যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত শুরু করার পরিকল্পনা করছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ট্রাম্পের পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, ইরান যুদ্ধ পরিচালনা, অভিবাসন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তৃতীয়বার অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর সম্ভাবনা—সবই রয়েছে আলোচনায়।
নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে কীভাবে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তদন্তের জন্য সাক্ষী তলব, নথিপত্র চাওয়া এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের সুযোগ পাবে দলটি।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, ডেমোক্র্যাটদের কর্মীরা সম্ভাব্য তদন্তের বিষয় ও সাক্ষীদের একটি তালিকা তৈরি করতে শুরু করেছেন। আগামী বছরের শুরুতেই এসব তদন্তের কিছু শুরু হতে পারে।
১. ট্রাম্পের পরিবার ও ব্যবসায়িক লেনদেন
ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এবং বিভিন্ন লাভজনক চুক্তি।
ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ও প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির সদস্য সুহাস সুব্রামানিয়াম বিবিসিকে বলেন, করদাতাদের অর্থ যেন সঠিকভাবে ব্যয় হয় এবং দুর্নীতির মাধ্যমে কেউ তা আত্মসাৎ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে চান তাঁরা।
সম্ভাব্য তদন্তের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক, বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনারের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এ ছাড়া কাতারের উপহার দেওয়া প্রায় ৪০ কোটি ডলারের বিমান, যা এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে, সেটিও তদন্তের সম্ভাব্য বিষয়। ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের পাওয়া কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তিও খতিয়ে দেখতে পারেন আইনপ্রণেতারা।
সুব্রামানিয়াম বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা, মন্ত্রিসভার সদস্য, এমনকি প্রেসিডেন্ট ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত ও দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে চালানোর বিষয়টিও উদ্বেগজনক।
তবে হোয়াইট হাউস বারবার সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা এবং পরিবারের ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতি আরও এগিয়ে নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, ডেমোক্র্যাটদের আমেরিকানদের জীবনমান উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনা নেই; বরং তারা ট্রাম্পের নীতিকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলতে চায়।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, কংগ্রেসে যে দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকুক, প্রশাসন তদারকি সংক্রান্ত অনুরোধের জবাব দিতে প্রস্তুত।
২. হেগসেথ ও পেন্টাগনের ভূমিকা
ইরানের সঙ্গে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা তদন্ত করতে চান ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।
তদন্তে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা, অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি, যুদ্ধের ব্যয় এবং সেনা ও সামরিক স্থাপনাগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হতে পারে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে চালানো হামলাগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। প্রশাসনের দাবি, এসব অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
এপ্রিলে প্রতিনিধি পরিষদের একদল ডেমোক্র্যাট হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব জমা দেন। ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ‘গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণের’ অভিযোগ আনা হয়।
প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অভিশংসন অনুমোদন করা সম্ভব। তবে পদ থেকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এভাবে এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রিসভার সদস্যকে পদচ্যুত করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের শুনানিতে হেগসেথের বিরুদ্ধে নেতিবাচক তথ্য প্রকাশ পেলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বরখাস্ত করা হতে পারে, অথবা তিনি পদত্যাগ করতে পারেন।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক ডেভিড মিলার বলেন, শুনানির কারণে হোয়াইট হাউসের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচার বাড়লে ট্রাম্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। এতে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিকভাবে লাভ হতে পারে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের হোয়াইট হাউসের নৈতিকতা বিষয়ক প্রধান আইনজীবী রিচার্ড পেইন্টার বলেন, যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনপ্রণেতাদের সামনে হাজির করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে পেন্টাগনের প্রেস সচিব কিংসলে উইলসন হেগসেথের ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়েছেন, উদ্ভাবন বাড়িয়েছেন এবং সামরিক বাহিনীর জন্য কাজ করেছেন।
৩. অভিবাসন অভিযান ও আইসিইর ভূমিকা
অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিষয়টিও ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়াসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির নেতৃত্ব পেলে দেশজুড়ে অভিবাসন অভিযানে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করা হতে পারে।
তবে এ ধরনের তদন্ত রাজনৈতিকভাবে জটিল হতে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই বার্তা তাঁর অনেক সমর্থকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পকে সমর্থন করা অনেক ভোটারসহ যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দেশটির বিভিন্ন শহরে আইসিইর অভিযান পরিচালনার কিছু কৌশল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন।
রিচার্ড পেইন্টারের মতে, ডেমোক্র্যাটদের আইসিইর কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করার পাশাপাশি অভিবাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় তাঁদের অবস্থান ভোটারদের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারে।
৪. ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বার অভিশংসনের উদ্যোগ
ট্রাম্পকে তৃতীয়বার অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো কয়েকজন নেতা অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরান যুদ্ধ শুরু করা এবং অন্যান্য অভিযোগ অভিশংসনযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে দলের কিছু নেতা সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পক্ষে। তাঁদের যুক্তি, সিনেটে ট্রাম্পকে পদ থেকে সরানোর মতো পর্যাপ্ত ভোট পাওয়া কঠিন। এ ছাড়া অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য কোন অভিযোগকে ভিত্তি করা হবে, তা নিয়েও ঐকমত্য নেই।
ট্রাম্প অবশ্য সব ধরনের অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অক্টোবরে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি চাইলে যা খুশি করতে পারি।’ নিজের প্রথম মেয়াদে অভিশংসন প্রচেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া ফৌজদারি মামলাগুলোকে তিনি ‘অত্যন্ত বেআইনি কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন।
প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান তদারকি কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার জুনে ওয়াশিংটন সানকে বলেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা একটিমাত্র কৌশলের ওপর নির্ভরশীল এবং তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে চাইবে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্তের পরিণতি কী হবে, তা নিশ্চিত নয়। প্রশাসন তদন্তে সহযোগিতা না করলে বা সিনেটে রাজনৈতিক সমর্থন না মিললে বড় কোনো ফল নাও আসতে পারে।
সুব্রামানিয়াম বলেন, তদন্ত সফল হবে কি না বা প্রশাসন বাধা দেবে কি না—এসব আশঙ্কায় কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া আরও ক্ষতিকর হবে। তাঁর মতে, এর প্রভাব শুধু আগামী দুই বছর নয়, পরবর্তী দুই দশকেও পড়তে পারে।
কংগ্রেসের নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহির চাপ বাড়াতে চায়। তবে তদন্তগুলো কতদূর এগোবে এবং সেগুলো থেকে কী ধরনের রাজনৈতিক বা আইনি পরিণতি আসবে, তা নির্ভর করবে কংগ্রেসের ভেতরের ঐকমত্য ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
সূত্র: বিবিসি