লস এঞ্জেলেস

মিনিয়াপোলিসে আলেক্স প্রেটির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ, উত্তাল লস এঞ্জেলেস

মিনিয়াপোলিসে ৩৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াসহ দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান এবং অভিবাসন দমন অভিযানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউনে ফেডারেল ভবনের সামনে প্রায় ৩০০ জন বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তারা অভিবাসনবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি নিহত আলেক্স প্রেটির হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দেন— “When the streets get hot, ICE melts.” ইন্টেনসিভ কেয়ার নার্স আলেক্স প্রেটি শনিবার মিনেসোটায় নিহত হন। তার মৃত্যু ঘটে চলতি মাসের ৭ জানুয়ারি নিহত রেনে গুডের ঘটনার পরপরই। তিন সন্তানের জননী রেনে গুডকেও একটি ফেডারেল অভিযানের সময় একাধিকবার গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। লস অ্যাঞ্জেলেসের বিক্ষোভকারী তারা গার্নার বলেন, “আমরা মিনিয়াপোলিসের পাশে আছি, কিন্তু আমরা জানি আইসিইর সন্ত্রাস শুধু মিনিয়াপোলিসে সীমাবদ্ধ নয়। তারা আমাদের শহরকেও জর্জরিত করছে।” ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রেটিকে একজন সহিংস ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ ও সম্ভাব্য হামলাকারী হিসেবে আখ্যা দিলেও তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং মিনিয়াপোলিস ভিএ মেডিকেল সেন্টারে যেসব ভেটেরান রোগীর চিকিৎসা তিনি করতেন—তারা তাকে দয়ালু ও মানবিক মানুষ হিসেবেই স্মরণ করছেন। রোববার তীব্র শীত উপেক্ষা করে মিনিয়াপোলিসে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। তুষারঢাকা শহরের রাস্তায় তারা হাঁটেন এবং প্ল্যাকার্ড বহন করেন—
“Stop killing our neighbors”, “It was murder”। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, “Shut it down!” এবং “No more Minnesota nice!”। এক পর্যায়ে উল্টো করে ধরা মার্কিন পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারীকে দেখা যায়। লস অ্যাঞ্জেলেসে রোববার বিকেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভ আলামেডা স্ট্রিটে ছড়িয়ে পড়লে প্রায় বিকেল ৪টার দিকে দুই দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ফুটপাতে ফিরে যেতে নির্দেশ দিলে তারা স্লোগান তোলে— “Pigs go home.” প্রায় পাঁচ মিনিট পর পুলিশ সরে যায়। এরপর বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় একটি মার্কিন পতাকায় লাইটার ফ্লুইড ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আবার উত্তেজনা ছড়ায়, যখন প্রায় ৩০ জন লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ কর্মকর্তা ৮০ জন বিক্ষোভকারীর মুখোমুখি হন। মাথার ওপর ঘুরতে থাকে পুলিশ হেলিকপ্টার। প্রায় ২০ মিনিট স্লোগান দেওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা সড়ক ছেড়ে ফুটপাতে ফিরে যান। এক নারী লস অ্যাঞ্জেলেস র‍্যামসের জ্যাকেট পরে চিৎকার করে বলেন, “এই সময় তো আমাদের সবাইকে খেলা দেখার কথা!” লং বিচে রোববার কয়েকশ মানুষ বিক্ষোভ করেন। মিনিয়াপোলিসের গুলির ঘটনা এবং লং বিচের হোটেলগুলোতে ফেডারেল এজেন্টদের অবস্থানকে কেন্দ্র করেই এই বিক্ষোভ। লং বিচের এক বিক্ষোভকারী, ৩৯ বছর বয়সী বারটেন্ডার র‍্যান্ডাল কসি বলেন, “মানুষ এখানে এসেছে কারণ আমরা এমন কোনো সরকারি সংস্থাকে মেনে নিতে পারছি না, যাদের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা অথচ কোনো জবাবদিহি নেই। এটা বাম-ডান রাজনীতি নয়, এটা ঠিক আর ভুলের প্রশ্ন।” বিক্ষোভকারীরা লং বিচ বিমানবন্দরের কাছে হ্যাম্পটন ইন ও হোমউড সুইটস হোটেলের চারপাশে মিছিল করেন, যেখানে অভিবাসন এজেন্টরা থাকছেন। পুলিশ পাহারা দিলেও বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন— “ICE out of Long Beach!” সো ক্যাল আপরাইজিংয়ের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি ব্রাইসন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো ব্যবসাগুলোকে জানানো—যদি তারা কোনোভাবে আইসিইকে সহায়তা করে, তাহলে বাসিন্দারা তাদের সমর্থন করবে না। তারা আমাদের শহর বা রাজ্যে স্বাগত নয়। তারা সন্ত্রাস চালাচ্ছে।” সূর্যাস্তের সময় এল সেগুন্দো সিটি হলে প্রায় ২৫০ জন মানুষ মোমবাতি প্রজ্বালন করে প্রেটি ও গুডের স্মরণে শ্রদ্ধা জানান। তারা গোলাপ, শিশু, কুকুর ও নানা প্ল্যাকার্ড নিয়ে উপস্থিত হন—যার মধ্যে ছিল, “Believe your eyes, not Trump’s lies.” এক শিক্ষার্থী কবিতা আবৃত্তি করেন এবং তিন নারী দল বেঁধে প্রতিবাদী গান গাইতে নেতৃত্ব দেন। আয়োজক জন পিকহ্যাভার বলেন, “ফেডারেল পর্যায়ে যেসব অভিবাসন অভিযানের দৃশ্য আমরা দেখছি, তাতে এই দেশে মানবিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু আমরা আশার আলো জ্বালাতে চাই।” এদিকে শুক্রবার ও শনিবারও লস অ্যাঞ্জেলেসে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেন। প্লাসিতা অলভেরা মার্কেটপ্লেসে ঝুলতে দেখা যায় একটি ব্যানার— “From Los Angeles to Minneapolis, stop ICE terror.” লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন ব্যাস প্রেটির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এই সহিংসতা বন্ধ হতেই হবে। প্রেসিডেন্টকে মিনিয়াপোলিস ও অন্যান্য শহর থেকে এসব সশস্ত্র ফেডারেল বাহিনী সরিয়ে নিতে হবে।” অন্যদিকে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি রিপাবলিকান পার্টি দ্রুত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানায় এবং পূর্ণ তদন্তের ওপর জোর দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক বিক্ষোভকারী বলছেন, প্রেটির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড নয়—এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহিহীনতার প্রতীক, যার বিরুদ্ধে এখন রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম