে অংশ নিতে সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে, যাদের তারা “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতীয় যুদ্ধে নিহত শহীদ” বলে উল্লেখ করেছে। তেহরানের দাবি, এই দুই দেশই ইরানে অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার ভয়াবহ দরপতন থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বৈধতা নিয়েই বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
যদিও ট্রাম্প এখনো স্পষ্ট করেননি যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বা আলোচনার ধরন কী হবে। তবে তিনি বলেন, ইরানি নেতারা “আলোচনা করতে চান”, কারণ তারা “যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ক্লান্ত”।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসির সহযোগী সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পকে ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক হামলা ছাড়াও সরকারবিরোধী অনলাইন প্রচার জোরদার করা, সাইবার অস্ত্র ব্যবহার এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রয়েছে।
বিবিসির সূত্র জানায়, রোববার রাতে বিক্ষোভ চললেও আগের দিনের তুলনায় তা কিছুটা কম ছিল। কারণ, সরকার আরও কঠোর দমন-পীড়ন চালাতে পারে—এই আশঙ্কা বাড়ছে। HRANA-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে ১০,৬০০-এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
বিবিসি তেহরানের কাছে একটি মর্গ থেকে পাওয়া ভিডিওতে প্রায় ১৮০টি মরদেহের ব্যাগ গণনা করেছে। এক সূত্র রোববার জানান, তেহরানের রাস্তাঘাট “রক্তে ভরে গেছে”। তিনি বলেন, “ট্রাকে করে মরদেহ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বহু মরদেহ খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা। আশপাশে স্বজনদের খোঁজে কান্না ও চিৎকার শোনা যায়। জীবিত ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রাখতে এসব ভিডিও ঝাপসা করা হয়েছে, কারণ তারা আরও নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।
সূত্রগুলো জানায়, হাসপাতাল ও ফরেনসিক কেন্দ্রগুলোতে বিপুলসংখ্যক মরদেহ জমে আছে। কিছু মরদেহ ভোরের আগেই দ্রুত দাফন করা হয়েছে, যাতে সনাক্তকরণ সম্ভব না হয়। এছাড়া রাতের আঁধারে শহরের রাস্তা থেকে পোড়া গাড়ি, ধ্বংসাবশেষ ও রক্তের দাগ পরিষ্কার করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিক্ষোভকারী ও আবাসিক এলাকাগুলোর ওপর নজরদারির জন্য ড্রোন উড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
ইরানে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় সরাসরি প্রতিবেদন করা সম্ভব নয়। বৃহস্পতিবার থেকে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু মানুষ স্টারলিংক সংযোগ বা স্যাটেলাইট টিভির মাধ্যমে খবর পাচ্ছেন, তবে এসব ব্যবহারে নজরদারির আশঙ্কাও রয়েছে।
দক্ষিণ ইরানের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, “আমরা টেক্সট মেসেজও পাঠাতে পারছি না। শুধু সরকারই মানুষকে হুমকি দিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছে।”
রোববার ট্রাম্প জানান, তিনি স্পেসএক্সের মালিক ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলবেন, যাতে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখা যায়।
এই বিক্ষোভ ২০২২ সালের পর ইরানে সবচেয়ে বড় আন্দোলন। সে সময় নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল।
খামেনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পকে “খুশি করতে” চাইছে। অন্যদিকে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের “ঈশ্বরের শত্রু” হিসেবে গণ্য করা হবে—যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার যুক্তরাষ্ট্রকে “ভুল হিসাব না করার” আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি এবং নৌপথ বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
এদিকে, ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই বিক্ষোভ “ইরানি সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে”। তিনি বলেন, “জনগণের ওপর গুলি চালানো শক্তির নয়, বরং পতনের ভয় ও দ্রুত অবক্ষয়ের লক্ষণ।”
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম