বরিশাল সিটির ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন সাদিক আবদুল্লাহ। এরপর সাড়ে চার বছরের বেশি সময় সিটি করপোরেশনে মেয়রের দায়িত্বে আছেন সাদিক আবদুল্লাহ। এই সময়ে নেতিবাচক নানা ঘটনায় গণমাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। এবার বরিশাল সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি সাদিক আবদুল্লাহ। মনোনয়ন পান তাঁর ছোট চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ।
প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর গত ২৬ মে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন খায়ের আবদুল্লাহ। তিনি প্রচার-প্রচারণায় বেশি জোর দিচ্ছেন ভাতিজা সাদিকের ব্যর্থতা ও নানা ধরনের অনিয়ম দূর করার ওপর। নির্বাচনী প্রচারে খায়ের আবদুল্লাহ বলেন, ‘গত ১০ বছরে বরিশালে কোনো উন্নয়ন হয়নি। বরিশাল সিটিতে রাস্তা, ড্রেনেজ, পানি ও মশার সমস্যা চরম আকার ধারণ করেছে। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে। আমার লক্ষ্য একটাই, বরিশাল নগরবাসীর মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া।’
সাদিক আবদুল্লাহ ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর আমলে সরকারি কোনো প্রকল্প পায়নি বরিশাল সিটি। কমে উন্নয়ন বরাদ্দও। নাগরিকদের সেবা দিতে হিমশিম খাওয়া সিটি করপোরেশন নিজেদের আয় বাড়াতে কর বাড়িয়ে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর আগের তুলনায় ১০ গুণ বেড়ে যায়। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে বর্ধিত কর নেওয়া শুরু হয়। বিষয়টি নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সঞ্চার করে।
খায়ের আবদুল্লাহ তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে মতবিনিময়, উঠান বৈঠকের মতো কর্মসূচিতে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত করের সমালোচনা করেন। একাধিক বৈঠকে তিনি বলেন, নগরবাসীর সঙ্গে সবচেয়ে বড় জুলুম করা হয়েছে অতিরিক্ত ট্যাক্স ধার্য করে। তিনি নির্বাচিত হলে হোল্ডিং ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেন।
৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটির আওতায় মোট সড়ক রয়েছে ৫৩২ কিলোমিটার। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে ৮৬ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কার না হওয়ায় বাকি ৮০ ভাগ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী। সিটি করপোরেশনের সড়ক উন্নয়নে ৬৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্প প্রস্তাবনা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা অনুমোদিত হয়নি।
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী খায়ের আবদুল্লাহকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে ভাঙাচোরা সড়কের জন্য ভোটারদের দাবির মুখে পড়তে হচ্ছে। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের রূপাতলী হাউজিং এলাকায় গণসংযোগে গিয়ে খায়ের আবদুল্লাহ বলেন, রূপাতলী হাউজিংয়ের সড়কের করুণ দশা প্রমাণ করে বরিশালে কোনো উন্নয়ন হয়নি। নির্বাচিত হতে পারলে শুধু এই সড়ক নয়, বরিশালকে নতুনভাবে গড়ব।
নগরবাসীর অভিযোগ, তারা মেয়র সাদিক আবদুল্লাহকে সেভাবে নিজেদের কাছে পাননি। নগর ভবনে গিয়েও অধিকাংশ সময় মেয়রকে পাওয়া যায় না। এই বিষয়টিকেও নিজের প্রচারের অংশ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী খায়ের আবদুল্লাহ। একাধিক গণসংযোগে তিনি বলেন, ‘নগরবাসীর জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা থাকবে। নগর ভবনকে উন্মুক্ত করে নাগরিকদের সম্মান ফিরিয়ে দিব।’
এবার বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আলোচনায় আছেন চারজন। আবুল খায়ের আবদুল্লাহ বাদে আলোচনায় থাকা অন্য তিন প্রার্থী হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি ফয়জুল করিম, জাতীয় পার্টির (জাপা) ইকবাল হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাত্রদলের সাবেক নেতা কামরুল আহসান। তাঁরাও নিজেদের প্রচারে বর্তমান মেয়রের আমলের উন্নয়ন বঞ্চনার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
একসময় বরিশাল নগরজুড়ে প্রবহমান ছিল অসংখ্য খাল। দখলে-দূষণে এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নে সেসব খালের অধিকাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যেসব খাল এখনো টিকে আছে, সেগুলোরও অস্তিত্ব হুমকিতে। ফলে কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সমস্যা বেশ ভোগাচ্ছে নগরবাসীকে। এই সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
নগরীর অভ্যন্তরে থাকা খালগুলো পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের জন্য মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ২ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিলেও সেটি অনুমোদন করেনি সরকার। অন্যদিকে গত বছর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বরিশাল নগরের ৭টি খাল খননের জন্য ২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়াও শেষ করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বাধায় সেই প্রকল্পও বাস্তবায়ন হতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তাঁর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করিম তাঁর প্রচারে জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ট্যাক্স পরিশোধ করেও রাস্তাঘাট, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার অভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। তিনি বিজয়ী হলে প্রশস্ত সড়ক, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা কার্যকরে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস