ক্লিফোর্নিয়াতে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে খুনের সংখ্যা। বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে খুন বেড়েছে ৩১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, খুন হওয়া ব্যক্তিদের এক তৃতীয়াংশ ব্যক্তিই কৃষ্ণাঙ্গ। এর ফলে বর্ণবাদ সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২০ সালে রাজ্যে ২ হাজার ২০২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে খুনের হার ছিলো ১ হাজার ৬৭৯টি। খুনের হার প্রতি এক লাখে চার দশমিক দুই থেকে পাঁচ দশমিক পাঁচ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগে ২০০৭ সালে সর্বশেষ সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৫৮টি খুনের ঘটনা ঘটে। ২০০৮ সালের পর থেকেই খুন সংক্রান্ত অপরাধের হার বাড়ছে।
খুন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩১ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, ৪৫ শতাংশ ব্যক্তি হিস্প্যানিক ও বাকি ১৬ শতাংশ ব্যক্তি ককেশীয় সম্প্রদায়ের।
ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির চারজন বিশেষজ্ঞ এক লাখের অধিক জনসংখ্যা বিশিষ্ট শহরগুলোর উপর একটি গবেষণা চালিয়েছে। গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৯৬৬ সালের পর কেবল ২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়া সর্বনিন্ম হত্যাকাণ্ডের হার দেখা গিয়েছে। এর পাশাপাশিই ষাটের দশকের পর ২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে সহিংসতা ও সম্পত্তি সম্পর্কিত অপরাধের হার সর্বনিম্ন দেখা গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার শহরগুলির অবস্থা অন্যান্য রাজ্যের শহরগুলোর তুলনায় ভাল।
স্টেট অর্নি জেনারেলের অফিস থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন হতে জানা যায়, গত বছর ক্যালিফোর্নিয়াতে ২০১৬ সালের চেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালে ১,৯৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিলো। উক্ত সালকে বিগত দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ বছর বলা হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা বলেন ‘হত্যাকাণ্ডের সংখ্যার বৃদ্ধির পিছনের কারণ এখনো অস্পষ্ট।‘ তাঁর মতে, বন্দুক বিক্রির হার বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। গতবছর রেকর্ডসংখ্যক ৬৮৬,৪৩৫টি হ্যান্ডগান বিক্রি হয়েছে। এর পাশাপাশি ৪৮০,৪০১টি লংগান বিক্রি হয়েছে যা ২০১৬ সালের পর সর্বোচ্চ ।হ্যান্ডগান বিক্রির হার শতকরা ৬৫ দশমিক ৫ ভাগ ও লং গান বিক্রির হার শতকরা ৪৫ দশমিক ৯ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২০ সালে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের এক তৃতীয়াংশেই বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছে। একবছর পূর্বে এর সংখ্যা ছিলো শতকরা ৬৯ ভাগ। এর পাশাপাশি বন্দুক সম্পর্কিত ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। জানা যায়, বন্দুক সম্পর্কিত ডমেস্টিক ভায়োলেন্স থেকে সাহায্যের আহ্বান গত বছর থেকে শতকরা ৪২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বন্টা বলেন ‘আমরা বলতে পারি যে মহামারী আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলেছে।‘ তিনি বন্দুক সহিংসতা সম্পর্কিত রিস্টেনিং অর্ডারের প্রচলন বৃদ্ধি করতে চান।
তিনি বলেন ‘অস্ত্রের সংখ্যার সাথে অর্থনৈতিক স্থিতি ও হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি মনে করি যে এগুলো হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পিছনে কাজ করছে।‘
তিনি উল্লেখ করেন যে ক্যালিফোর্নিয়ায় দেশের সবচেয়ে কঠিন আগ্নেয়াস্ত্র আইন রয়েছে এবং বেশিরভাগ মানুষ তাদের অস্ত্র সঠিকভাবে ব্যবহার করে। তবে তিনি বলেন যে তথ্য অনুসারে এখনও অনেক কিছু করা বাকি।
স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, মোট খুনের এক-তৃতীয়াংশই মতানৈক্যতার ফলে ঘটেছে। বাকি খুনগুলোর মধ্যে শতকরা ২৮ ভাগ গ্যাং সম্পর্কিত কারণে ঘটে। এর পাশাপাশি শতকরা ৭ ভাগ হত্যাকাণ্ড ডমেস্টিক ভায়োলেন্স ও ৮ দশমিক ৫ ভাগ হত্যাকাণ্ড চুরি বা ধর্ষণের সাথে সম্পর্কিত।
রাজ্যের প্রতিবেদন মতে, হত্যাকাণ্ড নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেলেও সহিংস অপরাধ পূর্বের চেয়ে শতকরা ১ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মতে, ডাকাতি ও ধর্ষণের হার কমে যাওয়ায় সহিংস অপরাধের হার কমছে। ২০১৯ এর তুলনায়, ডাকাতির হার শতকরা ১৪ ভাগ ও ধর্ষণের হার ৮ ভাগ কমেছে। তবে, পূর্বের তুলনায় হাতাহাতির ঘটনা ৯ শতাংশ ও অগ্নিসংযোগ ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে
এর পাশাপাশি সম্পত্তি জনিত অপরাধ ৭ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কমেছে। চুরির হার কমেছে ১৫ শতাংশ ও ডাকাতির হার কমেছে ৪ শতাংশ। কিন্তু, গাড়ি চুরির হার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
ইউসি বার্কলির একদল বিশেষজ্ঞ গর্ভ. গেভিন নিউসমের কমিটি অন দ্যা রিভিশন অফ দ্যা পেনাল কোডের নিকট একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে,গত বছরের মহামারী ও স্টে এট হোম অর্ডারের কারণে অপরাধের ধরণে অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন এসেছে।
তাদের মতে, বাড়িতে থাকার আদেশ জারি হওয়ার পর সামাজিক মেলামেশার হার অনেকাংশে কমে গিয়েছে। এর ফলে চুরি, ডাকাতি ও ধর্ষণের মতো অপরাধ কমেছে।
বিশেষজ্ঞ দলটির সদস্য মিয়া বার্ড বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়াতে হত্যাকাণ্ডের হারের আকস্মিক বৃদ্ধি আমাদেরকে অবাক করেছে। পুরো দেশের সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার অপরাধের হার ধাপে ধাপে এগুচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় ক্যালিফোর্নিয়ার অবস্থান ভাল। এটির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারছি যে ক্যালিফোর্নিয়া সহ সারা দেশের জন্য এই বৃদ্ধির হার চিন্তার বিষয়।‘
এফবিআইয়ের মতে, দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় ক্যালিফোর্নিয়াতে সম্পত্তি সম্পর্কিত অপরাধের হার কমছে। কিন্তু , ক্যালিফোর্নিয়ায় গাড়ি চুরির হার অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি। এটির কারণ অজানা।
সান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক সেন্টার অন জুভেনাইল এন্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস এ ব্যাপারে বলে, ‘মহামারীর পর অবস্থা স্বাভাবিক হলে ক্যালিফোর্নিয়ার অপরাধ জগত আগের রূপে ফিরতে পারে। ২০২০ সাল আমাদেরকে দেখিয়েছে কিভাবে একাকীত্ব, বেকারত্ব, ব্যবসায় অসফলতা ও সামগ্রিক শোক সামাজিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।‘
এলএবাংলাটাইমস/এমডব্লিউ