আন্তর্জাতিক

‘যুদ্ধের কথা ভাবার পর্যায়ে পৌঁছে গেছি’, ব্রিটেনকে সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

হঠাৎ করে ব্রিটেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ কী করবেন, তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হবে—এমন প্রশ্ন এখন সামনে আসছে দেশটিতে। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের প্রস্তুত করতে সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষকে বড় ধরনের সংকটের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। এর মধ্যে পর্যাপ্ত শুকনো ও সংরক্ষণযোগ্য খাবার ও পানীয় জল মজুত রাখা, নাগরিকদের মধ্যে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করার বিষয়ও রয়েছে। এদিকে কয়েক দশক ধরে হালনাগাদ না হওয়া সরকারের তথাকথিত ‘ওয়ার বুক’ বা যুদ্ধকালীন পরিকল্পনার বই নতুন করে তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা চিফ অব দ্য ডিফেন্স স্টাফ স্যার রিচার্ড নাইটনও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার হুমকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনীতে ৩৫ বছরের কর্মজীবনে বর্তমান সময়ই সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। তবে ব্রিটেনের রাস্তায় রুশ ট্যাংক চলে আসার আশঙ্কা কতটা বাস্তব? ইতিহাসবিদ ও ‘War: How Conflict Shaped Us’ বইয়ের লেখক মার্গারেট ম্যাকমিলানের মতে, যুদ্ধের ঝুঁকি এখন শুধু সরাসরি সামরিক হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাষায়, সাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের কেবল কেটে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কম্পিউটার ব্যবস্থায় হ্যাকিং এবং সাইবার হামলার মতো ‘অপ্রচলিত যুদ্ধ’ বা অসম যুদ্ধের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ ৮০ বছর নিজেদের ভূখণ্ডে যুদ্ধ না দেখার পর ব্রিটিশ সমাজ কি সত্যিই যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত? বড় ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো হলে এর প্রভাব সমাজের অন্য খাতে পড়তে পারে—সেই ত্যাগ মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও কি আছে? মার্গারেট ম্যাকমিলান মনে করেন, দীর্ঘদিন শান্তিতে থাকার কারণে ব্রিটিশসহ পশ্চিম ইউরোপের মানুষ যুদ্ধকে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তার মতে, মানুষ এমন একটি ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে শান্তিই স্বাভাবিক অবস্থা এবং সেটি দীর্ঘদিন চলবে। তবে এখন যুদ্ধের ঝুঁকি আগের তুলনায় কাছাকাছি চলে এসেছে—এমন উপলব্ধিও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা ১৯১৪ সালের আগের সময়ের মতো। তখনও ইউরোপে যুদ্ধের আলোচনা ছিল, কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ শুরু হবে—এমন ধারণা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্রিটেনে অনেক মানুষ যুদ্ধকে বীরত্ব ও গৌরবের সঙ্গে দেখতেন। ১৯১৪ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে স্বেচ্ছাসেবকদের ভিড়ও হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ইউরোপীয় সমাজের যুদ্ধ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দেয়। ম্যাকমিলানের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে আধুনিক যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখিয়েছে। এরপর যুদ্ধকে আর আগের মতো গৌরবময় হিসেবে দেখার ধারণা ফিরে আসেনি। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌশলগত গবেষণার অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মিখতা মনে করেন, ইউরোপের অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাব্য যুদ্ধের ঝুঁকি বিশ্বাস করতে না চাওয়ার একটি মানসিকতায় ভুগছে। তার মতে, যুক্তরাজ্যসহ অনেক ইউরোপীয় দেশের মানুষের যুদ্ধ মোকাবিলায় মানসিক প্রস্তুতি কম। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বও সাধারণ মানুষকে সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা যথেষ্ট স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯০-এর দশক থেকে ইউরোপের অনেক দেশ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি কমিয়ে দেয়। রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক হুমকি আর বড় সমস্যা হবে না—এমন ধারণার কারণে প্রতিরক্ষা ব্যয়ও কমতে থাকে। মিখতা জার্মানির রুশ জ্বালানির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সামলানো সম্ভব—এমন ধারণার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিল। অন্যদিকে স্যার রিচার্ড শিরেফ মনে করেন, ২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনই পশ্চিমা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল। তার মতে, রাশিয়া ২০১৪ সাল থেকেই ন্যাটোর সঙ্গে এক ধরনের সংঘাতে রয়েছে, যদিও সেটি সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধ নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়াকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ন্যাটোকে অস্থিতিশীল করতে রাশিয়া পরোক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জিম অরফোর্ড মনে করেন, ‘শত্রু’ ও ‘নায়ক’-এর মতো সরল ধারণার মাধ্যমে যুদ্ধের হুমকিকে দেখার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। তার মতে, যুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি, যুদ্ধ নিয়ে চিন্তা করা এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া—এই তিনটি আলাদা পর্যায়। তার দাবি, ইউরোপ এখন এরই মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে চিন্তা করার পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে। রাশিয়ার কাছাকাছি থাকা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলক বেশি। সুইডেনের উদাহরণটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০০ বছর কোনো যুদ্ধে না জড়ানো সুইডেন দীর্ঘদিন নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করেছে। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর দেশটি সেই অবস্থান পরিবর্তন করে এবং ন্যাটোতে যোগ দেয়। সুইডেনে আংশিক বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুল শেষ করা তরুণদের সামরিক সেবার জন্য নিবন্ধন করতে হয়। নির্বাচিতদের সর্বোচ্চ ১৫ মাস পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে তারা বেসামরিক জীবনে ফিরে গেলেও রিজার্ভ বাহিনীর অংশ হিসেবে থাকেন। দেশটি বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদেরও সংকটকালীন পরিস্থিতিতে কাজে লাগানোর জন্য চিহ্নিত করছে। তবে যুদ্ধ মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি ফিনল্যান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ‘উইন্টার ওয়ার’-এ লড়াই করেছিল ফিনল্যান্ড। বর্তমানে দেশটির রাশিয়ার সঙ্গে ১ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ২০২২ সালের পর সুইডেনের মতো ফিনল্যান্ডও দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার অবস্থান থেকে সরে এসে ন্যাটোতে যোগ দেয়। ফিনল্যান্ডে পুরুষদের জন্য সর্বজনীন বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ রয়েছে। কিছু নারীও স্বেচ্ছায় সামরিক সেবায় যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে তারা রিজার্ভ বাহিনীর অংশ হয়ে যান। ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আর্তো রাটি বলেন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমে যায় এবং পুরো সমাজকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়। দেশটির হাসপাতাল, পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার জন্যও সংকটকালীন দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে। পাশাপাশি সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতাদের জন্য প্রতিবছর সংকট ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের আয়োজন করে ফিনিশ সামরিক বাহিনী। ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। দেশটির নিয়মিত সামরিক বাহিনীতে সদস্য প্রায় ২৩ হাজার। এর বাইরে প্রশিক্ষিত রিজার্ভ বাহিনীর সদস্য প্রায় ১০ লাখ এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার সদস্যের রিজার্ভ সেনা মোতায়েন করা সম্ভব। ২০২৫ সালে ফিনল্যান্ড তার মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে। একই বছর যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল রিচার্ড শিরেফ মনে করেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য ব্রিটেনের বর্তমান প্রায় ৭০ হাজার সদস্যের সেনাবাহিনী যথেষ্ট নাও হতে পারে। তার মতে, প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা তৈরি করতে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ব্যবস্থা বিবেচনা করা হতে পারে। তিনি নরওয়ের মডেলের কথাও উল্লেখ করেছেন। সেখানে স্কুল শেষ করা তরুণদের সামরিক সেবার জন্য নিবন্ধন করতে হয় এবং নির্বাচিতরা এক বছর প্রশিক্ষণ নেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মজীবনে গেলেও সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তাদের সঙ্গে থাকে। শিরেফের মতে, যুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনগণের কাছে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। তার বক্তব্য, দেশের নিরাপত্তার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন—রাজনৈতিক নেতাদের জনগণকে তা সরাসরি ও খোলাখুলিভাবে বোঝাতে হবে।