যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার অভিযোগে কানাডার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ওয়াশিংটন। কানাডায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির কয়েকজন রাজনীতিকের বক্তব্য ও বিভিন্ন পদক্ষেপকে মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে কানাডার সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যবিরোধের মধ্যেই নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক তথ্যপত্রে মার্কিন দূতাবাস কানাডার পাল্টা শুল্কনীতি, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার মন্ত্রীদের বৈঠক এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে নিয়ে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনকে গুরুত্ব দিয়েছে। দূতাবাসের দাবি, কানাডার মন্ত্রী ও প্রাদেশিক নেতারা প্রকাশ্যে এমন কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যা মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ লড়াই অপেক্ষা করছে। নির্বাচনের আগে কানাডার কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের জবাবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করেছিল। জোলির আগের কিছু বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে চাপ তৈরির কৌশলের কথা উঠে এসেছিল। মার্কিন দূতাবাস এসব বক্তব্যকে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ও শিকাগোতে ডেমোক্র্যাট নেতাদের সঙ্গে জোলির বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দূতাবাস। এসব বৈঠকের উদ্দেশ্য এবং মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্যিক স্বার্থের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বক্তব্যকে সন্দেহের চোখে দেখছে ওয়াশিংটন।
তবে জোলি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের রাজনীতিকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য কানাডায় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। কানাডা কখনো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।
অন্টারিও প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ডের কর্মকাণ্ডও মার্কিন দূতাবাসের নজরে এসেছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করে গত বছর তাঁর সরকার একটি বিজ্ঞাপন প্রচার চালায়। এতে ১৯৮৭ সালে দেওয়া রিগ্যানের একটি বেতার ভাষণের অংশ ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে শুল্কের সমালোচনা এবং মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে বক্তব্য ছিল। ওই বিজ্ঞাপন প্রচারের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেন ট্রাম্প।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগের জবাবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম কানাডার বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এরপর কানাডা যা করেছে, তার লক্ষ্য ছিল দেশটির শ্রমিক, পরিবার ও অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষা করা। ফোর্ডও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার কোনো আগ্রহ তাঁর নেই।
মার্কিন দূতাবাসের তথ্যপত্রে আরও ১১ জন কানাডীয় নাগরিকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগে মামলা বা সাজা হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কানাডা সরকারের কোনো সমন্বিত উদ্যোগের যোগসূত্র তুলে ধরা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত কানাডীয় রাজনীতিকদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোকস্ট্রাও এর আগে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কানাডার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছেন। কোনো পদক্ষেপ নির্বাচনে হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া জানাবে।
দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নানা কারণে চাপে পড়েছে। শুল্ক নিয়ে বিরোধ, বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে।
নতুন অভিযোগের ক্ষেত্রে মার্কিন দূতাবাস কানাডার কিছু বক্তব্য ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপকে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেও, সেগুলো কীভাবে সরাসরি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের শামিল, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে তুলে ধরা হয়নি। ফলে অভিযোগ ও কানাডার পাল্টা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।