রাজধানীতে ধারণক্ষমতার চেয়েও প্রায় ছয় গুণ যানবাহন চলাচলের কারণে তীব্র পরিবেশদূষণ হচ্ছে। ধুলাবালি ও হর্নের কারণে একজন সুস্থ মানুষের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পরিবেশ থাকে না। মাস্ক ছাড়া চলাচল করলে ফুসফুসজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন অবস্থায় সারা দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডিউটি করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। বিশেষ করে ট্রাফিক কনস্টেবলরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ঢাকা শহরে ট্রাফিক পুলিশ মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এছাড়া ঢাকার বাইরে মেট্রোপলিটন শহরে এবং হাইওয়েতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ডিউটি করছেন তারা। ধুলোবালি রোদ-বৃষ্টি, ঝড় ও শব্দদূষণ যেন ট্রাফিক পুলিশের নিত্যসঙ্গী। দিন-রাত রাস্তায় দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে নানা বিড়ম্বনা। গাড়ির চালক ও পথচারীদের বেশির ভাগেরই রয়েছে আইন ভাঙার প্রবণতা। আইন মানাতে ট্রাফিক পুলিশকে অনেকটা হুমকি-ধমকির মুখোমুখি হতে হয়। তবুও এত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দায়িত্ব পালন করতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। নগরীর চাকা সচল রাখতে এক নাগাড়ে আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করে ট্রাফিক পুলিশ। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে শ্বাসকষ্ট, টিবি কিডনি, হার্ট, কান ও মস্তিষ্কসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিল সমস্যা হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশরা তো আমাদেরই পরিবারের সদস্য। এটা ভুলে গেলে হবে না, তারা এদেশের নাগরিক। তাদের নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন করা উচিত। আমাদের রক্ষা করতে গিয়ে তারা নিজেরাই ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। ধুলোবালি রোদ-বৃষ্টি, ঝড়ের মধ্যেও একজন মানুষ হিসেবে যে পরিশ্রম তারা করে, সেই তুলনায় তারা বিশ্রামের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য রাস্তার পাশে শৌচাগারসহ বিশ্রামের ব্যবস্থা সিটি করপোরেশনসহ দায়িত্বশীল বিভাগকে মানবিক বিবেচনায় করা উচিত। দীর্ঘ সময় বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের মধ্যে ডিউটিতে থাকার কারণে সবচেয়ে জটিল রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা। একাধিক সদস্য পালাক্রমে ডিউটি করতে পারলে কিছুটা ঝুঁকি কমে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে গিয়ে অনেক ট্রাফিক পুলিশ নানা রোগে ভুগছেন। রাজধানী ঢাকা বায়ু ও শব্দদূষণে বিশ্বের শীর্ষে। গাড়ির ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের প্রেক্ষিতে যেসব রোগ হতে পারে, তার সব হওয়ার ঝুঁকি সবচে বেশি ট্রাফিক পুলিশের।
চর্ম ও যৌনরোগ-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এনএন হুদা বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকা ও বায়ুদূষণের প্রভাবে ট্রাফিক পুলিশের চর্মরোগ, এলার্জি হতে পারে। তারা একধরনের পলেস্টার জাতীয় কাপড় পরিধান করে রোদ্রের মধ্যে ডিউটি করেন। এই কারণে তাদের চর্ম রোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। এই ধরনের রোগী তার কাছে প্রায়ই আসছে। ট্রাফিক পুলিশকে যে ছাতা দেওয়া হয়, সেটা তেমনভাবে সান প্রোটেকশন দিতে পারে না। এতে শারীরিক নানা সমস্যার ঝুঁকির মধ্যে তারা রয়েছেন।’
জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ একটানা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় হাঁটুর ব্যথা, কোমরের ব্যথা হয়। এছাড়া তাদের রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। রক্ত নিচের থেকে ওপরে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। অনেক সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ফুলেও যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুর রহমান বলেন, বায়ুদূষণের কারণে দীর্ঘমেয়াদি হাঁচি-কাশি হতে পারে, এজমা হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে একধরনের ভাইরাসেও ট্রাফিক পুলিশ আক্রান্ত হতে পারে; টিবি রোগও হতে পারে। শ্বাসনতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগ হতে পারে। অনেক ট্রাফিক পুলিশ এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ট্রাফিক পুলিশ প্রস্রাব দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখে। এতে প্রোস্টেটে নানা সমস্যা হতে পারে। শব্দদূষণের কারণে কানের সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন এই অবস্থার কারণে শ্রবণপ্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের একাধিক সদস্য বলেন, ‘আমরা সারা দিন কর্মব্যস্ত থেকে নির্বিঘ্নে মানুষকে আপন ঠিকানায় পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করছি। একটানা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঘোরায় ও পা ব্যথা হয়ে যায়।’ ট্রাফিক পুলিশের একাধিক সদস্য বেশ আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টি হলে আশ্রয় নেওয়ার কোনো জায়গা নেই। ঝড়-বৃষ্টিসহ যতই প্রতিকূল পরিস্থিতি হোক না কেন, আমাদের রাস্তা ছেড়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া, বসে খাওয়া-দাওয়া করারও কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের বিশ্রামের জন্য শৌচাগারসহ এসি রুমের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ আছে, যেখানে ট্রাফিক পুলিশদের দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে হয় না। রুমের মধ্যে কম্পিউটারের মাধ্যমে ট্রাফিক কার্যক্রম মনিটরিং করে থাকেন।’
মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, তারা এই বৈরী পরিবেশের মধ্যে জীবনবাজি রেখে রাস্তায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বিশ্রামের ব্যবস্থা করা সংশ্লিষ্ট বিভাগের নাগরিক দায়িত্ব।
এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস
এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস