আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর, যুদ্ধ বন্ধের পথে দুই দেশ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যার লক্ষ্য চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। চুক্তির আওতায় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এ বিষয়ে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা উভয় পক্ষের সম্মতিতে আরও বাড়ানো যেতে পারে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে সহায়তা করবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে তেহরান নিশ্চিত করেছে। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের অবিশ্বাস এখনো দূর হয়নি এবং প্রয়োজনে দেশটি আবারও শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার দাবি করা হয়। এরপর সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হয়। শান্তি চুক্তি ঘোষণার পর তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। বৃহস্পতিবার এশিয়ার প্রাথমিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৮.৭৯ ডলারে নেমে আসে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় দাম এখনো প্রায় ৮ ডলার বেশি। চুক্তি অনুযায়ী, ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে পাতলা বা কম সমৃদ্ধ করা হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আগের দাবি ছিল এই উপাদান সম্পূর্ণভাবে ইরানের বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে আগামী ৬০ দিন কোনো ফি নেওয়া হবে না। তবে ভবিষ্যতে ফি আরোপের সম্ভাবনা খোলা রাখা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে প্রণালী আর ফিরবে না এবং ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ওপর চার্জ আরোপ করা হতে পারে। চুক্তির প্রথম ধারায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হলেও ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করেনি। বুধবারও দেশটি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। এদিকে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের অনেক আইনপ্রণেতাই এর সমালোচনা করেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি একে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে সিনেটর টেড ক্রুজ ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ঘোষিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন বলেন, এই চুক্তি ইরানের আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান করতে পারেনি। তার মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিল, এই চুক্তি তার অনেকগুলোই পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।   এলএবাংলাটাইমস/ওএম