প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১৪ মার্চ ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসে এক বক্তৃতায় আইন ব্যবস্থা ও অপরাধ নিয়ে আলোচনা করেন। সেসময় তিনি অভিবাসন, ইউক্রেনে যুদ্ধ ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা বলেন। তিনি বাইডেন প্রশাসনের সময়ে গুরুতর অপরাধ, বিচারকদের মধ্যে দুর্নীতি, মিডিয়া আউটলেটগুলির অবৈধতা ও ট্রাম্পের মামলা নিয়ে সংযুক্ত আইন ফার্মগুলির দুর্নীতিপূর্ণ আচরণের অভিযোগ করেন। তবে, ট্রাম্পের দাবীগুলিতে কিছু মিথ্যা ও ভুল রয়েছে এবং বেশ কিছু অভিযোগের কোনো প্রমাণ তিনি দেননি বলে, সিএনএনের ওয়াশিংটন বরোর সিনিয়র সাংবাদিক ড্যানিয়েন ডেল উল্লেখ করেন।
এখানে ট্রাম্পের কিছু দাবির সত্যতা যাচাই করা হলো।
ট্রাম্পের প্রসিকিউশন ও বাইডেন:
ট্রাম্প দাবী করেন, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার অফিস ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই ভবনের দেওয়ালে জন লক্কের একটি উক্তি লেখা রয়েছে, ‘যেখানে আইন শেষ হয়, সেখানে স্বৈরতন্ত্র শুরু হয়।’ আমি সেটা দেখেছি এবং গত চার বছর ধরে আমি দেখেছি, যখন কাউকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এফবিআই ও ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস ব্যবহার করে আক্রমণ করতে দেওয়া হয়েছিল। সেটা কীভাবে কাজ করেছিল? এটা ভালোভাবে কাজ করেনি, এটা ভালো ছিল না। আমি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্বারা আক্রমণিত হয়েছিলাম।’
কিন্তু ট্রাম্পের এ দাবীর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস বা এফবিআই ব্যবহার করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি ফেডারেল মামলা, একটি ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয় প্রত্যাহারের জন্য ট্রাম্পের প্রচেষ্টা এবং একটি তার প্রথম রাষ্ট্রপতিত্বের পরে গোপন নথি ধরে রাখার বিরুদ্ধে, একজন বিশেষ আইনজীবী জ্যাক স্মিথ দ্বারা আনা হয়েছিল। স্মিথকে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ড (যিনি বাইডেন দ্বারা মনোনীত) নিয়োগ করেন, তবে এটি প্রমাণিত নয় যে বাইডেন প্রসিকিউশন প্রক্রিয়াতে জড়িত ছিলেন, এমনকি বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্ট ব্যবহার করে আক্রমণ করেছেন। গারল্যান্ড ২০২৩ সালে বলেছিলেন যে, যদি বাইডেন তাকে কখনও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেন, তবে তিনি পদত্যাগ করবেন এবং তিনি নিশ্চিত যে এমনটি কখনও ঘটবে না।
ট্রাম্পের আরও দুটি মামলা স্থানীয় জেলা অ্যাটর্নিরা করেছিলেন, একটি ম্যানহাটন, নিউইয়র্কে ও একটি ফুলটন কাউন্টি, জর্জিয়ায়। উভয়েই ডেমোক্র্যাট, তবে এখানেও কোনো প্রমাণ নেই যে, বাইডেন বা তার হোয়াইট হাউস তাদের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলেছে। ম্যানহাটন মামলায় ট্রাম্প ব্যবসায় সংক্রান্ত রেকর্ড ভ্রষ্ট করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হন; জর্জিয়া মামলাটি জুন ২০২৪ সালে স্থগিত করা হয়েছিল, যখন একটি আপিল আদালত, জেলা অ্যাটর্নি ফ্যানি উইলিস মামলাটি থেকে অযোগ্য হতে পারেন কিনা তা বিবেচনা করেছিল। দুটি ফেডারেল মামলাও স্মিথ দ্বারা বাদ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হন। ডকুমেন্টস মামলা আগেই ট্রাম্প-মনোনীত ফেডারেল বিচারক দ্বারা খারিজ করা হয়েছিল, কিন্তু স্মিথ তার সিদ্ধান্তকে সংবিধানবিরোধী বলে আপিল করেছিলেন।
বাইডেন ডকুমেন্টস তদন্ত:
ট্রাম্প তার বক্তৃতায় দাবি করেছিলেন যে,‘সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মূলত দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে অযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করে এবং তাই তাকে দোষী সাব্যস্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেউ জানে না রুলিংটা কী ছিল।’
ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, তার কাছ থেকে যা পাওয়া গেছে তার চেয়ে আমি দোষী সাব্যস্ত হলেই ভালো হতো। তারা বলেছিল যে সে কী করছে তা সে জানে না এবং তাই ... তাকে ছেড়ে দিন।’
বাইডেনক দোষী সাব্যস্ত হননি বা করা হয়নি এবং কোন বিচারিক রায় ও ছিল না; বাইডেনকে কোন অপরাধের জন্য অভিযুক্তও করা হয়নি। বাইডেনের গোপনীয় ডকুমেন্ট পরিচালনা সম্পর্কে তদন্তকারী বিশেষ কাউন্সেল রবার্ট হার তার পাবলিক রিপোর্টে লিখেছেন যে, ‘প্রমাণগুলি বাইডেনের দোষ উত্থাপন করার জন্য যথেষ্ট নয় এবং কিছু প্রতিরক্ষা সম্ভবত এমন অভিযোগের জন্য যুক্তিযুক্ত সন্দেহ সৃষ্টি করবে।’
হার রিপোর্টে যে তথ্য লিখেছেন তার প্রতি ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা এটাও বিবেচনা করেছি যে বিচারের সময়, বাইডেন সম্ভবত নিজেকে জুরির সামনে উপস্থাপন করবেন, যেমনটি তিনি আমাদের সাক্ষাৎকারের সময় করেছিলেন, একজন সহানুভূতিশীল, সদালাপী, দুর্বল স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে।’
তবে হার বলেননি যে, তিনি যদি এটি না করতেন তবে তিনি বাইডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতেন। হার বিস্তারিতভাবে মামলার বিভিন্ন সত্য এবং বাইডেনের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা তার মতে সরকারের পক্ষে সর্বসম্মত দোষী সাব্যস্ত রায় জয় করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
ট্রাম্পের শাসনে অভিবাসন:
ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্সির সময়কার অভিবাসন পরিসংখ্যান নিয়ে দুটি দাবি পুনরাবৃত্তি করেছেন। প্রথমত, তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রথম পূর্ণ মাসে, আমরা অবৈধ সীমান্ত অতিক্রমের সর্বনিম্ন সংখ্যা অর্জন করেছিলাম।’ তিনি যদি বলতেন যে, ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ সীমান্ত টহল বাহিনী (বর্ডার প্যাট্রোল) মাত্র ৮ হাজার ৩৪৭ জন অভিবাসী আটক করেছিল- যা অনেক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল- তাহলে তা সঠিক হতো। কিন্তু এটি কখনোই রেকর্ড করা সর্বনিম্ন সংখ্যা নয়। সরকারি ফেডারেল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকের শুরুর কিছু মাস ও তার আগের কিছু বছরে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে আরও কম সংখ্যক অভিবাসন ঘটেছিল।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘আমি যখন প্রথম বার ক্ষমতা থেকে বেরিয়ে আসি, আমাদের অভিবাসন সংখ্যা সর্বনিম্ন ছিল। আমার সর্বকালের প্রিয় চার্টটি, যেখানে লাল তির দেখিয়ে বলা হয়েছিল যে আমাদের সর্বনিম্ন সংখ্যা ছিল; সেদিন নামিয়ে আনা হয়েছিল।’
কিন্তু বাস্তবে, ওই চার্টটি দেখায় না যে, ট্রাম্প অফিস ছাড়ার সময় অবৈধ অভিবাসনের হার সর্বনিম্ন ছিল। বরং, ওই চার্টে যে লাল তিরটি ছিল, সেটি এপ্রিল ২০২০-এর দিকে নির্দেশ করে, যখন ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তখনও আট মাস বাকি ছিল এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বৈশ্বিক অভিবাসন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এপ্রিল ২০২০-এ অভিবাসনের হার তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। কিন্তু ইতিহাসের সর্বনিম্ন নয়। তবে এটাও সত্য যে, এরপর থেকে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ পর্যন্ত, দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অভিবাসনের সংখ্যা প্রতি মাসে ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ইউক্রেন সহায়তা:
ট্রাম্প আরো একটি বিভ্রান্তিকর দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সম্ভবত ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, যেখানে ইউরোপ দিয়েছে মাত্র ১০০ বিলিয়ন ডলার। এই দুটি সংখ্যার কোনোটিই সঠিক নয়, বিশেষ করে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার সংক্রান্ত ট্রাম্পের দাবি একেবারেই ভুল।
জার্মান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি, যারা ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন সহায়তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত- ইউরোপ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পৃথক ইউরোপীয় দেশসমূহ) মোট ২৬৯ বিলিয়ন ডলার সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা প্রতিশ্রুত করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ১২৯ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক বেশি। ইউরোপ ১৪৪ বিলিয়ন ডলার সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা সহায়তা বরাদ্দ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ১২৪ বিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন হিসাব পদ্ধতি অনুসারে মোট সহায়তার পরিমাণে কিছুটা পার্থক্য আসতে পারে, কিন্তু ট্রাম্পের ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
ইউক্রেন সহায়তা পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সরকারের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর জেনারেল) অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য মোট ১৮৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে, যার মধ্যে মাত্র ৮৩ বিলিয়ন ডলার কার্যত ইউক্রেনে পৌঁছেছে এবং এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যয় করা বা ইউক্রেন ছাড়া অন্য দেশে পাঠানো তহবিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন নির্বাচন:
ট্রাম্প বলেছেন যে, তিনি দেশে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনতে চান এবং দাবি করেছেন, ‘নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ কারসাজিপূর্ণ ছিল।’ যদিও এর কোনো প্রমাণ নেই। তিনি সরাসরি ২০২০ সালের নির্বাচন উল্লেখ না করলেও, সাম্প্রতিক মার্কিন নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ কারসাজিপূর্ণ ছিল- এই বৃহত্তর দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
ইরান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো:
ট্রাম্প আবারও ভুল দাবি করেছেন যে, তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ‘ইরান সম্পূর্ণ দেউলিয়া’ ছিল এবং তাই তারা হামাস বা হেজবোল্লাহকে কোনো অর্থ দিত না। বাস্তবে, ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খায় এবং তার শাসনামলের শেষের দিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ইরানের অর্থায়ন কমে যায়, কিন্তু কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। ২০২৪ সালে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা চারজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, ইরান হামাস ও হেজবোল্লাহকে অর্থায়ন করা কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করেনি। এমনকি ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই বলেছিল যে, ইরান এখনও হেজবোল্লাহসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অর্থ দিচ্ছে।
এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস