লস এঞ্জেলেস

টানা ৯০০ মাইল সাঁতরে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল পাড়ি, প্রথম নারী হিসেবে রেকর্ড গড়লেন তিনি

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ৯০০ মাইল দীর্ঘ প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল সাঁতরে পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন ৩৩ বছর বয়সী ক্যাথরিন ব্রিড। গত ১ জুলাই অঙ্গরাজ্যটির উত্তর সীমান্তে ওরেগনের কাছ থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই কঠিন অভিযান শেষ হয় ১৯ অক্টোবর। ১১১ দিনের যাত্রায় তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার পুরো উপকূল বরাবর সাঁতরে মেক্সিকো সীমান্তের কাছে পৌঁছান। পুরো উপকূলের দৈর্ঘ্য সাঁতরে অতিক্রম করা প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি নতুন নজির গড়েছেন। তবে এই অর্জন শুধু দূরত্বের রেকর্ড নয়। ব্রিডের লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো, পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা এবং নারী ও কিশোরীদের দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে উৎসাহিত করা। তিনি চেয়েছেন, মানুষ যেন সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি এর পরিবেশগত সংকট সম্পর্কেও সচেতন হয়। যাত্রার শুরুতে পরিকল্পনা ছিল প্রতিদিন নির্দিষ্ট দূরত্ব সাঁতরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়ার। সাধারণত তিনি দিনে প্রায় ১০ মাইল সাঁতার কাটতেন। পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত পানিতে থাকতে হতো তাঁকে। একটি ৫২ ফুট দীর্ঘ পালতোলা নৌকায় তাঁর সহায়তাকারী দল সঙ্গে থাকত। প্রতিদিনের সাঁতার শেষে জিপিএসের মাধ্যমে অবস্থান চিহ্নিত করা হতো, যাতে পরদিন ঠিক সেই জায়গা থেকে আবার যাত্রা শুরু করা যায়। এভাবে প্রতিটি অংশ যুক্ত করে পুরো উপকূল অতিক্রমের চেষ্টা করেন তিনি। এই অভিযানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমুদ্রের পরিবর্তনশীল অবস্থা। চলতি বছরের এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা, স্রোত ও ঢেউয়ের ধরনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একের পর এক গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ও হারিকেন। ফলে ব্রিডের দলকে বারবার পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে। কোনো কোনো অংশে দক্ষিণমুখী স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার ঝুঁকি না নিয়ে তাঁরা উল্টো দিকে, অর্থাৎ উত্তরমুখী হয়ে নির্দিষ্ট অংশ অতিক্রম করেন। সমুদ্রের পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে যাত্রার সময়সূচিও বদলাতে হয়েছে। উপকূলের কাছাকাছি সাঁতার কাটার সময় সামুদ্রিক প্রাণী ও মানুষের তৈরি নানা বাধার দিকেও নজর রাখতে হয়েছে। হাঙরের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ব্রিডের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর দল দূর থেকে কয়েকবার হাঙরের পাখনা দেখতে পেয়েছিল। সেগুলো সাঁতারের পথে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং সমুদ্রের স্রোত, আবহাওয়া ও ঢেউ সামলানোই ছিল বেশি কঠিন। কোথাও কোথাও প্রায় সাত ফুট উঁচু ঢেউয়ের মধ্যে সাঁতার কাটতে হয়েছে। ব্রিডের কাছে এমন পরিস্থিতি ছিল যেন ঢেউয়ের মধ্যে ওয়াশিং মেশিনে ঘুরছেন। অভিযানের শেষ পর্যায়েও দেখা দেয় নতুন সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের কাছে টিজুয়ানা নদী থেকে সমুদ্রে মিশে যাওয়া দূষিত পানির কারণে উপকূলের কিছু অংশে পানির মান নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তাই ব্রিড উপকূল থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে থেকেই সাঁতারের শেষ অংশ সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯ অক্টোবর সান দিয়েগোর করোনাডো সৈকতে তাঁর অভিযান শেষ হওয়ার উদ্‌যাপন করা হয়। দীর্ঘ ১১১ দিনের যাত্রা শেষ করে তিনি স্বস্তি ও আনন্দের কথা জানান। ব্রিডের সমুদ্রযাত্রার প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। ক্যালিফোর্নিয়ার প্লিজ্যান্টনে বেড়ে ওঠা ব্রিড ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে পড়াশোনা করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঁতার দলে ছিলেন। হাঁটুর চোট তাঁর প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারের পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করলেও পরে তিনি উন্মুক্ত সমুদ্রে দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারে মনোযোগ দেন। এর আগে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া এবং লেক তাহো ও ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে দীর্ঘ দূরত্ব সাঁতারের মতো চ্যালেঞ্জও সম্পন্ন করেছেন তিনি। এই অভিযানের পরিকল্পনা করতে ব্রিড ও তাঁর দল প্রায় তিন বছর সময় নিয়েছেন। তিনি নিজের এই অর্জনের মাধ্যমে সমুদ্র সংরক্ষণে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে চান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংস্থা ‘সি ড্রিমার্স’ নারী ও মেয়েদের উন্মুক্ত পানিতে সাঁতারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সমুদ্র রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে। ব্রিডের মতে, এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে নয়, বরং তার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই এগোতে হয়। তাঁর এই অভিযান অন্যদেরও কঠিন লক্ষ্য অর্জনে সাহস জোগাবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে সবার জন্য ৯০০ মাইল সাঁতারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়া জরুরি নয়। ব্রিডের পরামর্শ, যে যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেভাবেই সমুদ্রের কাছে যাওয়া এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা উচিত।