কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলের কারণে দেশটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। এতে বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বেড়েছে।
কানাডিয়ান ইন্টারএজেন্সি ফরেস্ট ফায়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৮৮৮টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি আগুন অন্টারিও প্রদেশে, যার বেশিরভাগই এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যেও অন্তত ১৫টি দাবানল জ্বলছে এবং সেখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
উত্তর অন্টারিওর দুর্গম এলাকায় অবস্থিত নামায়গুসিসাগাগুন ফার্স্ট নেশন আদিবাসী সম্প্রদায়ের পুরো বসতি আগুনে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে বাসিন্দাদের ছোট নৌকায় করে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হয়েছে। যদিও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন মাসের শেষ দিকে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং উচ্চচাপ বলয়ের (হিট ডোম) প্রভাবে এ বছরের দাবানল আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া বনাঞ্চলকে দ্রুত দাহ্য করে তুলেছে, ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
দাবানলের ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে ভেসে অন্টারিও থেকে টরন্টো, নিউইয়র্ক, বোস্টনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেট্রয়েট, শিকাগো, ওয়াশিংটন ডিসি ও নিউইয়র্কে বায়ুদূষণ বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, দাবানলের ধোঁয়ায় থাকা অতিক্ষুদ্র দূষিত কণা (পিএম ২.৫) ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও চোখের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং জরুরি সেবাকর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মানুষকে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার, জানালা বন্ধ রাখার এবং প্রয়োজন হলে এন–৯৫ মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বিভিন্ন শহরে বিনামূল্যে মাস্কও বিতরণ করা হচ্ছে।
এদিকে, দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, কানাডার বন ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি কানাডার ওপর নতুন শুল্ক আরোপেরও হুমকি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা দুই দেশেরই যৌথ দায়িত্ব। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডও যুক্তরাষ্ট্রকে সমালোচনা না করে দাবানল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের দাবানল ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সহায়তা করেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবানলের ধোঁয়ার জন্য শুধু কানাডাকে দায়ী করা ঠিক নয়। কারণ ধোঁয়া বাতাসের গতিপথ অনুসরণ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের দাবানলের ধোঁয়া কানাডায় পৌঁছেছিল।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে ধোঁয়া ভার্জিনিয়া ও নর্থ ক্যারোলিনার দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সপ্তাহান্তে বৃষ্টিপাত ও বাতাসের দিক পরিবর্তনের ফলে কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, জুলাই ও আগস্টজুড়েই কানাডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, অন্টারিও ও কুইবেকে দাবানলের ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ হেক্টর এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৮৩ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় দাবানলগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম