যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে, বেকারত্বের হারও তুলনামূলক কম এবং শেয়ারবাজার রয়েছে রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি। তারপরও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে অসন্তুষ্ট সাধারণ মানুষ। ফলে অর্থনীতির ইতিবাচক পরিসংখ্যান দিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে হিমশিম খাচ্ছে হোয়াইট হাউস।
এই পরিস্থিতি অনেকটা সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শেষ সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বাইডেন প্রশাসন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য তুলে ধরেছিল। কিন্তু অনেক ভোটারের কাছে এসব পরিসংখ্যানের চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এবার একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি ট্রাম্প। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় ফিরেই দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে স্থিতিশীলতা থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে রয়েছে, যা অনেক উন্নত অর্থনীতির তুলনায় সম্মানজনক। দেশটির বেকারত্বের হারও ৪ দশমিক ২ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু এসব তথ্য সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপের পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
সাম্প্রতিক হিসাবে, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ভোক্তামূল্য বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ায় অনেক কর্মজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়া মানেই পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ হলো, পণ্যের দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ভিন্ন। তাঁরা চান, মুদি দোকান, সুপারমার্কেট, জ্বালানি স্টেশন এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমুক।
ডেমোক্র্যাট দলের অভিজ্ঞ নির্বাচনী জরিপ বিশ্লেষক সেলিন্ডা লেকের মতে, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ ভোটার একই শব্দ ব্যবহার করলেও অনেক সময় তাঁদের বোঝার মধ্যে পার্থক্য থাকে। অর্থনীতিবিদেরা মূল্যস্ফীতি কমার কথা বললে সাধারণ মানুষ অনেক সময় পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা করেন। বাস্তবে তা সব সময় ঘটে না।
লেকের মতে, অর্থনীতি নিয়ে মানুষের ধারণা তৈরি হয় তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের চেয়ে মাস শেষে বিল পরিশোধ, বাজার করা এবং পরিবারের খরচ সামলানোর অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়।
ট্রাম্পের নীতিতে বাড়তি চাপ
বাইডেনের সময় মূল্যস্ফীতির পেছনে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভূমিকা ছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তাঁর প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও বর্তমান মূল্যচাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন কিছু অর্থনীতিবিদ।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ পিটার মরিচির মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও যুদ্ধের প্রভাব মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর বক্তব্য, এসব নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণ মানুষও অনুভব করছেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন ‘লিবারেশন ডে’ নামে পরিচিত উদ্যোগের আওতায় বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব শুল্কের কারণে ভোক্তাপণ্যের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
পরে ট্রাম্প প্রশাসন কিছু শুল্ক স্থগিত করে, নতুন বাণিজ্যচুক্তি করে এবং সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তের ফলে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে আরোপ করা অনেক শুল্ক বাধার মুখে পড়ে। তবে এর আগেই আমদানি ব্যয়ের ওপর শুল্কের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
এরপর ইরানকে ঘিরে সংঘাত জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পেট্রলের খরচও বাড়ে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর বাজেটে। বিশেষ করে গাড়ির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়া সামগ্রিক জীবনযাত্রার খরচকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে।
ভোটারদের মন জয় করতে নতুন উদ্যোগ
হোয়াইট হাউস অবশ্য বলছে, করছাড়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে পাওয়া ওষুধের ব্যয় কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে প্রশাসন মার্কিন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াচ্ছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরাও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে তাঁর নীতির পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।
তবে সাধারণ মানুষের আর্থিক উদ্বেগ কমাতে প্রশাসন আরও কিছু পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে। ট্রাম্প ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারের ওপর সর্বোচ্চ সীমা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি, কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কদের ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার ধারণাও সামনে এনেছেন।
এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর। তবে এই উদ্যোগগুলো থেকে বোঝা যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ রাজনৈতিক আলোচনায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির ইতিবাচক পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি আনতে পারছে কি না। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের তথ্য অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা বোঝাতে সাহায্য করে, কিন্তু ভোটারদের ব্যক্তিগত আর্থিক অভিজ্ঞতা সব সময় সেই চিত্রের সঙ্গে মেলে না।
বাইডেন প্রশাসনও এই ব্যবধান দূর করতে পারেনি। এখন ট্রাম্পের সামনে একই চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দাবি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কতটা কমানো যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন।