যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিরুদ্ধে ফেডারেল অভিবাসন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সমন (সাবপোনা) জারি করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা রাজ্যে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের কাজ ব্যাহত করতে ষড়যন্ত্র করেছেন।
সমন পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ, রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসন এবং মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি তীব্র বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে মিনেসোটা সফর করার সময় এসব আইনি নোটিশ জারি করা হয়।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কর্মকর্তার গুলিতে বিক্ষোভকারী ৩৭ বছর বয়সী রেনে গুড নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি “ভীষণভাবে দুঃখিত”। তিনি ঘটনাটিকে “একটি ট্র্যাজেডি” বলে উল্লেখ করেন। তবে গভর্নর ওয়ালজ এই তদন্তকে “দলীয় রাজনীতির বিভ্রান্তি” আখ্যা দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগ গুডের হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে আগ্রহী নয়—এই মৃত্যুই রাজ্যে অস্থিরতার সূচনা করেছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধের কারণেই বিচার বিভাগ তাকে নিশানা করছে। অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসন অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে বিচার বিভাগ এ বিষয়ে বিবিসির মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
কিথ এলিসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ফেডারেল অভিবাসন কার্যক্রম সংক্রান্ত তার দপ্তরের কাজের নথি ও দলিল চেয়ে তাকে গ্র্যান্ড জুরির সমন পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “পুরো বিষয়টি অত্যন্ত অনিয়মিত, বিশেষ করে যখন আমার দপ্তর সম্প্রতি মিনেসোটায় ট্রাম্প প্রশাসনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।”
মিনিয়াপোলিস সিটি হলের এক মুখপাত্র বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে মেয়র জ্যাকব ফ্রের দপ্তরও সমন পেয়েছে। ফ্রে এক বিবৃতিতে বলেন, “যখন ফেডারেল সরকার তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে স্থানীয় নেতাদের ভয় দেখাতে চায়, তখন প্রতিটি মার্কিন নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। আমাদের এমন দেশে বাস করা উচিত নয়, যেখানে মানুষ ভীত থাকে যে ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে।”
এছাড়া সেন্ট পল শহরের মেয়র কাওহলি হার এবং হেনেপিন কাউন্টির কৌঁসুলি মেরি মোরিয়ার্টিকেও সমন পাঠানো হয়েছে।
রোববার অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি হুঁশিয়ারি দেন, আইসিইবিরোধী বিক্ষোভের সময় একটি গির্জায় হামলার ঘটনার পর রাজ্য নেতারা যদি “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা” না নেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীরা “উপাসনালয় অপবিত্র” করেছে এবং এ ঘটনায় সম্ভাব্য নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করা হবে।
মিনিয়াপোলিসে চলতি মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমন অভিযানের অংশ হিসেবে আইসিই কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর থেকেই রাজ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ফেডারেল কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সেখানে “সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধীদের” লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছেন। তবে ৭ জানুয়ারি আইসিই এক কর্মকর্তার গুলিতে রেনে গুড নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, আইসিই কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত নারী কোনো হুমকি সৃষ্টি করেননি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিনেসোটায় প্রায় ৩,০০০ ফেডারেল কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে এবং আরও ১,৫০০ সেনা প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’-এর আওতায় গত ছয় সপ্তাহে তারা প্রায় ৩,০০০ “সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধীকে” গ্রেপ্তার করেছে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে মিনিয়াপোলিস–সেন্ট পল (টুইন সিটিজ) এলাকার কর্মকর্তারা ফেডারেল এজেন্টদের বিরুদ্ধে বর্ণভিত্তিক হয়রানির অভিযোগ তোলেন। তারা জানান, দায়িত্বের বাইরে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদেরও থামিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হয়েছে। ব্রুকলিন পার্ক পুলিশের প্রধান মার্ক ব্রুলি বলেন, “এই প্রত্যেক ব্যক্তি রঙিন ত্বকের মানুষ।”
গভর্নর ওয়ালজ ও মেয়র ফ্রে আইসিইকে এলাকা ছাড়ার দাবি জানিয়েছেন এবং রাজ্য সরকার ফেডারেল অভিবাসন এজেন্ট মোতায়েন ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। গত সপ্তাহে মিনেসোটায় বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের এক রাতের পর ট্রাম্প বিরলভাবে ব্যবহৃত ‘ইনসারেকশন অ্যাক্ট’ প্রয়োগের সম্ভাবনার কথাও উত্থাপন করেন।
এই অস্থিরতা শুরু হয়, যখন তিন ভেনেজুয়েলান অভিবাসীর হাতে একটি বেলচা দিয়ে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগে এক এজেন্ট একজনকে পায়ে গুলি করেন।
মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রেনে গুডের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং জানান, গুডের বাবা-মা ট্রাম্প সমর্থক—এ কথা জেনে তিনি আশা করেন, তারা ভবিষ্যতেও তাকে ভোট দেবেন। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের কড়া সমালোচনা করে তাদের “পেশাদার উসকানিদাতা” বলে আখ্যা দেন।
ট্রাম্প বারবার মিনেসোটায় আইসিই অভিযানের সঙ্গে রাজ্যের বড় সোমালি সম্প্রদায়ের সদস্যদের জড়িত কথিত জালিয়াতি মামলার যোগসূত্র টেনেছেন। মঙ্গলবার তিনি সোমালিয়াকে “একটি পশ্চাৎপদ দেশ, সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ দেশ” বলেও মন্তব্য করেন, যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম