আমেরিকা

পুলিশের গুলিতে ১ বছরের শিশুর মৃত্যু, উত্তপ্ত মিসিসিপির ছোট শহর

মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর সেনাটোবিয়াতে পুলিশি গুলিতে এক বছরের এক শিশুর মৃত্যু ঘিরে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় শহরটির কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

নিহত শিশুটির নাম কোহেন ওয়াইলি। গত রোববার একটি ওয়ালমার্ট দোকানে চুরির অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ গুলি চালায়। ওই সময় কোহেন তার মা এবং মায়ের এক বন্ধুর সঙ্গে একটি গাড়িতে ছিল।

মিসিসিপি ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এমবিআই) তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ দোকান থেকে বের হওয়া দুই নারী ও এক শিশুকে দেখতে পায়। তারা গাড়িতে উঠে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ গাড়িটি থামাতে চায়। তদন্ত সংস্থার দাবি, গাড়িটি পুলিশের দিকে এগিয়ে আসছিল এবং প্রায় একজন কর্মকর্তাকে ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল। তখন এক পুলিশ সদস্য গুলি চালান।

তবে কোহেনের মা ভেলেসিয়া ওয়াইলি পুলিশের এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, গাড়িটি পুলিশের দিকে যাচ্ছিল না। তার দাবি, পুলিশ সদস্যরা রাস্তার ডান পাশে ছিলেন, আর গাড়িটি বাম দিকে এগোচ্ছিল।

তিনি আরও বলেন, যেসব ডায়াপার চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর দাম তার বন্ধুই পরিশোধ করেছিলেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ান অ্যাডামস বলেন, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, চলন্ত গাড়ির দিকে গুলি চালানো উচিত হয়নি।

তার ভাষায়, “আধুনিক পুলিশি নীতিতে চলন্ত গাড়িতে গুলি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই তা এড়িয়ে চলতে বলা হয়। কারণ গাড়ির ভেতরে অন্য যাত্রীও থাকতে পারে, যেমনটি এই ঘটনায় ছিল।”

বর্ণবৈষম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক

কোহেন, তার মা এবং তার মায়ের বন্ধু—তিনজনই কৃষ্ণাঙ্গ। ফলে ঘটনাটি দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে পুলিশি সহিংসতা নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

অনেকের মনে পড়েছে ২০২৩ সালের তাকিয়া ইয়াং হত্যার ঘটনা। ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দোকান থেকে চুরির অভিযোগের তদন্তে গিয়ে পুলিশ গুলি চালালে গর্ভবতী তাকিয়া ইয়াং ও তার অনাগত কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়।

এ ধরনের ঘটনার তালিকায় রয়েছে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডও। ২০২০ সালে মিনিয়াপোলিসে একটি দোকানে জাল ২০ ডলারের নোট ব্যবহারের অভিযোগে আটক হওয়ার পর পুলিশের হাতে নিহত হন তিনি। তার মৃত্যু বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র-এর কন্যা বার্নিস কিং সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “দোকানের পণ্যের চেয়ে একটি শিশুর জীবনের মূল্য কম হতে পারে না। এটি শুধু খারাপ পুলিশি আচরণ নয়, এটি নৈতিকতারও বড় ব্যর্থতা।”

দীর্ঘদিনের ক্ষোভ

স্থানীয় অধিকারকর্মী সংগঠন বিল্ডিং ব্রিজেস কোয়ালিশন-এর প্রতিষ্ঠাতা মারকুয়েল ব্রিজেস বলেন, কোহেনের মৃত্যু বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, গত বছর একই ওয়ালমার্টের পার্কিং লটে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী ব্রেশারি ফকনারকে পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে পুলিশ টেজার ব্যবহারের হুমকি দেয়, গাড়ি থেকে টেনে নামায় এবং গ্রেপ্তার করে।

এর আগে ২০২৩ সালে এক কৃষ্ণাঙ্গ ১০ বছর বয়সী শিশুকে পার্কিং লটে প্রস্রাব করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে ওই শিশুর পরিবার শহর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলায় ক্ষতিপূরণ পায়।

সেনাটোবিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ৩০০। এর প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ। তবে শহরের মেয়র এবং বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি শ্বেতাঙ্গ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬০ সালে শহরটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন।

তদন্ত চলছে

ঘটনার পর গুলি চালানো পুলিশ কর্মকর্তা এবং গাড়ি চালানো নারীকে সাময়িক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এমবিআই ঘটনার তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হলে গুলির ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

কোহেনের দাদি ভেরোনিকা রবারসন বলেন, তার নাতি ছিল খুবই হাসিখুশি ও স্নেহশীল একটি শিশু।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ওর হাসিটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসিগুলোর একটি। সে আমাকে খুব ভালোবাসত, আমিও তাকে ভালোবাসতাম।”

কোহেনের প্রিয় খেলনাগুলোর মধ্যে ছিল একটি ছোট খেলনা লনমাওয়ার, যেটি ঠেলে নিয়ে গেলে বুদবুদ তৈরি হতো। রবারসন প্রায়ই তার সঙ্গে বাইরে বসে খেলতেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “সে ভাবত সত্যিই আমার উঠানের ঘাস কাটছে। শিশুটি ছিল আমার পুরো পৃথিবী।”

এলএবাংলাটাইমস/ওএম