লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে নাটকীয় পালাবদল ঘটেছে। ভোট গণনা চলার মধ্যে বর্তমান মেয়র কারেন বাসকে পেছনে ফেলে ব্যবধান বাড়িয়ে এগিয়ে গেছেন সিটি কাউন্সিল সদস্য নিথিয়া রমন।
মঙ্গলবারের নির্বাচনের পর ভোট গণনা অব্যাহত রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রমন পেয়েছেন ৪ লাখ ৫ হাজার ১৯৩ ভোট। অন্যদিকে বাসের ভোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৬৯। দুই প্রার্থীর ব্যবধান ২৬ হাজার ১২৪ ভোট।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রাথমিক ফলাফলে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন বাস। তবে রাতভর নতুন ব্যালট গণনার পর সেই ব্যবধান উল্টে যায় এবং রমন এগিয়ে যান।
এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। লস এঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন কর্তৃপক্ষ বাকি ব্যালট গণনা ও যাচাই করছে। তবে ডেসিশন ডেক্স এইচকিউসহ অন্তত একটি নির্বাচন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান রমনকে বিজয়ী হিসেবে পূর্বাভাস দিয়েছে।
ভোট গণনায় রমনের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ডেমোক্র্যাটিক পরামর্শক পল মিচেল মনে করেন, নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রার্থী বাসের জয় ধরে রাখতে মঙ্গলবার রাতেই অন্তত ৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকা প্রয়োজন ছিল। কারণ পরবর্তী সময়ে গণনা হওয়া ভোট রমনের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
মিচেল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, লস এঞ্জেলেসে পরবর্তী সময়ে গণনা হওয়া ভোটে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝোঁক দেখা যায়। দুই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরে গণনা হওয়া ভোট প্রগতিশীল প্রার্থীর পক্ষে বেশি যেতে পারে।
তবে ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রমনের জয় নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। আগামী কয়েক দিনে আরও ফল প্রকাশের কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে গ্রিফিথ পার্কের গ্রিক থিয়েটারে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন রমন। প্রচারকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটাররা পরিবর্তন চাইছেন।
রমন বলেন, লস এঞ্জেলেসে বসবাসের খরচ বহন করতে না পেরে একের পর এক বন্ধু ও পরিবার শহর ছেড়ে চলে যেতে দেখেছেন তাঁরা। এতে মানুষের মধ্যে এমন হতাশা তৈরি হয়েছে যে, অনেকে মনে করতে শুরু করেছেন শহরের সমস্যাগুলো স্থায়ী এবং লস এঞ্জেলেসের ভালো সময় পেছনে পড়ে গেছে।
অন্যদিকে হলিউডে নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বাস। তিনি বলেন, এমন একটি লস এঞ্জেলেস গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে, যেখানে কর্মজীবী পরিবারগুলো বসবাস করতে পারবে, শিশুরা সীমাহীন স্বপ্ন দেখতে পারবে, পাড়া-মহল্লা নিরাপদ থাকবে এবং শহরের সব এলাকায় সুযোগ পৌঁছাবে।
বাস বলেন, তিনি লস এঞ্জেলেসকে ভালোবাসেন, শহরটির ওপর বিশ্বাস রাখেন এবং বাসিন্দাদের প্রাপ্য শহর গড়ে তুলতে লড়াই চালিয়ে যাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের নেতৃত্ব নিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রধান আলোচনায় ছিল গৃহহীনতা, জননিরাপত্তা, আবাসন ব্যয় এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভয়াবহ দাবানলের পর শহরের পুনর্গঠন।
৭৩ বছর বয়সী বাস ২০২২ সালে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট অ্যাসেম্বলি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন।
মেয়র হওয়ার পরপরই তিনি গৃহহীনতা নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং ‘ইনসাইড সেফ’ কর্মসূচি চালু করেন। এর লক্ষ্য ছিল গৃহহীন মানুষকে রাস্তার অস্থায়ী শিবির থেকে সরিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন এবং পরে স্থায়ী আবাসনে নেওয়া।
লস এঞ্জেলেস সিটি কন্ট্রোলারের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় ১৪০টি গৃহহীন শিবিরে অভিযান চালানো হয়েছে এবং ৬ হাজার ৫০৯ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ১ হাজার ৭৭৫ জন অন্তর্বর্তীকালীন আবাসনে, ১ হাজার ৬১৬ জন আবাসনে স্থান পেয়েছেন। কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে গেছেন ৩ হাজার ১১৮ জন। এ কর্মসূচিতে ব্যয় ও বরাদ্দের পরিমাণ ৩৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি।
তবে কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ হাজার ৭৮১ জন আবারও গৃহহীন হয়েছেন বলে ওই ড্যাশবোর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে।
গৃহহীনতা মোকাবিলা ও জননিরাপত্তা উন্নয়নে নিজের প্রশাসনের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বাস। অন্যদিকে রমন মনে করেন, শহরের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োজন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পালিসেডস দাবানল মোকাবিলায় বাসের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়। আগুন লাগার সময় তিনি সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ঘানায় ছিলেন। পরে লস এঞ্জেলেসে ফিরে আসেন। এরই মধ্যে আগুন প্যাসিফিক পালিসেডস ও মালিবু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার বাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংস হয়।
৪৫ বছর বয়সী রমন ২০২০ সাল থেকে লস এঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র ছিল সাশ্রয়ী আবাসন, গৃহহীনতা মোকাবিলা এবং ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য রমন বাসের তুলনায় বেশি প্রগতিশীল অবস্থান নিয়ে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে লস এঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের অর্থায়ন নিয়ে তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়েও সমালোচনা হয়েছে।
প্রথমে বাসের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দিলেও পরে নিজেই মেয়র পদে প্রার্থী হন রমন। প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সমর্থন পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বাসের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসসহ প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতারা।
ভোট গণনা অব্যাহত থাকায় দুই প্রার্থীই এখন লস এঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরই নির্ধারিত হবে, লস এঞ্জেলেসের পরবর্তী মেয়র কে হচ্ছেন।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, কেটিএলএ