যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সাময়িকভাবে সব অভিবাসী ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। নতুন একটি ‘পাবলিক চার্জ’ বা সরকারি সুবিধার ওপর সম্ভাব্য নির্ভরশীলতা যাচাই নীতি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত কনস্যুলার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নীতির লক্ষ্য হলো এমন ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকানো, যারা ভবিষ্যতে সরকারি তহবিল বা বিভিন্ন সরকারি সুবিধার ওপর বোঝা হয়ে উঠতে পারেন বলে বিবেচিত হবেন।
এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন আশ্রয়ের আবেদন করা বিদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ দুই লাখ মানুষের ব্যবসা ও পর্যটন ভিসা বাতিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একক সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ভিসা বাতিলের ঘটনা হতে পারে। তবে এ পদক্ষেপ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক অভিবাসন নীতি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক জুলিয়া গেলাট বলেন, এসব পদক্ষেপের মূল দর্শন হলো অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর এবং ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন উপায়ে দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থা আরও কঠোর করে কম মানুষকে প্রবেশের সুযোগ দিতে চাইছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিবাসী ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্তটি মূলত ‘পাবলিক চার্জ’ সংক্রান্ত নতুন নিয়ম নিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত কনস্যুলার কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন থাকায় তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, আগস্টের শুরুতে এই স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়েছে এবং এটি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের বেশি স্থায়ী হওয়ার কথা নয়। আগস্টে যাদের ভিসা সাক্ষাৎকার নির্ধারিত ছিল, তাদের সাক্ষাৎকার বাতিল করা হয়নি; বরং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরে নতুন তারিখে তা নির্ধারণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে অভিবাসী ভিসার জন্য আবেদনকারীরা এ সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হতে পারেন। বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকদের বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং ভাইবোনের পারিবারিক ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আবেদনকারীদের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে যেসব কর্মী নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপের মাধ্যমে অভিবাসী ভিসার জন্য আবেদন করছেন, তারা সাধারণত এ স্থগিতাদেশের আওতায় পড়ছেন না। কারণ, তারা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আয়ের সক্ষমতা দেখাতে পারেন এবং সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকি কম বলে বিবেচিত হন।
জুলিয়া গেলাট বলেন, ভিসা সাক্ষাৎকারের নতুন তারিখ পাওয়া সহজ নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের সময়সূচি পাওয়া কঠিন হওয়ায় পুনরায় তারিখ নির্ধারণ আবেদনকারীদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
এর আগে জানুয়ারি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ৭৫টি দেশের অভিবাসীদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ রাখার একটি নীতি কার্যকর ছিল। পরে একটি আদালত সেই নীতি বাতিল করে দেয়।
অন্যদিকে, ‘পাবলিক চার্জ’ নীতি আরও কঠোর করার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা বা ইউএসসিআইএস এমন একটি নিয়ম পুনরায় চালু করেছে, যার অধীনে ফুড স্ট্যাম্প, মেডিকেইড এবং আবাসন ভাউচারের মতো সরকারি সুবিধা গ্রহণকারী অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইস্যু করা বি-১ ব্যবসা এবং বি-২ পর্যটন ভিসাধারীদের মধ্যে যারা আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা বর্তমানে আশ্রয়ের আবেদন করছেন, তাদের ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা করছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি এবং দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, তাদের জন্য ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। কারণ, আশ্রয়ের আবেদন জমা দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি মূলত সেই আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, পর্যটন বা ব্যবসা ভিসার ওপর নয়।
জুলিয়া গেলাটের মতে, এ পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে একটি বার্তা দেওয়া—যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে কেউ যেন পর্যটন ভিসায় এসে পরে আশ্রয়ের আবেদন করার কথা না ভাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি হতে অনেক বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, পর্যটন ও ব্যবসা ভিসায় সাধারণত প্রায় ছয় মাস থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে কেউ আশ্রয়ের আবেদন করলে তার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান নির্ভর করে চলমান আশ্রয় মামলার ওপর।
পর্যটন বা ব্যবসা ভিসার আবেদনকারীদের দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করতে হয় যে, নির্ধারিত সময় শেষে তারা নিজ দেশে ফিরে যাবেন। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে তাদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।
আশ্রয় ব্যবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রেই অপব্যবহার করা হচ্ছে—ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের এমন বিশ্বাসের সঙ্গেও নতুন ভিসা বাতিলের পরিকল্পনার মিল রয়েছে।
মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সোমবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ভুয়া আশ্রয় আবেদনে বিরক্ত। তাঁর ভাষায়, অভিবাসন আইন এড়িয়ে যাওয়ার পথ হিসেবে আশ্রয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার কথা নয়।
গত এপ্রিলেও ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, যেসব ভিসা আবেদনকারী নিজ দেশে ফিরে যেতে ভয় পাওয়ার কথা উল্লেখ করবেন, তাদের ভিসা আবেদন কনস্যুলেটগুলো প্রত্যাখ্যান করবে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম