আমেরিকা

ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে পারে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতির একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রাজ্যভিত্তিক সেইসব আইন বহাল রাখার পক্ষে ঝুঁকছেন, যেগুলো ট্রান্সজেন্ডার নারী ও কিশোরীদের নারী স্কুল ও কলেজ ক্রীড়ায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মঙ্গলবার শুনানিকালে আদালত দুটি অঙ্গরাজ্যের শিক্ষার্থীদের করা মামলার যুক্তি শুনেছে। এসব মামলায় সরকারি স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের ক্রীড়া দলগুলোকে জন্মের সময় নথিভুক্ত লিঙ্গের ভিত্তিতে নির্ধারণ করার আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আইডাহো অঙ্গরাজ্যে এক ট্রান্সজেন্ডার কলেজ শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, ওই নিষেধাজ্ঞা তার সাংবিধানিক সমঅধিকার লঙ্ঘন করছে। একইভাবে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার এক স্কুলছাত্রী অভিযোগ করেছেন, রাজ্যের আইনটি ফেডারেল নাগরিক অধিকার আইনের পরিপন্থী। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা শুনানিতে অন্তত পাঁচজন বিচারপতি নিষেধাজ্ঞাগুলো বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ৬–৩ ব্যবধানে রক্ষণশীল বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ২০২০ সালে আইডাহো যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে নারীদের ও কিশোরীদের খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে আইন পাস করে। বর্তমানে দুই ডজনেরও বেশি অঙ্গরাজ্যে একই ধরনের আইন কার্যকর রয়েছে। আইডাহোর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনকারী রাজ্যের সলিসিটর জেনারেল অ্যালান হার্স্ট বলেন, “আইডাহোর আইনটি লিঙ্গের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করে, কারণ খেলাধুলায় লিঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। এটি শারীরিক আকার, পেশির ভর, হাড়ের ঘনত্ব এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের সক্ষমতার মতো নানা ক্রীড়াগত সুবিধার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।” রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানফ বলেন, “আমাদের পুরো দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যখন অর্ধেক রাজ্য ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণের অনুমতি দিচ্ছে আর অর্ধেক দিচ্ছে না, তখন অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের মধ্যে কেন আমরা তড়িঘড়ি করে বিষয়টিকে সাংবিধানিক রূপ দিতে যাব?” সুপ্রিম কোর্টে রিপাবলিকান-নিযুক্ত ছয়জন রক্ষণশীল বিচারপতির উপস্থিতির কারণে আদালতের তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি এবং দুই ক্রীড়াবিদের আইনজীবীরা তুলনামূলক সীমিত রায়ের পক্ষে—বা কোনো রায় না দেওয়ার পক্ষেই—যুক্তি দেন। আইডাহোর মামলার বাদী লিন্ডসি হেকক্স, যিনি বোইসি স্টেট ইউনিভার্সিটির চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী, ইতোমধ্যে জানিয়েছেন যে তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয়-সমর্থিত খেলাধুলায় অংশ নিতে চান না এবং মামলাটি প্রত্যাহারের চেষ্টা করেছেন। এ কারণে বিচারপতি কাটাঞ্জি ব্রাউন জ্যাকসন বারবার প্রশ্ন তোলেন—এই মামলাটি কেন খারিজ করা হয়নি। হেকক্সের আইনজীবী ক্যাথলিন হার্টনেট বলেন, যদি আদালত মামলার মূল বিষয়ের ওপর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে টেস্টোস্টেরন দমনকারী ওষুধ গ্রহণকারী ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে পার্থক্য টানা উচিত। বিচারপতি কাভানফের এক প্রশ্নের জবাবে হার্টনেট বলেন, তিনি এমন কোনো ব্যক্তিকে নারী ক্রীড়ায় অংশগ্রহণের অনুমতি চাচ্ছেন না, যাদের “অন্যায্য জৈবিক সুবিধা” রয়েছে।

তিনি বলেন, “এতে নারীদের জন্য আলাদা ক্রীড়ার মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যাবে—যার লক্ষ্য ছিল নারীদের বিকাশ, শক্তিশালী হওয়া ও বিজয়ের সুযোগ দেওয়া।” তবে যদি লিঙ্গভিত্তিক শারীরিক সুবিধা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাহলে ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন। এক্ষেত্রে প্রমাণ দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট ক্রীড়াবিদদেরই থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উভয় পক্ষের আইনজীবীরাই আদালতে জানান, এই মামলাগুলোর আওতায় পড়া ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মামলায় বাদী বেকি পেপার-জ্যাকসনই একমাত্র শিক্ষার্থী, যিনি এই সুবিধা চাইছেন। তার বয়স যখন ১১ বছর, তখন ২০২১ সালে তার বাবা-মা মামলা দায়ের করেন, যাতে তিনি স্কুলের মেয়েদের ট্র্যাক দলে যোগ দিতে পারেন। শুনানিতে বিচারপতি নীল গরসুচ প্রশ্ন তোলেন—ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের ইতিহাস কি এমন যে তাদের জন্য বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রয়োজন? এর জবাবে আইডাহোর আইনজীবী হার্স্ট বলেন, যদিও “উল্লেখযোগ্য বৈষম্য” ছিল, তবে তা সাধারণভাবে প্রযোজ্য আইনের মাধ্যমে ঘটেছে, যেমন ক্রস-ড্রেসিং নিষিদ্ধকরণ। তিনি আরও বলেন, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা আফ্রিকান-আমেরিকান বা নারীদের মতো নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হননি—যাদের ভোটাধিকার বা সম্পত্তির অধিকার দীর্ঘদিন আইনেই অস্বীকার করা হয়েছিল। নিউইয়র্ক টাইমস ও ইপসোসের চলতি বছরের জানুয়ারির এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় সব রিপাবলিকান এবং প্রায় ১০ জন ডেমোক্র্যাটের মধ্যে সাতজন নারী ক্রীড়ায় ট্রান্সজেন্ডার নারীদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মিতভাবে নারী ক্রীড়ায় ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের বিষয়টি তুলে ধরেন। হোয়াইট হাউসে ফিরে তিনি ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা বাতিল, সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার এবং রাজ্য ও ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে নারী বিভাগে তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে চাপ দেওয়ার পদক্ষেপ নেন। গত বছর আদালতের ছয় রক্ষণশীল বিচারপতি টেনেসির একটি আইন বহাল রাখেন, যেখানে কিশোরদের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তন সংক্রান্ত চিকিৎসা নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও ওই রায়ে সরাসরি ট্রান্সজেন্ডার বৈষম্যের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি, তবে অনেক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন—এটি বর্তমান ক্রীড়া-সংক্রান্ত মামলার সম্ভাব্য রায়ের ইঙ্গিত দেয়। আগামী জুনে এই মামলাগুলোর রায় ঘোষণা করা হতে পারে। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ক্যালিফোর্নিয়ার ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া নীতির বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যা বিষয়টিকে আবারও সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যেতে পারে।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম