পরিবেশ

৬০ লাখ ডলারে বিক্রির অপেক্ষায় বিরল ডাইনোসরের কঙ্কাল, জনসমক্ষে দেখা যাবে কি ভবিষ্যতে

টি-রেক্সের ছোট বয়সের নমুনা বলে একসময় ভুল করা বিরল এক ডাইনোসরের কঙ্কাল এবার নিলামে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। ‘জোডি’ নামে পরিচিত প্রায় ১০ ফুট উঁচু কঙ্কালটির প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে ৬০ লাখ ডলার। নিলামে এর দাম ৯০ লাখ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিলাম আয়োজন করছে সোথেবি’স। মঙ্গলবার কঙ্কালটি বিক্রির কথা রয়েছে। প্রায় ১৯ কোটি বছর নয়, বরং প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করা এই মাংসাশী ডাইনোসরটি ‘ন্যানোটাইর‍্যানাস’ প্রজাতির। এর অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটে গত বছর গবেষণার মাধ্যমে। ফলে প্রজাতিটি স্বীকৃতি পাওয়ার পর বাজারে আসা প্রথম নমুনা হিসেবে কঙ্কালটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সোথেবি’সের তথ্য অনুযায়ী, কঙ্কালটিতে জীবাশ্মে পরিণত হওয়া প্রায় ১৯১টি হাড়ের অংশ রয়েছে। এর মাথার খুলিটিও প্রায় সম্পূর্ণ এবং ভালোভাবে সংরক্ষিত। নিলাম আয়োজকদের দাবি, বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচিত ন্যানোটাইর‍্যানাসের কঙ্কাল রয়েছে মাত্র তিনটি। সেই হিসেবে ‘জোডি’ জীবাশ্ম সংগ্রাহক ও ডাইনোসর গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি নমুনা। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে লন্ডনের ফ্রিজ মাস্টার্স আন্তর্জাতিক শিল্পমেলায় কঙ্কালটি প্রদর্শন করা হয়েছিল। তখন এটিকে কিশোর বয়সের টাইর‍্যানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্সের কঙ্কাল হিসেবে পরিচয় করানো হয়। পরবর্তী গবেষণায় ন্যানোটাইর‍্যানাসকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যে কঙ্কালটি আবিষ্কার করেন জোডি পিয়ারসন নামের এক খামারি। নিজের জমিতে হ্যাল ক্রিক ফরমেশনে তিনি এটি খুঁজে পান। এলাকাটি জীবাশ্ম গবেষণার জন্য সুপরিচিত। পরে বাণিজ্যিক জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞ ক্লেটন ফিপস কঙ্কালটি খনন করে উদ্ধার করেন। ফিপস এর আগে ‘ডুয়েলিং ডাইনোসরস’ নামে পরিচিত আরেকটি বিখ্যাত জীবাশ্মও আবিষ্কার করেছিলেন। ২০০৬ সালে ‘জোডি’র সন্ধানস্থল থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে সেটি পাওয়া যায়। ওই জীবাশ্মে ন্যানোটাইর‍্যানাস ও ট্রাইসেরাটপসের অবশেষ পাশাপাশি রয়েছে, যা দেখে মনে হয়েছিল তারা সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। ন্যানোটাইর‍্যানাসকে টি-রেক্স থেকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করার গবেষণায় ‘ডুয়েলিং ডাইনোসরস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষক লিন্ডসে জান্নো ও জেমস নাপোলির প্রকাশিত গবেষণার মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে চলা বিতর্কের অবসান ঘটে। এতদিন বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করতেন, ন্যানোটাইর‍্যানাস আসলে কিশোর বয়সের টি-রেক্স, আলাদা কোনো প্রজাতি নয়। যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ মেগান জেনকিনস বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, ন্যানোটাইর‍্যানাসকে দীর্ঘদিন টি-রেক্সের কিশোর নমুনা বলে মনে করা হতো। তবে এটি আকারে অনেক ছোট এবং গড়নে বেশি সরু ও হালকা। মাংস কাটার উপযোগী ধারালো দাঁতও ছিল এর। টি-রেক্স ও ন্যানোটাইর‍্যানাস একই ভূতাত্ত্বিক সময়ে, প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত। তবে কঙ্কালটির নিলামকে ঘিরে জীবাশ্ম সংরক্ষণ ও গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের আশঙ্কা, বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিরল জীবাশ্ম ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেলে গবেষক ও সাধারণ মানুষের জন্য সেগুলো দেখা এবং পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এর আগে জুলাইয়ে ‘গাস’ নামে পরিচিত একটি টি-রেক্সের কঙ্কাল ৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। সেটি ছিল ওই সময়ের নিলাম-ইতিহাসে টি-রেক্সের কঙ্কাল বিক্রির রেকর্ড মূল্য। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ স্টিভ ব্রুসাটে ওই বিক্রি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মতে, এত উচ্চমূল্যের জীবাশ্ম কেনার সামর্থ্য অধিকাংশ জাদুঘর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। তাঁর আশঙ্কা, ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের হাতে চলে গেলে গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে। এতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জনশিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ‘জোডি’র নিলাম নিয়েও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রুসাটে। তাঁর মতে, ন্যানোটাইর‍্যানাসকে স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এখনো খুব বেশি সময় পেরোয়নি। অথচ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কঙ্কাল সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি হতে যাচ্ছে। সেটি কোনো জাদুঘরে প্রদর্শনের বদলে ব্যক্তিগত সংগ্রহের গুদামে চলে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। অন্যদিকে, মেগান জেনকিনস মনে করেন, বিষয়টির দুটি দিক রয়েছে। জীবাশ্ম খুঁজে বের করা, খনন করা এবং সংরক্ষণের পেছনে অনেক সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়। তাই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিদের উচ্চমূল্যে জীবাশ্ম বিক্রি করতে চাওয়ার বিষয়টিও তিনি অযৌক্তিক মনে করেন না। তাঁর আশা, এ ধরনের অনেক জীবাশ্ম শেষ পর্যন্ত জাদুঘরে স্থান পাবে এবং সাধারণ মানুষও সেগুলো দেখার সুযোগ পাবে। বিরল ডাইনোসরের কঙ্কালটি শেষ পর্যন্ত কে কিনবেন এবং ভবিষ্যতে এটি জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। নিলামের ফলাফল শুধু জীবাশ্মটির ভবিষ্যৎ নয়, মূল্যবান বৈজ্ঞানিক নিদর্শন ব্যক্তিগত মালিকানায় বিক্রি করার সীমা নিয়েও চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করতে পারে।