যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বয়স্ক নেতাদের আধিপত্য ক্রমেই বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে শুরু করে কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের সদস্যদের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্যদিকে, তরুণ প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থের প্রভাব, অভিজ্ঞ নেতাদের শক্ত অবস্থান, ভোটারদের বয়সের পার্থক্য এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রবীণদের আধিপত্য টিকে রয়েছে।
৮৮ বছর বয়সী রিপাবলিকান নেতা হাল রজার্স এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কেনটাকির পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ১৯৮১ সাল থেকে প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০২৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে এটি হবে তাঁর ২৪তম মেয়াদ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে এমন প্রার্থীও রয়েছেন, যিনি তাঁর চেয়ে ৬০ বছরের ছোট।
এ ছাড়া ৯৩ বছর বয়সী সিনেটর চাক গ্রাসলি এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বয়স ৮০ বছর। তাঁর পূর্বসূরি বাইডেন ৮২ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়েছেন। সাবেক প্রতিনিধি পরিষদ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিও ৮২ বছর বয়সে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বয়স্ক নেতাদের আধিপত্যকে প্রায়ই ‘জেরন্টোক্রেসি’ বলা হয়। এর অর্থ এমন শাসনব্যবস্থা, যেখানে প্রবীণ ব্যক্তিদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে। তুলনামূলকভাবে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ৪৫ বছরের কম বয়সীদের অনুপাতও কম।
নির্বাচনী অর্থের প্রভাব
তরুণ প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো নির্বাচনী প্রচারণার অর্থ। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের পরিচিতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দাতাদের সমর্থন থাকায় তাঁরা সহজেই অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। নতুন প্রার্থীদের জন্য সেই সুযোগ তৈরি করা কঠিন।
২৭ বছর বয়সী রিপাবলিকান প্রার্থী রাইলি ওয়েন এ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের একটি নতুন নির্বাচনী আসন থেকে প্রতিনিধি পরিষদে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর প্রচারণায় মাতৃত্বকালীন বেতনসহ ছুটি, কংগ্রেস সদস্যদের শেয়ার লেনদেনে বিধিনিষেধ এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
কিন্তু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ৫১ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট নেতা বেন ম্যাকঅ্যাডামস নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে অনেক এগিয়ে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ম্যাকঅ্যাডামসের প্রচারণায় ২৬ লাখ ডলারের বেশি জমা পড়েছিল। বিপরীতে, ওয়েন সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন মাত্র দেড় লাখ ডলার।
ওয়েনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসে থাকা রাজনীতিকেরা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তি ও সমসাময়িক সামাজিক সমস্যাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে তরুণদের বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
ভোটারদের বয়সও গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রবীণদের আধিপত্যের আরেকটি কারণ ভোটারদের অংশগ্রহণের ধরন। বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে নির্বাচনে তাঁদের পছন্দ ও অগ্রাধিকার রাজনীতিকদের সিদ্ধান্তে বেশি গুরুত্ব পায়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনে ভোট না দেওয়া ব্যক্তিদের ২৫ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। ২০২৪ সালে এই অনুপাত বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ ছিলেন ৩০ বছরের কম বয়সী। কিন্তু প্রকৃত ভোটদাতাদের মধ্যে তাঁদের অংশ ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।
তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ কম থাকলে তাঁদের অগ্রাধিকার—যেমন জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, পরিবেশ ও কর্মসংস্থান—রাজনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে, বয়স্ক ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে আগ্রহী রাজনীতিকেরা তাঁদের প্রত্যাশাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।
অভিজ্ঞতা নাকি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা
দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকা মানেই যে একজন নেতা পরিবর্তনের বিরোধী, তা নয়। ৮৫ বছর বয়সী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের উদাহরণ দিয়ে অনেকে দেখান, প্রবীণ রাজনীতিকেরাও নতুন ধারণা গ্রহণ করতে পারেন এবং তরুণ প্রজন্মের সমর্থন পেতে পারেন।
তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে কোনো কোনো নেতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রচলিত চিন্তাধারার সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যে নতুন ধারণাকে সহজে গ্রহণ করতে চান না। এতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান বাধাগ্রস্ত হয়।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি তরুণ নেতৃত্বের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ৩৪ বছর বয়সে তিনি নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁর প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর এবং সিনেটর হওয়ার ক্ষেত্রে ৩০ বছর নির্ধারণ করা আছে। তবে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। ফলে একজন রাজনীতিক শারীরিক ও মানসিকভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম থাকলে এবং নির্বাচনে জয়ী হলে দীর্ঘদিন পদে থাকতে পারেন।
প্রবীণ নেতাদের স্বাস্থ্য ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাবেক সিনেট রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেলের দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসা নিয়ে নানা প্রশ্ন সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। তবে শুধু বয়সের ভিত্তিতে কোনো নেতার সক্ষমতা বিচার করা উচিত কি না, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বয়স্ক নেতাদের আধিপত্যের পেছনে শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং নির্বাচনী অর্থ, ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোগত সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তরুণদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ বাড়াতে হলে নির্বাচনী অর্থের অসমতা কমানো, নতুন প্রার্থীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং নেতৃত্বে প্রজন্মগত বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।