বাংলাদেশ

পিলখানা হত্যাকণ্ড পূর্বপরিকল্পিত : হাইকোর্ট

২০০৯ সালে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তৎকালীন বিডিআর এর সদর দফতর রাজধানীর পিলখানা দরবার হলে যে হামলা চালানো হয়েছিল তা ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নৃশংস, পৈশাচিক। এই মামলার আপিলের রায় ঘোষণার সময় এই পর্যবেক্ষণ দিয়ে হাইকোর্ট বলেছে বিচারিক আদালতের সকল নথিপত্র, পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তারা। আদালত বলেন, এ মামলার রায় যুগান্তকারী ঐতিহাসিক।

বহুল আলোচিত এই মামলার আপিলের রায় পড়া শুরু হয় রোববার সকাল ১০টা ৫৬ মিনিটে। বিচারপতি মো.শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রায় পড়া শুরু করে।

বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। পিলখানায় সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের এ মামলার আপিল শুনানি করতে প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন।

বহুল আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ১৫২ আসামির মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও সাজা বাতিলে আসামিপক্ষের আপিলের রায় পড়া শুরু করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো.শওকত হোসেন। পরে এ মামলার পর্যবেক্ষণ পড়েন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী।  

পর্যবেক্ষণের শুরুতেই বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এ মামলাটি শুনানির সময় আসামীপক্ষের আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, বেঞ্চ অফিসার, সহকারী বেঞ্চ অফিসার, বিচারপতিদের একান্ত সহকারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, ‘এ মামলা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। এজন্য আদালত তাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান।’  

আদালত তার মতামতে আরও বলেন, ‘এ রায়টি যুগান্তকারী। যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের মনোবিজ্ঞানী, অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজ বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসরণ করা হয়েছে। রায়ে ইসলাম ধর্ম, সনাতন ধর্মের বিষয়টি সামনে রাখা হয়েছে। আদালত বলেন, ঐতিহাসিক এ ঘটনায় রাষ্ট্র সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা লক্ষ্য রাখা হয়েছে। আসামীরা এ মামলা খালাস চেয়ে আবেদন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ আসামীদের সাজা বৃদ্ধি চেয়েছে। আমরা উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক, বিভিন্ন নথিপত্র ভালোভাবে পর্যালোচনা করেছি।’

রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় উভয়পক্ষ ভালো ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশের ৪ হাজার ৪২৭ বর্গ মাইল এলাকায় বিডিআর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। একটি চক্রান্ত। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশকে পিছিয়ে দিতে এ হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

আদালত আরও বলেন, বিডিআর বাহিনী থেকে সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরাতেই এ হামলা সংঘটিত করা হয়েছে।    

রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডে আনা মামলায় দায়ের করা সকল ডেথ রেফারেন্স ও ফৌজদারি আপিলের ওপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন গত ১৩ এপ্রিল শেষ হয়। এর আগে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক পেশ করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

রায়ে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা তাদের সাজা বাতিল চেয়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিল শুনানির জন্য সুপ্রিমকোর্টের বিশেষ ব্যবস্থায় সর্বমোট ৩৭ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এজন্য মোট ১২ লাখ ৯৫ হাজার পৃষ্ঠার ৩৫ কপি ও অতিরিক্ত দুই কপি পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়।

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ ঘটনায় প্রথমে রাজধানীর লালবাগ থানায় হত্যা এবং বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে এসব মামলা নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়। মামলায় সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে হত্যা মামলায় ২৩ বেসামরিক ব্যক্তিসহ প্রথমে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও ২৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আসামি দাঁড়ায় ৮৫০ জনে।

এছাড়া বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ৮০৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় সিআইডি। পরে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে মোট ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বিচার চলার সময়ে বিডিআরের ডিএডি রহিমসহ চার আসামির মৃত্যু হয়। মামলায় আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীরও দণ্ড হয়েছে। সাজা ভোগকালীন বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী এ বাহিনীর নাম পুনর্গঠন করা হয়। নাম বদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।

এলএবাংলাটাইমস/এন/এলআরটি