আমেরিকা

জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও উত্তপ্ত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর শনিবারের হামলা-পাল্টা হামলা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে দুটি ট্যাংকারকে ‘স্থায়ীভাবে অচল’ করে দেওয়া হয়েছে। আর তৃতীয় একটি ট্যাংকারকে ওমান উপসাগরে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও মার্কিন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরান একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছিল। তবে মার্কিন বাহিনী সেগুলো সফলভাবে এড়িয়ে যায় এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানের তেলবাহী জাহাজে হামলার বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান যদি মার্কিন জাহাজে হামলা করে, তাহলে আমরা তাদের তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস ও ডুবিয়ে দেব।’ মার্কিন সেন্টকমের দাবি, তারা যে তিনটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা করেছে, সেগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে ব্যবহৃত ‘বহু বিলিয়ন ডলারের ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরিব জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছে মার্কিন হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল এই দ্বীপেই অবস্থিত। দেশটির অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। ওমান উপসাগরে হামলার শিকার দুটি ট্যাংকারের নাবিকদের লাইফবোটের মাধ্যমে তীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরিব। তাদের একজন খালি ছিল, অন্যটিতে তেল ছিল বলে জানানো হয়েছে। পরে ইরিব জানায়, আইআরজিসি ওই অঞ্চলে আরও ছয়টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজ ছিল। ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচল করছিল। একই সঙ্গে ওই পথে চলাচল না করতে অন্য জাহাজগুলোকেও সতর্ক করেছে তেহরান। বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য দাবি করছে, প্রণালিটি ‘খোলা’ রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী ওমানের দিকের দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা শুরু করে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা ঠেকাতে তারা দুটি রকেট লঞ্চারে হামলা চালিয়েছিল। এরপর মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও একটি ‘খুব বড় হামলা’র কথা জানান। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানেও হামলার ঘটনা ঘটে। এদিকে, দক্ষিণ ইরানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার দাবি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে বলে ইরান দাবি করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও ঘটনাটি তদন্তের কথা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে। তবে নতুন করে কূটনৈতিক সমঝোতার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করলে নতুন করে যুদ্ধের সূচনা হয়। জবাবে ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে কার্যত জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হতো। প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এদিকে, যুদ্ধের ব্যয় এবং জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপরও চাপ বাড়ছে। শুক্রবার দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ৭১ ডলার।