আমেরিকা

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার মধ্যে স্থগিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা

লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার সরাসরি আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর পিছিয়ে দেওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত আসে। হোয়াইট হাউস বৃহস্পতিবার রাতে জানায়, ভ্যান্স আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন না। তারা বলেছে, আলোচনার আয়োজন ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি “সহজ বা পূর্বানুমানযোগ্য” ছিল না। এর একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। চুক্তিতে লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের চার সেনা নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইসরায়েল। হোয়াইট হাউসের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ লেবানিজ গণমাধ্যম জানিয়েছিল, চলমান ইসরায়েলি বিমান হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। তবে শুক্রবার পরে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, লেবাননে সংঘর্ষ বন্ধে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, “আমরা এখন যুদ্ধবিরতির মধ্যে আছি। প্রয়োজন হলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আবারও লড়াই চালাতে প্রস্তুত।” যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে এই সপ্তাহে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নিয়ে প্রযুক্তিগত আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। চুক্তিতে সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করা এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, পরবর্তী আলোচনার সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে যত দ্রুত সম্ভব প্রযুক্তিগত আলোচনা শুরু করার আশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করেছে যে বুর্গেনস্টক রিসোর্টে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে, যদিও প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। চুক্তিটির ১৪টি মূল ধারা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন অঙ্গীকার, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। চুক্তি অনুযায়ী, উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, যদিও পারস্পরিক সম্মতিতে সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে ভিন্নমত থাকলেও তিনি চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন। তার দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “চরম চাপ প্রয়োগ করে” এই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে, তবে তা প্রতিপক্ষের অবস্থান মেনে নেওয়ার সমান নয়। অন্যদিকে ট্রাম্প শুক্রবার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা হতাশা থেকে আলোচনায় বসিনি, ইরান বসেছে। তারা শেষ হয়ে গেছে।” যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও চুক্তি প্রকাশের পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যায়। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রাতভর চালানো বোমাবর্ষণ ছিল চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। চার ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, “পুরো লেবাননকে জ্বলে উঠতে হবে।” এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের সমালোচনা করে বলেন, ইসরায়েলের উচিত “বাস্তবতা উপলব্ধি করা।” ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পরই লেবানন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা চালায়। এরপর ইসরায়েল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে এবং দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশে সামরিক অভিযান চালায়। লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৩ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একই সময়ে সীমান্তের দুই পাশে অন্তত ৩০ জন সেনা ও ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম