আমেরিকা

১৬০ বছরের ঐতিহ্যে ইতি টানছে নিউইয়র্ক, নিরাপত্তা ও প্রাণী নির্যাতনের উদ্বেগে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ

নিউইয়র্ক শহরে ১৬০ বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি কাউন্সিল। জননিরাপত্তা, ঘোড়ার প্রতি নিষ্ঠুরতার অভিযোগ এবং একাধিক দুর্ঘটনার উদ্বেগ থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে সেন্ট্রাল পার্কের অন্যতম পরিচিত পর্যটন আকর্ষণের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ২০২৮ সালের ১ জুন থেকে শহরে ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে এ-সংক্রান্ত আইনটি ৪০-৭ ভোটে পাস হয়। দুই সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। নতুন আইন অনুযায়ী, ঘোড়ার গাড়ির নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ হবে এবং বর্তমানে চালু থাকা গাড়িগুলোর কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুটিয়ে নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রথা বন্ধের পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ঘোরার অভিজ্ঞতা বহু বছর ধরে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। তবে পার্কে মানুষের ভিড়, সাইকেল চলাচল এবং অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ব্যস্ত নগরীর শব্দ, যানবাহনের ধোঁয়া, গরম আবহাওয়া ও শক্ত পিচঢালা রাস্তায় চলাচল ঘোড়াগুলোর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ বছরের জুনে ভারতীয় পর্যটক ১৮ বছর বয়সী রোমাঞ্চ মহাজনের মৃত্যুর পর নিষেধাজ্ঞার দাবি আরও জোরালো হয়। সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ার সময় ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারালে তিনি গাড়ি থেকে ছিটকে পড়েন এবং মারা যান। এর আগে একই এলাকায় ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারানো, গাড়ির সংঘর্ষ এবং ঘোড়ার অসুস্থ হয়ে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সেন্ট্রাল পার্ক কনজারভেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়ার গাড়ি বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, প্রতিবছর চার কোটির বেশি মানুষের যাতায়াত করা একটি ব্যস্ত পার্কে ঘোড়ার গাড়ি চলাচল জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ঘোড়াগুলোকে অনুপযুক্ত পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করার পরিবর্তে নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তিও রয়েছে। ঘোড়ার গাড়িচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন আইনটির বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। তাদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা বহু মানুষের জীবিকা ও পারিবারিক ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। কর্মীদের ক্ষতি কমাতে নতুন আইনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর আওতায় গাড়িচালকদের নতুন চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, কর্মজীবনবিষয়ক পরামর্শ এবং অন্যান্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঘোড়াগুলোকে নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনটিতে ঘোড়াগুলোকে জবাইয়ের জন্য বিক্রি নিষিদ্ধ করার বিধানও রয়েছে। নিউইয়র্কের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শহরের দীর্ঘদিনের একটি পর্যটন ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছে। সমর্থকেরা একে জননিরাপত্তা ও প্রাণীকল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বিরোধীদের আশঙ্কা, ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা সুরক্ষার বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।