সৎ, আলোচিত ও চৌকস কর্মকর্তা, জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের আতংক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে গুলি করে ও কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রোববার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর জিইসি মোড়ে ওয়েল ফুড নামের দোকানের কয়েক গজ দূরে রাস্তার ওপর তাকে মাথায় গুলি ও বুকে-পিঠে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। মোটরসাইকেলে চড়ে কমান্ডো স্টাইলে এসে দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।
নির্মম হত্যার শিকার হওয়ার আগে মাহমুদা খানম তার দ্বিতীয় শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে আক্তার মাহমুদ মাহিরকে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের বাসে উঠিয়ে দেয়ার জন্য নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা জিইসি মোড়ে যাচ্ছিলেন। দুর্বৃত্তরা মাহিরকে মায়ের হাত থেকে নিয়ে ছুড়ে ফেলে মা মিতুকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে। হত্যাকাণ্ড শেষে আততায়ীরা নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সিসিটিভির ভিডিওচিত্র দেখে চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছরে উগ্রপন্থীরা দেশে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার সঙ্গে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানমের হত্যার মিল পাচ্ছেন তারা।
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে হত্যার এ ঘটনাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জঙ্গিরাই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে বলে তার বদ্ধমূল ধারণা। সৎ ও সাহসী পুলিশ অফিসারদের মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য বাবুল আক্তারের স্ত্রীর ওপর কাপুরুষোচিত ও বর্বর এ হামলা চালানো হয়েছে। চট্টগ্রামে অবস্থানরত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হামলাকারীদের গ্রেফতার করে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। তাদের শিগগিরই ধরে ফেলা হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেছেন, জঙ্গিরা সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যা করে রাষ্ট্রের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছে। পুলিশ, প্রশাসন ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ভয়ংকর জঙ্গি ও অপরাধীদের এ ধরনের হামলা এখানেই থামাতে হবে। সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহারও এ হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক টিম কাজ করছে। জড়িতদের গ্রেফতারে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন থেকেই জঙ্গিদের টার্গেট ছিলেন বাবুল আক্তার। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি আস্তানা আবিষ্কার, জঙ্গি গ্রেফতার, বারবার তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়াসহ নানা কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশসহ (জেএমবি) বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। বাবুল আক্তারের ওপর অ্যাকশন নিতে তারা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে চিঠি চালাচালিও করেছে। জঙ্গিদের টার্গেটে আছেন এমনটা জানতেন বাবুল আক্তার নিজেও। পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তার। বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যার মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা নতুন বার্তা দিল।
মাহমুদা খানমের হত্যাকাণ্ড চট্টগ্রামে পুলিশ, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। রোববার চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, মর্গ এবং মাহমুদার জানাজায় মানুষের উপস্থিতি, স্বামী বাবুল আক্তারের কান্না এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় : নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করতেই ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম ভবন। ওই ভবনের ৭/ডি ফ্ল্যাটে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে তিন বছর ধরে বসবাস করছেন বাবুল আক্তার। বৃহস্পতিবার পদোন্নতি পেয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তিনি ঢাকায় যান। ছেলে মাহির (৮) ও মেয়ে তাবাসসুমকে (সাড়ে ৩ বছর) নিয়ে বাসায় একাই ছিলেন মাহমুদা। রোববার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জিইসি মোড় থেকে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাসে ছেলে মাহিরকে তুলে দেয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন তিনি। হেঁটে বাসার মাত্র ২০০ গজ দূরে এবং জিইসি মোড়ের আগে ওয়েল ফুড নামের একটি দোকানের কাছাকাছি পৌঁছার পর মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক গোল পাহাড়ের মোড়ের দিক থেকে এসে পেছন থেকে হালকা ধাক্কা দেন মাহমুদাকে। তিনি পেছনে ফিরে তাকাতেই তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। আতংকিত ছেলে মাহিরকে মায়ের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুটপাতের দিকে ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তদের একজন। মাহমুদা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর দুর্বৃত্তরা আরও কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে। এক পর্যায়ে মাথার বাঁ পাশে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা মোটারসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা : কয়েক গজ দূর থেকে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন ওয়েল ফুডের দারোয়ান আনোয়ার এবং হোটেল নিরিবিলির কর্মচারী সিরাজুল ইসলাম। ঘটনা সম্পর্কে সিরাজুল বলেন, তিনি কর্মস্থলে আসছিলেন। তখন ভোর সাড়ে ৬টা হবে। এ সময় তাদের হোটেলের সামনে থেকে জিন্সের প্যান্ট পরা এক যুবক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছিল। তখনই আরেকটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক এসে পেছন থেকে স্কুলগামী বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটতে থাকা এক মহিলাকে ধাক্কা দেয়। মোটরসাইকেল থেকে নেমে দুই যুবক ওই মহিলার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে মহিলাকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এক পর্যায়ে গুলিও করে। এরপর জিন্সের প্যান্ট পরা সেই যুবকটিসহ তিনজন মোটরসাইকেলে উঠে গোল পাহাড়ের দিকে চলে যায়। এরপর আমরা ছুটে গেলাম। ততক্ষণে সব শেষ। ওয়েল ফুডের কর্মচারী আনোয়ার হোসেন মাত্র ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে দাঁড়িয়েই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বলেন, তখন রাস্তায় কোনো মানুষ ছিল না। তাই অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা একজন নারীকে তার শিশু সন্তানের সামনে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করলেও তারা বাধা দেয়ার বা প্রতিহত করার সাহস করেননি। মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম ভবনে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন আবদুস সাত্তার। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ম্যাডামকে প্রতিদিনের মতো আমি ভোরে বাসার গেট খুলে দিই। তিনি বাচ্চাকে নিয়ে হেঁটে জিইসি মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন। দুই-তিন মিনিট পর দেখি কয়েকজন লোক দৌড়াদৌড়ি করছে। কৌতূহলবশত দৌড়ে গিয়ে দেখি, এটা তো ম্যাডাম। নাকে হাত দিয়ে দেখি নিঃশ্বাস নেই। এরপর বিল্ডিংয়ে এসে একটা চাদর নিয়ে গিয়ে ম্যাডামকে ঢেকে দিই।
ডা. ইদ্রিস থাকতেন একই ভবনে। তার ছেলেও একই স্কুলে পড়ে। তার স্ত্রী সুরমা চমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে বলেন, ‘আমি আর মাহমুদা ভাবী একসঙ্গে বাচ্চাকে স্কুল বাসে তুলে দিই প্রায়ই। কিন্তু আজ (গতকাল রোববার) আমার সাহেব (ডা. ইদ্রিস) বাচ্চাকে নিয়ে নামেন। তিনি বাসা থেকে বের হয়ে কয়েক গজ যেতেই দেখতে পান মাহির দৌড়ে বাসার দিকে ছুটে আসছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে- আঙ্কেল আমার আম্মা মরে গেছে। আমার স্বামী দৌড়ে গিয়ে দেখতে পান মাহমুদা ভাবী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন।’
একই ভবনের প্রতিবেশীরা বলেন, মাহমুদা অত্যন্ত মিশুক ছিলেন। অমায়িক ছিলেন। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। এমন একজন নারীকে হত্যার নিন্দা কীভাবে জানাবেন তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
সুরতহাল রিপোর্ট : চমেক হাসপাতালের ডিউটি অফিসার ও মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার আমিরুল হক জানান, মাহমুদা খানমের শরীরে ৮টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাথার বামপাশে কপালের দিকে গুলির চিহ্ন রয়েছে একটি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার সামনে, বুকে ও পিঠে ৮টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এসব আঘাত বেশ গভীর। কপালের ডান পাশে একটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ এমএম ক্যালিবারের ২টি কার্তুজ, একটি ফায়ার্ড কার্তুজ, একটি মিস ফায়ার্ড কার্তুজ এবং মাহমুদা খানমের ব্যবহৃত এক জোড়া স্যান্ডেল আলামত হিসেবে উদ্ধার করেছে। পিবিআই, সিআইডির ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেটিভ টিমসহ প্রশাসনের একাধিক সংস্থা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাবুল আক্তার পুলিশের একজন চৌকস ও নির্ভীক কর্মকর্তা। এ হত্যাকাণ্ড পৈশাচিক। বাবুল আক্তার দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি দমনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে টার্গেট করা হয়েছে। পুলিশের অব্যাহত অভিযানকে বিভ্রান্ত করতেই পরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে জঙ্গিরা। মন্ত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি হত্যাকাণ্ডে জড়িত যে বা যারা হোক না কেন তাদের ধরে ফেলব। এটি অত্যন্ত পৈশাচিক, নৃশংস ও ঘৃণিত হত্যাকাণ্ড। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের মনোবল ভেঙে ফেলা ও তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য এটা করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের মনোবল ভ?াঙবে না।’
এ সময় সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেলা আড়াইটার দিকে ওআর নিজাম রোডে বাবুল আক্তারের বাসায় যান। ‘ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম’ নামের ভবনটি ৭ম তলার বাসায় প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করেন। এ সময় বাবুল আক্তারের সদ্য মাতৃহারা দুই সন্তানের খোঁজখবর নেন। পরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একই সঙ্গে এ ঘটনার নেপথ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। দেশে ৩৭ টার্গেটেড কিলিংয়ের মধ্যে ৩১টির আসামি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আইজিপির শোক : এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানমের মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক। তিনি মরহুমার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
জানাজা : বিকাল ৩টা ৩৪ মিনিটের দিকে চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠে মাহমুদা খানমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লাশ আনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেক পুলিশ সদস্য তখন কাঁদতে থাকেন। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এসপি বাবুল আক্তারকে একটি কালো রঙের পাজেরো জিপে করে জানাজার মাঠে আনা হয়।
সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতারা জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। জানাজায় শরিক হন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ প্রমুখ।
নির্মম হত্যার শিকার হওয়ার আগে মাহমুদা খানম তার দ্বিতীয় শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে আক্তার মাহমুদ মাহিরকে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের বাসে উঠিয়ে দেয়ার জন্য নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা জিইসি মোড়ে যাচ্ছিলেন। দুর্বৃত্তরা মাহিরকে মায়ের হাত থেকে নিয়ে ছুড়ে ফেলে মা মিতুকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে। হত্যাকাণ্ড শেষে আততায়ীরা নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সিসিটিভির ভিডিওচিত্র দেখে চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছরে উগ্রপন্থীরা দেশে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার সঙ্গে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানমের হত্যার মিল পাচ্ছেন তারা।
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে হত্যার এ ঘটনাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জঙ্গিরাই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে বলে তার বদ্ধমূল ধারণা। সৎ ও সাহসী পুলিশ অফিসারদের মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য বাবুল আক্তারের স্ত্রীর ওপর কাপুরুষোচিত ও বর্বর এ হামলা চালানো হয়েছে। চট্টগ্রামে অবস্থানরত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হামলাকারীদের গ্রেফতার করে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। তাদের শিগগিরই ধরে ফেলা হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেছেন, জঙ্গিরা সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যা করে রাষ্ট্রের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছে। পুলিশ, প্রশাসন ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ভয়ংকর জঙ্গি ও অপরাধীদের এ ধরনের হামলা এখানেই থামাতে হবে। সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহারও এ হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক টিম কাজ করছে। জড়িতদের গ্রেফতারে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন থেকেই জঙ্গিদের টার্গেট ছিলেন বাবুল আক্তার। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি আস্তানা আবিষ্কার, জঙ্গি গ্রেফতার, বারবার তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়াসহ নানা কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশসহ (জেএমবি) বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। বাবুল আক্তারের ওপর অ্যাকশন নিতে তারা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে চিঠি চালাচালিও করেছে। জঙ্গিদের টার্গেটে আছেন এমনটা জানতেন বাবুল আক্তার নিজেও। পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তার। বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যার মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা নতুন বার্তা দিল।
মাহমুদা খানমের হত্যাকাণ্ড চট্টগ্রামে পুলিশ, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। রোববার চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, মর্গ এবং মাহমুদার জানাজায় মানুষের উপস্থিতি, স্বামী বাবুল আক্তারের কান্না এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় : নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করতেই ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম ভবন। ওই ভবনের ৭/ডি ফ্ল্যাটে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে তিন বছর ধরে বসবাস করছেন বাবুল আক্তার। বৃহস্পতিবার পদোন্নতি পেয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তিনি ঢাকায় যান। ছেলে মাহির (৮) ও মেয়ে তাবাসসুমকে (সাড়ে ৩ বছর) নিয়ে বাসায় একাই ছিলেন মাহমুদা। রোববার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জিইসি মোড় থেকে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাসে ছেলে মাহিরকে তুলে দেয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন তিনি। হেঁটে বাসার মাত্র ২০০ গজ দূরে এবং জিইসি মোড়ের আগে ওয়েল ফুড নামের একটি দোকানের কাছাকাছি পৌঁছার পর মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক গোল পাহাড়ের মোড়ের দিক থেকে এসে পেছন থেকে হালকা ধাক্কা দেন মাহমুদাকে। তিনি পেছনে ফিরে তাকাতেই তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। আতংকিত ছেলে মাহিরকে মায়ের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুটপাতের দিকে ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তদের একজন। মাহমুদা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর দুর্বৃত্তরা আরও কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে। এক পর্যায়ে মাথার বাঁ পাশে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর দুর্বৃত্তরা মোটারসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা : কয়েক গজ দূর থেকে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন ওয়েল ফুডের দারোয়ান আনোয়ার এবং হোটেল নিরিবিলির কর্মচারী সিরাজুল ইসলাম। ঘটনা সম্পর্কে সিরাজুল বলেন, তিনি কর্মস্থলে আসছিলেন। তখন ভোর সাড়ে ৬টা হবে। এ সময় তাদের হোটেলের সামনে থেকে জিন্সের প্যান্ট পরা এক যুবক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছিল। তখনই আরেকটি মোটরসাইকেলে করে দুই যুবক এসে পেছন থেকে স্কুলগামী বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটতে থাকা এক মহিলাকে ধাক্কা দেয়। মোটরসাইকেল থেকে নেমে দুই যুবক ওই মহিলার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে মহিলাকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এক পর্যায়ে গুলিও করে। এরপর জিন্সের প্যান্ট পরা সেই যুবকটিসহ তিনজন মোটরসাইকেলে উঠে গোল পাহাড়ের দিকে চলে যায়। এরপর আমরা ছুটে গেলাম। ততক্ষণে সব শেষ। ওয়েল ফুডের কর্মচারী আনোয়ার হোসেন মাত্র ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে দাঁড়িয়েই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বলেন, তখন রাস্তায় কোনো মানুষ ছিল না। তাই অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা একজন নারীকে তার শিশু সন্তানের সামনে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করলেও তারা বাধা দেয়ার বা প্রতিহত করার সাহস করেননি। মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম ভবনে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন আবদুস সাত্তার। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ম্যাডামকে প্রতিদিনের মতো আমি ভোরে বাসার গেট খুলে দিই। তিনি বাচ্চাকে নিয়ে হেঁটে জিইসি মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন। দুই-তিন মিনিট পর দেখি কয়েকজন লোক দৌড়াদৌড়ি করছে। কৌতূহলবশত দৌড়ে গিয়ে দেখি, এটা তো ম্যাডাম। নাকে হাত দিয়ে দেখি নিঃশ্বাস নেই। এরপর বিল্ডিংয়ে এসে একটা চাদর নিয়ে গিয়ে ম্যাডামকে ঢেকে দিই।
ডা. ইদ্রিস থাকতেন একই ভবনে। তার ছেলেও একই স্কুলে পড়ে। তার স্ত্রী সুরমা চমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে বলেন, ‘আমি আর মাহমুদা ভাবী একসঙ্গে বাচ্চাকে স্কুল বাসে তুলে দিই প্রায়ই। কিন্তু আজ (গতকাল রোববার) আমার সাহেব (ডা. ইদ্রিস) বাচ্চাকে নিয়ে নামেন। তিনি বাসা থেকে বের হয়ে কয়েক গজ যেতেই দেখতে পান মাহির দৌড়ে বাসার দিকে ছুটে আসছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে- আঙ্কেল আমার আম্মা মরে গেছে। আমার স্বামী দৌড়ে গিয়ে দেখতে পান মাহমুদা ভাবী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন।’
একই ভবনের প্রতিবেশীরা বলেন, মাহমুদা অত্যন্ত মিশুক ছিলেন। অমায়িক ছিলেন। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। এমন একজন নারীকে হত্যার নিন্দা কীভাবে জানাবেন তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
সুরতহাল রিপোর্ট : চমেক হাসপাতালের ডিউটি অফিসার ও মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার আমিরুল হক জানান, মাহমুদা খানমের শরীরে ৮টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাথার বামপাশে কপালের দিকে গুলির চিহ্ন রয়েছে একটি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার সামনে, বুকে ও পিঠে ৮টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এসব আঘাত বেশ গভীর। কপালের ডান পাশে একটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ এমএম ক্যালিবারের ২টি কার্তুজ, একটি ফায়ার্ড কার্তুজ, একটি মিস ফায়ার্ড কার্তুজ এবং মাহমুদা খানমের ব্যবহৃত এক জোড়া স্যান্ডেল আলামত হিসেবে উদ্ধার করেছে। পিবিআই, সিআইডির ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেটিভ টিমসহ প্রশাসনের একাধিক সংস্থা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাবুল আক্তার পুলিশের একজন চৌকস ও নির্ভীক কর্মকর্তা। এ হত্যাকাণ্ড পৈশাচিক। বাবুল আক্তার দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি দমনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে টার্গেট করা হয়েছে। পুলিশের অব্যাহত অভিযানকে বিভ্রান্ত করতেই পরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে জঙ্গিরা। মন্ত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি হত্যাকাণ্ডে জড়িত যে বা যারা হোক না কেন তাদের ধরে ফেলব। এটি অত্যন্ত পৈশাচিক, নৃশংস ও ঘৃণিত হত্যাকাণ্ড। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের মনোবল ভেঙে ফেলা ও তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য এটা করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের মনোবল ভ?াঙবে না।’
এ সময় সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেলা আড়াইটার দিকে ওআর নিজাম রোডে বাবুল আক্তারের বাসায় যান। ‘ইকুইটি সেন্ট্রিয়াম’ নামের ভবনটি ৭ম তলার বাসায় প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করেন। এ সময় বাবুল আক্তারের সদ্য মাতৃহারা দুই সন্তানের খোঁজখবর নেন। পরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একই সঙ্গে এ ঘটনার নেপথ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। দেশে ৩৭ টার্গেটেড কিলিংয়ের মধ্যে ৩১টির আসামি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আইজিপির শোক : এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানমের মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক। তিনি মরহুমার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
জানাজা : বিকাল ৩টা ৩৪ মিনিটের দিকে চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠে মাহমুদা খানমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লাশ আনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেক পুলিশ সদস্য তখন কাঁদতে থাকেন। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এসপি বাবুল আক্তারকে একটি কালো রঙের পাজেরো জিপে করে জানাজার মাঠে আনা হয়।
সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতারা জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। জানাজায় শরিক হন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ প্রমুখ।