যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) কর্মকর্তারা বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত পরোয়ানা ছাড়াই অভিবাসন অভিযানের সময় বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করতে পারবেন—এমন নির্দেশনা রয়েছে ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা একটি অভ্যন্তরীণ মেমোতে। নথিটি বুধবার প্রকাশ্যে আসে।
১২ মে তারিখের ওই মেমোটি, যা আইসিইর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টড লায়ন্সের নামে জারি, দুইজন হুইসেলব্লোয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল (কনেকটিকাট)–এর কাছে সরবরাহ করেন।
মেমোতে বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিবাসন বিচারক “চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ” (Final Order of Removal) দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পরোয়ানা (Administrative Warrant) ব্যবহার করে বাড়িতে প্রবেশ করে গ্রেপ্তার করা যাবে। প্রশাসনিক পরোয়ানা গ্রেপ্তারের অনুমতি দেয়, তবে এটি বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেট স্বাক্ষরিত বিচারিক পরোয়ানা (Judicial Warrant) থেকে আলাদা, যা সাধারণত বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দেয়।
নথিতে লায়ন্স উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র প্রশাসনিক পরোয়ানার ভিত্তিতে “নিজ বাসভবনে” কাউকে আটক করা—এটি আগের প্রচলিত পদ্ধতি থেকে একটি পরিবর্তন।
মেমোতে বলা হয়, “অতীতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS) সাধারণত কেবল প্রশাসনিক পরোয়ানার ওপর নির্ভর করে কারও বাসভবনে গ্রেপ্তার চালায়নি। তবে সাম্প্রতিক আইনি মূল্যায়নে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট এবং অভিবাসন বিধিমালা এই উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক পরোয়ানা ব্যবহারে বাধা দেয় না।”
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ইমিগ্রেশন বিচারক, বোর্ড অব ইমিগ্রেশন অ্যাপিলস অথবা যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বা ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকের জারি করা চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ থাকলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তার বাসভবন থেকেই গ্রেপ্তার ও আটক করা যেতে পারে।
তবে কিছু সাধারণ নির্দেশনাও রয়েছে। ফর্ম I-205 ব্যবহার করে অভিযানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের “নক অ্যান্ড অ্যানাউন্স” নীতি মানতে হবে—অর্থাৎ দরজায় কড়া নাড়ে নিজেদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানাতে হবে এবং ভেতরের লোকজনকে সাড়া দেওয়ার জন্য সময় দিতে হবে। সাধারণভাবে ভোর ৬টার আগে বা রাত ১০টার পরে বাড়িতে প্রবেশ না করার কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে কেবল “যথাযথ ও যুক্তিসংগত মাত্রার বলপ্রয়োগ” করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) প্রথম এই নথির খবর প্রকাশ করে।
ডিএইচএস-এর মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন এক বিবৃতিতে বলেন, যেসব অবৈধ অভিবাসীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পরোয়ানা বা I-205 (বহিষ্কার পরোয়ানা) জারি করা হয়, তারা ইতোমধ্যে পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন এবং একজন অভিবাসন বিচারকের কাছ থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “এই পরোয়ানা জারির ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা সম্ভাব্য অপরাধের যথেষ্ট ভিত্তিও পেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট ও কংগ্রেস বহু দশক ধরেই অভিবাসন প্রয়োগে প্রশাসনিক পরোয়ানার বৈধতা স্বীকার করে আসছে।”
তবে হুইসেলব্লোয়ারদের পক্ষে আইনি সহায়তাকারী সংগঠন Whistleblower Aid বলেছে, এই নীতিমালা দীর্ঘদিনের ফেডারেল আইন প্রয়োগ প্রশিক্ষণ ও সংবিধানভিত্তিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সংগঠনটির বক্তব্য, “ফর্ম I-205 কোনোভাবেই আইসিই এজেন্টদের বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের—যাদের অনেকেরই পূর্ব আইন প্রয়োগের অভিজ্ঞতা নেই—চতুর্থ সংশোধনী (Fourth Amendment) উপেক্ষা করতে শেখানো সবার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।”
সিনেটর ব্লুমেনথাল জানান, ‘অল-হ্যান্ডস’ লেখা থাকলেও মেমোটি নাকি সবার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করা হয়নি। বরং কিছু এজেন্টকে মৌখিকভাবে জানানো হয়, কাউকে দেখানো হলেও কপি রাখতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “যারা প্রকাশ্যে এই নির্দেশনার বিরোধিতা করতেন, তাদের চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়েছিল।”
হুইসেলব্লোয়ার এইড আরও জানায়, বাস্তবে মেমোটি কেবল “নির্বাচিত ডিএইচএস কর্মকর্তাদের” দেখানো হয় এবং পরে সুপারভাইজাররা মৌখিক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নির্দেশনা ছড়িয়ে দেন।
উল্লেখযোগ্য যে, মেমোটির তারিখ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের চার মাসও পূর্ণ হওয়ার আগের। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কারের অঙ্গীকার করেছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমন অভিযান—বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতে—বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে এক আইসিই এজেন্টের গুলিতে মার্কিন নাগরিক রিনি গুড নিহত হওয়ার পর বড় ধরনের প্রতিবাদ হয়।
ব্লুমেনথাল বলেন, “এই নতুন আইসিই নীতি আমেরিকানদের আতঙ্কিত করা উচিত। এটি আইনগত ও নৈতিকভাবে ঘৃণ্য এবং আমাদের গণতন্ত্রে সরকারের বিচারকের অনুমতি ছাড়া বাড়িতে ঢোকার সুযোগ—ব্যতিক্রম ছাড়া—নেই।”
মেমোতে স্পষ্ট করা হয়েছে, ফর্ম I-205 কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট নয় এবং এটি কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা উচিত।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির ডিপোর্টেশন ডাটা প্রজেক্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর ২০ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে আইসিই গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজারের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না। এই তথ্য আইসিইর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম