বাংলাদেশ

আইভী-শামীমের বিরোধ আবার প্রকাশ্যে

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন নিয়ে আবারো প্রকাশ্যে চলে এসেছে শামীম ওসমান ও আইভীর বিরোধ। স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে সমর্থন করা নিয়ে এ বিরোধ অনেকটা প্রকাশ্যে চলে আসে। শনিবার আইভীর বক্তব্যের সূত্র ধরে এ বিতর্কের নতুন সূত্রপাত শুরু হয়।

আইভী বলেছেন ‘তৈমূর গডফাদার শামীম ওসমানের প্রার্থী। এ ছাড়া শামীম ওসমানের ভাই সেলিম ওসমানের দিকেও অভিযোগের তীর ছুড়েন আইভী। বলেন, সেলিম ওসমানের সমর্থিত চেয়ারম্যানরা তৈমূরের পক্ষে কাজ করছেন।
শামীম ওসমানকে ‘গডফাদার’ বলার পর শনিবার রাতেই প্রতিক্রিয়া জানান শামীম ওসমান এমপি । তিনি বলেন, ‘দু’দিন আগে ভাই ছিলাম এখন কেন গডফাদার হলাম! এ প্রশ্ন আপনারা আইভীকে করেন। তিনি কিভাবে এ কথা বলেছেন। আইভী আমাকে গডফাদার বলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি আঙুল তুলেছেন। এ বিষয়ে আজ সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন শামীম ওসমান।

যাকে নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত সেই তৈমূর আলম খন্দকার গতকাল রোববার জানান, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী (আইভী) তার নিজ দলের এমপিকে গডফাদার বলেছেন। বিষয়টি তাদের দলের নিজস্ব ব্যাপার। সেখানে আমাকে কেন জড়ানো হচ্ছে তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

এ দিকে গতকাল নির্বাচনী প্রচারণাকালে সেলিনা হায়াৎ আইভী শামীম ওসমান প্রসঙ্গে বলেন, আমি শামীম ওসমানকে গডফাদার উপাধি দেইনি। এটা তার ৩০ বছরের উপাধি। শুধু নারায়ণগঞ্জ না, সারা বাংলাদেশ তা জানে।
নির্বাচনে শামীম ওসমানের সমর্থন বিষয়ে জানতে চাইলে আইভী বলেন, উনি আমার দলের লোক। সমর্থন দিলে দিবে, না দিলে না দিবে। দলে থাকতেই পারে, আমাকে অপছন্দ করতেই পারে। এটা কোনো ব্যাপার না। আমি আমার বড় ভাইকে সম্মানিত করার চেষ্টা করেছি। উনি যদি উনার দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে আমার কিছু করার নাই। জনতা যে রায় দিবে সেটাই রায়। ষড়যন্ত্র তো করবেই কিন্তু ধ্বংস করে দিবে জনগণ।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বিশাল বড় দল। এখানে সবার স্থান আছে। যারা চলে যাওয়ার তারা চলে যাবে আর যারা টিকে থাকার তারা থাকবে। কে কী বলল, কে কী করল তাতে প্রধানমন্ত্রীর কিছু যায় আসে না। আইভী বলেন, জনপ্রতিনিধি জনগণের। গত তিনবার পাস করার পর আমি বলেছি, আমি সবার ভোটে পাস করেছি কিন্তু আমার পরিচয় আমি আওয়ামী লীগ। আমি বংশগতভাবে আওয়ামী লীগ করি, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী। কিন্তু আমি কাজ করব সবার জন্য। আমি যখন রাস্তা করি তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি দেখি না। সুতরাং আমি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করব। এখনো করছি, ভবিষ্যতেও করব।

তিনি বলেন, আমার জনগণ কখনো কোনো সন্ত্রাসী, খুনি, গডফাদারকে গ্রহণ করেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আমার জনগণ এটা কখনো গ্রহণ করে না আর করবেও না। কেন্দ্র কেন্দ্রের কাজ করবে, দল দলের কাজ করবে, জনতা জনতার কাজ করবে।

আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা আমার কথা বলে, ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আমার কথা বলে। আমার বিরুদ্ধে প্রচুর অপপ্রচার চালানো হয়েছে, বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ধর্মীয় উসকানি দেয়া হয়েছে। কোনোটাতেই কাজ হয়নি। আগেও হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। আমি বিভিন্ন ধর্মের জন্য কাজ করেছি। আশা করি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান কেউ অপপ্রচারে কান দিবে না। সাধারণ মানুষ আমার পাশে থাকবে। তারা ভয় পাবে না।

এ দিকে গতকাল রোববার নির্বাচনী প্রচারণাকালে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী তার নিজ দলের এমপিকে গডফাদার বলেছেন। বিষয়টি তাদের দলের নিজস্ব ব্যাপার। যেখানে আমি জড়িত সেখানে আমার বক্তব্য স্পষ্ট। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী তিনবার বলেছেন তৈমূর জেতার মতো ক্যান্ডিডেট। সে আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমি বলি প্রধানমন্ত্রীও নারায়ণগঞ্জের ভোটার হলে আমাকেই ভোট দিতেন। জনগণের সাথে আমার সম্পৃক্ততাকে তিনি মূল্যায়ন করতেন।
তৈমূর বলেন, আমাকে যদি রাস্তার একটা ভিখারি সমর্থন দেয় সেটা আমি মাথা পেতে নেব। সরকারি দলের মধ্যে যে আত্মকোন্দল বিবাদ মুখোমুখি অবস্থান এতে আমার লস কী। সবাই এগিয়ে আসছে। তারা কি ট্যাক্স দেয় না, তারা কি পানি খায় না।

রাজনীতি পরের বিষয় আগে এটা আমাদের নিজস্ব এলাকা এটা নিজের শহর। সংখ্যালঘু বলতে আমি কিছু বুঝি না সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। তবে মসজিদ মন্দিরের জায়গা দখল হয়েছে বলে নারায়ণগঞ্জবাসীর একটা অভিযোগ আছে।
তিনি বলেন, আইভী আজ নির্বাচন না করলে তিনি আমার নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়ক হতেন। এখন নির্বাচনের মাঠে তিনি নিজে দলের ব্যাপারে আরো কথা বলেছেন। তিনি শুধু সরকারি দলকে বিতর্কিত করেননি তিনি আমার নেত্রীকেও অপমান করেছেন। তিনি বলেছেন দুই নেত্রী দেশকে ধ্বংস করেছে। এই দুই নেত্রীকেও তিনি ছাড় দেননি, আমাকে কি ছাড় দিবেন। সাবেক মেয়র হিসেবে তার নিজ বক্তব্যে আরো সাবলীল ও সাবধান হওয়া উচিত।

তৈমূর বলেন, আমি নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। আমি কোনো দলের ব্যানারে দাঁড়াইনি। আমাকে মানুষ দলমত নির্বিশেষে সমর্থন দিচ্ছে। পত্রিকায় আপনারা দেখেছেন জাতীয় পার্টি বিএনপিসহ অনেকেই আমার সাথে ছিলেন। কাল রাতে ধামগড় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের বাড়িতে তল্লাশি হয়েছে।

এ দিকে আইভীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান শামীম ওসমান। শনিবার রাতে তিনি বলেন, ‘দু’দিন আগে ভাই ছিলাম এখন কেন গডফাদার হলাম! এ প্রশ্ন আপনারা আইভীকে করেন। তিনি কিভাবে এ কথা বলেছেন। আইভী আমাকে গডফাদার বলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি আঙুল তুলেছেন বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।

শামীম ওসমান বলেন, ‘দু’দিন আগে একটি ভিডিও দেখলাম, সেখানে উনি (আইভী) বলছেন, শামীম ওসমান আমাদের নেতা। উনি বড় ভাই, আওয়ামী লীগের এমপি। দুই দিনের মধ্যে গডফাদার হয়ে গেলাম। আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে আমার দল। আমি যদি গডফাদার হই, তাহলে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন কে? কাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো? যে বলেছে, তার (আইভী) কাছে জিজ্ঞেস করেন, আপনি দু’দিন আগে এটা বলেছেন, দু’দিন পরে এটা বললেন। কোনটা সঠিক।’
শামীম ওসমান আরো বলেন, ‘আমি কোনো সাবজেক্ট না। প্রথমদিক থেকেই চুপচাপ ছিলাম। এখনও আছি। তাহলে আমি নিউজ হবো কেন? যারা আমাকে নিউজ বানাতে চাচ্ছেন। আমি তো তাদের বলেছি, কারণটা কী। এখন উনারা যদি কেউ ফায়দা লুটার চেষ্টা করেন, তাহলে আমার দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে তা জানানো। জনগণ যদি সেটা সঠিক মনে করে, তাহলে সঠিক। এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত বিষয়, কোনো রাজনৈতিক নয়।’

ওসমান পরিবারের সমর্থন প্রয়োজন নেই : তৈমূর
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেছেন, শামীম ওসমানের পায়ে হাঁটার মতো অবস্থা তৈমূর আলম খন্দকারের হয়নি। আমার সাথে যারা আছেন তারাই আমার জন্য যথেষ্ট। এস এম আকরাম সাহেব ইতোমধ্যে একবার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। ওসমান পরিবারের সমর্থন আমার প্রয়োজন নেই।
গতকাল রোববার বিকেলে মাসদাইরের মজলুম মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তৈমূর। দলের সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের বাইরে না। বিএনপিও হোল্ডিং ট্যাক্স দেয়। জলাবদ্ধতা ভোগ করে। বিএনপি যারা করে তারাও এ নগরীর নাগরিক। আজকে যারা স্টেজে বসা তারা সবাই বিএনপির নেতা।

আওয়ামী লীগের কোন্দলের বিষয়ে তৈমূর বলেন, জনতা ভাবছে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ এবং আওয়ামী লীগ বিভক্ত। আমি আজকেও আমার দলের মহানগরের সভাপতির সাথে কথা বলেছি। তিনি তার ছেলের নির্বাচনী প্রচারণায়ও নামতে পারছেন না। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। মামুন মাহমুদের নামে হেফাজতের মামলা আছে। এ কারণে তারা আসতে পারছেন না।

তিনি বলেন, একটা রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল থাকে। নানান সময়ে নানান কৌশল অবলম্বন করতে হয়। বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, দলগতভাবে বিএনপি নির্বাচন করবে না। তবে কেউ নির্বাচন করলে তাতে দলের আপত্তি নেই।
তিনি আরো বলেন, ক্ষমতা ব্যবহার করে যদি নির্বাচনকে কলুষিত করা হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর।   এলএবাংলাটাইমস/এলআরটি/বি

[এলএ বাংলাটাইমসের সব নিউজ আরও সহজভাবে পেতে ‘প্লে-স্টোর’ অথবা ‘আই স্টোর’ থেকে ডাউনলোড করুন আমাদের মোবাইল এপ।]