বাংলাদেশ

শরিয়তসম্মত বিনিয়োগের ফাঁদ পেতে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ

প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসান ও তার ভাই আবুল বাশার খানকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর পল্টন এলাকার তোপখানা রোডে এ অভিযান চালানো হয়। র‌্যাব বলছে, একটি বহু স্তর বিপণন (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানে ৯০০ টাকা বেতনে চাকরি করা রাগীব পরে নিজেই ব্যবসা খুলে বসেন। শরিয়তসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগ ও প্রতি লাখে মাত্রাতিরিক্ত লাভ দেওয়ার প্রচার চালিয়ে তিনি ফাঁদ পাতেন। ১০ হাজার গ্রাহক নিয়ে যাত্রা শুরু করা তার এমএলএম প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সংখ্যা এখন লক্ষাধিক। গ্রাহকদের অভিযোগ ও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

এ ব্যাপারে জানাতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এতে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমএলএম প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলায় ভুক্তভোগীদের মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকজন ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও অভিযোগ করেন। র‌্যাব এ ঘটনার ছায়াতদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১০ এর একটি দল রাগীব আহসান ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ভাউচার বই ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব জানায়, মাদ্রাসায় পড়ালেখা করা রাগীব আহসান ২০০৬-২০০৭ সালে ইমামতির পাশাপাশি 'এহসান এস মাল্টিপারপাস' নামে একটি এমএলএম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এই চাকরির সুবাদে তিনি এমএলএম কোম্পানির আদ্যোপান্ত রপ্ত করেন। পরে ২০০৮ সালে 'এহসান রিয়েল এস্টেট' নামে একটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান চালু করেন। রাগীব মূলত মানুষের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতির অপব্যবহার করে এমএলএম কোম্পানির ফাঁদ পাতেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ব্যক্তি, ইমাম ও অন্যদের টার্গেট করেন তিনি। ওয়াজ মাহফিল আয়োজনের নামে তিনি ব্যবসায়িক প্রচার চালাতেন। ২০০৮ সালে তিনি ১০ হাজার গ্রাহককে যুক্ত করতে সমর্থ হন বলে জানান। তার প্রায় তিনশ কর্মচারী রয়েছে। যাদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না। কর্মচারীররা মাঠপর্যায় থেকে বিনিয়োগকারী সংগ্রহ করেন। গ্রাহকের বিনিয়োগের ২০ ভাগ অর্থ তাদের দেওয়ার কথা ছিল। ফলে তিনি দ্রুত গ্রাহকসংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হন। পরে তিনি কর্মচারী ও গ্রাহক সবার সঙ্গেই প্রতারণা করেছেন। ২০১৯ সাল থেকে গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছেন না রাগীব। তার নামে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। একবার গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও গেছেন।

র‌্যাব জানায়, রাগীব আহসান ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেন। সেগুলো হলো- এহ্‌সান গ্রুপ বাংলাদেশ, এহ্‌সান পিরোজপুর বাংলাদেশ (পাবলিক) লিমিটেড, এহ্‌সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমেটেড, নূর-ই মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট একাডেমি, জামিয়া আরাবিয়া নূরজাহান মহিলা মাদ্রাসা, হোটেল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক), আল্লাহর দান বস্ত্রালয়, পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ ও ২, এহ্‌সান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডিং অ্যান্ড কোং, মেসার্স মক্কা এন্টারপ্রাইজ, এহ্‌সান মাইক অ্যান্ড সাউন্ড সিস্টেম, এহ্‌সান ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, ইসলাম নিবাস প্রজেক্ট, এহ্‌সান পিরোজপুর হাসপাতাল, এহ্‌সান পিরোজপুর গবেষণাগার ও এহ্‌সান পিরোজপুর বৃদ্ধাশ্রম। ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে/বেনামে সম্পত্তি ও জমি কিনেছেন। রাগীব তার পরিবারের সদস্যদের নাম যুক্ত করে ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করেন। তার শ্বশুর প্রতিষ্ঠানের সহসভাপতি, বাবা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা, ভগ্নিপতি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। এ ছাড়া তার তিন ভাইয়ের মধ্যে আবুল বাশার প্রতিষ্ঠানের সহপরিচালক, বাকি দুই ভাই সদস্য।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত তিনি ১১০ কোটি টাকা সংগ্রহের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বিভিন্নভাবে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি চেক জালিয়াতি করতেন। অনেকেই পাওনা টাকার চেক নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। এ ছাড়া অনেকেই টাকা চাইতে গিয়ে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হয়েছেন।

এদিকে রাগীবের এমএলএম প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্য তার দুই ভাইকে পিরোজপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন- পিরোজপুর বাজার মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান ও খায়রুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার বিকেলে পিরোজপুর সদর থানা পুলিশ খলিশাখালী গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে।

পিরোজপুর সদর থানার ওসি আ. জা. মো. মাসুদুজ্জামান জানান, অধিক মুনাফা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দায়ের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলার বাদী ভুক্তভোগী গ্রাহক হারুন-অর-রশিদ জানান, তার ১০ লাখ টাকাসহ তার আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রাগীব। এ ছাড়া তিনি পিরোজপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, খুলনা, ঝালকাঠিসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে লক্ষাধিক গ্রাহকের প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

এলএবাংলাটাইমস/এলআরটি/বি

[এলএ বাংলাটাইমসের সব নিউজ আরও সহজভাবে পেতে ‘প্লে-স্টোর’ অথবা ‘আই স্টোর’ থেকে ডাউনলোড করুন আমাদের মোবাইল এপ।]