আমেরিকা

ক্যালিফোর্নিয়ার মৃত গাছগুলো কোথায় যাচ্ছে, রহস্য খুঁজতে গোয়েন্দার ভূমিকায় পরিবেশকর্মী

ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার বন থেকে দাবানলে পুড়ে যাওয়া হাজার হাজার মৃত গাছ কেটে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গাছগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এসব গাছের কাঠের টুকরো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পুড়িয়ে ফেলা হতে পারে। এতে বায়ুদূষণ বাড়ার পাশাপাশি বনের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে ট্রাকের পিছু নিয়ে মাঠে নেমেছেন বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মী মায়া খোসলা। তবে তাঁর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা তাঁর প্রাথমিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২০২০ সালে সিকোইয়া ন্যাশনাল ফরেস্টে ছড়িয়ে পড়া ক্যাসল দাবানলে বিস্তীর্ণ এলাকার গাছ পুড়ে যায়। আগুনের পর পাহাড়ের ঢালে অসংখ্য মৃত গাছ দাঁড়িয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগ এসব গাছের বড় অংশ সরানোর উদ্যোগ নেয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, মৃত গাছ ভবিষ্যতে ভয়াবহ দাবানলের জ্বালানি হয়ে উঠতে পারে এবং নতুন গাছ লাগানোর কাজেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু খোসলা ও তাঁর সঙ্গে কাজ করা পরিবেশকর্মীদের মতে, মৃত গাছ সরিয়ে ফেললে বনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়। এসব গাছের কাণ্ড ও গর্তে বিভিন্ন পাখি এবং বন্যপ্রাণী আশ্রয় নেয়। গাছের অবশিষ্টাংশ মাটিতে পচে পুষ্টি সরবরাহ করে, যা নতুন বন গড়ে ওঠার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। খোসলা মনে করেন, নির্বিচারে এসব গাছ সরিয়ে ফেলা বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ক্ষতি হতে পারে। এ নিয়ে খোসলা ও তাঁর সংগঠন সিকোইয়া ফরেস্টকিপারসহ আরও দুটি পরিবেশবাদী সংগঠন গত সেপ্টেম্বরে ফেডারেল আদালতে মামলা করে। তাঁদের অভিযোগ, বন থেকে মৃত গাছ সরানোর কার্যক্রমের ফলে তিনটি বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার স্পটেড আউল, সাউদার্ন সিয়েরা নেভাডা ফিশার এবং ক্যালিফোর্নিয়া কনডর। খোসলার অনুসন্ধানের শুরু ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যাঞ্চলের ম্যাকফারল্যান্ড শহরের কাছে একটি কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা থেকে। সেখানে হাজার হাজার পোড়া গাছের গুঁড়ি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। যন্ত্রের সাহায্যে গাছগুলো ছোট ছোট কাঠের টুকরোয় পরিণত করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা তাঁকে জানান, এসব কাঠের চিপস বাগান ও ভূদৃশ্য সাজানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ কাঠ শুধু এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল খোসলার। একদিন তিনি কাঠের চিপস বোঝাই একটি ট্রাকের পিছু নেন। ট্রাকটি বিভিন্ন সড়ক পেরিয়ে শিল্পাঞ্চলের দিকে চলে যায়। প্রথমে তিনি ধারণা করেছিলেন, কাঠের টুকরোগুলো দিয়ে বোর্ড তৈরির কোনো কারখানায় নেওয়া হচ্ছে। পরে অবশ্য সেই ধারণার পক্ষে প্রমাণ পাননি। পরবর্তী অনুসন্ধানে তিনি আরেকটি ট্রাককে অনুসরণ করে একটি দুগ্ধ খামারের পাশের মাঠে পৌঁছান। সেখানে কাঠের চিপস দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরনের পরিশোধনব্যবস্থা। বায়োফিল্ট্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাঠের টুকরোর বিছানায় লাল কেঁচো ব্যবহার করে খামারের বর্জ্যপানি পরিশোধন করে। এতে পানি পুনরায় ব্যবহার করা যায় এবং সময়ের সঙ্গে কাঠের টুকরো ও কেঁচোর বর্জ্য মাটির উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়। এই ব্যবহার দেখে খোসলা স্বীকার করেন, অন্তত এই ক্ষেত্রে কাঠের চিপস সরাসরি পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে না। বরং এগুলো একটি কার্যকর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বন থেকে সরানো মোট গাছের কত অংশ এভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। খোসলা আরও কয়েকটি ট্রাকের গন্তব্য অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। একটি ট্রাকের চালক জানান, সেটি নেভাডায় যাচ্ছে। কিন্তু ট্রাকটি ঠিক কোথায় কাঠ পৌঁছে দেবে, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ম্যাকফারল্যান্ডের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ডেভিড মিটেলস্টাডট জানান, তাঁদের উৎপাদিত কাঠের চিপসের একটি অংশ যৌগিক উপাদান দিয়ে তৈরি ডেকিং পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বায়োমাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাঠ সরবরাহ করছে না। তবে খোসলা মনে করেন, পুরো সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন। বায়োমাস জ্বালানি বলতে কাঠ, কৃষিবর্জ্য ও অন্যান্য জৈব উপাদান পুড়িয়ে বিদ্যুৎ বা তাপ উৎপাদনকে বোঝায়। ক্যালিফোর্নিয়ায় একসময় এ ধরনের প্রায় ৬০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু ছিল। আশির দশকে এসব কেন্দ্র রাজ্যের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৯ শতাংশ উৎপাদন করত। পরে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সরকারি ভর্তুকি কমে যাওয়া এবং দূষণ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের কারণে শিল্পটি সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে এ ধরনের প্রায় ২০টি কেন্দ্র চালু রয়েছে। বায়োমাস শিল্পের সমর্থকদের দাবি, কাঠ ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে এসব উপাদান খোলা জায়গায় পোড়ানো বা ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন কমে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, কাঠ পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হয়। নতুন গাছ বেড়ে উঠে সেই কার্বন শোষণ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে বায়োমাসকে সব পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব বা কার্বন-নিরপেক্ষ বলা যায় না। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম সম্প্রতি এমন একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে বন থেকে পাওয়া জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। এতে রাজ্যে বায়োমাস বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখা ও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এতে বন থেকে আরও বেশি মৃত গাছ সরিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। দুই দিন অনুসন্ধান করেও খোসলা সব ট্রাকের চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করতে পারেননি। তাঁর হাতে পাওয়া তথ্য থেকে বোঝা যায়, কাঠের চিপস বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে; কিন্তু কতটা কাঠ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তাঁর অনুসন্ধান তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—দাবানলের ঝুঁকি কমানোর নামে বন থেকে সরানো মৃত গাছগুলো কি সত্যিই পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, নাকি সেগুলোর কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে? এর উত্তর জানতে সরবরাহব্যবস্থার আরও স্বচ্ছতা ও স্বাধীন অনুসন্ধান প্রয়োজন।